যুদ্ধ, তেল, ভারত

Representative Image

অবসন্ন, ক্লান্ত ও কিছু রক্তশূন্য মুখ। নিউ দিল্লি রেলস্টেশনে ভিড় করে আছে। রাজধানীতে, কোনও অস্থায়ী ভাতের হোটেলে কাজ করতেন কেউ। কেউ ছিলেন ক্ষুদ্র একটি রেস্তোরাঁর রাঁধুনি অথবা সামান্য কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায়, কেউ-বা মেসে কিংবা পিজিতে খাবার পৌঁছে দিতেন সকাল-বিকেল। বিগত একমাসে, কাজ হারিয়েছেন প্রায় প্রত্যেকেই। রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট ঠেলাগাড়িতে দুপুরের ভাত-ডাল-সব্জি বিক্রি করতেন যাঁরা, দেখা পাই না অনেকদিন। অকস্মাৎ উবে গেলেন যেন! পাশাপাশি, অটোচালক এবং ট্যাক্সি-ড্রাইভারদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে— সিএনজি অর্থাৎ কমপ্রেসড ন্যাচরাল গ্যাসের ব্যবহারই এ-মুহূর্তে একমাত্র সম্ভবপর সমাধান। নইলে, বৈদ্যুতিন গাড়ি-সমূহ। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম, বর্তমানে আকাশছোঁয়া। ৩০৭১.৫০ টাকা। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী, হরদীপ সিং পুরি জানিয়েছেন, দেশে ৬০ দিনের ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) এবং ৪৫ দিনের এলপিজি সিলিণ্ডার মজুত আছে।

প্রশ্ন হল, তারপরে? হরমুজ প্রণালী-সংক্রান্ত সমস্যা কি চিরস্থায়ী তবে? অতি সরলীকরণ করা হয়ে যাচ্ছে। প্রথমেই যে বিষয়টির শিকড় গভীরে, হরমুজ প্রণালী কেন ভারত তথা আবিশ্বের অর্থনীতিতে একটি অপরিহার্য অংশ? পৃথিবীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তৈল রপ্তানি করিডরগুলোর মধ্যে অন্যতম— হরমুজ প্রণালী। বলা যেতে পারে, মধ্যপ্রাচ্য এবং অবশিষ্ট পৃথিবীর একটি মহার্ঘ বাণিজ্যপথ। আয়তনে সংকীর্ণ। উত্তরে ইরান। দক্ষিণে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE) এবং কাতার। তারপর এ-প্রণালী মিশেছে আরব সাগরে। একইসঙ্গে, নাব্যতাও ভীষণরকম। যে-কারণে বড়-বড় তৈলবাহী জাহাজ অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারে। গতবছরের একটি পরিসংখ্যান বলছে, প্রত্যেকদিন, প্রায় ২০.৯ মিলিয়ান ব্যারেল তেল এবং বিবিধ তৈলজাত দ্রব্যের রপ্তানি হয়েছে। আমেরিকান মুদ্রায়, এক বছরে, ৬০০ বিলিয়ান ডলারের লেনদেন। এই প্রণালীর মাধ্যমেই, মূলত কাতার থেকে সর্বমোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০% রপ্তানি হয়ে থাকে গোটা পৃথিবীতে। ভারত কোন-কোন উপায়ে উপকৃত হয়?

আরও পড়ুন: কেন মানুষের উপরে বাঘের আক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে ক্রমাগত?

সাধারণত, ভারতে যে-পরিমাণ ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) ব্যবহৃত হয়, তার ৮৮% আমদানিকৃত। বহির্বিশ্বের থেকে। তবে, আমদানিকৃত ক্রুড অয়েলের প্রায় অর্ধেক, ভারতে এসে পৌঁছয় হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। একই জলপথে এসে পৌঁছয় এলপিজি সিলিণ্ডার এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। অর্থ হয়, দেশের মোট শক্তির অধিকাংশই এই প্রণালীর ওপরে নির্ভরশীল। ইজরায়েল যেদিন অনৈতিক বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল তেহরানে! আমেরিকার স্পষ্ট মদতেই। সেদিন থেকে হরমুজ প্রণালী একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। বেসরকারিভাবে ঘোষণা করেছিল, হরমুজ প্রণালীতে কোনও জাহাজ দেখামাত্রই আক্রমণ করবে। তেমনটাই স্বাভাবিক নয় কি? তারপর সকলেই দেখেছি, ইরানি মিসাইল এবং ড্রোন হামলা। তাছাড়া, ভৌগোলিকভাবেএ-প্রণালীর ওপরে ইরান ও ওমানের আধিপত্যই সবচেয়ে বেশি।

তারপর? যে-পথে, প্রায় ১৩০টিরও বেশি তৈলবাহী জাহাজ এবং ট্যাঙ্কার চলাচলই ছিল স্বাভাবিক এবং চিরাচরিত, সম্প্রতি সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০! কিন্তু প্রশ্ন হল, বিশ্ব-অর্থনীতি এভাবে থ মেরে গেলে চলে না। তাই আমেরিকা এবং ইরান— উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে, হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী, আব্বাস আরাগছি জানিয়েছেন— সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হয়েছে। তেল-রপ্তানিতে কোনও বাধাবিঘ্ন ঘটবে না। যেটুকু তৈরি হয়েছে, সেটা আমেরিকার দায়! তবে ইরানি নৌ-সেনার সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ-হেন পরিস্থিতিতে দুটি ঘটনা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এক, ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) একটি মানচিত্র প্রকাশ করে জানিয়েছে, ইরানের নিয়ন্ত্রণ হরমুজ প্রণালী-সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রসারিত হবে। তৈরি করা হবে, দু-টি লাইন অফ কন্ট্রোল। যথাক্রমে, প্রণালীর ডান ও বাম পাশে। প্রবেশপথে। দুই, ইরান এবং চিনের একটি মৌখিক চুক্তি। যে-চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের অনুমতিক্রমে চীনের উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ তৈলবাহী জাহাজ রওনা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। তবে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েল অথবা প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানি-বাবদ খরচ করতে হবে, নির্ধারিত মূল্যের পরে অতিরিক্ত এক ডলার। হরমুজ প্রণালীর নতুন নিয়ম!

তাহলে কী দাঁড়াল? হরমুজ প্রণালীতে ভীষণ ট্র্যাফিক। ভারতের নানা তৈলবাহী জাহাজ-সমূহ, দেশে পৌঁছচ্ছে দীর্ঘ সময়ের পরে। বর্তমানে, অতি অস্বাভাবিক দামে তেল আমদানি করতে বাধ্য! নন-গালফ দেশগুলির থেকে। দেশের তৈল-শোধনাগারগুলিও এহেন দুর্দিনে, যত মুনাফা লুটেপুটে নিতে উৎসুক। তেল-আমদানি বাবদ প্রতি বছর কত ব্যয় করে ভারত সরকার? ১২৩ বিলিয়ান ডলার। যে তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক, হরমুজ প্রণালীতে অব্যবস্থা কায়েম থাকে, সেই ব্যয়ের পরিমাণ হয়ে দাঁড়াবে, ২০০ বিলিয়ান ডলার। যে-মানুষের হাতে টাকা আছে, হাঁচড়ে-কামড়ে সার্ভাইভ করে যাবে। আর যে মানুষগুলো সর্বহারা? মিলিয়ে যাবে পঞ্চভূতে? ভাঁড়ারে টান পড়তে শুরু করেছে। ব্যারাকপুর-শ্যামনগর রুটের একজন অটোচালক বলছেন, ভাড়া ২৫ টাকাথেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা হয়েছিল। এরপরে যদি প্যাসেঞ্জারের কাছে চল্লিশ টাকা চাইতে হয়, তাহলে গাড়ি চালিয়ে লাভ নেই। গ্যাস ভরার জন্যে এক-দু’ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এভাবে ব্যবসা হয় না। 

-হেন পরিস্থিতিতে দুটি ঘটনা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এক, ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) একটি মানচিত্র প্রকাশ করে জানিয়েছে, ইরানের নিয়ন্ত্রণ হরমুজ প্রণালী-সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রসারিত হবে। তৈরি করা হবে, দু-টি লাইন অফ কন্ট্রোল। যথাক্রমে, প্রণালীর ডান ও বাম পাশে। প্রবেশপথে। দুই, ইরান এবং চিনের একটি মৌখিক চুক্তি। যে-চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের অনুমতিক্রমে চীনের উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ তৈলবাহী জাহাজ রওনা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে।

শেষ এক বছরে, পেট্রোলিয়াম-জাত দ্রব্যেরমূল্য ৫১.১% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে, ৬.১%। রাজধানীতে, কয়েকমাস আগেও, একটি আলুর পরোটার দাম ছিল, ২০ টাকা। এখন, ৩০ টাকা। চিকিৎসা-খাতেও দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৩.২%। পেট্রোলে, ২০% ইথানল মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে দেশের সমস্ত পেট্রোল পাম্পেই। হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাসয়নিক সার আমদানি হত এ-দেশে। সেই পথে জিজ্ঞাসা চিহ্ন। কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত সার নেই। ক্রয়ক্ষমতা নেই। আত্মহত্যা ছাড়া পথ নেই কিংবা আত্মহত্যার জন্য ফলিডলও নেই। গুজরাতের মৎস্যজীবীরা বলছেন, মাছের রপ্তানিমূল্য কমেছে প্রায় অর্ধেক। স্থানীয় বাজারে অথবা দেশের ভেতরেও বিক্রি করলে, উপযুক্ত দাম পাওয়া অসম্ভব। পাশাপাশি, মাছ ধরার যে জাল— এক ধরনের পেট্রোলিয়াম-জাত পণ্য, পূর্বে এক কেজির দাম, ১৫০ টাকা। তা বর্তমানে, ৩৫০ টাকা। বর্ষার প্রারম্ভে, প্রায় ২৭,০০০ নৌকো ভাসে গুজরাত উপকূলে। আয়ের আদর্শ সময়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, অধিকাংশ নৌকো আর ভাসবে না কখনও।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি অত্যধিক নির্ভরশীলতা। তেল রপ্তানির ক্ষেত্রগুলো বহুমুখী নয় কেন? প্রশ্নহীন আমেরিকা-প্রীতি। অতএব, ভারতের কূটনৈতিক দুর্বলতার দায় এড়ানো চলে না কোনওভাবেই। তবু দেশের প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন। সেগুলো পালনের পাশাপাশি, প্রশ্নগুলোও জারি থাকুক।