বিষাদের বৈচিত্র্যময় সুর

Pablo Neruda

A poet closer to death than to philosophy, closer to pain than to intelligence,
A poet closer to blood than ink.

চিলি-র কবি পাবলো নেরুদা বিষয়ে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার এই উক্তি যেন পাঠকের সামনে উন্মোচিত করে তোলে নেরুদার অকৃত্রিম কবিমনকে। প্রকৃত কবিতা আসলে কবির নিজের সঙ্গে এক নিভৃত কথোপকথন। কবিতা অনেকটা স্বপ্নের মতো। স্বপ্নে যেমন অবচেতন মন জেগে ওঠে, ভেসে ওঠে মনের গভীর-গোপন অতলে লুকিয়ে রাখা ইচ্ছের সাংকেতিক দৃশ্যরূপ, তেমনই কবিতার মধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে কবি মনের বিচিত্র দিক। নেরুদা মূলত সাম্যবাদের কবি এবং কমিউনিস্ট কবি হিসেবে অধিক জনপ্রিয় হলেও তাঁর কবিতা ছুঁয়ে গিয়েছে মানব-অভিজ্ঞতার বিভিন্ন আশ্চর্য বাঁক। অনেক সময়েই তাঁর লেখনীর বৈচিত্র্যকে ঢেকে দেয় বামপন্থী কবি হিসেবে নেরুদার সর্বজনবিদিত পরিচয়। নেরুদার কবিতায় বিষাদ, বিরহ এবং মৃত্যুর নীল-নীরবতা যেন হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ, গতিময়, মহাজাগতিক বিস্ফোরণ।

বিষণ্ণতা কবিকে করে তুলেছিল সত্যদর্শী। মানবজীবনের ক্ষুদ্রতাই তাঁকে দিয়েছিল এক সীমানাহীন মহাবিশ্বের ধারণা, যার মধ্যে বিলীন হতে চেয়েছেন তিনি, চেয়েছিলেন মহামুক্তির পথ খুঁজে নিতে। নিয়েছেনও তাই। নেরুদার কবিতায় তাই মানব-অস্তিত্ব যাত্রা করেছে সীমা থেকে অসীমের দিকে। বিষাদ পরিণত হয়েছে একরকম মৌনতার নিরুচ্চার উৎসবে। নেরুদা বিষাদকে দূরে ঠেলেননি, তিনি ওই গাঢ়, অতল অন্তর্বেদনার সমুদ্রে সাঁতরাতে চেয়েছেন। মৃত্যু তাঁর কাছে ছিল গভীরভাবে জীবন্ত, স্পন্দনমুখর। প্রেম, বিচ্ছেদ, বিরহ— সমস্ত অনুভূতির ক্ষেত্রেই নেরুদার কবিতা নিয়েছে এমন এক অভিনব ভাষাপথ, যা আপাতদৃষ্টিতে অচঞ্চল, শান্ত, কোলাহলবিহীন এক স্বর বলে মনে হলেও তার অন্তরে প্রবাহিত হয়েছে এক চঞ্চল, চেতনাময় স্রোত। তাঁর কবিতায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়াও যেন এক মহাপ্রাপ্তি। স্থান-কাল-পাত্র সমস্ত কিছু নিয়ে ডুবে-যাওয়া আসলে এক গোপন উত্থান, সমুদ্রের অতল থেকে এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠা! নেরুদা তাই A Song of Despair-এ যখন লিখছেন—

You swallowed everything, like distance
Like the sea, like time. In you everything sank!
It was the happy hour of assault, and the kiss
The hour of the spell that blazed like a lighthouse
Pilot’s dread, fury of a blind diver
Turbulent drunkenness of love, in you everything sank.

তখন বিষাদের এই গান হয়ে উঠছে নক্ষত্রালোকিত আকাশের মতো জাজ্জ্বল্যমান। কারণ তাঁর বিরহজ্বলন্ত চওড়া আকাশে ছড়িয়ে রয়েছে প্রেমের জাদুময়তার স্মৃতি! তিনি বিষাদ-বিষয়ক কবিতায় ব্যবহার করছেন ‘হ্যাপি’-র মতো প্রাণবন্ত শব্দ, ব্যবহার করছেন ‘অ্যাসল্ট’-এর মতো জোরালো অভিঘাতপূর্ণ শব্দ— তাও আবার একই বাক্যে। বলছেন, ‘হ্যাপি আওয়ার অফ অ্যাসল্ট অ্যান্ড দ্য কিস’— অর্থাৎ, এমন এক সময়ের কথা পাঠক জানতে পারছেন, যা একইসঙ্গে আনন্দ এবং আঘাতের প্রবলতায় সম্পৃক্ত। এইরকম তীব্র আবেগ কি সমস্ত পাঠকই কোনও-না-কোনও সময়ে অনুভব করেননি? করেছে নিশ্চিত, কিন্তু সমস্ত বিমর্ষতা, রোমাঞ্চ, হতাশা, রহস্য, আতঙ্ক, আক্রোশকে এক বিন্দুতে এনে যে এমন বিষাদের বৈচিত্র্যময় সুর সৃষ্টি করা সম্ভব, তা কি ভাবা যায়?

আরও পড়ুন: কোহেনের কবিতাই তাঁর গানের মূল শক্তি? লিখছেন বৃন্দা দাশগুপ্ত…

এই যে বার বার করে এই দীর্ঘ কবিতায় নেরুদা লিখছেন,  In you everything sank!— কে এই ‘you’? এই ‘তুমি’ কি প্রেম, না কি মৃত্যু? না কি বিষাদের পাতালস্পর্শী সমুদ্র? এই তলিয়ে যাওয়া, মিলিয়ে যাওয়া, লীন হয়ে যাওয়া কী আকস্মিক বৈচিত্র্যময়তায় হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের, নিবিড়তার, প্রগাঢ়তার এক অন্তর্লীন বিস্ফোরণ! নেরুদা হয়তো মৃত্যু, বিষাদ, প্রেমের অন্তর্ঘাত এই সমস্ত অনুভূতিকেই চেয়েছিলেন এক অদৃশ্য অথচ অবশ্যম্ভাবী সামগ্রিকতা দিয়ে উপলব্ধি করতে। নেরুদার চিন্তার স্রোত তাঁকে বার বার নীরবতার নির্জন সৈকতে নিয়ে গেলেও তাঁর মনের অন্তর্স্রোত অবিরত প্রবাহিত হয়েছে এক রূদ্ধবাক বিস্ময়বোধ ও চমৎকারিত্ব অনুধাবনের দিকে।

কবি তাঁর Fleas Interest Me So Much কবিতায় লিখেছেন,

They are the dancer of celestial spheres
Delicate acrobats
In the softest and most profound circus
Let them gallop on my skin.

কবিতাটিতে এক ধরনের বিরক্তি-উদ্রেককারী পতঙ্গের কথা বলতে গিয়ে নেরুদা নিয়ে এসেছেন ব্রহ্মাণ্ডের প্রসঙ্গ। শুধু তাই নয়, এই বাক্যগুলির মধ্যে তিনি প্রবেশ করালেন এক অদম্য গতি, নিয়ে এলেন রক্তের উচ্ছ্বাসময় অথচ শব্দহীন জোয়ার। এই পোকাগুলোর কামড়ে তাঁর ভেতরে যে-অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তাকে সহজেই অতিক্রম করে তিনি পাড়ি দিতে পেরেছেন আরও বৃহত্তর আবিষ্কারের দিকে।

একটি কবিতার নাম Gentleman Alone। সেই কবিতায় একাকিত্মের বর্ণনা দিতে গিয়ে নেরুদা লিখছেন আশ্চর্য কিছু কথা!

And the hours after lunch, when the students and priests are masturbating,
And the animals mount each other openly,
And the bees smell of blood, and the flies buzz cholerically
And cousins play strange games with cousins…

এ এক অন্যরকম উদ্গীরণ। এ হল মানব-অভিজ্ঞতার এক সৎ এবং তীব্র উদ্ভাস। নেরুদা একাকিত্বের বিষণ্ণতার সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন নিষিদ্ধ দৈহিক মিলনের রোমাঞ্চ, শিহরন, প্রাঞ্জলতা! স্বমেহনের সঙ্গে একাকিত্ব গভীরভাবে সম্পর্কিত। কী অদ্ভুত! জীবজন্তুরা প্রকাশ্যে যেখানে যৌন মিলনে লিপ্ত, সেখানে ছাত্র এবং পাদ্রিরা ব্যস্ত হস্তমৈথুনে। প্রশ্ন হল, অন্য সকলের কথা বাদ দিয়ে কবি ছাত্র এবং পাদ্রিদের টেনে আনলেন কেন? ছাত্রদের কাজ, জ্ঞানান্বেষণ অর্থাৎ সাধনা। ধর্মযাজকদের কাজ অবধারিতভাবেই ধর্মপ্রচার এবং সাধনা। সাধকদের হতে হবে বীতকাম— এমনটাই আশা করে সমাজ। কিন্তু এই প্রত্যাশা মানুষের স্বাভাবিক কামপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়মাত্র।

কবি এই কবিতায় পাঠককে সত্যদর্শন করাচ্ছেন৷ একইসঙ্গে তিনি নিয়ে আসছেন মৌমাছিদের কথা, যাদের শরীরে রক্তের গন্ধ, আনছেন মাছির ভনভনানির কথা। মৌমাছির শরীরে রক্তগন্ধ এক অপ্রত্যাশিত বিষয়, আবার মাছিবাহিত রোগ যেহেতু কলেরা, তাই বাক্যের পরের অংশটি অত্যন্ত প্রত্যাশিত। এরপর জ্ঞাতি-ভাইবোনের একে-অপরের সঙ্গে অদ্ভুত সব খেলায় লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারটিও পাঠকের ভাবনার বাইরে। সুতরাং, দু’টি বাক্যের পরিসরে কবি এমন যাতায়াত করেছেন, যেখানে পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন কবিতাটির চলার পথ নিয়ে। আসলে একজন একাকী মানুষের অনন্ত পর্যবেক্ষণ, নিরন্তর শারীরিক চাহিদাকে গুটিয়ে রাখা এবং সেই অতৃপ্তি থেকেই এমন অনেক কিছু খুঁটিয়ে লক্ষ করা সম্ভব, যা কোনও পরিতৃপ্ত মানুষের চোখে পড়বে না, সে-কথাই মূলত এই কবিতা পাঠককে বলছে। আসলে কবি নিজেই সেই একাকী মানুষ এবং এই কবিতা তাঁর গোপন জার্নালের একটি পাতা। এই কবিতার সূত্র ধরে মনে পড়ছে Fable of the Mermaids and the Drunks কবিতাটির কিছু লাইন—

All those men were there inside
When she came in totally naked.
They had been drinking: they began to spit. ….
The insults flowed down her gleaming fresh.
Obscenities drowned her golden breasts…..
They blackened her with burnt corks and cigarette stubs,
And rolled around laughing on the tavern floor.

এই কবিতা আত্মসমালোচনার। একজন তীব্র অনুভূতিপ্রবণ পুরুষ হিসেবে নারীদের প্রতি পুরুষজাতির অন্যায় ক্ষমতাপ্রদর্শন এবং যথেচ্ছ অত্যাচার করার স্বাধীনতাকে নেরুদা সমালোচনা করেছেন। একজন পুরুষ হয়েও তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন পুরুষের কদর্য চরিত্র। শুধুমাত্র শারীরিক শক্তির আধিক্যের কারণে সমাজ পুরুষের হাতে তুলে দিয়েছে নারীশরীরকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করবার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারার অন্ধ গর্বে পুরুষ বার বারই হারিয়ে ফেলেছে মনুষ্যত্ব। তাই এই কবিতার শেষে এসে অনেক পুরুষ দ্বারা অত্যাচারিত ধর্ষিতা নারী হয়ে উঠছে অলৌকিক মৎস্যকন্যা। সমস্ত লাঞ্ছনা উপেক্ষা করে সে প্রবেশ করছে নদীগর্ভে। এই পর্যন্ত এসে মনে হয় নেরুদা মেয়েটির জয়কে সুনিশ্চিত করলেন। কিন্তু শেষ দু’টি লাইন বলে দেবে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে এমন প্রত্যাশা বৃথা। শেষ দু’লাইন এরকম—

and without looking back she swam again
swam towards emptiness, swam towards death.

অর্থাৎ, এক মৃত্যুকে কাটিয়ে মেয়েটি প্রবেশ করল অন্য একটি মৃত্যুতে। কিন্তু তবু দ্বিতীয় মৃত্যু অবশ্যই প্রথমটির তুলনায় সুখকর। এই কবিতা পিতৃতন্ত্রের প্রতি এক উচ্চকিত ধিক্কার।

নারী-পুরুষের প্রেম সম্পর্কে Poor Creatures কবিতায় নেরুদা এনেছেন এমন এক দিক, যা একেবারে সত্য হলেও এই বিষয়টির ওপর খুব একটা আলোকপাত করা হয় না। কবিতাটির খানিক অংশ পড়ে নেওয়া দরকার—

What it takes on this planet,
To make love to each other in peace.

অর্থাৎ, কবি জানতে চাইছেন যে, এখন নারী এবং পুরুষ এই পৃথিবীতে যদি একটি নিরঙ্কুশ, শান্তিপূর্ণ প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চান, তাহলে তাদের কী করা উচিত? কেন এই শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক সম্ভব নয়, তা বোঝাতে কবিতাটি বলছে—

Everyone pries under your sheets,
Everyone interferes with your loving.
They say terrible things about a man and woman,
Who after much milling about,
all sorts of compunctions,
do something unique,
they both lie with each other in one bed.

প্রেমাবদ্ধ নারী-পুরুষকে বাদ রাখলে, বাকি অন্যান্য সমস্ত মানুষ একযোগে সচেষ্ট হয়ে ওঠে সম্পর্কটার ভেতরে তাদের নিজস্ব মতামত এবং চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রবেশ করতে। দুই তরুণ-তরুণীর হাঁড়ি থেকে কম্বলের তলা অব্দি সমস্ত খবর তাদের জানা চাই। অবশ্য সত্যিটা না জানলেও ক্ষতি নেই, কারণ এই সম্পর্ক বিষয়ে নানা কুরুচিকর রটনা তারা রটাতে থাকে। এই সব কিছু বলার পর কবি কবিতাটিতে নিয়ে আসেন এক দুর্দান্ত বাঁক। তিনি বলেন, চারপাশের সমস্ত মিথ্যে রটনা শুনে বিচলিত, বিরক্ত, অনুশোচনায় কাতর ওই নারী-পুরুষ অবশেষে অনিবার্য এবং সঠিক কাজটিই করে। একদিন সত্যিই তারা নিজেদের আবিষ্কার করে একই বিছানায় পাশাপাশি শায়িত অবস্থায়। অর্থাৎ, প্রকৃত প্রেম নিজে এতখানি স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, তাকে নানাভাবে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করা হলেও অবশেষে সম্পর্কের বাইরে থাকা মানুষদের সেই উদ্দেশ্য কোনওদিনই সফল হয় না। সবশেষে জয়ী হয় প্রেমই।

I Like You Calm As if You Are Absent কবিতায় নেরুদা জানাচ্ছেন তিনি চান, তাঁর প্রেমিকা শান্ত থাকুন, যেন তিনি আশেপাশে উপস্থিতই নন। তিনি এতই দূরে থাকুন, যাতে কবির ডাকও তাঁর কর্ণগোচর না হয়। যেন তাঁর প্রেমিকার তরফ থেকে কোনও সাড়া না আসে এবং এক সময়ে এই সাড়াহীন নৈঃশব্দকে তিনি মেনে নিতে পারেন। এতক্ষণ পর্যন্ত একরকম বিষাদ এবং বিরহভাবের ওপরই ভর করে কবিতাটি এগোলেও শেষ লাইনে গিয়ে পাঠক আবার পড়ে যায় এক আকস্মিক আবেগের উদ্ভাসের মুখে! এই কবিতার শেষ লাইনে কবি আগের বলা সমস্ত কথাকে অস্বীকার করছেন। কবি ব্যবহার করছেন ‘প্যালিনোডি’ স্টোরিটেলিং টেকনিক! আমরা পাচ্ছি এমন একজন কথক, যিনি ভরসাযোগ্য নন, অর্থাৎ ‘আনরিলায়েবল ন্যারেটর’-কে, অথচ শেষপর্যন্ত পাঠক তাঁর কথা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। শেষ লাইনটি বলছে— And I thrill then I thrill: that it cannot be so. অর্থাৎ, এই যে কবি-কাঙ্ক্ষিত প্রেমিকার সাড়াহীনতা, তা আসলে কবির তরফে সমাজ-আরোপিত সংযম-শিক্ষা আয়ত্ত করার প্রচেষ্টামাত্র। শেষ লাইনে সমস্ত সংযম ভেঙে জেগে থাকে কবির মুখোশহীন, অকপট, বিশুদ্ধ প্রেমাকাঙ্ক্ষা। তাই প্রেমিকার তরফ থেকে সাড়া আসবেই, তা ভাবার সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর শরীর-মন উল্লসিত, রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে।

নেরুদার সদাচঞ্চল মনের এক উজ্জ্বল বিচ্ছুরণ পাওয়া যায় তাঁর Ode to Age কবিতায়। সময়ের স্বাভাবিক চলনকে অস্বীকার করে এই কবিতা। সময়কে অস্বীকার করা মানে বয়সকেও অস্বীকার করা। কবিতার প্রথম লাইনেই নেরুদা একেবারে স্পষ্ট উচ্চারণে বলছেন— I don’t believe in age. জীবন থেকে মৃত্যুর দিকে মানুষের যে-যাত্রাপথ, তাকে সময় দিয়ে পরিমাপ করা যায় বলে কবি মনে করেননি। তিনি বিশ্বাস করেছেন, সমস্ত বৃদ্ধ মানুষের সত্তার মধ্যে বসবাস করে একটি করে শিশু। আবার অনেক সময়ে শিশুরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ মানুষের মতো পর্যবেক্ষণ করে বয়স্কদের। সুতরাং, কোন মানুষ জীবনের কত বছর অতিক্রম করেছে— তা দিয়ে কিছুই বিচার করা সম্ভব নয়। তাই তিনি প্রশ্ন রেখেছেন—

Shall we measure
life
in metres or kilometres
or months?
How far since you were born?
How long must you wander
Until like all men
Instead of walking on its surface
We rest below the earth?

কবিতা নিজেই যে এক অলৌকিক ও সাংকেতিক রহস্যময়তা নিয়ে নেরুদাকে স্পর্শ করেছিল তা বোঝা যায় তাঁর ‘পোয়েট্রি’ কবিতায়। এই কবিতার ছত্রে-ছত্রে তিনি বলে চলেছেন তাঁর প্রথম কবিতা লেখার অভিজ্ঞতার কথা, কিন্তু কবিতাটি পড়তে-পড়তে পাঠক বুঝতে পারেন, কেন এই কবির কাব্যভাষা স্পর্শ করতে পেরেছে অনন্ত, অসীম ত্রিভুবনের অন্তর্নিহিত সৃষ্টিস্রোতকে। কারণ লিখতে গিয়ে তাঁর চোখের সামনে উন্মোচিত হয়েছে নক্ষত্রলোক, মহাবিশ্বের অনন্ত পরিসর। তিনি শুনতে পেয়েছেন বিশ্বজগতের গভীর হৃৎস্পন্দনের শব্দ! তাই নেরুদা লিখছেন—

And suddenly I saw
The heavens unfastened
And open
Planets palpitating plantations
Shadow perforated
Riddled
With arrows, fire and flowers
The winding night, the universe.

নেরুদাকে যতই বিষণ্ণতা, মৃত্যু এবং বিরহের কবি বলা হোক, আসলে তিনি সর্বক্ষণ নিজের মধ্যে বহন করেছেন এক সহজ স্বতঃস্ফূর্ততা ও জীবনমুখিতা। মানবজীবন এবং তাঁর অস্তিত্ব এই সীমাহীন অন্তরিক্ষের নিরিখে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র— এই সার বুঝে নিয়ে তিনি খুঁজেছেন বিষাদ পেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা এবং তা পেয়েও গিয়েছেন। তা নাহলে যে-কবিতার নাম Ode to Sadness, সেই কবিতায় কী করে তিনি স্পষ্টস্বরে জানাচ্ছেন—

A poet lives here
No sadness may
Cross this threshold.

নেরুদার কবিতার শব্দহীন বিস্ফোরণের আলো যেন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তুকণায়। তাঁর কবিতা তাই পাঠকমনকে ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় অথচ দুর্বোধ্য এক আবেগের সুতীব্র আলোড়নে। মন্ত্রপাঠের মতো পাঠকের মাথার ভিতরে বাজতে থাকে—

And I, infinitesimal being
Drunk with the great starry void
Likeness, image of mystery
Felt myself, a pure part of the abyss
I wheeled with the stars
My heart broke loose on the wind.