মানবজমিনের ‘চাষা’

Representative Image

তথ্য বলছে, ১৯১২ সালের অক্টোবরে বিলাতে বসেই রবীন্দ্রনাথ কিনে রেখেছিলেন সুরুল কুঠিবাড়ির সঙ্গে প্রায় একশো বিঘে জমি। এই ভগ্নকুঠির আংশিক মেরামত করে ১৩২১ সালের পয়লা বৈশাখ (এপ্রিল, ১৯১৪) কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ আর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী গৃহপ্রবেশ করলেন। ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের কারণে অবশ্য এখানে খুব বেশিদিন থাকতে পারেননি তাঁরা। তবে কয়েক বছর বাদে এই কুঠিবাড়িটিই হয়ে উঠবে কবির পল্লিপুনর্গঠন কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার। ১৩২১ সালে ‘শ্রীনিকেতন’ নামটি ছিল ভবিষ্যতের গর্ভে। লোকে না জানুক, কবির মনের ভিতর শ্রীমণ্ডিতা নিকেতনের একটা আবছা আদল নিশ্চয় গড়ে উঠেছিল। নইলে ‘গীতালি’ কাব্যের পাণ্ডুলিপিতে ১৯ ভাদ্র ১৩২১ (৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৪) ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’ গানটির নীচে রচনাস্থান হিসেবে কেনই-বা স্থান-নাম হিসেবে উল্লেখ করবেন ‘সুরুল/ শ্রীনিকেতন’?

পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে তখন ঠিক এরকমই এক নিকেতনের কথা ভাবছিলেন এক ‘ভারতবন্ধু’ও। লেনার্ড নাইট এল্‌মহার্স্ট (৬ জুন, ১৮৯৩-১৬ এপ্রিল, ১৯৭৪) নামের সেই ভারতবন্ধু সাহেব ১৯১৫ সালে চলে আসেন ভারতে। স্যামুয়েল হিগিনবটম নামে আরেক মিশনারি সাহেব ততদিনে এলাহাবাদে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি কৃষি-প্রতিষ্ঠান। মিশনারিরা যে শুধু ধর্মান্তরিত করতেই এদেশে আসতেন, তা মনে করলে সত্যের নিদারুণ অপলাপ হয়। দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজও ছিলেন আরেক ভারতবন্ধু মিশনারি। এ-ব্যাপারে কোনও-কোনও ওরিয়েন্টালিস্ট পণ্ডিতের সিদ্ধান্ত শুনে মনে হয়, তাঁরা নার্সারি বালকদের মতো সরল!

লেনার্ড নাইট এল্‌মহার্স্ট

সে যাই হোক, হিগিনবটমের সঙ্গে সম্যক পরিচয় হল এল্‌মহার্স্টের। হিগিনবটমের সঙ্গে আলোচনাসূত্রে কিছুটা, কিছুটা সরেজমিন অভিজ্ঞতায় ভারতীয় কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে পরিচিত হলেন তরুণ এল্‌মহার্স্ট। কেমব্রিজের ইতিহাসের ছাত্র এল্‌মহার্স্ট ঠিক করে ফেললেন, এদেশের কৃষকদের এই দুর্দশা-মোচনই হবে তাঁর জীবনের সংকল্প। এর জন্য দরকার কৃষিবিদ্যা নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনা করা। সাহেবরা যে-কাজ করতে চান, সচরাচর তা গোড়া বেঁধেই করে থাকেন। অতএব আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন এল্‌মহার্স্ট।

স্যামুয়েল হিগিনবটম

এর ঠিক কয়েক বছর আগে, শান্তিনিকেতনে বসে কবি রবীন্দ্রনাথও ভেবেছিলেন, আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান না পড়লে, দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ দূর করা যাবে না। পুত্র রথীন্দ্রনাথ, বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, আর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে আমেরিকারই অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিদ্যা পড়তে পাঠিয়েছিলেন কবি। হিগিনবটম জানতেন রবীন্দ্রনাথের কথা। তিনি এল্‌মহার্স্টকে বলেছিলেন কবির কথা। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এল্‌মহার্স্টের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল তখনই। কবির ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ পড়ে তাঁর প্রতি দু’জনেই অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অফ ট্রাস্ট্রির সদস্যা ছিলেন মিসেস হ্যারিয়েট মুডি। তিনিও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পূর্ব-পরিচিত এবং অনুরাগিণী। সমীর সেনগুপ্ত তাঁর ‘রবীন্দ্রসূত্রে বিদেশিরা’ বইতে লিখেছেন, ১৯২১ সালে আমেরিকা সফররত রবীন্দ্রনাথ, মিসেস মুডির পরামর্শেই এল্‌মহার্স্টকে তাঁর সঙ্গে শিকাগোয় এসে দেখা করতে টেলিগ্রাম করেন। ‘রবিজীবনী’-কার প্রশান্তকুমার পাল অনুমান করেছেন, ১৯২১ সালের আনুমানিক ১৭ মার্চ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এল্‌মহার্স্টের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। কবির সঙ্গে সাক্ষাতে মুগ্ধ এল্‌মহার্স্টের মনে হল, ‘গীতাঞ্জলি’র কবিসত্তাটাই এই কবির একান্ত পরিচয় নয়। এই বাস্তব পৃথিবীটাকেও কবি চেনেন নিবিড়ভাবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে জানালেন, তাঁর সুরুল-সংকল্পের কথা। এল্‌মহার্স্ট স্থির করে নিলেন, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেই তিনি কবির কর্মযজ্ঞের শরিক হবেন।

আরও পড়ুন: বিখ্যাত হওয়ার আগেই যামিনী রায়কে নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল শাহিদ সুরাবর্দির আগ্রহে…

এল্‌মহার্স্টের বাবা-মা অবশ্য পুত্রকে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন, তা নয়। বিশেষ করে যখন তাঁরা শুনলেন একরকম বিনা বেতনেই এল্‌মহার্স্ট কবির কাজে যোগ দিতে যাচ্ছেন, তখন তাঁদের আপত্তি খুব অনুচ্চারিত থাকল না। রবীন্দ্রনাথের দিক থেকেও নিশ্চয় এই অর্থগত ব্যাপারটাতে একটা সংকোচ ছিল মনে। অ্যান্ড্রুজ একটি টেলিগ্রাম পাঠালেন এল্‌মহার্স্টকে। তার মর্মার্থ ছিল— বেতনের টাকাপয়সার জোগাড় নেই। অতএব এল্‌মহার্স্টের শান্তিনিকেতন না আসাই ভাল। টেলিগ্রামটা রবীন্দ্রনাথই করিয়েছিলেন, না কি অ্যান্ড্রুজ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে করেছিলেন দেশোয়ালি ভাইকে, তা অবশ্য নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। শান্তিনিকেতনের আরেক সাহেববন্ধু পিয়ার্সন তখন কিছুদিনের জন্য শান্তিনিকেতন থেকে ছুটিতে গেছেন স্বদেশ।  অ্যান্ড্রুজের টেলিগ্রাম পাওয়ার পর সরাসরি পিয়ার্সন সাহেবের সঙ্গে তাঁর ম্যাঞ্চেস্টারের বাড়িতে গিয়ে দেখা করলেন এল্‌মহার্স্ট। ‘মিসেস স্ট্রেট’-এর আর্থিক সহযোগিতা তখন পাচ্ছেন এল্‌মহার্স্ট। মনস্থিরও করে ফেলেছেন, শান্তিনিকেতন আসার। সুতরাং আর কোনও পিছুটান নয়। ভারতের উদ্দেশে সোজা গিয়ে জাহাজে চেপে বসলেন রবীন্দ্রনাথের শ্রীনিকেতন-প্রকল্পের প্রধান বিদেশি সহযোগী এল.কে.এল্‌মহার্স্ট। শেষমেশ ভুবনডাঙায় নোঙর ফেললেন ২৭ নভেম্বর ১৯২১।

দেশের মানুষকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শেখাতে হবে, এই কথাটা রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন ঢের দিন আগেই। তরুণ বয়সে শিলাইদহে পিতার জমিদারির কাজের সূত্রে এসে পল্লিগ্রামের মানুষের সমস্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল কবির। সাধ্যমতো কিছু-কিছু প্রতিবিধানের কাজও করেছিলেন। পতিসরের জমিদার হিসেবে পরবর্তীকালে অনেক বেশি পল্লিপুনর্গঠনের কাজ করেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশে আহমদ রফিকের মতো গবেষকেরা এ-নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। পতিসরেই শ্রীনিকেতন প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল বললে একেবারেই অন্যায় হয় না। কবির এইসব মেঠো কাজের আরেকরকম পূর্বসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে ১৯০৪ সালে অভিব্যক্ত ‘স্বদেশী সমাজ’ ভাবনায়। ‘আত্মশক্তি’-তে বলীয়ান হয়েই যে আর্থিক দৈন্য ও পরাধীনতার রজ্জু কেটে বেরোতে হবে দেশের মানুষকে, তা তো কবি স্পষ্টভাবে বলে আসছেন বিশ শতকের একেবারে গোড়া থেকেই। কৃষিক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুশীলন ও নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেই প্রকল্পেরই একটা ফলিত দিক।

সুরুলে এল্‌মহার্স্টের কাজ শুরু হল মূলত সে-দিকটি নিয়েই। বার্নার্ড বে নামের এক লিথুয়ানিয়ান বৈজ্ঞানিক তখন অবস্থান করছেন শান্তিনিকেতনে। বাদাম তেলকে রান্নার উপযোগী করে তোলা ছিল তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্যতম বিষয়। এল্‌মহার্স্ট আর মিস্টার বে, ডেরা বাঁধলেন সুরুলে। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ এল্‌মহার্স্টকে জানালেন, শান্তিনিকেতনের জনাদশেক কলেজ-ছাত্র কৃষিকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করবার কথা ভেবে রেখেছে। অতএব আর দেরি নয়। সুরুলে শুরু হোক কৃষি-বিদ্যালয়। শান্তিনিকেতন রইল কবির সদ্যপ্রতিষ্ঠিত (১৯২১) বিশ্বভারতীর জ্ঞানকাণ্ড হয়ে, আর সুরুল হবে তার কর্মকাণ্ড। এল্‌মহার্স্ট হলেন বিশ্বভারতীর ‘স্কুল অফ এগ্রিকালচার’-এর সচিব। সত্যদাস চক্রবর্তী তাঁর ‘শ্রীনিকেতনের গোড়ার কথা’ বইতে লিখেছেন, ‘‘১৯২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর তারিখে বিশ্বভারতী সোসাইটির বার্ষিক পরিষদের সভায় সোসাইটির সংবিধি সংশোধনকালে সুরুল সমিতির পরিবর্তে ‘শ্রীনিকেতন সমিতি’ কথাটির সর্বপ্রথম উল্লেখ দেখা যায়।” আর ১৩৩০ সালের মাঘ সংখ্যার ‘শান্তিনিকেতন পত্রিকা’-র সাক্ষ্যে জানা যাচ্ছে, ‘শ্রীনিকেতন’ নামটির ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হচ্ছে ওই ১৩৩০ থেকেই। মাঘ ১৩৩০ মানে অবশ্য ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস। 

পতিসরেই শ্রীনিকেতন প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল বললে একেবারেই  অন্যায় হয় না। কবির এইসব মেঠো কাজের আরেকরকম পূর্বসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে ১৯০৪ সালে অভিব্যক্ত ‘স্বদেশী সমাজ’ ভাবনায়। ‘আত্মশক্তি’-তে বলীয়ান হয়েই যে আর্থিক দৈন্য ও পরাধীনতার রজ্জু কেটে বেরোতে হবে দেশের মানুষকে, তা তো কবি স্পষ্টভাবে বলে আসছেন বিশ শতকের একেবারে গোড়া থেকেই।

১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এল্‌মহার্স্ট রথীন্দ্রনাথ-সহ কয়েকজনকে নিয়ে ঘুরে গেলেন সুরুল। ফিরে এসে শান্তিনিকেতন বাড়ির দোতলায় রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে শুরু হল পরিকল্পনা। সাহেব আর দেরি করতে চান না। অতএব, পরদিন ৬ ফেব্রুয়ারিই শুরু হয়ে গেল সুরুলের ‘স্কুল অফ এগ্রিকালচার’-এর কাজ। শান্তিনিকেতনে ১৯০১ সালে আশ্রম-বিদ্যালয়, কিংবা ১৯১৮ ও ১৯২১ সালে যথাক্রমে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা ও লোকার্পণ অনুষ্ঠিত হয়েছে পৌষ-উৎসবের মধ্যেই। সেগুলির প্রতিষ্ঠা-দিবস হিসেবে মান্যতা পেয়েছে ব্রাহ্ম-ঐতিহ্য অনুযায়ী বাংলা তারিখ। কিন্তু সুরুলের এই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ৬ ফেব্রুয়ারি। আসলে আগে থেকে পাঁজি-পুথি দেখে এই নয়া-প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়নি। অনাড়ম্বরভাবেই পথচলা শুরু হয়েছিল শ্রীনিকেতনের। খুব সম্ভব শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতি অনুসারে কোনও বৈদিক মন্ত্র বা গানও গাওয়া হয়নি সেদিন। শ্রীনিকেতনের সূচনা হয়েছিল একেবারে ‘আনসাং’ভাবেই! 

হাতে গুনলে খুব বেশিদিনের ব্যাপার নয়। মাত্র চোদ্দমাস শ্রীনিকেতন গড়ে তোলার কাজ করেছিলেন এল্‌মহার্স্ট। ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি চিনের কৃষিবিপ্লব প্রত্যক্ষ করতে আবার জাহাজে চেপে বসেন। ১৯২৪ সালে চিন যাবেন রবীন্দ্রনাথ। তার আগে এল্‌মহার্স্ট একবার ঘুরে আসবেন। চিনের কৃষিব্যবস্থা দেখার পাশাপাশি, শ্রীনিকেতনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথাও তিনি বলবেন সে-দেশে। ‘তাজমহল’ ফিল্ম কোম্পানিকে দিয়ে তার জন্য শ্রীনিকেতনের উপর একটা তথ্যচিত্রও বানিয়ে নিয়ে গেলেন এল্‌মহার্স্ট। তার চিত্রনাট্য লিখলেন গ্রেচেন গ্রিন।

যাওয়ার আগে ১৯২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এল্‌মহার্স্টকে বিদায়-সম্বর্ধনা জানানো হয়। বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘দেশিক’ উপাধি প্রদান করেন। বিশ্বভারতী-প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান ‘দেশিকোত্তম’-এর সূচনা ও প্রথম প্রাপক সম্ভবত এল্‌মহার্স্টই। গ্রেচেন গ্রিনের সাক্ষ্য অনুসারে, সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আশপাশের গ্রামের সাধারণ মানুষও। রীতিমতো শান্তিনিকেতনের রীতিতেই তাঁকে বিদায়-সম্বর্ধনা জানানো হয়। স্বয়ং কবি তাঁকে একটি লালচে বাদামি রঙের রেশমি আঙ্‌রাখা পরিয়ে দেন। তার উপর সোনালি অক্ষরে লেখা ছিল সংস্কৃত কোনও স্তোত্র। মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল খয়েরি রঙের ভেলভেটের একটি শিরোভূষণ। বলা যায়, এসবই তাঁর প্রতি শান্তিনিকেতনের আন্তরিক প্রীতির স্বাক্ষর। এই অল্পদিনেই তিনি মিশে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের জীবনধারার সঙ্গে। এর মধ্যে এল্‌মহার্স্ট বক্তৃতা করেছেন পৃথিবীর ভূমির উপর সভ্যতার দস্যুবৃত্তি নিয়ে (‘রবারি অফ দ্য সয়েল’)। পরিবেশ সচেতন মানুষ আজও যা নিয়ে আক্ষেপ করেন, একশো বছরেরও বেশি আগে তা নিয়ে যুক্তি ও আবেগের মিশেলে বক্তৃতা করেছিলেন এল্‌মহার্স্ট। তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল সভ্যতাগর্বী আধুনিক মানুষের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথেরও সতর্কবাণী। ‘পোয়েট অ্যান্ড প্লাউম্যান’ বইতে মুদ্রিত হয়ে আছে এল্‌মহার্স্টের বক্তব্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের সেই সতর্কবার্তাও। শুধু বক্তৃতাই নয়, কলকাতার অ্যালফ্রেড থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ নাটকের রাজসেনাপতির চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন এল্‌মহার্স্ট। অভিনয় করেছিলেন ম্যাডান থিয়েটারে ‘বসন্ত’ নাটকেও। তবে সবচেয়ে তাঁর বড় কৃতিত্ব এই যে, পল্লিপুনর্গঠনের কর্মসূচির ব্যাবহারিক প্রয়োগে সে-সময়ে ম্যালেরিয়ার অন্যতম ডিপো সুরুল গ্রামের অসুখ-বিসুখ অনেকটাই কমে আসে।

এল্‌মহার্স্ট ঠিক কী ধরনের কাজকর্ম শুরু করেছিলেন শ্রীনিকেতনে, তা ওই সময়ের পৌষমেলার বিবরণনামা বা নথিপত্রে রয়ে গেছে। বীরভূমের অনুর্বর কাঁকুরে মাটির উপর বালতি করে মনুষ্যমল ঢেলে তাকে আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করেছিলেন এল্‌মহার্স্ট। মনুষ্যমলের পাত্র নিজের হাতে বয়ে নিয়ে যেতে তাঁর কোনও গ্লানি ছিল না। বরং তাঁকে দেখে প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে জনৈক বর্ণ-ব্রাহ্মণ ছাত্রও পরিষ্কার করেন মলের বালতি। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২২ তারিখে ডায়েরিতে লিখেছেন উৎফুল্ল এল্‌মহার্স্ট: ‘দুটি লালরঙে চিহ্নিত দিন গেল; গতকাল দুজন ছাত্র, আজ আরো দুজন, তাদের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণ, তাদের সমস্ত স্বাভাবিক ও ধর্মীয় সংস্কারকে দমন করে স্বেচ্ছায় পায়খানার বালতি পরিষ্কার করল। কী দারুণ জয়!’ (অনু: সমীর সেনগুপ্ত)। খবর শুনে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন এল্‌মহার্স্টকে, ‘পৃথিবীর এই দুর্গম কোণায় যে ক্ষুদ্র কর্ম তুমি আরম্ভ করলে তার সত্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে একদিন— যার সন্ধানে আজও মানুষ হাতড়ে হাতড়ে বেড়াচ্ছে।’ (অনু: সমীর সেনগুপ্ত)। ফলে বলা যায়, এল্‌মহার্স্ট শ্রীনিকেতনে শুধু মাটির জমির চাষ করেই তাকে সুফলা করে তোলেননি, এখানকার মনের জমির চাষও কিয়দংশে করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বহিরঙ্গে অবশ্য গোপালন, পক্ষীপালন, আগাছা দূরীকরণ এসব কাজেই মানুষকে উৎসাহিত করতেন এল্‌মহার্স্ট। পৌষমেলার প্রদর্শনীতে দেখানো হত, মনুষ্য-প্রযত্নে রুখুমাটি কীভাবে হয়ে উঠেছে শস্য-শ্যামলা। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে, এল্‌মহার্স্ট যেন সাগরপারের এক ম্যাজিশিয়ান। জাদুকরের মতোই কয়েকজনমাত্র সহযোগী নিয়ে বীরভূমের খয়েরি মাটির একাংশকে সবুজে সবুজ করে দিয়েছিলেন অল্পসময়েই।

ঠিক আগের মতো শ্রীনিকেতনের কাজে আর পুরোপুরি কখনওই ফিরে আসেননি এল্‌মহার্স্ট, তা ঠিক; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল অব্যাহত। কবির আর্জেন্টিনা সফরের সময়েও এল্‌মহার্স্ট তাঁর ভ্রমণ-সচিবের ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৯২৫ সালের মার্চ মাসে তিনি তাঁর বাগদত্তা ডরোথি হুইটনি স্ট্রেটকে বিবাহ করেন। এই ডরোথিকে বলা যায় বিশ্বভারতীর ইতিহাসে উপেক্ষিতা! এই ডরোথির অর্থানুকূল্যেই ইংল্যান্ডের ডেভনশায়ারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ডার্টিংটন হল’। এই হলটিকে বলা যায় এল্‌মহার্স্ট-দম্পতির রবীন্দ্রপ্রীতির অন্যতম স্মারক। শুধু কি তাই? শান্তিনিকেতন আসার পর এখানকার প্রয়োজনে বান্ধবী ডরোথিকে আর্থিক সাহায্য করতে অনুরোধ করেছিলেন এল্‌মহার্স্ট। ডরোথি তৎক্ষণাৎ মঞ্জুর করেছিলেন পঁচিশ হাজার ডলার।

এল্‌মহার্স্ট আর ডরোথি জুটি ছিল রবীন্দ্রনাথ কথিত সেই ‘বড়ো ইংরাজ’। একটা ভৌগোলিক রাষ্ট্রীয় সীমানায় এঁদের জন্ম হয়েছিল বটে, কিন্তু আসলে এঁরা অধিকার করতে পেরেছিলেন নিখিল পৃথিবী। নিজেকে অনায়াসে ‘চাষা’ বলতে পারা এল্‌মহার্স্ট আসলে মানবজমিনেরও ‘চাষা’। পতিত রুখুজমিকে আবাদ করে ‘শ্রীনিকেতন’ বানিয়ে তাতে সোনা-ফলানো তাঁর আজীবনেরই সাধনা।