ভারতের জাতীয় খেলা কী? সরকারি খাতায়-কলমে যাই-ই থাকুক, সবাই জানেন ক্রিকেট। স্টেডিয়ামগুলো সব উপন্যাস-সম। ক্রিকেটাররা যদি পুরো দেবতা নাও হন, অবতার-টবতার তো বটেই! এহেন ক্রিকেট খেলার বিশ্ব-আসরে, ভারত যদি হড়কায়, তাহলে কী-কী হয় আমাদের জানা আছে। ২০০৭-এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে, গ্রুপ-লিগ থেকেই বিদায় নেওয়ার পরে, রাঁচিতে মহেন্দ্র সিং ধোনির জানলার ভাঙা কাচ, দরজা-দেওয়ালের গায়ে পচা টমেটো-ডিমের কুসুমের দাগগুলো— আমাদের মনে আছে। কিন্তু, ক্রিকেটে ভারত হেরে গেছে বলে, বিসিসিআই-এর কর্তাদের পার্লামেন্টে ডেকে, ডাইনে-বাঁয়ে গণঝাড় দেওয়া হচ্ছে, এতটা ভাবা যায়! জয় শাহ-র রাজত্বকাল ছেড়ে দিন, কোনওকালেই ভাবা যায় না! কিন্তু আমাদের পক্ষে অভাবনীয় ঘটনাটাই ঘটে গেল ইতালিতে। সে-দেশের জাতীয় ফুটবল দল বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ড থেকেই বিদায় নেওয়ার হ্যাটত্রিক করে নেওয়ার পর, ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারশনের সভাপতি— গ্যাব্রিয়েল গ্র্যাভিনাকে সংসদে একটা বিশেষ শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হয়।
তবে সেটাকে শুনানি না বলে, বোধ হয় দাবড়ানি বলাই ভাল। কারণ গ্র্যাভিনাকে সংসদে ডেকে কী বলা হবে, আর কীভাবে বলা হবে, তার ট্রেলারটা— সকলের আগেই দেখা হয়ে গিয়েছিল। এপ্রিল ফুলের ঠিক আগের রাত্তিরেই, বিশ্বকাপ ’২৬-এর যোগ্যতা-অর্জনের প্লে-অফ ফাইনালের ট্রাইব্রেকারে, ফিফা-র্যাং কিং-এ অনেক নীচের তলার বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার ফুটবলারের শটটা, যখন ইতালির গোলরক্ষক-অধিনায়ক দোনারুমার আকুল বারিয়ে দেওয়া হাতকে বেকুব বানিয়ে, জাল কাঁপিয়ে দিল— ফেডারেশন সভাপতির ললাট-লিখন তখন টাইপ হয়ে গেছে। শুধু দস্তখতটুকু বাকি ছিল। নীল-‘আজুরি’ ফ্যান যে জনগণ, রোম-মিলান-বোলোনা-তুরিমের পাব-রেস্তোরাঁ কিংবা রাস্তার মোড়ে জায়েন্ট স্ক্রিনে দলের বিশ্বকাপ উত্থান দেখার জন্য হা-পিত্যেশ করে ছিলেন, তাঁরা তো ম্যাচ হারতেই দলের ফুটবলার-কোচ-ম্যানেজমেন্টের দিকে তাক করে, বাপ-বাপান্ত, সাপ-সাপান্ত যা ওগড়ানোর উগড়ে দিয়েছেন। রবার্ত বাজ্জিও থেকে শুরু করে, মাতেরাজ্জি, দেল পিয়েরো থেকে পাওলো মালদিনির মতো সুপারস্টার প্রাক্তনীরাও— যে যার ঝাল মিটিয়ে নিয়েছেন। মালদিনি বলেছেন, ২০১৮-য় যখন ইতালি প্রথমবার মূল পর্বে যেতে পারল না, তখন মনে হয়েছিল, এটা একটা দুর্ঘটনা। আর ’২৬-এ তৃতীয়বার ফসকানোর পর, মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা ‘নিও-নর্মাল’, গা সয়ে গেছে।
ঈশ্বরের হাতের বিতর্ক মারাদোনাকে করে তুলেছিল দার্শনিক?
লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী…
দেশের প্রথম সারির খবরের কাগজ, খেলার পত্রিকাগুলোও জবরদস্ত সব হেডলাইন করেছিল। কেউ বলেছে তৃতীয় ‘অ্যাপোক্যালিপ্স’, কারও কপি জুড়ে করুণ-ভায়োলিন। আহা রে, গ্রীষ্মের ছুটিতে গোটা ইউরোপ যখন মার্কিন মুলুকে ভিড় জমাবে, আমাদের তখন— ‘কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।’ হ্যাঁ, প্রাক্তন ফুটবলার বা কাগজের ফুটবল-বিশেষজ্ঞরা ব্যর্থতার প্রাণপণ কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। মান্ধাতার আমলের পরিকাঠামো, ভাঙা-পুরনো স্টেডিয়াম, যুব ফুটবলারদের তুলে আনার ব্যবস্থা নেই, সিরি-এ লিগে স্থানীয়দের ফেলে, বিদেশি ফুটবলারদের নিয়ে আদিখ্যেতা— ইত্যাদি-ইত্যাদি কত কী! দেল পিয়েরো বলেছেন, ‘এই দলটা গোটা দুনিয়ার সামনে আমাদের হাস্যকর বানিয়ে তুলেছে।’ কিন্তু মোক্ষম কথাটা বলেছেন, রাজনীতির লোকেরাই। জর্জিয়া মেলোনির, এখনকার ঘোর দক্ষিণপন্থী সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রী ও প্রাক্তন মধ্যপন্থী প্রধানমন্ত্রী— দু’জনেই একসুরে বলেছেন— যত নষ্টের গোড়া ফেডারেশন সভাপতি। তিনি শুধু যে এতকালের ফুটবল-গৌরবকে ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন তা-ই নয়— ইতালির জাতিসত্তা, তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়টাই আজ ওর জন্য ধ্বংসের মুখোমুখি!
তার মানে, এতক্ষণ যতসব আবেগের বিস্ফোরণ, টেকনিক্যাল কাটাছেঁড়া চলছিল, সেটা একরকমের ব্যাপার। কিন্তু এবার বিতর্কটা অন্য মাত্রা পেয়ে গেল! এমনিতে এই ফেড-সভাপতি গ্র্যাভিনা বেশ তালেবর ব্যক্তি। অনেকদিন ধরে চেয়ার আঁকড়ে আছেন। এ-যাত্রাতেও তাঁর পদত্যাগ করার তেমন ইচ্ছে ছিল না। বরং জাতীয় কোচ গান্নারো গাত্তুসো অনেকটা ‘বুঝলে নটবর’ কায়দায় ‘তুমিও যাবে না, আমিও যাব না’ বলে দল পাকাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গোটা দেশের মর্জি-মেজাজ বুঝে গাত্তুসো আগেভাগেই ইস্তফা দিয়ে দেন। গ্র্যাভিনা-বাবুর তার পরেও থেকে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু খোদ সংসদে, সব রঙের রাজনীতিবিদরাই তাঁর বিরুদ্ধে ইতালির ‘ইতালীয়ত্ব’ বিপন্ন করার অভিযোগ আনছেন! প্রায় আমাদের ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’-গোছের ব্যাপার। এর পরে আর টিকে থাকা মুশকিল, গ্র্যাভিনাও হাল ছেড়েছেন।
তবে প্রশ্নটা কিন্তু এখানে একজন ক্ষমতালোভী ক্রীড়াকর্তার পদে থাকা বা না-থাকা নিয়ে নয়। এমনকী, ক্রীড়া প্রশাসনে রাজনীতির হস্তক্ষেপ নিয়েও নয়। আসলে ক্রীড়ামন্ত্রী রেগে গিয়ে যেটা বলেছেন, ঘটনাটা তা-ই। ফুটবলটা ইতালিতে শুধুই, মাঠে নেমে, একটা হাওয়া-ভরা বল নিয়ে বাইশটা লোকের ছুটোছুটি-গুঁতোগুঁতি নয়। সে-দেশের লোকের কাছে ফুটবল স্বপ্ন-বাসনা-যাপন, কাম-ক্রোধ-মোহ, সাধন-ভজন-রমণ, অবসাদ-বিষাদ-অবদমন। ফুটবল তাদের শাঁসে-রক্তে, বাতাসে-জলে। একটা নান্দনিক গোল, দুর্দান্ত একটা রতিক্রিয়ার মতোই তৃপ্তিদায়ক। সব মিলিয়ে ফুটবলটা তাদের দেশ-জাতি-স্মৃতি-সত্তা-সংস্কৃতি— পরিচয়ের চিহ্ন। এই খেলাটাকে তাই ইতালির ঐতিহ্য-ইতিহাসের ওতপ্রোত অংশ হিসেবে ধরতেই হবে। নইলে ভাবুন, সেই কোথাকার কোন মুলুকের রাসেল ক্রো, নিউজিল্যান্ডে জন্মেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় বড় হয়েছেন, হলিউডে নাম করেছেন— ‘ইতালিয়ান কানেকশন’ বলতে ওই একখানি হলিউডি ধামাকা ‘গ্ল্যাডিয়েটর’— তাত্রেই রোমান সাম্রাজ্য, দাস বিদ্রোহ, স্পার্টাকাস হয়ে-টয়ে ইতালির সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি এমনই জড়িয়ে গেছেন যে, বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পরের দিন ভোরে উঠে খবর দেখে, তাঁরও মনে হয়েছে, ‘এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার’!
তো, কোনও ভিনদেশি সিনে-তারা যদি ইতালির প্লে-অফ বিপর্যয়ে এতট মুষড়ে পড়তে পারেন, তাহলে দেশি রাজনীতির ইকো-সিস্টেম কতটা কুরুক্ষেত্রে বাধাতে পারে, তা বুঝতে কোনও রকেট সায়েন্স লাগে না। আসলে ইতালির ফুটবলে আলাদা করে রাজনীতির অনুপ্রবেশ দরকারই হয় না। ওখানে ফুটবল রাজনীতিময় বা রাজনৈতিক সংস্কৃতিই ফুটবল-আচ্ছন্ন। এখন গোটা দেশের মানুষগুলোই যদি ধর্ম বা মাদকের চেয়েও বেশি ফুটবলে আসক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে রাজনীতির লোকগুলোই-বা যায় কোথায়! ইতালিতে তাই অতিদক্ষিণপন্থী থেকে অতি-বাম, মুক্ত-বাজারবিলাসী থেকে গণতন্ত্রী থেকে সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিতে ভরতুকি ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মুখর সমাজতন্ত্রী— ফুটবল মাঠে সব্বাই গা-ঘেঁষাঘেঁষি করেই থাকেন। অবশ্য গা-ঘষাঘষি কথাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শগত আকচাআকচি এখানে ফুটবল স্টেডিয়াম অবধি ঢুকে পড়ে, সেই বেনিতো মুসোলিনির সময় থেকেই।
রাজধানী রোমের সাবেক ফুটবল দল এসএস লাজিও-কে মুসোলিনি ও তাঁর জাতীয় ফ্যাসিস্ট পার্টি, বলতে গেলে দত্তক নিয়েছিল। লাজিও-র ফ্যানক্লাবগুলি গ্যালারিতে এখনও মুসোলিনির ছবিওয়ালা ‘তুমি ধর্ম, তুমি সত্য, তুমি মহা ত্রাতা হে’ গোছের মস্ত-মস্ত টিফো ঝোলায়। নানারকম ফ্যাসিস্ট স্লোগান লেখা ব্যানার টাঙায়। এমনকী, লাজিও-র গোলের পরে, গোটা গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে— ফ্যাসিস্ট কায়দায় সেলাম ঠোকে। এই লাজিও স্ট্যান্ডের সঙ্গে সব সময়ে টক্কর চলে পাশের ক্লাব রোমা-র। রোমা-র সমর্থকরা মূলত আসছে, শহরের শ্রমিক মহল্লাগুলো থেকে। ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলনের সূত্রে, তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য বামপন্থী সমাজতন্ত্রীদের প্রতি, ফলে মাঠে লাজিও-রোমা-র ম্যাচের সময়ে গ্যালারিতে প্রায়ই শ্রেণি সংগ্রামের পরিস্থিতি তৈরি হয়। রোম-ডার্বি উতরে দেওয়াটা, শহরের পুলিশ বাহিনীর কাছেও সব সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়।

শ্রেণিসংগ্রামের প্রসঙ্গেই মনে পড়ল, লাজিও যদি ইতালিয়ান ফ্যাসিবাদের উত্তরাধিকার বহন করে, তাহলে সিরি-এ লিগে ইতালির কমিউনিস্ট ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হল— ইউএস লিভোর্নো। ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির শুরুয়াত যে-শহরে, সেই লিভোর্নো-তেই এই ক্লাবের শিকড়। লিভোর্নোর জার্সির রঙ পার্টির পতাকার মতোই টকটকে গাঢ় লাল। ক্লাবের সদস্য-সমর্থকদের চেতনার রঙও তাই। তারা মাঠে আসে, মার্ক্স-লেনিন-চে গেভারার ছবি সঙ্গে নিয়ে। ম্যাচের শুরু-শেষ ও বিরতিতে, খেলার মাঝেও ‘ইন্টারন্যাশনাল’ গেয়ে দলের উৎসাহ দেয়। ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির মতোই লিভোর্নোরও সময়টা এখন ভাল যাচ্ছে না। কিন্তু একুশ শতকের শুরুতেও সিরি-এ লিগে তাদের ভালই দাপট ছিল। লাজিও-র সঙ্গে তাদের ম্যাচগুলি শুধু বল দখলের লড়াই থাকত না। দুই বিরোধী মতাদর্শর তুমুল টক্কর হয়ে দাঁড়াত। লিভোর্নো-র একদা অধিনায়ক, দুরন্ত স্ট্রাইকার ক্রিশ্চিয়ানো লুকারেল্লির কথা কারও-কারও মনে থাকতে পারে। কট্টর কমিউনিস্ট, জার্সির নিতে ‘চে টি-শার্ট’ পরতেন। লাজিও-র বিরুদ্ধে একবার গোল করে গ্যালারির দিকে ফিরে হাত মুঠো করে রক্তিম অভিবাদন জানিয়েছিলেন। সে-জন্য তাকে লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল। নিজেদের ডাগ-আউট থেকে শুরু করে, গোটা স্টেডিয়াম সেদিন ক্রিশ্চিয়ানোকে বীর শহিদের সম্মান দিয়েছিল।
ইতালি তো চিরকালই এভাবেই রাজনৈতিক বিশ্বাস আর ফুটবল-আবেগের উদযাপন একইসঙ্গে করে এসেছে। পরপর দুটো বিশ্বকাপ জেতার পরে তিন নম্বরটা জিততে, তাদের ছ’দশকেরও বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। চারনম্বরটা জিততে, আরও পঁচিশ বছর। তাতে আবেগে কোথাও কমতি হয়নি। রাজনীতির নায়করাও ফুটবলটাকে ক্ষমতার গদি পোক্ত করার স্প্রিং হিসেবেই দেখেছেন। ফ্যাসিস্ট সর্বাধিনায়ক ‘ইল দুচে’ বা ‘প্রিয় নেতা’, মুসোলিনির চোখের সামনেই ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮-এর বিশ্বকাপ জিতেছিল। ১৯৩৮-এ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরে, সে-দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া-পত্রিকা, ‘লা গেজেত্তা দেল্লো স্পোর্ট’ লিখেছিল, ‘ফ্যাসিস্ট জমানায়, ফুটবলে এই সাফল্য, আমাদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণ করে।’ আর তার ক’দিন আগেই সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে হারানোর উচ্ছ্বাসে লেখা হয়েছিল— ‘কালো মানুষদের পাশবিক শক্তিকে রুখে দিতে, আমাদের ছেলেরা যে-দক্ষতা দেখিয়েছে, তাকে কুর্নিশ জানাই।’ প্রসঙ্গত বলা যায়, ২০০৬-এ ইতালি যখন শেষবার বিশ্বকাপ জিতেছিল, তখন শাসন-ক্ষমতায় ছিলেন মুসোলিনি ভক্ত, বারলুসকোনি। এসি মিলানের সভাপতির পদ থেকে যিনি প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছিলেন। আর ফাইনালে, জিদানের ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারানোর পরে, তাঁর মন্ত্রীসভার এক সদস্য বুক বাজিয়ে বলেছিলেন, ‘ইতালি এ-যাত্রা মুসলিম, কৃষ্ণাঙ্গ আর কমিউনিস্টদের নোংরা হাতের ছোঁয়া থেকে বিশ্বকাপকে বাঁচিয়ে দিল।’

ইতালির বিশ্বকাপ অভিযানের সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে এভাবেই বারবার জড়িয়েছে, ইতিহাস-রাজনীতি। ইতালিয়ান সমাজের এই রাজনীতিকরণ, রাজনীতির ফুটবলীকরণের নীল-নকশা বা রহস্যটা বারবারই বুঝতে চেয়েছেন, সে-দেশের লেখক-কবি-সমাজতাত্ত্বিক— চলচ্চিত্রকার-সহ অনেকেই। আর বুঝতে গিয়ে নিজেরাই ফুটবলের গহন-গোপন নেশায় কখন মজে গেছেন, টেরই পাননি। যেমন, আলবার্তো মোরাভিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর রোমের সাব-অলটার্ন মানুষজনের কাহিনি নিয়ে, তার ছোট গল্পের সংকলন ‘রোমান টেলস’। সে-গল্পের চরিত্ররা, চোর, ট্যাক্সি ড্রাইভার, বেকার শ্রমিক, যৌনকর্মী যাঁরাই হন, তাঁদের প্রায় সবার জীবনই কীভাবে যেন ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। আর ইতালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি-গদ্যকার ও দুনিয়ার সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রকারদের একজন, পাসোলিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যতই বাণিজ্যকরণ হোক, পণ্য-পুঁজিতন্ত্রর সাধ্য নেই ফুটবল মাঠের প্যাশন-আবেগের সবটা দখল করে নেবে। ১৯৭০-এর বিশ্বকাপ ফাইনালে, ব্রাজিলের কালোমানিক, পেলে রিভেলিনো, মারজিনহোদের পায়ের জাদুতে, ইতালির অপরাজেয় কাতেনাচ্চিও রক্ষণ, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার পরে, এই পাসোলিনি-ই লিখেছিলেন, ইতালি তথা ইউরোপের ফুটবল নীরস। ছকে বাঁধা নেহাতই গদ্য, আর ব্রাজিলের খেলায় স্বপ্ন-কবিতা-কল্পনার সৃষ্টিসুখের উল্লাস।
পাসোলিনি মনে করতেন ফুটবল হল, ‘দ্য লাস্ট সেক্রেড রিচুয়াল অফ আওয়ার টাইম।’ গ্রামশির ভক্ত, অনেকটা আমাদের মৃণাল সেনের মতোই ‘প্রাইভেট মার্ক্সবাদী’ পাসোলিনির ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া গিয়েছিল রোম থেকে কিছু দূরে, অস্ট্রিয়ার সমুদ্র সৈকতে। ‘সাঁলো’-র মতো ভয়ংকর ফ্যাসিবিরোধী ছবির পরিচালককে হত্যা করেছিল, নিও ফ্যাসিস্টরাই। তাঁর কফিনের ওপরে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পাসোলিনির প্রিয় ক্লাব— বোলোনা এফসি-র বেগুনি-লাল জার্সি। এক ফুটবল দার্শনিকের জন্য, এক ফুটবলপাগল দেশের শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি— ‘লাস্ট রিচুয়াল’।




