চোখ-কান খোলা: পর্ব ৩০

অরণ্যের অধিকার

সম্প্রতি, গত এক মাসে, বাঘের আক্রমণে, জিম করবেট সংলগ্ন ‘তাদাম’ গ্রামের দু’জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সে-কারণেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, জিম করবেট এবং কালাগড় অভয়ারণ্যর মোহন সাফারি জোন। সাধারণ মানুষ বলছেন, ক্রমবর্ধমান সাফারির জন্য— পর্যটকরা দিনে একাধিকবার অভয়ারণ্যর নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলিতে (যেখানে প্রায়শই বাঘের দেখা মেলে) ঘোরাফেরা করছেন। জঙ্গল-পর্যটনের ক্ষেত্রে, খুব পরিচিত এবং প্রচলিত দু’টি শব্দ হল, ‘সাইটিং’ ও ‘স্পটিং’। জঙ্গলে বেড়ানোর সময় যতগুলি জন্তু-জানোয়ার দেখা যায়, তারই হিসেবনিকেশ। এর মধ্যেই, বিরল থেকে বিরলতম হল টাইগার স্পটিং। বিরল বলেই, তার তুমুল জনপ্রিয়তা। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, যেসব অঞ্চলে বাঘের আনাগোনা বেশি, সেখানেই পর্যটকদের মধ্যে ভিড় করার হিড়িক বাড়ছে। নিজেদের সংরক্ষিত এলাকায় অন্যের প্রবেশ বাঘেদের বিপন্ন করে তুলছে, ফলে সেই জায়গা ছেড়ে তারা অন্যত্র যাবার চেষ্টা করছে। এবং সেই অন্যত্র, কখনও-কখনও লোকালয়ও হচ্ছে। এমনিতে, ‘প্যান্থেরা টাইগ্রিস’ প্রজাতির প্রাণীরা জিনগত কারণেই লাজুক প্রকৃতির। মানুষের আনাগোনা যত বাড়ছে, ততই তারা নিজেদের নির্দিষ্ট সীমানা (টেরিটোরি) থেকে লোকালয়ের দিকে যাচ্ছে বলে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় জনজীবন।

আরও পড়ুন: বাঘ বাঁচলে প্রজাপতিও বাঁচবে, ভাল্মিক থাপারের ভাবনা ছিল এমনটাই!
লিখছেন শুভময় মিত্র…

এ-প্রসঙ্গে বাঘেদের মানসিক-স্বাস্থ্যের কথাও বিবেচ্য। গাছেদের গায়ে মূত্রত্যাগ ক’রে, বাঘেরা নিজেদের সীমানা নির্দিষ্ট করে; এবং এই সীমানা বিষয়ে তারা খুবই সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর। ধরা যাক, কোনও একটি অঞ্চলে ‘T1’ এবং ‘T2’ বাঘ থাকে, সেখানে কিন্তু কোনওভাবেই ‘T13’ বা ‘T15’ বাঘ প্রবেশ করতে পারবে না। বাঘিনিরা এ-বিষয়ে আরও বেশি স্পর্শকাতর হয়। বিশেষ করে প্রজননের পর, গর্ভবতী বাঘিনিরা পুরুষ-বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য বাধ্য হয়েই নিজের সীমানা ছাড়ে। তখন বাঘিনি যদি আলাদা কোনও অঞ্চলে গিয়ে নিজের সীমানা নির্দিষ্ট করে, এবং সেখানেও হানা দেয় মানুষ, মেজাজ তো বিগড়োবেই! স্পষ্টত, এই হিংস্রতার পিছনে দু’টি কারণ কাজ করে— এক, সীমানা ছেড়ে চলে আসা; দুই, শাবক-রক্ষার বাসনা।

পরিসংখ্যান বলছে, এ-যাবৎ যত বাঘ মানুষকে আক্রমণ করেছে, সেখানে বাঘিনির সংখ্যাই বেশি; এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, সেই বাঘিনিটি একইসঙ্গে গর্ভবতীও। এ-প্রসঙ্গে জিম করবেটে অভয়ারণ্যের একটি ঘটনা উল্লেখ্য। ২০২৬-এর জানুয়ারি মাস নাগাদ, সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়; দেখা যায়, একটি বাঘিনি হঠাৎই আক্রমণ করছে পর্যটনরত জিপসি গাড়িতে। বন্যপ্রাণ-বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের শাবকদের রক্ষার জন্যই বাঘিনির এহেন আচরণ। একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক ২০২১ সালে। মহারাষ্ট্রের জবাতমাল জেলার, মুকুটবন ফরেস্ট রেঞ্জের ঘটনা। সে-সময়ে জঙ্গল-সংলগ্ন গ্রামে বেড়ে গিয়েছিল মানুষের ওপরে বাঘের আক্রমণ। একদিন সকালে ফরেস্ট রেঞ্জাররা দেখতে পেলেন, জঙ্গলের একটি গুহার সামনে একটি বাঘের মৃতদেহ পড়ে; বাঘটি গুরুতরভাবে জখম, সেই সঙ্গে চারটি পায়ের থাবা কেটে নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তে জানা গিয়েছিল, চার বছর বয়স্ক বাঘিনিটি গর্ভবতী এবং চারটি শাবক তার গর্ভে ছিল। এক মাস পরেই জন্ম হত শাবকগুলির। বিশেষজ্ঞরা আন্দাজ করেছিলেন, সম্ভবত এই বাঘিনিটিই গ্রামে আক্রমণ করছিল, ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়েই ‘খুন’ করেছে তাকে।

মুশকিল হল, পর্যটনপ্রিয় মানুষ নাছোড়বান্দা; তাড়া করে ফিরছে বাঘের গতিপথ। উপরন্তু শুরু হয়েছে— বিরাটাকৃতি লেন্স-সহ কিছু ফোটোগ্রাফারের আনাগোনা। তারা স্থানীয় জিপসি গাড়ির ড্রাইভারদের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে, ‘বাফার’ কি ‘ট্রানজিশন’ অঞ্চল ছাড়িয়ে, ‘কোর’ অঞ্চলে প্রবেশ করছে। বিপন্ন হয়ে উঠছে বাঘেদের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র। প্রসঙ্গত, একটি জঙ্গলকে (রিজার্ভ ফরেস্ট) সাধারণত ‘কোর’, ‘বাফার’ ও ‘ট্রানজিশন’ এই তিনটে সীমাতে ভাগ করা হয়ে থাকে, যেখানে একমাত্র ‘ট্রানজিশন’ অঞ্চলই অনুমতিসাপেক্ষে (পারমিট) পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ‘বাফার’ অঞ্চলে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রবেশাধিকার একমাত্র স্থানীয় মানুষের। এবং কোর অঞ্চলে একমাত্র অধিকার বন্যপ্রাণের। কিন্তু নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ‘কোর-বাফার-ট্রানজিশন’ অঞ্চলের সীমারেখা ভেঙেচুড়ে দিচ্ছে মানুষ। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ভারতে সমস্তরকম বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ হয় ১৯৭২ সালে। বন্ধ হয় রাইফেল নিয়ে জঙ্গলে আনাগোনাও। তবে আজ, এই একুশ শতকে, রাইফেলের পরিবর্তে মানুষ হাতে তুলে নিয়েছে বড় লেন্সের ক্যামেরা। প্রাণে না মারলেও, বন্যপ্রাণীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আর কবেই-বা গুরুত্ব দিয়েছে মানুষ?

আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। মানস ন্যাশনাল পার্কের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাণী, ব্ল্যাক প্যান্থার। জনপ্রিয় হলেও, তার দেখা মেলা ভার। অর্থাৎ সাইটিং হয় হাতে গোনা। সাধারণত, ব্ল্যাক প্যান্থার কোনও আলাদা প্রজাতি নয়; লেপার্ড অর্থাৎ প্যান্থেরা পারডুস প্রজাতির, মেলানিন-ঘটিত বৈচিত্র্য। এখন বাঘ যত-না লাজুক, তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণে লাজুক লেপার্ড শ্রেণির ব্ল্যাক প্যান্থার। সম্প্রতি এই ব্ল্যাক প্যান্থারেরই দু’টি শাবকের দেখা মিলেছে মানস ন্যাশনাল পার্কের বাঁশবাড়ি রেঞ্জে। প্রায় রোজই দেখা মিলছে এদের। একইসঙ্গে হিড়িক লেগে গেছে তথাকথিত ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফারদের। ব্ল্যাক প্যান্থারের শাবক-সংক্রান্ত যে-ছবি ও রিল সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে এক নির্জন-শান্ত পরিবেশে রয়েছে তারা; কিন্তু নেপথ্যের দৃশ্য শিউরে ওঠার মতো। একটি রিলে দেখা যাচ্ছে, যেখানে এই দুই শাবকের দেখা মিলেছে, সেখানেই একসঙ্গে প্রায় ৬০-৭০ জন ফোটোগ্রাফারের ভিড়, এবং তাদের শাটারের আওয়াজ গমগম করে উঠছে জঙ্গলের নির্জন-শান্ত পরিবেশে! দুটো প্রাণী বেড়ে উঠছে তাদের নিজস্ব পরিবেশে, সেখানেও গিয়ে হামলা করছে ‘একগাদা মানুষ’।

প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ফ্রেমবন্দি করতে গিয়ে, আরও কত কী যে ধ্বংস করছে, মানুষ কি বুঝতে পারছে না? না কি, তার থেকে এই ছবিগুলোর মূল্যই বেশি, যা একবার সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করলেই লক্ষ-লক্ষ টাকা রোজগারের রাস্তা খুলে যাবে! না, ব্ল্যাক প্যান্থার আক্রমণের কোনও সংবাদ পাওয়া যায়নি মানস থেকে, কিন্তু মানসের যে-ঘটনা সম্প্রতি সামনে এসেছে, তা কম শিউরে ওঠার মতো নয়। দেখা যাচ্ছে, একটি একশৃঙ্গ গণ্ডার আচমকাই আক্রমণ করছে একটি পর্যটক-জিপের ওপর। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে জিপের একাংশ। আসলে মানুষের আনাগোনা এবং অনধিকার প্রবেশ এত বেড়ে গেছে জঙ্গলে, বিঘ্নিত হচ্ছে সামগ্রিক পরিবেশ। আগামীতে যে আরও বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে না, সে-নিশ্চয়তা কে দিতে পারে? বন্যপ্রাণকে আজও শুধু উপভোগের উপাদান করে রাখলে, জঙ্গলের সঙ্গে-সঙ্গে প্রভাব পড়বে মানুষেরও বাস্তুতন্ত্রে। আমরা যতই আধুনিক হই-না কেন, প্রয়োজন বন্যপ্রাণ সম্পর্কে সচেতনতা আর শিক্ষার, যা সমান্তরালভাবে বাঁচাতে শেখাবে আমাদেরই— যেখানে বন্যপ্রাণ শুধুমাত্র ‘সাইটিং’ আর ‘স্পটিং’-উপাদান হয়ে থাকবে না।