বিষ-রূপ দর্শন: পর্ব ২

Representative Image

মৃত্যুর খুব কাছেই

আমাদের শরীরের প্রত্যেক কোষের ভেতরে গ্লাইকোলাইসিস, ক্রেবস চক্র ও ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম এই ত্রয়ী— পরস্পর শৃঙ্খলিত জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে, এক অনু গ্লুকোজ জারিত হয়ে ছয় অনু জল, ছয় অনু কার্বন ডাইঅক্সাইড আর প্রায় ৩৮ অনু ATP (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট) তৈরি হয়। দেহের কোষীয় শ্বসনকে এভাবেই সহজে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই ৩৮ অনু ATP-র মধ্যে, দু’অনু তৈরি হয় গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়ায়, বাকি প্রায় পুরোটাই তৈরি হয় ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমে। ATP হল আমাদের দেহের এনার্জির কারেন্সি। একে ভাঙিয়েই যে-শক্তি পাওয়া যায়, তা দিয়েই আমাদের দেহের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় থাকে। এই ATP তৈরির জন্যই কোষের এত কাঠ-খড় পোড়ানো। গ্লুকোজ দহনের একদম শেষধাপ, ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম সংঘটিত হয় কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায়। এই মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরেই সাইটোক্রম সি অক্সিডেজ নামের এক উৎসেচক থাকে। ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের একদম শেষ ধাপে অক্সিজেন রক্তের হিমোগ্লোবিন দ্বারা বাহিত হয়ে কোষে প্রবেশ করে, উক্ত উৎসেচকটির সঙ্গে জুড়ে যায় ও আগত ইলেকট্রন গ্রহণ করে জল উৎপন্ন করে। এই ক্ষুদ্র পর্যায়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছাড়া ATP উৎপন্ন হবে না। সায়ানাইড ঠিক এখানেই গণ্ডগোল পাকায়।

সোডিয়াম বা পটাশিয়াম সায়ানাইড খাদ্য বা পানীয়ে দ্রবীভূত হয়ে কিংবা সরাসরি— যেভাবেই পাকস্থলীতে প্রবেশ করুক, পাকস্থলীর প্রগাঢ় আম্লিক পরিবেশে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন সায়ানাইডে রূপান্তরিত হয়, তারপর পাকস্থলীর দেওয়াল ও অন্ত্র দ্বারা শোষিত হয়ে মূল রক্তস্রোতে প্রবেশ করে। হাইড্রোজেন সায়ানাইড পরিপাক তন্ত্র-দ্বারা শোষিত হয়ে রক্তে মিশুক কিংবা প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুস হয়ে সরাসরি রক্তস্রোতে মিশুক, একবার রক্তস্রোতে প্রবেশ করলে তার ধ্বংসলীলা অবশ্যম্ভাবী।

আপেলে লুকিয়ে সায়ানাইড? যে-ইতিহাস ধরা রয়েছে উনিশ শতকের এক হত্যাকাণ্ডে! পড়ুন: বিষ-রূপ দর্শন পর্ব ১…

হাইড্রোজেন সায়ানাইড রক্তে মিশে যাওয়ার পর, রক্ত দ্বারা বাহিত কোষে প্রবেশ করে। কোষে প্রবেশের পর সায়ানাইড আয়নটি হাইড্রোজেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। এবারই শেষের কবিতার শুরু। সায়ানাইড আয়নটি সবার অলক্ষ্যে কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায় ঢুকে পড়ে। তারপর সেই সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজ উৎসেচকের ঘাড়ে শক্ত করে চেপে বসে। সায়ানাইড আয়ন অক্সিজেন অনুর চেয়ে দ্রুত, চটপটে। তাই অক্সিজেন অনু যখন শেষমেষ রক্ত দ্বারা বাহিত হয়ে ওই উৎসেচকের কাছে পৌঁছায়, সে তখন হতভম্ব হয়ে দেখে, তার সিংহাসনটি ইতিমধ্যেই সায়ানাইড আয়ন জবরদখল করে নিয়েছে। অক্সিজেনের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা রইল না। সে ওই উৎসেচকের সঙ্গে জুড়তে না পেরে, ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে পড়ল।

জল উৎপাদনের যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়া, সেটা আর সম্পন্ন হল না। রক্তে অক্সিজেনের কোনও কমতি নেই, কিন্তু কোষ তাকে ব্যবহার করতে অক্ষম। এ যেন একপ্রকার কোষের শ্বাসরোধ। অক্সিজেন অনু থেকে জল উৎপাদনের এই ছোট্ট পর্যায়টি অসম্পূর্ণ রয়ে যাওয়ায়, ক্রেবসচক্র ও ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের এইসব পরস্পর সম্পর্কিত জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার শৃঙ্খলও মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। সেই মুহূর্ত থেকেই বন্ধ হয়ে যায় ATP-র উৎপাদনও।

স্বাভাবিক অবস্থায় এক-এক কোষে উৎপন্ন হত প্রায় ৩৮ অনু ATP,  কিন্তু ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, কোষের এখন একমাত্র ভরসা গ্লাইকোলাইলাইসিসে উৎপন্ন মাত্র দুই অনু ATP। কিন্তু মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, হৃৎপিণ্ডের মতো দেহতন্ত্রের ‘পাওয়ার হাউস’ সিস্টেমগুলো চালানোর জন্য, নিরন্তর প্রচুর ATP-র জোগান প্রয়োজন। তাদের মাত্র এই দুই অনু ATP তে পোষাবে না। তাই দেহের এইসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা  প্রথমে বন্ধ হতে শুরু করে। বিষক্রিয়ার লক্ষণও ক্রমে পরিস্ফুট হয়।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ক্রমে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ফলস্বরূপ—  প্রথমে মাথা ঘোরা, বমিভাব, অস্থিরতা শুরু হয়, তারপর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সংজ্ঞা হারানো। হৃদপিণ্ড তখন সচল থাকলেও, স্পন্দন ক্রমে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ক্রমে আসে দেহের পেশি শৈথিল্য। শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমে ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে কোষ গ্লাইকোলাইলিসে ওই দুই অনু ATP উৎপাদন বজায় রাখতে গিয়ে, ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে বসে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ল্যাকটিক অ্যাসিড যখন কোষে সঞ্চিত হয়, কোষেদের মৃত্যু তখন সময়ের অপেক্ষা। অতঃপর ক্রমে কোমা ও তারপর নির্মল মৃত্যু। এখন দেহের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষস্তরে সায়ানাইড কী ভয়ানক রাসায়নিক কারিকুরি করে রেখেছে, পরিপূর্ণ দেহপট দেখে তা আন্দাজ করার উপায় নেই। মৃত্যুর কোনও বিভীষিকা-চিহ্ন রেখে যায় না।

সায়ানাইড শরীরে প্রবেশের মিনিট দুয়েকের মধ্যেই বিষক্রিয়ার লক্ষণ পরিস্ফুট হয়— বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, মৃত্যু আসে দশ মিনিট থেকে আধঘণ্টার মধ্যে। তবে, বিষের পরিমাণ বেশি হলে মৃত্যু আসে আরও দ্রুত। বিষ পেটে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। মুখে থাকতেই খেল খতম। মুখের লালা জলীয়, উপরন্তু অল্প আম্লিক। স্বল্প পরিমাণ লালাতেই যে-পরিমাণ পটাশিয়াম সায়ানাইড দ্রুত দ্রবীভূত হয়ে হাইড্রোজেন সায়ানাইড উৎপন্ন করে, তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু আসে মাত্র মিনিট কয়েকের মধ্যে। পরিপাকতন্ত্রের তুলনায় মুখগহ্বরে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের শোষণ অনেক বেশি দ্রুত ও কার্যকরী। হাইড্রোজেন সায়ানাইড অতি উদ্বায়ী। তাই মুখগহ্ববের শ্লেষ্মা ঝিল্লি, এপিথেলিয়াল ট্যিসু দ্বারা দ্রুত শোষিত হয়ে রক্ত জালিকার মাধ্যমে খুব সহজেই দেহের রক্তস্রোতে মিশে যায়। সায়ানাইড পিল, সায়ানাইড ক্যাপসুল কিংবা লিথাল পিলেরও কার্যপদ্ধতি ঠিক এটাই। ওতে সায়ানাইড মজুত থাকে মাত্রারিক্ত ঘনত্বের। এক কামড়েই মৃত্যু হানা দেয় চকিতে। তাই তো, যুগে যুগে বিপ্লবী, বিদ্রোহী, গুপ্তচররা নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য সায়ানাইড পিলের উপর ভরসা রেখে চোখ বুজেছেন।

চিটাগাঙ পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব হামলার পর— প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। তারপর উল্লেখ্য বিপ্লবী বাদল গুপ্তর কথা। পটভূমি ১৯৩০ এর ৮ ডিসেম্বর কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ‘অলিন্দ যুদ্ধ’। সেদিন বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত নিজেদের রিভলবারের শেষ গুলিটা খরচ করেছিলেন জীবন উৎসর্গ করার উদ্দেশ্যেই। আর বাদল গুপ্ত মুখে দিয়েছিলেন সায়াইনডের পুরিয়া। বিনয় বসু আর দীনেশ গুপ্তকে পুলিশ পরে আহত অবস্থায় উদ্ধার করলেও, বাদল গুপ্ত মারা গিয়েছিলেন তৎক্ষণাৎ।

বিপ্লবী বাদল গুপ্ত

এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্তিম লগ্নে শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এয়ারফোর্সের যে-সমস্ত পাইলটরা যুদ্ধবিমান নিয়ে শত্রুপক্ষের ডেরায় হানা দিতেন, শত্রুপক্ষের হাতে যুদ্ধবন্দি হওয়া এড়াতে তাঁরা অনেকেই অভিযানে যাওয়ার আগে জামার কলারে সেলাই করে নিতেন সায়ানাইড-ক্যাপসুল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরাও ভরসা রাখতেন সায়ানাইডের এই মৃত্যুবটিকায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে জার্মানির পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত, মিত্রশক্তির হাতে অপমানজনক গ্রেপ্তারি এড়াতে হেঁরিখ হিমলা, ফিলিপ বুলারের মতো প্রথম সারির নাৎসি নেতারা সায়ানাইড পিলকেই বেছে নিয়েছিলেন। স্বয়ং জার্মান ফ‍্যিউরার ও তার স্ত্রী(?) ইভা ব্রাউনও শেষমেষ একই পথের শরিক হলেন। নাৎসি প্রপাগান্ডা মিনিস্টার জোসেফ গবেলস ছিলেন হিটলারের একনিষ্ঠ অনুগত শিষ্য। তিনিও সপরিবারে গুরুর পথই অনুসরণ করলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে নুরেমবার্গে যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে বাকি নাৎসি অফিসারদের বিচার শুরু হল। বিচারে হিটলারের ডানহাত হেরম্যান গুরিং-সহ প্রায় প্রত্যেকেরই মৃত্যুদণ্ডের সাজা হল। মৃত্যুদণ্ডের আগের রাতে হেরম্যান গুরিং গোপনে সায়ানাইড পিল খেয়ে আত্মহত্যা করলেন। এ-সকল নাৎসি অফিসারদের সকলেই ছিলেন হলোকাস্টের মাস্টারমাইন্ড, কন্সট্রেশন ক্যাম্পে লক্ষ-লক্ষ ইহুদি, যুদ্ধ-বন্দিদের গ্যাসচেম্বারে হাইড্রোজেন সায়ানাইড দিয়ে হত্যার প্রণেতা। সেই সায়ানাইডের কাছেই তাঁদের আত্মসমর্পন করতে হল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ছয় ও সাতের দশকের আমেরিকা-রাশিয়ার ‘ঠান্ডা লড়াই’-আবহ রোমাঞ্চকর স্পাই কাহিনির জন্ম দিয়েছে, জনপ্রিয় সব কাল্পনিক স্পাইচরিত্রও তৈরি হয়েছে সে-সময়েই।

রাশিয়ার আলেকজান্ডার ওগরডনিক কিন্তু কোনও কাল্পনিক স্পাইচরিত্র ছিলেন না। ছিলেন ডবল এজেন্ট। খাতায়-কলমে কেজিবির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করলেও, তলে-তলে আমেরিকার সিআইএর কাছে রাশিয়ার গোপন নথি পাচার করতেন। ১৯৭৭ নাগাদ কেজিবি তাঁর বিশ্বাসঘাতক কর্মকাণ্ডের খোঁজ পেয়ে ওগরডনিককে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারির পর স্বীকারোক্তি লেখার সময়ে ওগরডনিক নিজের ফাউন্টেন কলমটি চেয়ে বসেন। তারপর স্বীকারোক্তি লিখতে-লিখতে হঠাৎই সেই কলমের গোড়া নিজের মুখের মধ্যে দিয়ে দেন। ওগরডনিকের এমন আচরণে, উপস্থিত কেজিবি অফিসাররা হতভম্ব হয়ে যান। তাঁরা কেউ ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করেননি, ওই কলমের গোড়ায় লুকানো রয়েছে সায়ানাইড ক্যাপসুল। ঘণ্টা কয়েক পর হাসপাতালে ওগরডনিকের মৃত্যু ঘটে।

মৃত হেরম্যান গুরিং

তবে আধুনিক সময়ে ‘নো এস্কেপ’ সিচুয়েশনে, মুক্তির খোঁজে সায়ানাইড ক্যাপসুলের ব্যবহারকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছিল শ্রীলঙ্কার ‘তামিল টাইগার্স’ এর সদস্যরা। রাষ্ট্রবিরোধী যে-কোনও ‘মিশনে’ আপৎকালীন মুক্তির জন্য তাদের গলায় ঝুলত সায়ানাইডের মৃত্যুবীজ। বিপ্লবী, বিদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী ,যুদ্ধ অপরাধী-উপরোক্ত ব্যক্তিদের এসব আপাত আপেক্ষিক ঐতিহাসিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যদি এঁদের মৃত্যু পরিস্থিতিকে বিচার করা হয়, তাহলে বোঝা যাবে এরা প্রত্যেকে প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করার গ্লানির তুলনায়, স্বেচ্ছামৃত্যুর মুক্তিকেই শ্রেয় মনে করেছেন।

গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতিরা যদি সায়ানাইডকে খলনায়কের আসনে বসিয়ে থাকে, তাহলে দেশ-কাল নির্বিশেষে এমন আত্মোৎসর্গও সায়ানাইডকে বানিয়েছে মর্বিড রোম্যান্সের নায়ক, মৃত্যুঞ্জয়ী বীজমন্ত্র।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে সায়ানাইড খেয়ে কিংবা খাইয়ে আত্মহনন ও হননের ঘটনা ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি। টায়েলের কেসের মতো বহু ঘটনা সে-সময় সামনে এসেছে, কোনওটা হয়তো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্যে সায়ানাইডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়, আর এ-যুগে সায়ানাইড দিয়ে খুন বা আত্মহননের ঘটনা দুর্লভ। সে-সময়ে বারোমেসে মামুলি রোগের টোটকা হিসেবে সায়ানাইডের নানান সলিউশন মুড়িমুড়কির মতো ব্যবহৃত হত, এখন সে-সুযোগ নেই। ফলে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সায়ানাইডের নাগাল পাওয়া মুশকিল। স্বর্ণশিল্প, ওষুধ নির্মাণের মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ছাড়া বাকিদের সায়ানাইডের নাগাল পাওয়া এ যুগে দুষ্কর। তারফলে, এ-যুগে সায়ানাইড ঘটিত কোনও অপকর্ম ঘটলে, তদন্তের পরিসর অনেকটাই সীমিত এবং সায়ানাইড কীভাবে প্রাপকের কাছে এসেছে, সেটিও সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব।

সায়ানাইড ত্রয়ীর মধ্যে হোমিসাইডের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ব্যবহার পটাশিয়াম সায়ানাইডের। কারণটি এর দ্রাব‍্যতা। পূর্নবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে পটাশিয়াম সায়ানাইডের মারণ ডোজ কয়েকশো মিলিগ্রাম। হিসেবের সুবিধার্ধে যদি সকল পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ডোজকে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, ঘরের তাপমাত্রায় ১০০ মিলিলিটার জলে যে-পরিমাণ পটাশিয়াম সায়ানাইড দ্রবীভূত হতে পারে, তা খাতায়-কলমে প্রায় আড়াইশো পূর্ণবয়স্ক মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে সক্ষম। সুতরাং অতি স্বল্প পরিমাণ জলে, মারণমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ পটাশিয়াম সায়ানাইড গুলে দেওয়া সম্ভব।

তুল‍্যমূল্য বিচারে দেখা যাবে, এযুগে, এমনকী উনিশ শতকেও যখন বিভিন্ন বিষের ব্যবহার ও অপব্যবহারের স্বর্ণযুগ হয়ে উঠেছিল, সে-সময়েও অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে অপরাধী মহলে অন্যান্য বিষের তুলনায় পটাশিয়াম সায়ানাইডের ব্যবহার বেশ কম। ভাবতে অবাক লাগে— এর অসাধারণ দ্রাব্যতা, নিখুঁত মৃত্যুর নিশ্চয়তাও অপরাধীদের মধ্যে একে তেমন জনপ্রিয় করতে পারেনি। প্রথম কারণটি যদি পটাশিয়াম সায়ানাইডের প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা হয়, দ্বিতীয়টি এর বিচিত্র স্বাদ ও গন্ধ।

বিষ প্রয়োগে হত্যার ক্ষেত্রে অপরাধী সবসময়ে এমন বিষের সন্ধানেই থাকে, যার দ্বারা ভিক্টিমের মৃত্যু যেমন নিশ্চিত করা যায়, তেমনি সেই বিষ মেশানো খাদ্য বা পানীয় গ্রহণের সময়ে ভিক্টিম কোনওরকম সন্দেহ যেন না করে। খাদ্য বা পানীয়ের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ভিক্টিমের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় জাগলেও, ভিক্টিম তা সচারচর গ্রহণ করবে না, উপরন্তু আততায়ীর উপর সন্দেহও পড়তে পারে। পটাশিয়াম সায়ানাইড প্রথম শর্তটি পূরণ করলেও, দ্বিতীয়টি পূরণে অক্ষম। পটাশিয়াম ও সোডিয়াম সায়ানাইডের নিজস্ব কোনও স্বাদ-গন্ধ নেই। কিন্তু দুটোই জলীয় দ্রবণে আংশিক বিশ্লেষিত হয়ে হাইড্রক্সিল আয়ন উৎপন্ন করে এবং দু’ক্ষেত্রেই উদ্বায়ী হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি হয়। হাইড্রক্সিল আয়নের উপস্থিতির জন্যই, দুই সায়ানাইড লবণের জলীয় দ্রবণই অত্যন্ত ক্ষারীয়। তাই এর কষাটে তীব্র তীক্ষ্ণ জ্বালা উদ্রেককারী এক অনুভূতি আছে। আর হাইড্রোজেন সায়ানাইডের গন্ধ কতকটা তেতো আমন্ড বাদামের মতো (কিংবা বলা যেতে পারে, তেতো আমন্ডের গন্ধ কতকটা হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো)। যদিও গন্ধটি মৃদু এবং গন্ধের তীব্রতা অনেকাংশে নির্ভরশীল, বায়বীয় পরিমণ্ডলে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের ঘনত্বের উপর। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, হাইড্রোজেন সায়ানাইডের এই বিশেষ মৃদু গন্ধটি সব ব্যক্তি পায় না, এটা কিছুটা জিন নিয়ন্ত্রিত। তাই কোনও ভিক্টিম গন্ধ পেতেও পারে আবার বাকিরা নাও পারে। কিন্তু সায়ানাইড লবণের জলীয় দ্রবণের অমন তীক্ষ্ণ স্বাদ উপেক্ষা করার কারও জো নেই।

তুল‍্যমূল্য বিচারে দেখা যাবে, এযুগে, এমনকী উনিশ শতকেও যখন বিভিন্ন বিষের ব্যবহার ও অপব্যবহারের স্বর্ণযুগ হয়ে উঠেছিল, সে-সময়েও অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে অপরাধী মহলে অন্যান্য বিষের তুলনায় পটাশিয়াম সায়ানাইডের ব্যবহার বেশ কম। ভাবতে অবাক লাগে— এর অসাধারণ দ্রাব্যতা, নিখুঁত মৃত্যুর নিশ্চয়তাও অপরাধীদের মধ্যে একে তেমন জনপ্রিয় করতে পারেনি। প্রথম কারণটি যদি পটাশিয়াম সায়ানাইডের প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা হয়, দ্বিতীয়টি এর বিচিত্র স্বাদ ও গন্ধ।

২০০৬ নাগাদ কেরালার এক স্বর্ন ব্যবসায়ী এম পি প্রসাদ সোডা-হুইস্কির গ্লাসে পটাশিয়াম সায়ানাইড মিশিয়ে আত্মহত্যা করেন। সায়ানাইড তাঁর শরীরে বিষক্রিয়া শুরুর আগে তিনি একটি ছোট সুসাইড নোট লেখার সুযোগ অন্তত পেয়েছিলেন। সেই অসমাপ্ত সুসাইড নোটে তিনি উল্লেখ করে গেছেন, পটাশিয়াম সায়ানাইড দ্রবণের স্বাদ- ‘ইস…কী বিশ্রী…কী তীব্র…আমার জিভ জ্বলে গেল।’ সুতরাং, এমন ব্যতিক্রমী বিচিত্র স্বাদ লুকানো বড় সহজ নয়। এই প্রতিবন্ধকতার জন্যই মূলত পটাশিয়াম সায়ানাইড দ্বারা খুনের ঘটনা বেশ কম।

যে-ব্যক্তি এই প্রতিবন্ধকতাকয়ে বাজিমাত করে কার্যসিদ্ধি করেন, তিনি নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান অপরাধী। তাঁর হাতে পটাশিয়াম সায়ানাইড হয়ে ওঠে ‘পয়জনার্স প্যারাডাইজ’। আততায়ী, পানীয়ের মাধ্যমে পটাশিয়াম বা সোডিয়াম সায়ানাইড যদি ভিক্টিমকে দিতে চায়, তার প্রধান লক্ষ্যই হবে, এই স্বাদের তীব্রতা ও তীক্ষ্ণতা যতটা সম্ভব হ্রাস করা। কিংবা দৈনন্দিন জীবনের এমন কোনও সময়ে ভিক্টিমের হাতে বিষাক্ত পানীয়ের গ্লাস তুলে দেওয়া, যাতে ভিক্টিম তা পান করার সময়ে, পানীয়ের ব্যতিক্রমী স্বাদটি খেয়াল করার বিশেষ সুযোগ না পায়। ১৯৯৮ নাগাদ এই দুইয়েরই সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিল এক অপরাধী।

ঘটনাস্থল, মিশরের লাক্সরের ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল উইন্টার প্যালেস হোটেল। এ-হোটেলের ঘরের জানালা দিয়ে নীলনদের বিস্তীর্ণ প্যানোরমিক দৃশ্য দেখা যায়। তাই বিশ্বের ধনবান অভিজাতদের কাছে এ-হোটেলর খুব জনপ্রিয়তা। বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এ-হোটেলে পা রেখেছেন। শোনা যায়, আগাথা ক্রিস্টি মিশর বেড়াতে এসে, তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ডেথ অন দ‍্য নাইল’ এর কিছু অংশ এই হোটেলের ঘরে বসেই নাকি লিখেছিলেন। রহস্যসম্রাজ্ঞীর পদধূলিধন্য এই হোটেলই এক হত্যা রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল ১৯৯৮ নাগাদ।

শাওয়ারের ঈষদুষ্ণ বারিধারা নিরাভরণ শরীরের স্পর্শ করতেই শেরিলের স্নায়ু শিথিল হয়ে এল। আজ সন্ধ্যায় জনের সঙ্গে একপ্রস্থ মনোমালিন্যর পর মাথাটা কেমন যেন গুম মেরে ছিল। এখন অনেকটা হাল্কা লাগছে। জনের সঙ্গে বেশ কিছুদিনই হল সম্পর্ক তার ভাল যাচ্ছে না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিস্ট জন একসময়ে চাকরি-বাকরি করত বটে, কিন্তু  বছর পাঁচেক আগে শেরিল যখন জনের প্রেমে পড়ে, জন তখন বেকার। শেরিল তখন সেসব নিয়ে ভাবেনি।  জনের মতো ভদ্র, শান্ত স্বভাবের ছেলেকে ভাল না বেসে সে পারেনি। শেরিলের মা-বাবা অবশ্য সেদিনও জনকে পছন্দ করেনি। একে তো জন বেকার, উপরন্তু জনের আগের দু-দুটো বিয়েও টেকেনি। শেরিল তার বাবা-মাকে বুঝিয়েছে— জনের চোখে সে আত্ম প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা দেখেছে। আর শেরিল নিজেও তো ডিভোর্সী, তাই খামোখা জনের ব্যাপারেই বা ছুঁৎমার্গ কেন! সেই থেকে শেরিলের ইংল্যান্ডের বাড়িতেই দু’জনের একসঙ্গে থাকা শুরু।  শেরিল সুপ্রতিষ্ঠিত। তার নিজস্ব এক সলিসিটর ফার্ম আছে। সেখান থেকে যা কামাই হয়, আর শেরিলের নিজস্ব যা সম্পত্তি আছে, তাতে তাকে রীতিমতো ধনী বলা চলে।

কিন্তু তার প্রেমিক পুরুষটি কাঠ-বেকার। তাই শেরিলের বন্ধুবান্ধব মহল জানে, জনের ছোট একটা ব্যাবসা আছে, আর গোটা দুই নিজের লেখা বই থেকে ভালই রয়ালটি পায়। আসলে তো জন কানাকড়িও উপার্জন করে না।  যতদিন যায়, শেরিল অনুভব করে, জনের চোখে দেখা সেই আত্ম প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা আসলে যেন ভান। উপার্জনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও জনের নেই। বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে, শেরিলের পয়সায় ফুর্তি করাই জনের একমাত্র কাজ। জনের খরচখরচার যাবতীয় বিল শেরিলকেই মেটাতে হয়। এ-নিয়েই শেরিল আর জনের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু। শেরিল, জনকে অনেক বুঝিয়েছে- দারুণ কোনও চাকরি না হোক, ছোট-খাটো একটা চাকরিই অন্তত জন করুক।

শেরিলের অর্থাভাব নেই। সাংসারিক খরচ নিয়ে জনকে ভাবতে হবে না। কিন্তু স্ব-উপার্জনের যে এক আলাদা আত্মমর্যাদা আছে, সামাজিক সম্মান আছে তা অন্তত জন বুঝুক। শেরিল আর জনের সম্পর্কের চারুত্ব এতটাই তলানিতে ঠেকেছিল যে, শেরিল বাধ্য হয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদের কথাও ভাবে। তবে শেষ চেষ্টা করতে এবার জনকে নিয়ে মিশর বেড়াতে এসেছে, একপ্রকার জনের আবদারেই। যদি ভ্যাকেশন মুডে শেষমেষ কোনও সমাধান সূত্র বেরোয়।  কিন্তু নাহ্, আজও হল না। সন্ধ্যায় ডিনারের সময়ে কথায়-কথায় শেরিল সেই প্রসঙ্গ তুলতে, জন বিরক্ত হয়ে খাওয়া অসমাপ্ত রেখে হোটেল-রুমে ফিরে এসেছে। অগত্যা, শেরিলও একটু বাদে রুমে ফিরে বাথরুমে স্নানে ঢুকেছে। জন বিছানায় আধশোয়া হয়ে বই পড়ছিল, শেরিলকে পাত্তাও দেয়নি।

শাওয়ারটা বন্ধ করে তোয়ালেটা টেনে নেয় শেরিল। গা মুছতে-মুছতে শুনতে পায়, জন টনিক ওয়াটারের বোতল খুলছে।  শুতে যাওয়ার আগে, এক পেগ জিন-টনিকের ককটেল নেওয়ার বহুদিনের অভ্যেস শেরিলের। বাথরুম থেকে শেরিল আন্দাজ করে, জন তার জন্য ককটেল বানাচ্ছে। যাক, এতক্ষণে তাহলে জনের রাগ পড়ল। খুশিতে মনটা ভরে ওঠে শেরিলের। জনের প্রতি তার এখনও বিশ্বাস আছে। শেরিল এখনও ক্ষীণ আশা রাখে, জনকে চিনতে সে ভুল করেনি। নিশ্চয়ই জন তার কথা রাখবে। শেরিল মনে-মনে ঠিক করে, যতদিন তারা ভ্যাকেশনে আছে, ততদিন আর উপার্জনের প্রসঙ্গ তুলে জনকে বিরক্ত করবে না। যা হবে, পরে দেখা যাবে।

বাথিং-গাউনটা জড়িয়ে বেডরুমে ঢোকে শেরিল। বেডসাইড টেবিলে জন তার জন্য জিন-টনিকের পেগ তৈরি করে রেখেছে। বিছানা সংলগ্ন ফটো-ফ্রেমের মতো কাঁচের জানালার বাইরে নীলনদের তীরের ব্যস্ত শহরকে শত-শহস্ত্র জোনাকির মতো লাগছে। শেরিল জানালার পর্দা টেনে দেয়। তারপর জনের দিকে প্রগলভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে খুলে ফেলে বাথিং গাউনের ফিতে। শেরিলের শরীরী বিভঙ্গে যেন আত্মবিশ্বাসের ঝংকার। মেয়েদের এই আত্মবিশ্বাসকেই বড় ঘেন্না করে জন।  তবুও জন কাষ্ঠ হাসি হাসল। শেরিল সেসব নজর করে না। সে এক ঢোকে জিন-টনিকের পেগটা গলায় চালান করে দিয়ে তার নিরাভরণ শরীরটা মখমলি বিছানায় এলিয়ে দেয়। এখন শুধু পরস্পরের শারীরিক সান্নিধ্য উদ্‌যাপন। জন, আলতো করে জড়িয়ে ধরে শেরিলকে, ঘাড়ে চুম্বন করে। ইন্দ্রিয় সুখের আবেশে তলিয়ে যাচ্ছে শেরিল। সুখাবেশের ইন্দ্রজালেও তার সচকিত মন কোথাও যেন একটু অসঙ্গতি লক্ষ করছে। সাধারণত, তাদের শরীরী আদর শুরু হয় প্রগাঢ় ওষ্ঠালাপ দিয়ে, তবে কেন আজ জন তার ঘাড়ে চুম্বন করল! তাহলে, নতুন কোনও শরীরী উদযাপন! লজ্জায় আরক্তিম শেরিল আবার সুখ সাগরে নিজেকে সমর্পণ করে, ক্রমে তলিয়ে যেতে থাকে অতলে। গভীরে, আরও গভীরে। অলীক সুখে যেন তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। শেরিল নিজের শরীরের উপর হারাচ্ছে নিয়ন্ত্রণ।  শেরিল ক্রমে অনুভব করে, তার সুখসাগর আসলে যেন এক মৃত্যুকূপ! তার শরীরের ভিতর এক প্রবল ঝঞ্চা শুরু হয়েছে। সব কিছু যেন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে! শেরিল এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় জনকে। শেরিলের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। শত চেষ্টা করেও একটুকটুও বাতাস ঢুকছে না তার ফুসফুসে। সারা শরীর নীলচে হয়ে উঠছে তার। সে ক্রমে জ্ঞান হারাচ্ছে। জন কিছুক্ষণ নিঃস্পৃহভাবে বসে থাকে মুমূর্ষু শেরিলের পাশে। তারপর রিসেপশনে ফোন করে জানায়— তার ইমিডিয়েট সাহায্যের দরকার। তার প্রেমিকা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

হোটেলে সে-সময়ে ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন না। তবে হোটেলের এক আমেরিকান ট্যুরিস্ট টুকটাক প্রাথমিক চিকিৎসা জানতেন। তিনিই সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন।

আমেরিকান ভদ্রমহিলা যখন এলেন, উইন্টার প্যালেস হোটেলের ৫০৮ নম্বর রুমের বিছানায় নগ্ন-অচেতন শেরিল পড়ে আছে। মুখ দিয়ে তার গ্যাজলা বেরোচ্ছে।  শেরিলের কাছে ঝুঁকতেই এক অদ্ভুত ঝাঁঝালো গন্ধ পেলেন তিনি। গন্ধটি যে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের তা তার আন্দাজ ছিল না। শেরিলের অবস্থা ভাল নয়। এক্ষুণি মুখে-মুখ রেখে সিপিআর দিতে পারলে ভাল হয়।

ভদ্রমহিলা জনকে সেটাই করতে বলে, ছুটলেন ডাক্তার ডাকতে। কিন্তু জন দাঁড়িয়ে রইল নিশ্চেষ্ট হয়ে। সে বিলক্ষণ জানে, শেরিলের মুখ দিয়ে গ্যাজলার সঙ্গে বেরিয়ে আসছে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের বিষবাষ্প। তাই ও মুখে, মুখ লাগানো আত্মহত্যার সামিল। একই কারণে শরীরী আদরের সময়ে শেরিলকে মুখ চুম্বনের সাহসও তার হয়নি। সায়ানাইডের স্বভাব-চরিত্র জনের নখদর্পণে। সায়ানাইডের সঙ্গে সখ্যতা তো তার আজকের নয়! সায়ানাইড, জনের চাইল্ড’স প্লে। সেই কোন কাল থেকে সায়ানাইড নিয়ে সে খেলা করছে! কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুবাদে সায়ানাইড নিয়ে পড়াশুনাও তার বিস্তর। যৌবনে সে যখন জাম্বিয়ায় চাকরি করত, তখন প্রজাপতি সংগ্রহের শখ ছিল তার। আর সংগৃহীত প্রজাপতিদের সে মারত সোডিয়াম সায়ানাইড দেওয়া বাক্সে ভরে। আজ এই চল্লিশোর্ধ প্রজাপতিটিকে মারতেও, জন সোডিয়াম সায়ানাইডই ব্যবহার করেছে। জিন-টনিকের পেগে ইচ্ছে মতন মিশিয়ে দিয়েছে সোডিয়াম সায়ানাইড।

অ্যালকোহলের তীব্র ঝাঁঝালো আর টনিক ওয়াটারের মিষ্টি-তেতো স্বাদ, সায়ানাইড দ্রবণের তীক্ষ্ণ কষাটে স্বাদকে কিছুটা হলেও হ্রাস করেছিল। বছর কয়েক আগে এক দুর্ঘটনায় শেরিলের ঘ্রাণ শক্তি যে দুর্বল হয়ে পড়েছে সেটাও তো জনের জানা। তাই হাইড্রোজেন সায়ানাইডের গন্ধ শেরিল সম্ভবত পাবে না, সেটাও জন জানে। আর শেরিল প্রতি রাতে শুতে যাওয়ার আগে জিন-টনিকের পেগটা এক ঢোকেই তাড়াতাড়ি শেষ করে- এই দৈনন্দিন অভ্যাসটি সম্পর্কেও জন অবগত। সুতরাং, জিন-টনিকের পেগের স্বাদের পরিবর্তনটুকু শেরিল সচরাচর খেয়াল করবে না। জন এসব সুযোগেরই আজ পূর্ণব্যবহার করেছে।

ডাক্তার এসে বুঝল, তার আর বিশেষ কিছু করার নেই। তবে শেরিলকে নিয়মমাফিক হাসপাতালে পাঠানো জরুরি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শেরিলকে মৃত ঘোষণা করল। হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু ঘটেছে।

শেরিলের নখ, আঙুলের ডগা, ঠোঁট— বেগুনি-নীল বর্ণ ধারণ করেছে। আর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর শেরিলের পিঠ, নিতম্বের মতো শরীরের অংশ বিশেষ হয়ে উঠল টকটকে লাল। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর মৃতদেহে এমন দেহলক্ষণ (লিভর মর্টিস) ফুটে ওঠা, সায়ানাইডের বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর দিকেই ইঙ্গিত করে।

কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সাইয়ানাড ঘটিত মৃত্যুর সংখ্যা এতটাই কম যে, সবসময়ে ডাক্তারদের পক্ষে মৃতদেহ দেখে তা আন্দাজ করা সম্ভব হয় না। তাই শেরিলের মৃত্যুর পেছনে যে কোনও ফাউল প্লে থাকতে পারে, তা হাসপাতালের ডাক্তাররা আন্দাজও করতে পারল না। তারা শেরিলের মৃত্যুকে হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট মনে করে ডেথ সার্টিফিকেটও দিয়ে দিল।

জন অ্যালেন ও শেরিল লুইস

ব্যস, জনকে আর পায় কে! শেরিলের চল্লিশ হাজার পাউন্ডের সম্পত্তি এখন তার হাতের মুঠোয়। এ-জন্যই তো এত কসরত, এত ঝক্কি! তবে, কাজ যে এত সহজেই হাসিল হয়ে যাবে, জন ভাবেওনি। ‘মার্ডার ইজ ইজি’! জন ভেবেছিল নীলনদের ধারেই শেরিলের পারলৌকিক ক্রিয়া চুকিয়েই ইংল্যান্ড ফিরবে। কিন্তু তাতে শেরিলের বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়রা সন্দেহ করতে পারে। অতঃপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও কফিনবন্দি শেরিলকে নিয়ে দেশে ফিরল জন। শেরিলের বাবা-মা অবশ্য মিশরের হাসপাতাল প্রদত্ত ডেথ সার্টিফিকেট মানতে নারাজ। তাদের আপাত সুস্থ-সবল মেয়ে হঠাৎ করে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মরে যাবে, সেটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তাঁদের অনুরোধে, ইংল্যান্ডে শেরিলের পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা হল। ফরেন্সিকের ডাক্তার শেরিলের দেহ-অভ্যন্তরে এমন কিছু শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করলেন, যা মূলত সায়ানাইডের বিষক্রিয়াকেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু এসব নিছক সম্ভাবনা। পোক্ত প্রমাণ নয়। তাই পোক্ত প্রমাণ জোগাড়ের জন্য, শেরিলের দেহাংশের টক্সিকোলজিক্যাল পরীক্ষা করতে পাঠানো হল। কিন্তু তাও বিশেষ ফলপ্রদ হল না। মৃত্যুর এতদিন পর বেশিরভাগ সায়ানাইডই দেহ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সামান্য কিছু সায়ানাইডের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বটে, কিন্তু তা তেমন বিপদজনক মাত্রার নয়। আর, শেরিল ছিল চেইন স্মোকার, তাই তার শরীরে সামান্য সায়ানাইডের উপস্থিতি পাওয়া অস্বাভাবিক কিছুও নয়। সুতরাং, শেরিলের মৃত্যুটি যে সায়ানাইড ঘটিত, তার পরোক্ষ প্রমাণ থাকলেও প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব। ব্যস, জনও মনের সুখে শেরিলের বাড়িতেই থাকতে শুরু করল, শেরিলের রেখে যাওয়া ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সেই আবার শুরু হল জনের বিলাসিতা।

তবে তদন্তকারীরা জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড়ের জন্য তক্কে-তক্কে ছিল। শেষমেষ ২০০০ সাল নাগাদ পারিপার্শ্বিক জোরালো তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শেরিলকে হত্যার অভিযোগে জন গ্রেপ্তার হয়। আদালতে জনের অপরাধ প্রমাণিতও হয়।

সমকালীন সংবাদপত্রে শেরিল লুইস হত্যাকাণ্ডে জনের গ্রেপ্তারির সংবাদ

একবিংশ শতাব্দীতে যে-সায়ানাইড ঘটিত হত্যাকাণ্ড সারা দুনিয়ার নজরে এসেছিল, তা ঘটেছিল আমাদের দেশেই, কেরালার কোঝিকোড় জেলার কোডাথাই অঞ্চলে। একটি কিংবা দু’টি হত্যা নয়, গৃহস্থবাড়ির মিষ্টভাষী সুগৃহিনী জলি, ২০০২ থেকে ২০১৬— প্রায় চোদ্দ বছর ধরে পরিবারের ছয়জন সদস্যকে সায়ানাইড দিয়ে হত্যা করেন। প্রথম ভিক্টিম নিজের শাশুড়ি, পরেরজন শ্বশুর। তারপর ক্রমে স্বামী, মামা-শ্বশুর, জা এর দু’বছরের শিশুকন্যা ও জাকে। এদের প্রত্যেককেই জলি সায়ানাইড দিয়েছিল খুব কৌশলে। কারও ক্ষেত্রে দৈনন্দিন ক্যাপসুলের মধ্যে ভরে, কারও হুইস্কিতে মিশিয়েছিল সায়ানাইড। উপরোক্ত শেরিল কেসের মতোই এক্ষেত্রেও প্রায় প্রতিটি মৃত্যুকে হাসপাতালের ডাক্তাররা স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই মনে করেছিলেন। জলির স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃতদেহে সায়ানাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও, সেটিও আত্মহত্যা বলেই প্রাথমিকভাবে গণ্য হয়।

২০১৮ নাগাদ পরিবারের এক সদস্য এই সবকটি মৃত্যু নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করে। তারই অনুরোধে পুলিশ তদন্ত শুরু করে, মৃতদেহ কবর থেকে তুলে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। শেষমেষ এতগুলো হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত হিসেবে জলিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই কেস এখনও আদালতের বিচারাধীন। এমন সব ঘটনা জনসমাজে রেখাপাত করে, পটাশিয়াম সায়ানাইডের প্রতি মানুষজনকে কৌতূহলী করে তোলে। সর্বোপরি এমন সব ঘটনাই, পটাশিয়াম সায়ানাইডকে বহুল পরিচিতি দিয়েছে, বহুলশ্রুত করেছে।

আদিকাল থেকে আধুনিক কাল— এ দুনিয়ায় যে-সব বিষের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ অবগত রয়েছে, তা প্ৰকৃতিলব্ধই হোক কিংবা পরীক্ষাগারে মনুষ্য নির্মিত, তার প্রায় সবকটিরই ব্যবহার হয়েছে হত্যা, আত্মহত্যা, গণহত্যায়। সায়ানাইডও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তবু, উগ্র জাতীয়তাবাদ-জাতিবিদ্বেষ-ফ্যাসিজম ও গণহত্যার কলঙ্ক মাথায় নিয়েও, সায়ানাইডের মতো আর কোন বিষই-বা দেশপ্রেম-বিপ্লব-দ্রোহ-মতাদর্শের জন্য সংগ্রামী আত্মোৎসর্গের অলঙ্কার হয়ে উঠেছে!