সিঙ্গল : পর্ব ৩

Representative Image

সিঙ্গল স্ক্রিন

বসুশ্রী সিনেমার পর্দায় দুর্গার মৃত্যুদৃশ্য চলছে, আমি সে-দৃশ্য দেখে কাঁদছি খুব। মা আমাকে ভোলানোর জন্য বাইরে নিয়ে গিয়ে লজেন্স খাওয়াচ্ছেন। এ-স্মৃতি আমার নয়, আমার মায়ের মুখে শোনা। আমার শুধু মনে পড়ে বিস্ময়ে— অপু-দুর্গার কাশবন দিয়ে ছুটে চলা আর ধোঁয়া-ওঠা ট্রেনের সেই বিখ্যাত দৃশ্য দেখছি দু’চোখ ভরে। আসলে বসুশ্রী সিনেমার মালিকপক্ষের সঙ্গে আমার মামার বাড়ির আত্মীয়তা ছিল। সে-সূত্রেই ছোটবেলায়, আমি ওখানে বাবা-মার সঙ্গে বক্সে বসে ‘পথের পাঁচালী’ দেখেছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গল স্ক্রিনের ইতিহাসে বসুশ্রী হলের ‘বক্স’ খুব বিখ্যাত ছিল। মূলত নিমন্ত্রিত অতিথি কিংবা মালিকপক্ষের আত্মীয়স্বজনরা বক্সে বসে ছবি দেখতেন।

ছোটবেলায় আমরা সিনেমা দেখতাম সিঙ্গল স্ক্রিনগুলোতেই; তখন আর মাল্টিপ্লেক্স কোথায়! সাহেবপাড়ার সিঙ্গল স্ক্রিনগুলোতে সিনেমার সঙ্গে উপরি মজা হিসেবে ছিল— রেস্টুরেন্ট, বার, ডান্সিং ফ্লোরের আমোদ। আমেরিকান-ব্রিটিশ স্টাইল, বা বলা ভাল ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির একটা ধারা বজায় রেখেছিল সাহেবপাড়ার সিঙ্গল স্ক্রিনগুলি। বাঙালিপাড়ার সিনেমা হল বলতে, কয়েকটা নির্দিষ্ট অঞ্চল জুড়ে চেন-থিয়েটার ছিল। অর্থাৎ মিনার-বিজলী-ছবিঘর-প্রাচী-ইন্দিরা এগুলো। ব্যবস্থাপনাটা খানিক এমন— যে-ছবি রিলিজ হবে, একটা নির্দিষ্ট চেনে রিলিজ হবে। পরবর্তীকালে যখন আমি ছবি করেছি, তখন আমার ছবিও এই চেনেই রিলিজ করেছে।

আরও পড়ুন: ‘সিঙ্গল মম’-দের ঘিরে এখনও রয়েছে নানা অশ্লীল কৌতূহল! লিখছেন মন্দার মুখোপাধ্যায়…

মাল্টিপ্লেক্স এল, সিঙ্গল থিয়েটার আস্তে-আস্তে কমতে আরম্ভ করল। মাল্টিপ্লেক্স-সংস্কৃতি আমেরিকাতেই প্রথম শুরু হয়েছিল, কারণ ওরা দেখল লোকজন সিনেমাহল-বিমুখ হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। রেস্টুরেন্ট-জামাকাপড়— এসবের মধ্যে সিনেমাহল নিয়ে এলে নাকি, লোকের দেখার সম্ভবনা বেড়ে যায় । যে-সময়ে আমেরিকাতে টেলিভিশন এসে সিনেমাকে প্রচণ্ড পরিমাণে ধাক্কা দিল, সে-পর্বেই এটা হয়েছিল মনে করা যেতে পারে। আমাদের এখানে এটা হল ঠিকই, কিন্তু সিঙ্গল স্ক্রিনের বিকল্প হিসেবে এটা হয়নি।

আমাদের এখানে শপিং মলে যে-সিনেমা হলগুলো, তার টিকিটের ব্যয়ভার মধ্যবিত্ত বহন পারে না। একটা টিকিটের দাম যদি ৩০০/৪০০ টাকা হয়, একটা পরিবারের পক্ষে মাসে কতগুলো সিনেমাই-বা দেখা সম্ভব! নানান সরকারের আমলে আমরা চেষ্টা করেছি, যদি কোনও পদক্ষেপ নিয়ে সিঙ্গল স্ক্রিনগুলো বন্ধ হওয়া আটকানো যায়! পাশাপাশি প্রোমোটিং-ব্যাবসার বিষয়টিও চলে আসে। সেটা করেও একটা বড় লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা অনেকে খুঁজতে থাকলেন। তবে এও ঠিক, সরকার-পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত কিছু আইন ছিল, যা বলবৎ হয়েছিল কি না আমার জানা নেই। যেমন ধরা যাক, সিঙ্গল স্ক্রিন ভাঙতে গেলে সে-অঞ্চলে অন্তত একটা কিংবা দুটো হল করতে হবে। এ-নিয়ম কয়েকটা জায়গায় হয়তো কার্যকর হয়েছে, হয়তো-বা হয়নি। আমরা যখন সিনেমা বানাতে শুরু করলাম, তখন পশ্চিমবঙ্গের মতো ছোট রাজ্যেও প্রায় ৭০০/৮০০ থিয়েটার ছিল। কিন্তু সেই সংখ্যা কমতে-কমতে এখন হয়তো ১০০-ও নেই। ফলত এ-রাজ্যে সিঙ্গল স্ক্রিনের এমন কেন দুর্দশা হল, সেটার কারণগুলো আগে অনুসন্ধান করে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রযুক্তি, টেলিভিশন, কোভিড পরবর্তী সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর এসে যাওয়া এগুলো তো রয়েছেই। এ-পর্ব থেকেই মোবাইলে সিনেমা দেখার একটা  চল শুরু হল। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের ওয়ার্কিং ক্লাসের একটা বড় অংশ হলবিমুখ হতে শুরু করল। এখন গুটিকয়েক মধ্যবিত্ত মানুষ সিনেমা হলে যান। এঁদের অনেকেই আবার টেলিভিশন-অডিয়েন্স। সামগ্রিক ফুটফল খুবই কম। পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতে— অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলেঙ্গানা মিলে সিঙ্গল স্ক্রিনের সংখ্যা কম করে হলেও প্রায় ১৮০০-র বেশি। এই সংখ্যাটা কিন্তু ওখানকার মাল্টিপ্লেক্সের চেয়েও বেশি। কেরলার মতো ছোট রাজ্যে, একসঙ্গে প্রায় ৬০০ থিয়েটার চলছে। যতই টিভি ওটিটি চলে আসুক না কেন, দক্ষিণ ভারতে সিনেমাহলে যাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। আমাদের এখানে নতুন কোনও এক্সপিরিয়েন্স দেওয়া হয়নি বলেই হয়তো দর্শক হলবিমুখ হয়েছেন। উল্টোদিকে দক্ষিণ ভারতে ম্যাজিক-সার্কাসের মতো নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে দর্শককে নতুন উপাদান দেওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছে।

আমাদের এখানে সিঙ্গল স্ক্রিনে লগ্নিও দিন-দিন কমেই চলেছে। আবার, সিঙ্গল স্ক্রিন একটা শো-ই তিনবার করে চালাত। আমার ‘মনের মানুষ’ সিনেমার ক্ষেত্রেও ম্যাটিনি-ইভিনিং-নাইট এরকম তিনটে শো হয়েছিল। এমনকী ‘আবার অরণ্যে’র সময়েও তো তিনটে শো-ই হত। তখনকার দিনে ছবিটা আমার প্রযোজককে ২০ লক্ষ টাকার উপরে শেয়ার দিয়েছে। এ-ঘটনাও তো এ-সহস্রাব্দের শুরুর-ই! সিঙ্গলস্ক্রিন নেই বলে, বহু জায়গা থেকে রেভেনিউ-ই আসছে না প্রডিউসারের ঘরে। যেটুকু লাভ ছবি থেকে আসছে, তা খুবই কম। বাংলা ভাষায় যেখানে একটা সময়ে এত ছবি হত, সেখানে সিঙ্গল স্ক্রিন থেকে পাওয়া লাভের পরিমাণটা সহজেই আন্দাজ করে নেওয়া যায়। এখন শুনেছি, একটা দল নিজের মতো করে চেষ্টা করছে সিঙ্গল স্ক্রিনকে ফেরানোর। তারা নানা জায়গায়, মফস্‌সলে ঘুরে-ঘুরে সিনেমা দেখাচ্ছে। আমি কিছু ডেমো দেখেছি, যথেষ্ট ভাল। এরকম ফ্রান্সে প্রচুর আছে। ফ্রান্সে হলিউডের চাপ থাকার কারণে, বিখ্যাত নির্মাতাদের ছবি ছোট-ছোট হলে রিলিজ করত। উদ্যোগটা ভাল, কিন্তু প্রশ্ন হল, যদি ৫০-৬০জন একটা হলে আসেন, সেখান থেকে কতটাই-বা রেভেনিউ আসবে!

আমাদের এখানে শপিংমলে যে-সিনেমাহলগুলো, তার টিকিটের ব্যয়ভার মধ্যবিত্ত বহন পারে না। একটা টিকিটের দাম যদি ৩০০/৪০০ টাকা হয়, একটা পরিবারের পক্ষে মাসে কতগুলো সিনেমাই-বা দেখা সম্ভব!

সরকারি উদ্যোগের অন্যতম উদাহরণ নন্দন। পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন ও বর্তমান উভয় সরকারই ‘নন্দন’কে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বর্তমান সরকারের আমলে নন্দন ২-তেও ছবি রিলিজ করা শুরু হয়েছে। এখানে কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষ আসেন, কারণ টিকিট সস্তা। ‘রাধা’ সিনেমাটা আমি উদ্যোগ নিয়ে করেছিলাম প্রিভিউ সিনেমাহল হিসেবে। এখন দুপুর নাগাদ প্রিভিউ হয়, তারপর সিনেমা দেখানো শুরু হয়, প্রচুর লোক ওখানে আসেন। সিঙ্গল স্ক্রিন বাঁচাতে গেলে এরকম আরও উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক। এখানে আরও একটা বিষয় রয়েছে; সিনেমাহল তথা সিঙ্গল স্ক্রিন যে বাড়বে, সে-জন্য তো ‘সিনেমা’ দরকার! সেটার সংখ্যাও তো দিন-দিন কমে আসছে।

আরও যে-দিকটা থেকে বাঙালি মার খেয়েছে, সেটা হল দেশভাগ। সে-অর্থে দেখতে গেলে ভারত তো ভাগ হয়নি, হয়েছে বাংলাভাগ। এই দেশভাগের আগে এতবড় একটা মার্কেট ছিল, বাঙালি লাহোর পর্যন্ত থাকতেন, সে-অবধিও ছবি রিলিজ হত। দেশভাগের পর সব ভেঙেচুড়ে গেল, আমাদের কলকাতা থেকে বিমল রায়, শচীন দেববর্মণ, সলিল চৌধুরী— এঁরা বম্বে চলে গেলেন। এটা বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম দুর্ভাগ্য। তা সত্ত্বেও অসামান্য কিছু ভাল ছবি হয়েছে এই বাংলাতেই, সে-ছবি ব্যাবসাও করেছে। এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ভাবতে হবে আমরা কীভাবে কী করতে পারি। সিঙ্গল স্ক্রিনের উপভোগ্যতাই আলাদা। আমি মাঝে-মাঝে মাল্টিপ্লেক্সে যাই, তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। সিঙ্গল স্ক্রিনের পরিবেশ যেন অনেক বেশি মার্জিত, ‘সিনেমা দেখতে হলে আসছি’— এই ব্যাপারটা অনেকটা উপভোগ করা যায় সিঙ্গল স্ক্রিনের ক্ষেত্রে।

ফিরে আসি সেই ছোটবেলার স্মৃতিতেই; আমরা যখন ছোটবেলায় সিনেমা দেখতাম, সবথেকে সস্তার টিকিটে দেখতে হত। সেই সিটগুলো থাকত একদম উপরে। এছাড়া লাইটহাউস, মেট্রো— এগুলোর সামগ্রিক পরিবেশটাই অন্যরকম ছিল। মেট্রোর বিখ্যাত লাল কার্পেটের কথা ভাবলে, আজও রোমাঞ্চ হয়! সবটা জুড়ে একটা গ্র্যাঞ্জার ছিল। প্রযুক্তির সঙ্গে-সঙ্গে অনেককিছুই বদলাচ্ছে, অতএব আক্ষেপ না করে আগামীদিনের আশাতেই আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে…