ঈশ্বরের হাত
বলটায় লেগেছিল ‘হ্যান্ড অফ গড’-এর স্পর্শ; পরতে-পরতে জড়িয়ে ছিল ইতিহাস। অ্যাডিডাসের ওই বলটা বছর চারেক আগে নিলামে আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি করে দিয়েছেন আলি বিন নাসের। দাম উঠেছিল ২ মিলিয়ন পাউন্ড! মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে, ২০১৫ সালে দুবাইতে একটি বিজ্ঞাপনের শুটিং করতে যাওয়ার পথে, তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে নেমে বিন নাসেরের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছিলেন সস্ত্রীক দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। নাসেরকে একটি নিজের সই করা টি-শার্টও উপহার দিয়েছিলেন তিনি; তাতে স্প্যানিশে লেখা ছিল, ‘মি অ্যামিগো ইতার্নো’; যার অর্থ, ‘আমার চিরকালের বন্ধু’। নাসেরও কিংবদন্তি ফুটবলারকে পালটা উপহার দেন তাঁর দেওয়ালে টাঙানো ছবির সংগ্রহ থেকে বাছাই করা একটি ছবির ফ্রেম। যে-ফ্রেমে ধরা ছিল, সেন্টার সার্কেলে ইংরেজ অধিনায়ক পিটার শিলটনের সঙ্গে মারাদোনার হাত মেলানোর দৃশ্য। পেছনে কালো পোশাকে ম্যাচ বল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নাসের।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই পরিষ্কার হল, কে এই আলি বিন নাসের! হ্যাঁ, তিনিই ১৯৮৬-র ঐতিহাসিক আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের বিতর্কিত সেই তিউনিসিয়ার রেফারি; যাঁর মুহূর্তের সিদ্ধান্তহীনতা জন্ম দিয়েছিল বিশ্বকাপের ‘হ্যান্ড অফ গড’ বিতর্কের। সে-কারণে তিউনিসে গিয়েই তাঁর বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র। সেদিন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজিয়েই বলটির দখল নিয়ে নিয়েছিলেন নাসের। তবে পরে সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান যে, মারাদোনা যদি তাঁর কাছে ওই ‘ঈশ্বরের হাত’-খ্যাত বলটি দাবি করতেন, তাহলে তা তিনি কিছুতেই দিতেন না!
আরও পড়ুন: এই বিশ্বকাপেই শেষ হবে রোনাল্ডো-মেসি যুগ? লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…
২২ জুন, ১৯৮৬; মেক্সিকো সিটি-র এস্তাদিও অ্যাজটেকা। লিও মেসি, হ্যারি কেনরা তখনও জন্মাননি। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঠিক চার বছর পর আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ঘিরে প্রবল উত্তাপ, যা গ্রীষ্মের অ্যাজটেকার দুপুরের দাবদাহকেও ছাপিয়ে গেছে। মাঠের সেন্টার-সার্কেলের কাছে দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে রয়েছে কালো মাকড়সার মতো ছায়ার নকশা। ম্যাচ তখনও গোলশূন্য; ইংল্যান্ড-বক্সে আছড়ে পড়ছে একের পর এক আর্জেন্তিনীয়দের আক্রমণ, যার প্রাণভোমরা মারাদোনা। পুরো ইংল্যান্ড দলটার দশা তখন কোনও হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের আগ্রাসনের মুখে বক্সিং রিং-এ কোণঠাসা-হয়ে-পড়া এক যোদ্ধার মতো। ডিফেন্সে ত্রাহি-ত্রাহি রব।
ম্যাচের ৫১ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে একটা বল পেয়ে বাঁ-দিক থেকে এগোতে শুরু করলেন মারাদোনা। কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ ডানদিকে হেলে কাটিয়ে নিলেন গ্লেন হডলকে, তারপর চকিতে গতি বাড়িয়ে পিটার রিড আর ট্রেভর স্টিভেনকে পরাস্ত করে ইংল্যান্ড-বক্সের মুখে পৌঁছে গেলেন তিনি। বক্সের মুখ ব্লক করে দাঁড়িয়ে দুই ইংরেজ ডিফেন্ডার— টেরি বুচার আর কেনি স্যানসম। তা পলকে দেখে নিয়ে সতীর্থ জর্জে ভালদানোকে কোনাকুনি বলটি পাস করে বক্সের গোলমুখ লক্ষ করে দৌড়লেন তিনি, ওয়াল পাসের আশায়। ভালদানো বাঁ-পায়ে ফ্লিক করলেন, বলটি প্রায় কাঁধের উচ্চতায় উঠে তাঁর আয়ত্তের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে তাঁর ঘাড়ের কাছে দাঁড়ানো ইংল্যান্ডের স্টিভ হজ বাঁ-পা তুলে ক্লিয়ার করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু হজের পায়ে বলে ঠিকমতো সংযোগ না হওয়ায় বলটি বেলুনের মতো আকাশে উঠে ইংল্যান্ড গোলমুখেই ডিপ করল।

ছ’ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার পিটার শিলটন গোল ছেড়ে বের হতে সামান্য দেরি করলেন। সেই সুযোগে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির মারাদোনা গতিবেগের স্ফুরণে লাফিয়ে বলটি আগে স্পর্শ করলেন। মাথা দিয়ে না প্রসারিত বাঁ-হাত দিয়ে? সাত গজ দূর থেকে তাঁর স্পর্শে বলটি জালে জড়িয়ে গেল। মাটিতে পড়েই মারাদোনা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন রেফারির প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে। তারপর দু’হাত তুলে দৌড় শুরু করলেন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে। তাঁর কাছে সবার আগে পৌঁছে সের্জিও বাতিস্তা জানতে চান, ‘তুই হাত দিয়ে গোলটা করলি, তাই না?’ মারাদোনা দাঁতে দাঁত চেপে টিমমেটকে বলেন, ‘চুপ কর। এখন সেলিব্রেট কর।’ পরে ‘টাচড বাই গড’-এ এই কথা লিখেছেন মারাদোনা। রেফারি বিন নাসের বক্সের বাইরে ছিলেন, তিনি বুলগেরিয়ার লাইন-সহকারী বোগদান দচেভের দিকে একবার তাকালেন। কিন্তু দচেভ ফ্ল্যাগ না তুলে সেন্টার লাইনের দিকে দৌড় শুরু করায়, নাসের গোলের বাঁশি বাজিয়ে দেন।
খুব কাছে থাকায়, টেরি ফেনউইক আর পিটার শিলটন ছাড়া আর কেউই প্রত্যক্ষ করেননি ঈশ্বরের হাতের স্পর্শ। মারদোনার ওই টাচ পূর্বপরিকল্পিত ছিল না, তা ছিল ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়ায় ঘটে যাওয়া এক ‘ফাউল প্লে’। উপস্থিত এক লক্ষ পনেরো হাজার দর্শক ও ধারাভাষ্যকাররাও বুঝতে পারেননি, ঠিক কী হয়েছিল। স্টিল ক্যামেরার কোনও ছবিই ধরতে পারেনি ওই স্পর্শের মুহূর্তটি। মাঠজুড়ে তখন সৌন্দর্য্য, বিভ্রান্তি, বিস্ময় আর উচ্ছ্বাসের মিশ্র অনুভূতি। ফেনউইক ছুটে সেন্টার-সার্কেলে নাসেরকে তাড়া করে গিয়ে হ্যান্ডবলের আবেদন জানাতে শুরু করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন গ্লেন হডল। গ্যারি লিনেকর এসে নাসেরকে বলেন, ‘রেফারি, হ্যান্ডবল প্লিজ!’ লিনেকররা কীসের আবেদন করছেন তা বুঝতে না পেরে বিবিসি ধারাভাষ্যকার ব্যারি ডেভিস মাইক্রোফোনে বলেন, ‘ওরা অফসাইডের আবেদন করছে মাঠে।’ পরে টেলিভিশন রিপ্লে-তে বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার পর, এই নিয়ে নাসের ও দচেভের মধ্যে তিন দশক জুড়ে বিবৃতি-পালটা বিবৃতির ঝগড়া চলে।

এমনিতে ফরাসি ও ইংরেজিভাষী নাসেরের সঙ্গে জার্মান ও স্প্যানিশভাষী দচেভের ভাষা-সমস্যা ছিল। ড্রেসিংরুমে তাঁরা দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলতেন। হ্যান্ড অফ গডের সৌজন্যে আর্জেন্টিনা জিতে যাওয়ায় নিজের দেশে রাতারাতি ‘বিশ্বাসঘাতক’ বনে যান অভিজ্ঞ রেফারি দভেচ। শহর ও ফুটবলের সঙ্গে সমস্ত সংস্পর্শ ত্যাগ করে ২০১৭ সালের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কাটান একটি গ্রামে। যাঁর ভুল ক্লিয়ারেন্স থেকে বিতর্কিত গোলের সূত্রপাত, সেই স্টিভ হজই ভাগ্যবান হয়ে গেলেন ম্যাচের পর; টানেলে মারাদোনাকে ডেকে তার সঙ্গে জার্সি বদল করলেন। এবং দীর্ঘদিন সংগ্রহে রাখার পর, নাসেরের মতোই সেই জার্সি ২০২২-এ নিলামে ৭.১ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে দিলেন। কোনও ক্রীড়া-স্মারকের জন্য এটা রেকর্ড মূল্য। ম্যাচ-স্মারকের ক্ষেত্রেও দচেভের কপাল শূন্যই রয়ে যায়। মৃত্যুর পর মারাদোনা অবশ্য তাঁকেও ‘মি অ্যামিগো’ বলে তাঁর পরিবারের কাছে একটি শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু ম্যাচের সেরা দৃশ্যের তখনও জন্ম হয়নি। হয়েছিল আরও তিন মিনিট পর। সেন্টার-সার্কেলের একটু পেছনে, নিজের অর্ধে একটি লুজ বল ধরে এগোতে থাকেন মারাদোনা। চোরা গতি ও শরীরের ঝাঁকুনিতে একের পর এক ইংরেজ ডিফেন্ডারকে অবলীলায় অতিক্রম করে বক্সে ঢুকে পড়েন। শেষ প্রহরী শিলটন-সহ ছ’জনকে ড্রিবল করে যখন বলটি ইংল্যান্ড-জালে জড়িয়ে দিলেন, তখন অ্যাজটেকার সীমানা ছাড়িয়ে, লা মালভিনাসের (ফকল্যান্ড দ্বীপ) যুদ্ধে অপমানের জ্বালা জুড়ল সুদূর বুয়েনোস আইরেসেও! ‘হ্যান্ড অফ গড’-এর পর একই ম্যাচে দেখা গেল ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’! মারাদোনার এই স্বপ্নের দৌড় থামাতে তাঁকে অন্তত চারজন ইংরেজ খেলোয়াড় ফাউল করার চেষ্টা করেছিলেন; প্রতিটা ক্ষেত্রেই নির্ভুলভাবে অ্যাডভান্টেজ প্রয়োগ করেন নাসের, যা তিউনিসিয়ান রেফারিকে এই ম্যাচ নিয়ে কিছুটা ‘গর্ব’ করার জায়গা করে দেয়।

ইংল্যান্ড কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়েছিল। উইঙ্গার জন বার্নস নেমে আক্রমণে ছন্দ ফিরিয়েছিলেন। বার্নসের সেন্টারে, ৮০ মিনিটে নিখুঁত হেডে ১-২ করেছিলেন লিনেকর। সেই গোলই শেষপর্যন্ত মারাদোনাকে টপকে ব্রিটিশ স্ট্রাইকারকে এনে দিয়েছিল ওই আসরের সোনার বুটের সম্মান। একদম শেষ মুহূর্তে বার্নসের একইরকম সেন্টারে সময়মতো মাথা ছোঁয়াতে না পারায় হারিয়ে গেল ইংল্যান্ডের আশা। পরে নাসের স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি চাইছিলেন ইংল্যান্ড সমতা ফেরাক, যাতে এইরকম একটা রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে তিনি আরও তিরিশটা মিনিট রেফারিং করতে পারেন। প্রথম গোলে তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত যে তাঁর আন্তর্জাতিক রেফারিং কেরিয়ার শেষ করে দেবে, তখনই কি তার আঁচ পেয়েছিলেন নাসের? মারাদোনার টিমে লিনেকরের মতো কোনও যথার্থ নম্বর ৯ ছিলেন না। থাকলে, তাঁকে বক্সের মধ্যে ওইভাবে হাত দিয়ে গোল করতে হত না। ভাগ্যিস! তা না হলে দিয়েগো মারাদোনার দুটো গোলের মধ্যে তাঁর চরিত্রের দুটো বিপরীত সত্তা প্রকাশ পেত না ওই গ্রীষ্মের দুপুরে— একটি শৈল্পিক জিনিয়াসের, আর অন্যটি বিতর্কের ঝড় তোলার; দুটোই সমগ্র বিশ্বকে আন্দোলিত করতে সক্ষম।
ম্যাচের পর আন্তর্জাতিক মিডিয়া, বিশেষ করে আগ্রাসী ব্রিটিশ মিডিয়া থেকে ধেয়ে আসা প্রশ্নবাণের মুখে অদ্ভুতরকম সংযত ও শান্ত আর্জেন্তিনীয় জিনিয়াসকে বলতে শোনা যায়, ‘প্রথম গোলটা খানিকটা আমার মাথা, আর খানিকটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে হয়েছে।’ এহেন দার্শনিক উত্তর স্তম্ভিত করে বহু বিশেষজ্ঞকে। আসলে যতই খেলা হোক, এই ম্যাচের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছিল লা মালভিনাস যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশ ও জাতির রেষারেষি। ৭৪ দিন যুদ্ধের পর লা মালভিনাস ব্রিটিশ দখলেই থেকে যাওয়া, আর্জেন্তিনীয়দের মরিয়া করে তুলেছিল এই ম্যাচটি জিততে। কয়েকজন আর্জেন্টিনার প্লেয়ারকে পরে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের কাছে এই ম্যাচ জেতাটা ছিল বিশ্বজয়ের থেকেও অগ্রাধিকার!’ শুধু আর্জেন্টিনা-শিবিরই নয়, ফিফাও এই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রেষারেষির কথা মাথায় রেখে ইংরেজিভাষী কোনও ইউরোপীয় বা লাতিন আমেরিকানের হাতে বাঁশি তুলে দিতে চায়নি, পক্ষপাতের বিতর্ক এড়াতে।

ওই ম্যাচে, আর্জেন্টিনার গোলের দিকে থাকা নাসেরের আরেক সহকারী, কোস্টারিকার বার্নে উলোয়া বলেছিলেন, হোটেলে ফিরে গোলটির রিপ্লে দেখে ‘দুঃখিত’ হয়ে পড়েন নাসের। যদিও নাসের সরাসরি আঙুল তুলেছিলেন দচেভের দিকে, ‘ফিফা-নির্দেশ অনুযায়ী কোনও লাইন সহকারী যদি আরও ভাল পজিশনে থাকে, তাহলে তার সিদ্ধান্তকেই মান্যতা দেওয়ার কথা। আমিও দচেভ ফ্ল্যাগ না তোলায়, গোলের বাঁশি বাজিয়ে দিই।’ দচেভও পালটা বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ফিফা-নির্দেশ অনুসারে তখন রেফারিকে গিয়ে কোনও উপদেশ দেওয়ার উপায় ছিল না লাইন সহকারীর। আর নাসেরের এত হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ খেলানোর উপযুক্ত অভিজ্ঞতাই ছিল না!’ দচেভ তার আগের স্পেন বিশ্বকাপেও রেফারি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। বুলগেরিয়ার প্রথম ডিভিশন লিগের প্রাক্তন ফুটবলার এই দচেভ রেফারি হিসেবে নাসেরের থেকে ছিলেন অনেক বেশি অভিজ্ঞ। যদিও সংশ্লিষ্ট দুজনেরই আন্তর্জাতিক রেফারিং কেরিয়ারে যবনিকা টেনে দেয় এই ম্যাচ।
আর্জেন্তিনীয়দের মরিয়া ভাব ম্যাচের শুরু থেকেই দেখা যায় সেদিন। প্রবল গরমের জন্য ম্যাচের গতি সামান্য শ্লথ হলেও, ম্যাচের শুরু থেকে আগ্রাসী মেজাজে খেলার রাশ নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন ভালদানো-হেক্টর এনরিকেরা। নেতৃত্বে ছিলেন মারাদোনা। ‘টাইমস’ পত্রিকার ডেভিড মিলার লিখেছিলেন, ‘মারাদোনাকে মনে হচ্ছিল সেই খ্যাপা ষাঁড়ের মতো, যাকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না এক ঝাঁক কৃষকের সমবেত প্রচেষ্টাও। চার-পাঁচজন ইংরেজ ফুটবলার ঘিরে ধরলেও মারাদোনা ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তখনই বিশ্রীভাবে পা চালাচ্ছিলেন ফেনউইক-হডলরা।’

প্রথমার্ধেই দুটো গোল পেতে পারত আর্জেন্টিনা; পায়নি শিলটনের সতর্কতায়। তাই ম্যাচের পর মারাদোনা হয়তো বলতে চেয়েছিলেন যে, এমন একজন ফুটবল ঈশ্বরের স্পর্শ তাঁর টিমকে সাহায্য করেছে, যিনি চেয়েছিলেন সেরা দলটাই যেন এই ‘যুদ্ধ’-এ জয়ী হয়। দক্ষতা ও বুদ্ধির কাছে যেন হার মানে ক্ষমতার দম্ভ। তাই ‘অবিশ্বাসী’ মারাদোনার কণ্ঠেও শোনা গেল ‘ঈশ্বর’-এর উপস্থিতির কথা! প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকে উঠে আসা মারাদোনার প্রাতিষ্ঠানিক যে-কোনও ধর্মের প্রতিই ছিল ঘোর অনীহা। এ-কথা পরে বার বার তাঁর নানা মন্তব্যে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু মারাদোনার এই ‘হ্যান্ড অফ গড’ মন্তব্যের সূত্র ধরে, সেইদিন থেকেই সমগ্র বিশ্বের মানুষ সন্ধান পেলেন ফুটবল মাঠের এক ‘ঈশ্বর’-এর। ৪০ বছর পর আবার অ্যাজটেকায় ফিরছে বিশ্বকাপের আসর। মারাদোনা আর নেই, বহু ফুটবলপ্রেমীর স্মৃতির সরণিতে উঁকি দেবে তাঁর অজস্র শৈল্পিক স্পর্শ। কিন্তু ‘ঈশ্বরের হাত’ আর ফিরে আসবে কি?



