মরশুমি পাখির মতো বিশ্বকাপ-পিপাসু গড় বাঙালি, বিশেষ করে যাঁরা ‘সিজনাল ফ্যান’, তাঁদের নিয়ে ফুটবল বিশারদদের বড় একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে আজকাল। তাঁদের ঘোরতর আপত্তি এই নিয়ে যে, এই ‘মরশুমী ফ্যান’-রা কেন ‘জাজমেন্টাল’? এতকাল যাঁরা লাল-পাথরের রকে বসে, ভুঁড়িতে হাত বোলাতে-বোলাতে, বিড়ির শেষ টানটা দিতে-দিতে বলতেন, ‘ওসব মেসিফেসি কোনও প্লেয়ারই না, খেলা দেখেচি মাইরি মারাদোনার, এইট্টি সিক্স-মেক্সিকো, ওহ! ওই বাঁ-পায়ে বল নিয়ে ফেন্টটা…’; কথাটা শেষ হত না। বাকিটা মুখের ভেতরে থেকে যাওয়া আত্মতৃপ্তি। এসব আত্মতৃপ্তির চোঁয়া ঢেকুরে, মোটামুটি ২০২২-এ মেসি অ্যান্টাসিড ঢেলে দিয়েছেন। এখন ওই দক্ষিণাকালী-গৃহলক্ষ্মী-পেলে আর মারাদোনার পাশে, একটু বামহস্তে পুজো পাবার মতো পুজো পান মেসিও। রোনাল্ডোকে এখনও সে-জায়গা দেয়ার কথা তুললে, লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর তুলে বাজখাঁই গলায় জোর তক্কো বাঁধবে। জিদান-বড় রোনাল্ডো-বেকেনবাওয়াররা একটা রোগাপাতলা ঠাকুরের তাক পেয়েছেন যদিও, মানে নকুলদানাটা শেষ হয়ে যাচ্ছে বুঝলে, যেখানে দুটোর বদলে একটা করে পাতে দিলেও কাজ চলে যায়।
যাক গে! এহেন সবজান্তাকাকু ও জেন-জি ভাইপোদের মধ্যে, পা-টানাটানির ফাঁকতালে এবারের বিশ্বকাপে জেন-জি টাট্টুঘোড়াদের সঙ্গে একটু আলাপ করে নেয়া যাক। কে বলতে পারে, এরাই হয়তো আগামী দশকে, মিলেনিয়ালদের কাকুত্বে পৌঁছানোর সময়ে, বামহস্তে পুজোটুজো পেয়ে যাবেন।
আরও পড়ুন: ইতালি, ফুটবল ও রাজনীতি! লিখছেন শান্তনু চক্রবর্তী…
যেমন ধরা যাক, এ-বিশ্বকাপের সবচেয়ে চর্চিত জেন-জি তারকার কথা— লামিন জামাল। ক্লাবফুটবলের কল্যাণে, এই ডেঁপো ছেলেটি, সকল ফুটবলপ্রেমীর কাছেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। বয়স মাত্র ১৮। কাতালান ক্লাব বার্সিলোনার রাইট উইঙ্গার। লা-মাসিয়া থেকে উঠে আসা ছেলেটি এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়দের একজন। কাতালান ক্লাব ওঁর রিলিজ ক্লজ স্থির করেছে, ১ বিলিয়ান ইউ এস ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় একশো কোটি টাকা। গত তিনবছরে চোখ ধাঁধানো ফুটবলে মাতিয়ে দিয়েছে ইউরোপ। পজেশনাল ফুটবল যেখানে ক্রমশ মাঠ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে স্কিলফুল বলপ্লেয়ারদের, সেখানে জামাল অন্যতম চর্চিত ব্যতিক্রমী। ইতোমধ্যেই বার্সিলোনার হয়ে, দেড়শোর ওপর ম্যাচে শ’খানেকের ওপর গোল ইনভলভমেন্ট। ২০২৪ সালে স্পেনের ইউরো জয়ে জামালের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। প্রতিপক্ষের যে-কোনও লেফ্টব্যাকের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য ওঁর জুড়ি মেলা ভার। আর হ্যাঁ, মিলেনিয়ালরা কিন্তু জামালের খেলার সঙ্গে তাঁদের সময়ের এক মহাতারকার মিল পাবেন! ডাচ উইঙ্গার আর্জেন রবেন!


পরের তারকাও রাইট উইং— মাইকেল ওলিসে। জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের ২৪ বছরের এই তারকা, ফ্রান্সের আক্রমণ-ভাগে অন্য দুই মহাতারকা দেম্বেলে ও এম্বাপ্পের সঙ্গে শুরু করবেন। এই মুহূর্তে, ফর্মের নিরিখে জামালকেও ছাপিয়ে যাচ্ছেন ওলিসে। সদ্যসমাপ্ত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাইডব্যাক নুনো মেন্ডেসের কার্যত নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিলেন সেমিফাইনালে। এক মরশুমে বায়ার্নের হয়ে প্রায় পঞ্চাশটি গোলে অবদান রেখেছেন ওলিসে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতিপর্বে সেরে ফেলেছেন হ্যাটট্রিকও। দিদিয়ের দেশঁ-র কোচিং-এ আমরা ২০১৮ সালে কিলিয়ান এম্বাপ্পের উল্কাসম উত্থান দেখেছি। এবার মাইকেল ওলিসের আন্তর্জাতিক মঞ্চে, স্বপ্নের উড়ান দেখার আশায় বসে আছে ক্লাবফুটবল দেখে রাতের ঘুম উড়িয়ে ফেলা ফুটবলপাগলেরা।


এরপর আসে এন্ড্রিকের নাম। কলকাতা শহরের অলিতে-গলিতে, হলদে-সবজে কলোনি দেখেছে রোমারিও-বেবেতোর চুরানব্বই, রোনাল্ডোর আগুনে টোকিও ২০০২, দেখেছে রোনাল্ডিনহো-কাকা-নেইমারের উত্থান। পাড়ায়-পাড়ায় ব্রাজিলের মহাতারকাদের ফ্যাকাশে পোস্টারের পাশে এবার কিন্তু জমকালো রঙে নিজেকে খোদাই করতে পারে এই তরুণ তুর্কি। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে লোনে খেলছেন লিওঁ-তে। দীর্ঘদিন ব্রাজিল একজন বিধ্বংসী স্ট্রাইকারের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরেছে। রোনাল্ডো পরবর্তী সময়ে, সেই মানের নাম্বার নাইন আসেনি ব্রাজিলীয় ফুটবলে। এন্ড্রিক সেই জুতোতে পা গলানোর সমস্ত ঝলক দেখিয়েছেন এই মরশুমে। প্রস্তুতি ম্যাচে, কার্লো আন্সেলোত্তি তাঁকে খেলিয়েছেন, তিনি গোলও পেয়েছেন। সঙ্গে, ভিনি-রাফিনহার মাঝখানে বক্সে যে তিনি বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেন তার সমস্ত লক্ষণ স্পষ্ট।

চতুর্থ জেন-জি হিসেবে আসতেই পারে, স্পেনের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সির নাম। বিশ্বকাপ যেমন রোনাল্ডো-মেসি-রোমারিও-জিদান-ক্লোজেদের মতো অ্যাটাকারদের, তেমনই জানেত্তি-মালদিনী-ক্যানাভারোর মতো কালজয়ী ডিফেন্ডারদেরও। বার্সেলোনার লা-মাসিয়া থেকে উঠে আসা, কুবার্সির বয়স মাত্র ১৯! কিন্তু এই বয়সেই তিনি বার্সেলোনা ও স্পেনের জাতীয় দলের প্রধান ডিফেন্ডার। বরফশীতল মস্তিষ্ক এবং অসম্ভব ভাল বলপ্লেয়িং ও পজিশনাল ডিফেন্ডিং-সেন্স। এই মুহূর্তে, বিশ্বের সবচেয়ে দামি ডিফেন্ডারদের তালিকায় একেবারে ওপরে তার নাম— আশি মিলিয়ন। রিলিজ ক্লজ, প্রায় পাঁচশো মিলিয়ন। বিশ্বফুটবলের ধুরন্ধর কোচ, পেপ গুয়ার্দিওলার নজরে ছিলেন কুবার্সি। এবারে স্পেন দলের ডিফেন্সের মূল চাবিটি থাকবে এই উনিশ বছরের তরুণের কাছে। প্রথম বিশ্বকাপেই মহাতারকা হয়ে ওঠার সমস্ত সুযোগ থাকছে তার সামনে।

পঞ্চম তারকা, ফ্রান্সের অ্যাটাকার ডিজায়ার ডুয়ে। ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মানের আক্রমণভাগের এ-বছরের সবচেয়ে বৈচিত্রময় তারকা এই কুড়ি বছরের ডুয়ে। ডুয়ের শক্তি হল, তিনি বলপ্লেয়ার হিসেবে সেন্ট্রালি এবং উইং-এ ওয়াইড পজিশনে দু’জায়গাতেই স্বচ্ছন্দ্যে খেলতে পারেন। বিশ্বফুটবলে এই মুহূর্তে প্রেসিং ফুটবলের রমরমার কারণে, টাইট স্পেসে অপারেট করতে পারে এমন তারকাদের চাহিদা তুঙ্গে। ডুয়ে এই তালিকায় সবচেয়ে জমকালো নাম। পরপর দু’বারের ইউরোপ-সেরা, কোচ লুইস এনরিকে ডুয়েকে বিশ্বের অন্যতম সেরা উঠতি তারকা হিসেবেই দেখেন। দিদিয়ের দেশঁ-র কোচিং-এ সম্ভবত তিনি ফ্রান্স দলে শুরু থেকে খেলবেন না। কিন্তু বেঞ্চ থেকে এসে খেলা ঘুরিয়ে দেবার সবচেয়ে বড় দাবিদার তিনিই।
হাত বোলাতে-বোলাতে, বিড়ির শেষ টানটা দিতে-দিতে বলতেন, ‘ওসব মেসিফেসি কোনও প্লেয়ারই না, খেলা দেখেচি মাইরি মারাদোনার, এইট্টি সিক্স-মেক্সিকো, ওহ! ওই বাঁ-পায়ে বল নিয়ে ফেন্টটা…’; কথাটা শেষ হত না। বাকিটা মুখের ভেতরে থেকে যাওয়া আত্মতৃপ্তি। এসব আত্মতৃপ্তির চোঁয়া ঢেকুরে, মোটামুটি ২০২২-এ মেসি অ্যান্টাসিড ঢেলে দিয়েছেন।
এছাড়া ইংল্যান্ডের কোবি মাইনু (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), তুর্কির আরদা গুলার (রিয়াল মাদ্রিদ), ফ্রান্সের ওয়ারেন এমেরি (পি এস জি) র দিকেও থাকবে নজর। নজর থাকবে আর্জেন্টিনার নিকো পাজ, ভ্যালেন্টাইন বার্কোর দিকে। তাই, মরশুমি ফ্যানেদের যতই অসহ্য লাগুক, এ-বিশ্বকাপের মহাৎসবে, ওঁরাই কিন্তু আসল প্রাণ। কেঠো-শুষ্ক দুনিয়ায় এই ক’দিনের যে অনাবিল উচ্ছ্বাস, তার রূপ-রস-গন্ধ ও স্পর্শের পিছনে এই মানুষগুলি। এদের মগজে কারফিউ লাগিয়ে প্রবেশ করা এবং পাকাপাকি থেকে যাওয়ার মধ্যেই, আছে চিরশ্রেষ্ঠত্ব-স্থায়ীত্ব। মারাদোনা-পেলে-মেসিরা সেই কাজটি করতে পেরেছেন। এই সমস্ত ঝকঝকে জেন-জি তারকারা, এ-বিশ্বকাপের পর যদি সেই কাজটি করে ফেলতে পারেন, তাহলে তার চেয়ে আনন্দের আর কীই-বা হতে পারে। ততদিন, মিলেনিয়াল কাকা আর জেন-জি ভাইপোদের এই মজা-মশকরা নিয়েই চলতে থাকুক ‘দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ।’



