রংমশাল

‘কৃতি’ আর ‘ফেবলওয়ার্কস’-এর উদ্যোগে হয়ে গেল ‘রংমশাল’ শীর্ষক তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠান।সঙ্গে ছিল ডাকবাংলা.কম। তিনরকম তিনটি সন্ধে কতটা সুরেলা হল?

গানের ওপারে: ফিরে দেখা

বাংলা টেলিভিশনের স্বর্ণযুগ বলে যদি কোনও কিছুকে চিহ্নিত করা যায়, তবে তা এই শতকের প্রথম দশকের কয়েকটি বছর। সাতদিন দিনরাত সিরিয়াল বা খবরের কচকচি নয়, পাঁচ মিনিটের খবর থেকে নানারকম নন-ফিকশন শো (কেবলই ধামাকাদার রিয়েলিটি শো নয়), সাক্ষাৎকারমূলক অনুষ্ঠান, টেলিফিল্ম— কতরকম সম্ভাবনা তখন জেগে থাকত টিভির পর্দা জুড়ে। কিন্তু কেবলই ধারাবাহিকের কথাই যদি বলা যায়, তাহলেও বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল সে-সময়ের বাংলা টেলিভিশনের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলি। ‘এক আকাশের নীচে’-র মতো তুমুল জনপ্রিয় সিরিয়ালের রূপায়ণ আজ দেখলে খানিক ঘাবড়েই যেতে হয়, কুড়ি বছর আগে, আজকের ভাষায় যাকে বলে ‘কনটেন্ট’— তার উচ্চতা কী মাপের ছিল, তা দেখলে। কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল, বদলে যাচ্ছিল ধারাবাহিকের গতিপ্রকৃতিও। এইরকম একটা সময়ই বাংলা টিভিতে এসেছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের সৃজনে ‘গানের ওপারে’। টিআরপি-র অঙ্কে কতটা ঝড় তুলেছিল সেই সিরিয়াল, তা অন্য প্রসঙ্গ, কিন্তু কয়েক প্রজন্ম ধরে ‘গানের ওপারে’-র স্মৃতি থেকে গেছে অমলিন, দেড় মিনিটের রিলের মতো স্মৃতির অতলে তা হারিয়ে যায়নি।

এই ‘গানের ওপারে’-র ১৫ বছর পূর্তিতে ‘কৃতি’ আর ‘ফেবলওয়ার্কস’-এর উদ্যোগে হয়ে গেল বিশেষ অনুষ্ঠান ‘গানের ওপারে: ফিরে দেখা’। ‘রংমশাল’ শীর্ষক তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম দিনের এই অনুষ্ঠানটির চিত্রনাট্য লিখেছেন রোহিত-সৌম্য। তাঁদের লেখা আলেখ্য পাঠ এবং অভিনয়ে ফুটিয়ে তুললেন অগ্নিজিৎ সেন ও মঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায়। আর গানে ছিলেন শ্রাবণী সেন, এবং ‘গানের ওপারে’-র মূল চরিত্র গোরা-র নেপথ্য কণ্ঠদাতা স্যমন্তক সিনহা, যাঁর কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল তখন।

‘গানের ওপারে’-র ট্রিভিয়া নয়, অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল একেবারে অন্যরকম এক পরিকল্পনায়। সোহিনী দেব ও গোরা— ধারাবাহিকের সমনামী দু’টি চরিত্রকে নিয়ে বলা হল একেবারে অন্য এক গল্প, যার সময়কাল ‘গানের ওপারে’-র সময় থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দেড় দশককে ধরেছে। বয়ঃসন্ধির একটি হয়ে ওঠা প্রেম, এক বর্ষণমুখর সন্ধের পর হঠাৎ বিচ্ছেদ, এবং আরেক তুমুল বৃষ্টির দিনে এক ব্যথাতুর পুনর্মিলনের এই আখ্যানটিকে প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় ফুটিয়ে তুললেন অগ্নি ও মঞ্জিমা। তাঁদের অভিনয়সূত্রে ধারাবাহিকটির নস্টালজিয়ার পাশাপাশি নতুন দু’টি চরিত্রের গল্পও যেন প্রতীয়মান হয়ে উঠল। শ্রাবণী সেন ছিলেন স্বমহিমায়, স্যমন্তক সিনহার গান এই সন্ধের জি ডি বিড়লা সভাঘরকে কেবলই উজ্জ্বল করে তুলল, তা নয়, একইসঙ্গে মজিয়ে রাখল স্মৃতিকাতরতাতেও। অনুষ্ঠানের শেষে মঞ্চে এলেন দেবজ্যোতি মিশ্র, যাঁর সূত্রে ‘গানের ওপারে’-র সংগীত অন্য মাত্রা পেয়েছিল। সব মিলিয়ে ধারাবাহিকটির অনুরাগী ও দর্শকদের কাছে সন্ধেটি পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা।

সুরের গুরু: গুরু দত্ত, জীবনের গান

জীবন শুরু নয়্যার দিয়ে। আঁধারমেশানো রহস্যগাথা থেকে ক্রমে জীবন, মহাজীবনের ট্র্যাজেডিতে পা রেখেছিলেন গুরুদত্ত পাড়ুকোন, ওরফে গুরু দত্ত। ‘বাজি’ থেকে ‘আর পার’, ‘জাল’ বা ‘বাজ’ থেকে ‘পেয়াসা’ বা ‘কাগজ কে ফুল’— গুরু দত্তর জীবন আর সিনেমা ওই বম্বে নয়্যারের আঁধার থেকে শিল্পীর বিষাদের দিকে যাত্রা করেছিল এক আশ্চর্য মোকামে। আলফ্রেড হিচকক থেকে অরসন ওয়েলসরা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে তাঁকে।

কিন্তু গুরু দত্ত কেবলই এক অভিনেতা বা চলচ্চিত্র-নির্মাতা তো নন, ফুল আর কাঁটায় মোড়া তাঁর জীবনটাই যেন আস্ত একটা সিনেমা। স্ত্রী গীতা দত্ত থেকে প্রণয়ী ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে তাঁর জীবনের ওঠাপড়া, সিনেমার জন্য জীবনকে বাজি রাখার অদম্য জুয়াড়ি মন— গুরু দত্তর জীবনের নুড়িপাথরকে জুড়লেও যেন সেলুলয়েডের রিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একের পর এক মেলডি, শচীন দেব বর্মন থেকে ও পি নায়ারের সুর, সাহির লুধিয়ানভি থেকে কাইফি আজমির লিরিক, গীতা দত্ত থেকে মহম্মদ রফির কণ্ঠ— সব মিলিয়ে অমরত্ব পেয়েছে গুরু দত্তর সৃষ্টি।

এহেন শিল্পীর শতবর্ষে তাঁর প্রিয় কলকাতা শহর একটি সন্ধ্যা খরচ করবে না তাঁর জন্য? ‘কৃতি’ আর ‘ফেবলওয়ার্কস’-এর উদ্যোগে তাই একটি অপূর্ব সাংগীতিক অনুষ্ঠান হয়ে গেল মহাজাতি সদনে। ‘রংমশাল’ শীর্ষক তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনের ‘সুরের গুরু: গুরু দত্ত, জীবনের গান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটির ভাবনা ও পরিকল্পনা ছিল কবি শ্রীজাত-র। তাঁর আলেখ্য, তাঁর কবিতা, সঙ্গে মরমি সেসব গান। জয়তী চক্রবর্তী, শৌনক চট্টোপাধ্যায়, শোভন গঙ্গোপাধ্যায় হালকা বৃষ্টির আবহে চোখে ভিজিয়ে রাখলেন দর্শকদের। শ্রীজাতর পাঠ থেকে শিল্পীদের গান— এই মহান শিল্পীকে স্মরণ কেবল নয়, উদযাপনও করল যেন। নির্ধারিত বিরতি দর্শক ও শিল্পীদের অনীহায় আর হলই না, একটানা সুরের সঙ্গে বোঝাপড়া চলল।

তিন ইয়ারি গান

‘বন্ধুরা ছাড়া এ-গান যেন কেউ না শোনে।’ বলেছিলেন এক আধুনিক গীতিকার-সুরকার। কিন্তু কয়েকজন বন্ধুর নিজস্ব গান যখন বন্ধুরাই ভাগ করে নেয়— তখন যে-আবহ তৈরি হয়, তা বন্ধুত্বর সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

জি ডি বিড়লা সভাঘরে ‘কৃতি’ ও ‘ফেবলওয়ার্কস’ আয়োজিত একটি গানের সন্ধ্যা এমনই কিছু অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকল। অনুষ্ঠানটির নাম ‘তিন ইয়ারি কথা’। ‘কৃতি’ আয়োজিত ‘রংমশাল’ শীর্ষক তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষদিন ছিল তিন বন্ধুর এই গানের অনুষ্ঠান।

তিন বন্ধু কারা? সৌমিত্র-শ্রীকান্ত-প্রবুদ্ধ। সৌমিত্র সেনগুপ্ত, শ্রীকান্ত আচার্য এবং প্রবুদ্ধ রাহা। মানুষ তাঁদের পদবি-সহই একডাকে চেনেন। কিন্তু তাঁদের নিজেদের মধ্যে পদবি ব্যবহারের অবকাশ নেই। আছে ডাকনাম ধরে ডাকার আটপৌরে মেজাজ। এই আটপৌরে মেজাজই এ-দিনকার অনুষ্ঠানের মূল ভিত্তি। যেখানে শুধু গান নেই, আছে আড্ডা, গপ্পো—  একটা সময়ের ইতিহাস। সামগ্রিক অনুষ্ঠানটির গঠন এখানেই আলাদা আর পাঁচটা ‘গানের অনুষ্ঠান’-এর থেকে।

এই অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বলতে একটা পিয়ানো, দুটো হারমোনিয়াম। দু’জন গাইছেন হারমোনিয়াম-সহ— শ্রীকান্ত আচার্য এবং প্রবুদ্ধ রাহা। আর সৌমিত্র সেনগুপ্ত পিয়ানো বাজাচ্ছেন। মঞ্চে ফিরে-ফিরে আসছে ছয়ের দশক থেকে সাত কিংবা নয়ের দশক। আর আসছেন রবীন্দ্রনাথ। এই অনুষ্ঠানে নানা গীতিকার-সুরকারের গান তিন বন্ধু মিলে গাইলেও— দৃঢ়ভাবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। অনুষ্ঠান শুরুই হয় শ্রীকান্ত আচার্য, প্রবুদ্ধ রাহার যুগল কণ্ঠে ‘আলো আমার আলো ওগো’ দিয়ে। তাঁরা ‘দক্ষিণী’-তে শিখেছিলেন এই গান। তাঁদের শেখা প্রথম রবীন্দ্র-গান। পিয়ানোয় ছিলেন সৌমিত্র সেনগুপ্ত। ‘দক্ষিণী’ প্রসঙ্গেই এল শুভ গুহঠাকুরতা, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাও । ‘দক্ষিণী’ থেকেই আবার এক ছুটে প্রেসিডেন্সি কলেজর আড্ডা, সেখানে থেকে আবার ভুল শব্দে গাওয়া গোয়ানিজ কিংবা চেক সুরের গান— এই অনুষ্ঠান যেন তিন বন্ধুর টাইম-ট্রাভেল। সেই সময়-স্রোতে ভেসে গেলেন দর্শকরাও।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে তাঁরা গাইছিলেন ভূপন হাজারিকার— ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে, অসংখ্য মানুষের—/হাহাকার শুনেও / নিঃশব্দে নীরবে— ও গঙ্গা তুমি—/গঙ্গা বইছ কেন?’

এই অনুষ্ঠান আসলে বয়ে যাওয়া নদী স্রোতের মতোই। যে স্রোতে বাঁক কাছে, আছে অজস্র গল্প, থুড়ি গানের গল্প। সর্বোপরি আছে তিনজন বন্ধুর যাপন।