সিঙ্গল মম
‘সিঙ্গল’ শব্দটার সমার্থক বাংলা প্রতিশব্দ না থাকায়, ধরেই নেওয়া হয় যে ব্যাপারটি বেশ আধুনিক এবং পশ্চিমি সংস্কৃতির ফসল। ফলে, তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় প্রতিবাদী তকমা এবং নারীবাদী হুহুংকার। সিঙ্গল খাট বা সিঙ্গল পর্দা-বেডকভার তুলনায় সস্তা এবং আয়ত্তের মধ্যে থাকলেও, ‘সিঙ্গল মম’ বা বাচ্চাসমেত একা-মা ব্যাপারটা বেশ ভজকট জায়গায় পৌঁছে যায়। হয়তো এজন্যই শব্দটা শুনতে ‘সিঙ্গল’ হলেও সন্তানপালনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ অন্য অনেক কিছু বোঝায়; এবং তা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। যেন একটা গড়ানে ঢালু পথে নেমে আসা পাথরখণ্ড; কতটা পথ আর কতটা গড়ানো— তার ঠিকানা নির্দেশ না করে, গড়ানোর অভিমুখটাই লক্ষ্য করে বুঝে-বুঝে পা ফেলে এগিয়ে যাওয়া। কারণ এই গড়ানে ধ্বস এবং ভাঙন দুই-ই আছে; আছে স্বাধীনতাকামী মন এবং একইসঙ্গে বাধ্যত সিঙ্গল হয়ে যাওয়ার মতো এক পরিস্থিতি। তাই আপস এবং প্রতিবাদ, দু’টি ছায়াই এবড়োখেবড়ো করে জায়গা করে নিতে চায় এমন এক গড়ানে রাস্তায়।
ছয়-সাত বা আটের দশকেও শোনা যেত ‘বিধবার সন্তান’ এমন এক চালু লব্জ; ছেলে হলে চাকরি এবং মেয়ে হলে বিয়ের নিদান— এমনটাই ছিল সামাজিক কর্তব্য। করুণাবশত সেই মায়ের পাশে দাঁড়াতে মন চাইত সমাজের। সেখানে ভাগ্য ছিল এক বড় দোহাই। মাথা উঁচু করে না দাঁড়ালেও চলত, কারণ সমাজ তাকে ভিক্ষা দিতে প্রস্তুত। তবে সেই মা কিন্তু বৈধব্যের নিগড় ভেঙে বেরোতে চাইলেই মুশকিল। ফলে বৈধব্য তখন এক বড় কোয়ালিফিকেশন। বৈধব্যের মধ্যেও চিহ্নিত হয়ে থাকবেন মৃত স্বামী; ফলে, মৃত ও জীবিতের এই সামাজিক যৌথতাকে সম্মান করতে প্রস্তুত ছিল সমাজ। ক্রমে দেখা গেল, আর এক রকম বৈধব্য, যেখানে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী চাকরি পেলেন, বিধবা হিসেবেই; বা সন্তান পেল চাকরি এবং স্ত্রী পেলেন পেনশন। এই আর্থিক সুরক্ষাটুকুর আয়োজন হতেই সেই মা-কে কিন্তু ততটা করুণার চোখে না দেখে, চাপা গুঞ্জনে শোনা গেল, একজনের জায়গায় দুজনেরই তো বেশ ব্যবস্থা হয়ে গেল! মৃত্যু কোনও বাহ্যিক শূন্যতা তৈরি করল না; কারণ আর্থিক সংকটের সমাধান হয়ে গেল অচিরেই। সমাজ তাই তাকে দেখল সুবিধা ভোগের দিক থেকে।
এমন সব ব্যবস্থার মধ্যেই একাকিত্বের আরও একটি দিক দেখা গেল, যখন বিবাহ-বিচ্ছেদ চাইল স্বামী বা স্ত্রী। সমাজ এবার কড়াভাবে আইন দেখাল। ফুল-মালা-নহবত-অতিথি আপ্যায়নের মধ্যে আসলে লুকিয়ে ছিল বিবাহ আইন; বিয়ে না ভাঙলে যেটি চট করে বোঝা যায় না। এইখানেই জমাট বেঁধে ছিল ‘সিঙ্গল মম’ ভাবনার প্রাথমিক প্রকাশ। অর্থাৎ বৈধব্য বা অন্যান্য সুরক্ষার বাইরে এসে, অন্য কোনও কারণ, যার ফলে বিবাহিত জীবনে যৌথতায় ছেদ ঘটানো গেল বা যায়। দু’জনের সম্মতিতে হলে হ্যাপা কম; লড়াই চালিয়ে বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হলে উকিল-আদালত, মানে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। তবু জয় হল বিচ্ছেদ-ভাবনার এই মর্মে যে, স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে বিচ্ছেদই একমাত্র সুস্থ সমাধান। অনিবার্যভাবে দেখা দিল সন্তানের অভিভাবকত্ব বা কাস্টডির প্রশ্নটিও; বিচারধীন নানা বিষয়ে আইনি পর্যালোচনার পর মা যখন সন্তানের অভিভাবকত্ব পেলেন, তাঁকে বলা হল ‘সিঙ্গল মম’; আইন নয়, সমাজের দেওয়া নাম বা শিরোপা। অর্থাৎ, অভিভাবকত্বে যৌথতা ভেঙে তিনি একক অভিভাবক হয়ে ওঠার স্বীকৃতি পেলেন। এই স্বীকৃতি দিল আইন। কিন্তু এই ‘সিঙ্গল মম’কে কে কীভাবে গ্রহণ করল, সেটাই আসল কথা। আইন একটা ফতোয়ামাত্র; কিন্তু তার চালচলনে যে বেগড়বাই ঘটবে না, তা কিন্তু মোটেই নয়। গণ-ব্যবহারের ঝোঁক যেহেতু যৌথতানির্ভর, সেহেতু সিঙ্গল মমকে নিয়ে চলবে আরও এক আলোচনা এবং সমালোচনা। খোঁজ চলবে যৌথতা নামক এক সফল পরিষেবা থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণটা ঠিক কী! কেউ যদি মনে করেন ঔদ্ধত্য, তো বাকিরা মনে করবেন বোকামি। আর কেউ-কেউ মনে করতে পারেন স্বেচ্ছাচার। এই তিন দিকের ঝুঁকি নিয়েই শুরু হবে একজন একক মায়ের যাত্রা।
আরও পড়ুন: সংগীতে সিঙ্গলস অনেকটা ছোটগল্পের মতো!
লিখছেন দেবজ্যোতি মিশ্র…
সে-যাত্রায় একদিকে যেমন আছে নানা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাপূরণের চাপ, অন্যদিকে তেমন আছে একা হয়ে যাওয়ার অবসাদ। বাচ্চা, সে যে-বয়সেরই হোক-না কেন, ছেলে-মেয়ে ভেদে মায়ের সঙ্গে জুতে যাবে এমন এক কাঠগড়ায়, যেখানে থাকবে হয় অনুকম্পা নয়তো প্রতিরোধ। আহা রে, এই বাক্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা লোকজনদের মধ্যে কেউই বলবে না যে, এ এমন এক ‘সাহসী মা’র সিদ্ধান্ত, যে নিজের এবং বাচ্চার সমস্তরকম দায়িত্ব নিতে সক্ষম। ‘সমস্তরকম’ ব্যাপারটাও এত বিস্তৃত যে, তারও কিছু ব্যাখ্যা আছে। কাস্টডি তখনই দেওয়া হয়, যখন একজন মা আর্থিকভাবে সক্ষম এবং যথেষ্ট সময় নিয়ে বাচ্চার দেখভালে সমর্থ। সময়ের কথাটা এইজন্য বলা যে, উদয়াস্ত উপার্জনে লেগে থাকলে বাচ্চার অবহেলা হবে। কারণ ধরে নেওয়া হয় যে, তথাকথিত সংসার-কাঠামোয় স্বামী যখন রোজগারে বের হন, স্ত্রী তখন ঘর এবং বাচ্চাদের সঙ্গে স্বামীরও দেখভাল করেন। ফলে এই সমাজ খুব ভাল করেই জানে যে, একটি মেয়েকে কী কী কাজ প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে করতে হয়। সেক্ষেত্রে এই কাজগুলো তো কমবেই না, উলটে ঘাড়ে চাপবে উপার্জনের চাপ। এসব নিয়ে নানা সমীক্ষা, আন্দোলন ও লেখালেখির ফলে ‘রিপ্রোডাক্টিভ ওয়ার্কস অফ উইমেন’— এমন এক চিন্তা-ভাবনার সংগঠিত প্রসার হয়েছে।

আবার অন্যদিকে এমনও সংশয়— তবে কি উপার্জনক্ষম হতেই মেয়েরা যৌথতার নিগড় ভাঙছে! কারণগুলিকে সমাহারে সরলীকরণ করা যায় না। কিন্তু সব ছাপিয়ে এটা বলা যায় যে, যৌথতার দোহাই দিয়ে অসম্মানের যে নানারকম আয়োজন হতে থাকে, তখনই হয়তো মেয়েরা এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তান-সহ বেরিয়ে আসতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে যাকে বলা হয় উপায়ান্তর না দেখে, সেটাই আসলে সম্মানজনক এক উপায়— নিজের জোরে বেঁচে থাকা। আর এই নিজের জোর ব্যাপারটার না আছে কোনও ব্লু প্রিন্ট, না কিছু ধরাবাঁধা পথ। কারণ পদে-পদে নানা পরিস্থিতি এবং প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া; আর সেই সব প্রশ্নের সত্যি উত্তরটা হয় কেউ বুঝেও বোঝে না, নয়তো বাকিদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। কারণ ডিভোর্সে আবার সম্মান কোথায়! প্রতিটি দিনের জন্য নিজেকে এবং বাচ্চাকে প্রস্তুত করে বাড়ির বাইরে পা রাখা মানেই নতুন-নতুন সিলেবাসে ক্রমাগত পরীক্ষা দেওয়া।
যৌন সম্পর্কের খোঁচাখুঁচির অশ্লীল কৌতূহলটাই আসলে অন্য ভাষায় প্রকাশ পেতে থাকে। ঘটনাটা এমনও নয় যে, যৌথজীবনে খুব মোলায়েম অনুরাগে এক স্বতঃস্ফূর্ত যৌন-জীবন যাপন করেছে দুজনে; কিন্তু ওই আড়ালটুকুর আড়ালটাই নব্বই শতাংশ মানুষ পছন্দ করে। ফলে একক মা হয়ে সমাজে বাস করার সিদ্ধান্তে এক চরম অবজ্ঞা দেখা যায় সেই মা এবং বাচ্চার প্রতি; আর তা এমন সমভাবে বর্তায়, যেন শিশুটি পিতৃপরিচয়হীন হয়ে গেল। মায়ের সক্ষমতার দিকটি না দেখে, তাকে একজন অক্ষম মায়ের সন্তান হিসেবেই দেখা শুরু হয়ে যায়। একক মা আসলে অবাঞ্ছিত লতাতন্তুর আড়াল-আবডালগুলো সরিয়ে প্রকাশ্য আলোয় যখন বেরিয়ে আসে, সেই আলোয় ধরা পড়ে যায় আরও অনেক অসহনীয় দিক, যা অন্যায়ভাবে সহ্য করতে বাধ্য হয় মেয়েরা বা অভ্যাসবশে সহ্য করে নেয়, সংসার টিকিয়ে রাখার অনুপ্রেরণায়।
সামাজিক পরিবর্তনের আরও এক প্রসার দেখছি অবিবাহিত মেয়েদের ‘সিঙ্গল মম’ হবার সিদ্ধান্তে। আইনি বিয়ে বা লিভ-ইন পার্টনার ছাড়াই একটি মেয়ে সন্তান লালন করতে চাইছে, তার একার সিদ্ধান্তে এবং সক্ষমতায়; সমস্ত আইনি নিয়ম মেনে সন্তান-সহ নিজের অবস্থানে সে শুধু সিঙ্গল লিখছে না, লিখছে আনম্যারেডও। এ-সমাজ সেটাও হজম করছে, ক্রমাগত ঢোক গিলতে-গিলতে; আবার ‘সিঙ্গল মম’ হিসেবে বাচ্চা অ্যাডপ্ট করার পর যখন মেয়েটি বিয়ে করছে, সে কিন্তু একবারও জোর করছে না তার স্বামীকে, অ্যাডপ্টেড বাচ্চাটিকে বাবা হিসেবে আইনি
স্বীকৃতি দিতে।
আমার মাঝে মাঝেই মনে পড়ে, ‘হসপিটাল’ সিনেমায় একক মা হিসেবে সুচিত্রা সেন অভিনীত চরিত্রটি। সেখানে শেষ পরিণতি মিলনাত্মক হলেও, ‘ক্রেমার ভার্সেস ক্রেমার’ ছবিটিতে মেরিল স্ট্রিপ কিন্তু আপোস করেন না। কে কোন পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্তে আসেন, সেটা বোঝা শক্ত। কিন্তু বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তটি সংখ্যায় বেশ ক্রমবর্ধমান এবং এতরকম অসুবিধে সত্ত্বেও। মেয়েদের ক্ষেত্রে সন্তান-সহ ডিভোর্সি মেয়েরা সব সময়ে যে বাবা-মায়ের সম্মতিতে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে পারে, তা-ও নয়। স্বামী এবং শ্বশুরঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা মানেই, বাপের বাড়িতেও তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেল। সময়টা কিছুটা বদলেছে, কারণ পারিবারিক যৌথতার বাইরেও আরও কিছু সামাজিক পরিষেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে; যেমন বাচ্চাদের প্লে স্কুল, ডে বোর্ডিং কেয়ার এবং ক্রেশ। এমনকী নিম্নবিত্ত কর্মরতা মায়েরাও এই সুবিধা কখনও-কখনও পাচ্ছেন, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি উদ্যোগের দৌলতে। সেখানে আবার কর্মরতা মা হিসেবেই একটা যুক্তিগ্রাহ্য পরিষেবা পাবার ব্যবস্থাও লাগু হচ্ছে। মেয়েদের মধ্যে অন্য আর এক রকমের যৌথতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে আরও নানা পরিষেবার আদান-প্রদান এবং পরস্পরকে সহযোগ দেবার এক নিরাপদ বলয় তৈরি করে নিচ্ছে তারা।
সামাজিক পরিবর্তনের আরও এক প্রসার দেখছি অবিবাহিত মেয়েদের ‘সিঙ্গল মম’ হবার সিদ্ধান্তে। আইনি বিয়ে বা লিভ-ইন পার্টনার ছাড়াই একটি মেয়ে সন্তান লালন করতে চাইছে, তার একার সিদ্ধান্তে এবং সক্ষমতায়; সমস্ত আইনি নিয়ম মেনে সন্তান-সহ নিজের অবস্থানে সে শুধু সিঙ্গল লিখছে না, লিখছে আনম্যারেডও। এ-সমাজ সেটাও হজম করছে, ক্রমাগত ঢোক গিলতে-গিলতে; আবার ‘সিঙ্গল মম’ হিসেবে বাচ্চা অ্যাডপ্ট করার পর যখন মেয়েটি বিয়ে করছে, সে কিন্তু একবারও জোর করছে না তার স্বামীকে, অ্যাডপ্টেড বাচ্চাটিকে বাবা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিতে। সংসারে যে যার স্বাধীন অবস্থানে থাকা অবধি এগোতে পেরেছি আমরা। সীমিত সংখ্যায় হলেও একেবারে যে ঘটছে না— এমনভাবে নস্যাৎ করে দেওয়া যাচ্ছে না ‘সিঙ্গল মম’ হওয়ার গতিকে।
একদিন সম্মান এবং অসম্মানের প্রশ্নে বিবাহ-বিচ্ছেদ এবং একক মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল মেয়েদের। পীড়ন এবং বঞ্চনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিদারুণ অভিমানও; ফলে তার ধরনটা ছিল সক্ষমতার প্রকাশ; সমাজ যাকে দেগে দিতে চেয়েছিল ঔদ্ধত্য বলে। কিন্তু সময়ের বদলে পরিবার নামক তথাকথিত যৌথতাকে পাশ কাটিয়ে মেয়েরাই যখন নিতে চাইছে একক সিদ্ধান্তে মা হওয়ার দায় এবং দায়িত্ব, তখন সেটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তার সম্মত নির্বাচন; অভিমান, কুৎসা বা করুণা কোনও কিছু দিয়েই হেয় করা যাচ্ছে না তাকে। ফলে আইনসম্মত বিয়ে, পারিবারিক যৌথতা, সম্পর্কের জটিল বিস্তার, সম্পত্তির ভাগাভাগি এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব— এমন সব বিষয়গুলিকে ‘দুধুভাতু’ করে দিয়ে গুরুত্বে আসছে একক মা হওয়ার সিদ্ধান্ত। আইনও জুলজুল করে দেখছে এই নতুন মায়েদের, যারা ‘সিঙ্গল মম’ হিসেবে কোনওভাবেই আর অনুকম্পার পাত্র নয়।

আর্থিক সক্ষমতার দিকটিই এক মস্ত আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েদের একক সিদ্ধান্তের পাশে। আমার মনে পড়ে বেশ কিছু মেয়ের কথা, যাঁরা ধর্ম-মা হতে চাইতেন। আইনের বাইরে গিয়ে মনের ইচ্ছেকে প্রকাশ করতেন ‘ধর্ম’ শব্দটির আশ্রয়ে। নাবালক এবং সাবালক দু’বয়সের ছেলেমেয়েরাই সন্তানতুল্য বলে গণ্য হতেন, আইনের সহযোগ ছাড়াই। যুক্তি ছিল এ-ই যে, মা ডেকেছে বলেই সে সন্তান। মন এবং ইচ্ছেরই এক প্রধান ভূমিকা থাকত বলেই আইন তাকে সুরক্ষা দেয়নি। ফলত ‘সিঙ্গল মম’ ব্যাপারটাও বিবেচনায় আসেনি এ-সময়ে। আজকের এই আইন-আশ্রিত পরিণত সমাজব্যবস্থায় ‘সিঙ্গল মম’ ধারণাটি কিন্তু সেই ইচ্ছেকেই মর্যাদা জানাতে বাধ্য হচ্ছে। করুণা, অনুকম্পা, অভিযোগ বা বন্ধ্যাত্ব— এসবের বাইরে এসেই সম্মতির ভাবনাই জোরদার হচ্ছে। আইনি দত্তক না নিয়ে, কোনও মেয়ে যদি স্বেচ্ছায় গর্ভবতী হতে চায় বা সন্তানের জন্মের পর যদি জানাতে না চায় সন্তানের পিতৃপরিচয়, সেখানেও আইনস্বীকৃত হবে গর্ভধারিণী এবং তার সন্তান। ‘জারজ’ হিসেবে বেড়ে উঠবে না সে। ফলে ‘সিঙ্গল মম’ বিষয়টি আজ এতটাই ইচ্ছাধীন এবং আইনসম্মত, যাকে মান্যতা দিতে শিখছে এই অসংঠিত এবং মননহীন সমাজও। ফলত এই জায়গায় যে টেনে আনা গেছে, তার পূর্ণ দায়িত্ব ওই ‘সিঙ্গল মম’দেরই, যাঁরা ঝুঁকির দিকটি বড় করে না দেখে, আনন্দ এবং সম্মানের বিষয়টিকেই গুরুত্বে আনতে পেরেছেন।
বহু শতাব্দী আগে স্পষ্টবাদী জাবালা তাঁর সন্তান সত্যকামকে চিনিয়ে গেছেন মাতৃপরিচয়ে। আরও পরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ইচ্ছে হয়ে ছিলি মনের মাঝারে’। আর এই সময়ে দাঁড়িয়ে সময়ের অভিধান জানাচ্ছে আরও এক শব্দ— ‘সিঙ্গল মম’। প্রশ্নটা তাই শুধুমাত্র দায়-দায়িত্ব বা সম্মান-অসম্মানের নয়। এ হল আইনের প্রতিশ্রুতি এবং একক-মায়ের স্বাধীন ইচ্ছের মধ্যে এমন এক অবাধ যাতায়াতের সম্পর্ক, সাংসারিক যৌথতার হিড়িকে যাকে নস্যাৎ করা যাবে না। মা এবং মাতৃত্বকে একক নিক্তিতে মাপতে শেখার প্রস্তুতিমাত্র। যেতে হবে আরও অনেক পথ; আর ওই একক-মায়েদের চলার বেগেই জেগে উঠবে রাস্তাও।




