তেলেঙ্গানার এক যুবক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বহিষ্কৃত হন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল প্রাক-বৈবাহিক যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার। এই ঘটনার পরেই আদালতে মামলা দায়ের হয়। প্রশ্ন ওঠে যে, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা নিজস্ব যৌনজীবন কোনও ভারতীয় নাগরিকের চারিত্রিক দৃঢ়তা বিচারে পরিমাপক হতে পারে কি? এর সূত্র ধরেই অতি-সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, আজকাল বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপন কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি একসঙ্গে থাকতে চায় এবং শারীরিক সম্পর্কে আবদ্ধ হতে আপত্তি না জানায়, তাহলে দেশের কোনও আইন এক্ষেত্রে বাধা দিতে পারে না। সুতরাং, আগামীতে প্রাক-বৈবাহিক যৌনতার প্রসঙ্গ টেনে কারও চরিত্র নিধন করা যাবে না। এই শেষের কথাটি অত্যন্ত জরুরি, কারণ দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন বলে যে, যৌনতার সঙ্গে নীতিনৈতিকতা জড়িও না বা যৌন সম্পর্ক কারও চরিত্র ঠিক করে দেয় না, তখন মনে হয়, সত্যিই হয়তো সুদিন এসেছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা লালিত হই এই আদর্শে যে, বিবাহ নামক অতি-পবিত্র প্রতিষ্ঠান সঙ্গম বা যৌনতাকে মান্যতা দেয়। বিয়ের আগে যৌনতা, বিয়ের পর পরকীয়া, অজাচার, বিধবার প্রেম: এমন সমস্ত বিবাহ-বহির্ভূত প্রণয় অনৈতিক, স্বেচ্ছাচারী।
যদিও আমাদের সাহিত্যে, শিল্পে বা লোকসংস্কৃতিতে যৌনতার অভিনব প্রতিফলন দেখা যায়। প্রেমকে আটকে থাকতে হবে বিয়ের বেড়াজালে, এমনটা মোটেই দেখা যায়নি প্রাক-আধুনিক বাংলা সাহিত্যে। যেমন এই পঙক্তি:
সময় পাইল, মদনে মাতিল, কোকিল কোকিলা কুহরে
রসে গর গর, অধরে অধর, ভ্রমর ভ্রমরী গুঞ্জরে…
রতিমদপাগর,নাগরী নাগর, নিরখি নিরখি দুই ঠোটে।
রাখিতে নিজ ঘর, রতি রতিনায়ক কুলপির কুলুপ কপাটে৷৷
শ্বাসপবন ঘন, ঘন ঘন খেলই, হেলই সঘন নিতম্বে।
দংশই দশন, দশন মধুরাধর, দুহ তনু দুহ অবলম্বে।
অবিবাহিত মধ্যবয়সি মহিলারাও সুখী হতে পারে?
লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…
কাঞ্চীর রাজপুত্র সুন্দর গোপনে দেখা করেছিল বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যার সঙ্গে। তাদের অভিসারে সহায় ছিল হীরা মালিনী। উপরোক্ত বর্ণনা ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর প্রণয়ের ছবি আঁকে, প্রায় দু-পাতা জুড়ে কাম ও প্রেমের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃশ্য অনেককে অস্বস্তিতে ফেলে। দেশজ আচার মানলে বলতে হয়, এটি প্রাক-বৈবাহিক মিলনই বটে। যদিও গান্ধর্ব বিবাহের কথা উল্লিখিত এই কাব্যে; রাজা, সভাসদ, পরিবার, প্রজা: সকলের গোপনে শুধু ঈশ্বর আর প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করা। বলাই যায় যে, এটি যেন নিজের সম্মতিতে একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত, আমরা যাকে এখন ‘কনসেন্ট’ বলে থাকি। এমন প্রাক-বৈবাহিক প্রণয় বা যৌনতার কথা ভারতের বিবিধ সাহিত্যে পাওয়া যায়। মহাভারতের সত্যবতী বিবাহের আগে মিলিত হয়েছিলেন পরাশর মুনির সঙ্গে।

আমরা যদি দক্ষিণ ভারতের আকাম কবিতা পড়ি (‘সঙ্গম’ সাহিত্যের অন্তর্গত), সেখানেও প্রাক-বৈবাহিক প্রেমের এক পৃথক ধারা চোখে পড়বে। এই কবিতাগুলিকে বলে ‘কালাভু’, যেখানে কমবয়সি যুবক-যুবতীদের প্রেমকে খুব স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। কুরিঞ্জি পাহাড়ের কাছে প্রেমিক-যুগল দেখা করবে, তাদের সাহায্য করবে সমবয়সি বন্ধুরা, কখনও রাতে কিংবা দিনে-দুপুরে ঘন জঙ্গল পার করে দেখা হবে দু-জনের। এই গোপন অভিসারে দৈহিক মিলন যে একেবারেই ব্রাত্য, এমনটা নয়। বরং নানা রূপকে বা কখনও অকপটেই যৌনতার কথা আসছে কালাভু সাহিত্যে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকেও আমরা প্রাক-বৈবাহিক বলতে পারি, যদি রাধার দিক থেকে না-ভেবে কৃষ্ণের জবানিতে পড়ি।
মোদ্দা কথা হল, বিয়ের আগে প্রণয়, মেলামেশা বা যৌন সম্পর্ক ভারতে যে কখনও ছিল না; সাহিত্য, সংস্কৃতি বা লোকগীতিতে কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায় না, এমনটা কিন্তু নয়। তাহলে হঠাৎ কীভাবে এই মনোভাব বদলে গেল? শুধুই কি ভারতে, না কি সারা বিশ্বে যৌনতা মানেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ সম্পর্ককে বোঝানো হয়?
এই প্রসঙ্গে ফিরে পড়া যায় মিশেল ফুকোর ‘হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়ালিটি’, যেখানে তিনি বলছেন যে, অষ্টাদশ শতক থেকে ইউরোপে বৈবাহিক যৌনতাকে মহিমান্বিত করার একটা প্রয়াস দেখা যায়। বৈধ প্রেম কাকে বলে? ওয়েডলক বা বিয়ের মন্ত্র যাকে ন্যায্যতা দেয়, এছাড়া অন্য কোনও ধরনের সঙ্গম ফুকোর ভাষায় ‘পেরিফেরাল সেক্সুয়ালিটি’ বলে অভিহিত হতে থাকে। মধ্যযুগেও বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত, কিন্তু আধুনিকতার সূচনায় ছাপাখানা, স্বাস্থ্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক ধারণা বা ‘কন্ডাক্ট’ বইয়ের রমরমা বাড়লে কোন আচরণটি সমাজসিদ্ধ আর কোনটি ব্রাত্য, সেই নিয়ে ক্রমশ আলোচনা বেড়ে চলে। ভারতের ইতিহাসেও এই ধরনের নীতিবাগীশ লেখকের উৎপত্তি হয়, যারা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রেম ও যৌনতার মধ্যে নির্দিষ্ট রেখা টানতে সচেষ্ট হন। নীরদচন্দ্র চৌধুরী তাঁর ‘বাঙালি জীবনে রমণী’ গ্রন্থে বলেছেন যে, বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম বা পূর্বরাগ নিয়ে প্রাক-আধুনিক যুগে একটা খোলামেলা পরিবেশ ছিল। তাঁর ছেলেবেলায় অনুষ্ঠিত হত মাঘমণ্ডল ব্রত, যেখানে অবিবাহিতা মেয়েরা এই লোকাচার পালন করলে পাড়ার অন্যান্য ছেলেরাও তাদের সাহায্য করত এবং কিছু ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের মেলামেশার পরিসর তৈরি হত। এটা নিয়ে তেমন কুৎসা বা নিন্দা তিনি ছেলেবেলায় লক্ষ করেননি। তবে চৌধুরী বলছেন প্রেম, যৌনতা, মেলামেশা নিয়ে একটা ‘ডিসিপ্লিনারি’ বা শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণের নির্দেশ উনিশ শতক থেকে আরও বেড়ে যায়। চন্দ্রনাথ বসু, মনমোহন বসুর মতো ‘কন্ডাক্ট বুক’-এর লেখকরা প্রাক-বৈবাহিক প্রেমকে বিদেশি আমদানি বলে দাগিয়ে দেন যা হিন্দু যৌথ পরিবারকে ভেঙে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। ইংল্যান্ডে কোর্টশিপ প্রথা প্রচলিত থাকলেও, তা ছিল chaperone বা মহিলা অভিভাবকের নজরদারিতে প্রাক-বৈবাহিক মেলামেশার পরিসর। সেখানে যৌনতা, সঙ্গম কিংবা শ্রেণি পরিচিতির বাইরে প্রণয়েরও কোনও সুযোগ ছিল না। তাই যৌন স্বেচ্ছাচারকে চন্দ্রনাথ বসুর মতো লেখকরা ‘ওয়েস্টার্ন ইমপোর্ট’ বলে দাগিয়ে দিলেও, তা পুরোপুরি সত্য নয়।
মজার কথা হল, উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে কলকাতার বটতলা অঞ্চলে অসংখ্য প্রহসন বা নকশা বিকোতে শুরু করে, যেগুলো বয়ঃসন্ধির মেয়েদের যৌন স্বেচ্ছাচার নিয়ে খড়গহস্ত হয়েছিল। দুর্গাদাস দে রচিত ‘মহিলা মজলিশ’, ‘এনকোর 99’, যোগীন্দ্রচন্দ্র বসুর ‘মডেল ভগিনী’ বাংলার মেয়েদের বিবাহ-পূর্ববর্তী প্রেমকে বিদ্রুপ করে। এই প্রহসনগুলিতে লেখা হচ্ছে যে, মেয়েদের স্কুল বা কলেজ আসলে এই পূর্বরাগ চর্চা করার আখড়া। এগুলো না তুলে দিলে প্রেম, যৌনতা, অবৈধ সন্তানধারণ: এভাবেই মেয়েরা উচ্ছন্নে যাবে। দুর্গাদাস দে-র একটি প্রহসনে এক মহিলা চরিত্র গাইছে:
কলেজে উঠবো যখন, কত পড়া পড়বো তখন।
এলিয়ে দিয়ে আলবেনি, হাতে নিয়ে রুমালখানি,
করবো বুটের টকটকানি।
যে চাবে লো ভালোবাসা, পুরাবো তাহার আশা
রাখবো না প্রেম পিপাসা, কতজনকে করব দাস…


এখানে ‘প্রেম পিপাসা’ বা ‘দাস’ শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহের আগে স্কুল-কলেজে মেয়েদের অভিভাবকহীন অবস্থায় প্রেরণ তাদের নামে কলঙ্ক রটায়। শিক্ষাঙ্গনে তারা তাদের যৌনচেতনাকে প্রশ্রয় দেয়, এমন ইঙ্গিত বটতলা প্রহসনে সর্বত্র। শুধু শিক্ষিতা মেয়ে নয়, গ্রামের মেয়েরাও কীভাবে অচেনা পুরুষে আকৃষ্ট হয়ে শহরে চলে আসে গোপনে (elopement) এবং শেষে তাদের জায়গা হয় কলকাতার পতিতালয়ে: সেই নিয়েও অজস্র নকশা উনিশ শতকের বাজারে ছেয়ে গিয়েছিল। তবে এত কুৎসার মাঝেও যদি বাস্তব চিত্রটি দেখি, সেখানে প্রাক-বৈবাহিক প্রেমের খুব যে একটা সুযোগ বা অবসর মেয়েরা পেত, এমনটা নয়। সাত-আট বছর বয়সে মেয়েদের গৌরীদান করা হত এবং ১১-১২ অবধি তার ঋতুমতী হওয়ার (ফার্স্ট মেনস্ট্রুয়েশনের) অপেক্ষায় থাকত পরিবার, যাতে গর্ভাধানের মাধ্যমে স্বামীর সঙ্গে সহবাসে পাঠানো যায়। যে-সমাজে যৌনতা বা সঙ্গমকে আচার-অনুষ্ঠানে বেঁধে, দিনক্ষণ ঠিক করে, পুজোআচ্চার মধ্যে নিয়ে এসে ‘পারফর্ম’ করানো হয়, সেখানে সহজাত বা স্বতঃস্ফূর্ত পূর্বরাগের যে কোনও জায়গা নেই, তা সহজে অনুমান করা যায়। ব্রাহ্মরা কোর্টশিপ নিয়ে একটু উচ্চবাচ্য করেছিল বটে, কিন্তু তাও ছিল অত্যন্ত কঠোর নিয়মে বাঁধা, যৌনতার কোনও স্থান সেখানে ছিল না।
ঔপনিবেশিক যুগ ছেড়ে এবার যদি বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ও আসি, সেখানেও একলা অবিবাহিতাকে নিয়ে সামাজিক উত্তেজনা চোখে পড়ে। আজও রাজস্থান, মহারাষ্ট্র বা উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুলশয্যার দিন সতীত্বের পরীক্ষা বা ভার্জিনিটি টেস্ট একরকম নিয়মে রূপান্তরিত হয়েছে। সাদা চাদরের ওপর সদ্য-বিবাহিতা সঙ্গমে লিপ্ত হবেন, তার যোনি থেকে রক্তপাত হলেই তা হবে সতীত্বের প্রমাণ, নতুবা সে বিবাহ-পূর্ববর্তী অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত ছিল, সুতরাং চরিত্রহীনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন প্রথাকে যদিও শুধু নিকৃষ্টই নয়, বরং অমূলক হিসেবে ভাবা হয় (কারণ ‘হাইমেন’ বা ‘সতীচ্ছেদ’ নিয়ে একপ্রকার মিথ থেকে এই নিয়মটি তৈরি হয়েছে, আদপে কুমারীত্ব রক্ষা ও হাইমেন অটুট থাকার মধ্যে কোনও সরল সম্পর্ক নেই) কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বউভাতের রাতে মেয়েটির বিবাহ-পূর্ববর্তী সম্পর্ক নিয়ে সকলে এত কৌতূহলী কেন? শুধু স্বামী নয়, শ্বশুরালয়ের প্রত্যেকটি সদস্য সেই সাদা চাদর নিরীক্ষণ করেন নতুন বউয়ের চরিত্র বোঝার জন্য। এটি শুধু যে মেয়েদের শরীরের ওপর একটা পুরো গোষ্ঠী বা কমিউনিটির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা তা নয়, বরং তার মবিলিটি, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, প্রেম সবকিছুই যে kin, কমিউনিটি বা কুল দ্বারা নির্ধারিত হবে, তার ইঙ্গিত দেয়। কুলটা, কুলভ্রষ্টা— এই শব্দগুলো বিবাহ-পূর্ববর্তী প্রেমের সঙ্গেও যুক্ত, অবশ্যই এর কোনও পুংলিঙ্গ নেই, কারণ জোয়ান বয়সে পুরুষ (বিবাহের আগে হোক বা পরে) গণিকালয়ে যাবেন, একে আভিজাত্যের প্রতীক মানা হত।

এই সমস্ত নীতিবাগিশতার মাঝেই যদি ছত্তিশগড়ের বস্তার জেলার গোণ্ড ও মুড়িয়া সম্প্রদায়ের দিকে তাকাই, তাহলে এক ব্যতিক্রমী চিত্র পাব। বিবাহ-পূর্ববর্তী একত্রবাসকে বেশিরভাগ মানুষ পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বলে দেগে দিলেও, ভারতের কোনও কোনও আদিবাসী সমাজে এখনও বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধরা হয়। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েরা রাত্রিবাস করবে ‘ঘোটুল’-এ। ঘোটুল হল বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরি একটি কুঁড়েঘর, মুড়িয়া জাতি মনে করে, তাদের দেবতা লিঙ্গো পেন এই প্রথা শুরু করেছিলেন। নাচ, গান, অন্তরঙ্গ কথার মধ্য দিয়ে যুবক-যুবতীরা রাত্রি অতিবাহিত করেন। একে-একে জুটিতে ঢোকেন তারা ঘোটুলে, সেখানে মন ও শরীর নিয়ে তুষ্ট যুগল শেষে বিবাহে সম্মতি দেন, মাথায় ফুল গুঁজে দিয়ে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এক্ষেত্রে কোনও মহিলা যদি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন, তাকে সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করা হয় না, তাদের লালনপালন করে পুরো গোষ্ঠী। বলা হয়, এই প্রথাই যেন আদিবাসী সমাজে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ বা লিঙ্গ-হিংসাকে একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। যেখানে মানসিক অবদমন কম, যৌনতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ফুলশয্যার খাটে পরীক্ষা দিতে হয় না, সেখানে লালসা, বিকৃতি বা জুলুমের জায়গা নেই। সম্মতি থাকলে দু-জন মানুষ একসঙ্গে থাকবে, নতুবা নয়; কিন্ত ভারতের বেশিরভাগ জায়গায় এমন বদান্যতা বিরল, কারণ মূলস্রোতের সমাজে আছে পণপ্রথা, আছে সম্পত্তি ভাগ, মেয়েদের জমির অধিকার না থাকা। এগুলির সঙ্গেই যে যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা অকাট্য সম্পর্ক রয়েছে— সেই কথা ঐতিহাসিকরা বলেন। মেয়েদের যৌনতা যদি নিয়ন্ত্রিত না হয়, সে বিবাহের আগে হোক, ব্যভিচার হোক কিংবা বিধবার প্রেম, তাহলে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের আর কোনও মানে থাকবে না। আর সর্বসাকুল্যে বিয়ে উঠে গেলে ‘patrilineal kinship’ রক্ষা করা অসম্ভব। আদিবাসী সমাজে যেখানে প্রাইভেট ওনারশিপের ধারণা তথাকথিত মূলস্রোতের সমাজের থেকে শিথিল, সেখানে একটা গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ মেয়ের যৌনতার ওপর নীতিপুলিশি কম করে, বিবাহ-বহির্ভূত সন্তানকে লালন পালন করে। সেখানে জমি, জল, সম্পত্তি নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি কম, একটা কালেক্টিভ আইডেন্টিটি লিঙ্গসমতার পক্ষে রায় দেয়।

যদিও এখনকার সাহিত্য বা সিনেমায় মেয়েদের যৌনতাকে বাঁকা চোখে কম দেখা হয়। কিছুদিন আগে ‘লাস্ট স্টোরিজ ২’ নামক সিরিজে আর বালকি পরিচালিত গল্পে এক ঠাকুমার চরিত্র দেখানো হয়েছে। নিনা গুপ্তা অভিনীত এই বৃদ্ধা তার নাতনির অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বয়োজ্যেষ্ঠাকে বলতে শোনা যায় যে, সারাজীবনের জন্য কোনও সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়ার আগে দেখে নেওয়া উচিত, তার সাথে সঙ্গমসুখ ভোগ করা যায় নাকি।
আসলে আমরা ভুলে যাই মানুষই তৈরি করে লোকাচার ও নৈতিকতা। আদর্শ বা ‘মরালিটি’ কোনও বিজ্ঞানের সমীকরণ নয় যে, তা অপরিবর্তিত (ইউনিভার্সাল) বা সময়হীন (টাইমলেস)। ‘লাস্ট স্টোরিজ ২’-এ মেয়েদের যৌনতাকে আজ উদযাপন করা হচ্ছে, কিন্তু কিছুদিন আগে অবধিও অবিবাহিতা প্রসবিনীকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হত ভারতীয় সিনেমায়। প্রীতি জিন্টা অভিনীত ‘কেয়া কেহেনা’-তে পারিবারিক বহিষ্কারের কথা উঠলেও পরে সমবেদনা বা কিশোরী মা-কে যত্ন করার প্রয়াস দেখানো হয়। প্রাক-বিবাহ যৌনতা বলতে মনে পড়ে যায় সুচিত্র ভট্টাচার্যের ‘নীলঘূর্ণী’ উপন্যাস। Transgressive love (সীমালঙ্ঘনকারী প্রেম) এই গল্পের মূলে; ছাত্রীর সঙ্গে প্রফেসরের প্রণয়, অসম বয়সে মেলামেশা এবং শেষমেশ ছাত্রী সন্তানসম্ভবা হলে তাকে ত্যাগ করে প্রেমিক-শিক্ষক। এখানে মেয়েটির যৌন ইচ্ছা এবং সাময়িক ভাললাগা কীভাবে তার স্থিতিশীল জীবন পাল্টে দিল, তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলো, তারই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই গদ্য নিশ্চয়ই বটতলা প্রহসনের মতো নয়, এখানে শিক্ষামূলক বা নির্দেশমূলক ন্যারেটিভের থেকে চরিত্রগুলির মানসিক দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ বা অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। কিন্তু জরুরি বিষয় হল, সেই ঘুরেফিরে কী করে প্রাক-বৈবাহিক যৌনতা একটি মেয়েকে বিপদে ফেলল, তারই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা লেখা। এখানে যৌনতার উদযাপন নেই, নিজের ইচ্ছাকে সমর্থন করে আত্মবিশ্বাসের নজির কম, সঙ্গমে লিপ্ত অবিবাহিতা দয়িতা এখানে শুধুই যেন ভিক্টিম। ২০০১ সালে রচিত এই গল্পে সংকোচ, উদ্বেগ ও পরাজয়ের কথা আছে, এগুলি নস্যাৎ করে উঠে দাঁড়ানোর আখ্যান নেই।
আজ যেমন বাংলা সাহিত্য বা ভারতীয় সিনেমা প্রাক-বৈবাহিক যৌনতা দেখাতে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ, ২৫ বছর আগে তা ছিল না। ডেটিং অ্যাপ, কন্ট্রাসেপটিভ পিলের ব্যবহার, গাইনোকোলজিস্ট-এর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ-সুবিধা এখন অনেক বেশি। এই অভিজ্ঞতা যদিও গ্রাম বা শহর কিংবা মেট্রো সিটি-মফসসলের ক্ষেত্রে আলাদা। আগামীতে এটাই দেখার যে, শিক্ষার প্রসার, লিঙ্গ-বিষয়ক গবেষণা, বুনিয়াদি স্তরে ঋতুস্রাব নিয়ে হাইজিন রক্ষা— এগুলি যৌনতা বিষয়ক ট্যাবুগুলোকে কীভাবে ভেঙে দিতে পারে। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য মেয়েদের আত্মনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টা।
আশা করা যায় যে, যৌনতা নিয়ে যে লজ্জা, কলঙ্ক বা সামাজিক অপবাদের গভীর অসুখ তৈরি করে রাখা হয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সেগুলিকে অগ্রাহ্য করতে সাহায্য করবে।


