ধন্বন্তরি

Representative Image

‘মিথ’-এর কুয়াশার আড়ালে ইতিহাসকে ঢেকে রাখা, পৃথিবীর সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ ভারতের ঐতিহ্য! সে-দেশের নাগরিক হয়ে আমরাই-বা অন্যরকম হতে যাব কেন! পয়লা জুলাই জন্মেছিলেন পরবর্তীকালের যে-প্রতিভাধর চিকিৎসক, সেই বিধান রায়কে জন্মদিনে মালা পরানো হয়, সমাজমাধ্যম ভরিয়ে দেওয়া হয় ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের ছবিতে-ছবিতে! জনশ্রুতির আড়াল থেকে চিকিৎসক বিধান রায়কে বার করে আনার পরিশ্রম আমাদের ধাতে সয় না!

রাজশেখর বসু সেই কবে বলে গেছেন, ‘ইহাই আমাদের স্বভাব।’

কেমন চিকিৎসক ছিলেন বিধান রায়? না, রক্ত আমাশার রোগীকে এক ডোজ ওষুধ দিয়ে চাঙ্গা করে, গরম তেলেভাজা খাওয়ার পরামর্শ বিধান রায় কোনওদিন দেননি। অপারেশন ছাড়া, শুধু কয়েক-পুরিয়া ওষুধ দিয়েই ভাল করে তোলেননি— পেটের ভেতরকার টিউমারের চাপে মরমর এক যুবক রোগীকে। রোজ ভোরে উঠে তৈরি হয়ে, নিজের বাড়িতেই দেখতেন অনেক রোগী। ধন্বন্তরি ডাক্তার নীলরতন সরকারের ছাত্র তিনি। ‘কলকাতা মেডিকেল কলেজ’ থেকে মেডিসিনে ‘এম ডি’ পাস করে, শুধুমাত্র জ্ঞান আর জেদকে সম্বল করে সাতাশ বছর বয়সে বিলেত থেকে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন, বিলিতি সার্জেন আর ফিজিশিয়ানের দু-দুটো সার্টিফিকেট দু-পকেটে পুরে।

দেশে ফিরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাধারণ মানুষের চিকিৎসার কাজে। সারাদিনে অনেক রোগী দেখতেন বিধানবাবু। রোগীর সংখ্যা নিয়ে রসসম্রাট শিবরাম চক্রবর্তীর একটা গল্প শুনলে পাঠকের মন একটু হালকা হবে। শিবরামের সঙ্গে একদিন দেখা হয়েছে ডাক্তার রায়ের। বিধানবাবু শিবরামকে চেনেন না। গম্ভীর গলায় জানতে চাইছেন, ‘কী নাম আপনার?’ — ‘আঁজ্ঞে শিবরাম চক্রবর্তী।’ — ‘কী করা হয়?’ — ‘এই সামান্য লেখালেখি।’ — ‘রোজগারপাতি কেমন হয় লিখে?’— ‘আপনার মতো কি আর হয়!’ — ‘আমি! আমি আবার কী লিখলাম!’— ‘ওই যে, হাজার-হাজার প্রেসক্রিপশন।’ ঘর কাঁপিয়ে হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন ধুতিপাঞ্জাবি পরা দীর্ঘকায় বিধান রায়। এই হাসিটি ছিল বিধানবাবুর সিগনেচার মার্ক। হাসতে-হাসতে রোগী দেখতেন, অনিয়ম করলে রোগীকে বকতেন পর্যন্ত হাসিমুখে। রবি ঠাকুর লিখে গেছেন, ভাল ডাক্তার হতে গেলে, আগে ভাল মানুষ হতে হয়। ‘ভাল মানুষ হতে গেলে যখন-তখন হেসে উঠতে জানতে হয়’— এটা লেখার মতো দুঃসাহস অবশ্য রবীন্দ্রনাথের হয়নি!

আরও পড়ুন: অনেক অবহেলা বঞ্চনা সয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়!
লিখছেন বিষাণ বসু…

ভাল ডাক্তারি রপ্ত করা চিকিৎসক শুধু রোগী দেখবেন তা তো হয় না। রোগী দেখা আর রাজ্য চালানোর ফাঁকে-ফাঁকে শুধু বাংলা নয়, গোটা দেশের চিকিৎসার রূপরেখা নিয়ে ডাক্তার বিধান রায় ভাবনা-চিন্তা করেছেন অনেক। আর-একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছেন, চিকিৎসকদের সংগঠন, ‘ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘আইএমএ’। এই সংগঠনের জার্নাল ‘জিমা’ (‘JIMA’)-র বহু পুরনো কিছু সংখ্যায় চিকিৎসক বিধান রায়কে নিয়ে লেখা বেশ কিছু নিবন্ধ রয়েছে। বিধান রায়ের চিকিৎসকজীবন নিয়ে লেখা হয়েছে বেশ কয়েকটি বইও। বইগুলোর বেশিরভাগই এখন প্রায়-দুষ্প্রাপ্য। তবু চিকিৎসক হিসেবে ডাক্তার বিধান রায়কে কিছুটা হলেও জানতে পারা যায়— নানা লিখিত সূত্র থেকে।

শুধু নিজে ভাল ডাক্তার হলেই চলবে না, তৈরি করে যেতে হবে অসংখ্য মানবপ্রেমী ডাক্তার। এই ভাবনা থেকেই দেশে ফিরে প্রথমে ডাক্তারি শিক্ষক হিসেবে ডাক্তার বিধান রায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন প্রথমে ‘ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুল’-এ। পরে ‘কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ’-এ। এই প্রতিষ্ঠান দু’টি এখন ‘নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ’ ও ‘আর জি কর মেডিকেল কলেজ’। বিধান রায়ের কাছে পড়া অসংখ্য চিকিৎসক, গত শতাব্দীতে চিকিৎসক হিসেবে এই পেশায় জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। গুরু নীলরতন সরকারের মতোই রোগার্ত মানুষের জাতি-ধর্ম-বিত্ত বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে মাথা ঘামাতেন না ডাক্তার বিধান রায়। তাঁর কাছে মেডিসিনের পাঠ নেওয়া পরবর্তীকালের চিকিৎসকরাও— এসব নিয়ে ভাবা পর্যন্ত ‘অপরাধ’ বলে মনে করতেন। ডাক্তার রায় মনে করতেন, প্রত্যেক চিকিৎসকের পক্ষে, ‘মেডিকেল এথিক্স’ বা ডাক্তার হবার শুরুতে নেওয়া ‘শপথ’গুলোর প্রত্যেকটাকে অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলা আবশ্যিক।

আবার একটা গল্প । গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। অনেক রাত অবধি ‘রাইটার্স’-এ কাজ করে প্রশস্ত লবি ধরে হেঁটে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়। ঘর থেকে বেরিয়েই শুনতে পেয়েছেন অদ্ভুত একটা কাশির আওয়াজ। হাঁটতে-হাঁটতে দূর থেকে হঠাৎ করে চোখ পড়ে গেল, টুলে বসে থাকা এক পিওনের দিকে। মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছেন পিওন ভদ্রলোক। থমকে দাঁড়িয়ে গেছেন বিধানবাবু, পিছন-পিছন আসা সহকারীকে বলছেন, ‘এঁর বুকে যক্ষা হয়েছে। কাল সকালেই যাদবপুরের যক্ষা হাসপাতালে ভর্তি করে দেবার ব্যবস্থা করুন।’ খানিকটা এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়েছেন, “যতদিন ইনি হাসপাতালে থাকবেন, ততদিন ইনাকে ‘স্পেশাল লিভ’ দেবার ব্যবস্থা করবেন। কাল সকালেই ফাইল যেন আমার টেবিলে চলে আসে।”

ডাক্তার নীলরতন সরকারের কাছে অনেক কিছু শিখেছেন বিধান রায়। শিখেছেন, চোখ মেলে রোগীকে দেখতে, কান পেতে শব্দ শুনতে, নাক দিয়ে রোগীর ঘরের গন্ধ বুঝে নিতে। ধন্বন্তরী নীলরতন, ভাগ্নে প্রশান্তর স্ত্রী রানীর একটানা জ্বরের কারণ যে টাইফয়েড, তা ধরেছিলেন প্রথম ঘরে ঢুকে গন্ধ পেয়ে। ধন্বন্তরীর শিষ্য বিধান, রোগীর বুকের যক্ষা মুহূর্তের মধ্যে ধরে ফেললেন কাশির শব্দ শুনে। যক্ষার কথাই যখন এল, তখন পাঠকের জানা থাক, যাদবপুরের যক্ষা হাসপাতালটি তৈরি হয়েছিল ডাক্তার বিধান রায়ের পরিকল্পনায় ও উদ্যোগে। কলকাতার হাজরার শিশু ও মাতৃমঙ্গল হাসপাতালটিও, সাধারণ মানুষ যে-হাসপাতালটিকে চেনেন, ‘শিশুমঙ্গল’ হাসপাতাল হিসেবে, তৈরি হয়েছিল ডাক্তার বিধান রায়ের দূরদর্শিতায়। সুবোধ চন্দ্র মিত্রের হাতে গড়া, ‘চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল’ তৈরিতেও ডাক্তার রায় সাহায্য করেছেন অনেক।

ফিরে আসা যাক দূর থেকে দেখেই রোগীর রোগ ধরে ফেলবার ‘ডাক্তারি চোখ’ বা ‘ক্লিনিকাল আই’-তে। ‘হারিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারি চোখ’ নিয়ে হাহুতাশ করে লাভ নেই! যে-ডাক্তার দেখেন বেশি, লেখেন কম, এমন ডাক্তারদের ‘সেকেলে’ ভাবতে শিখে গেছি আমরা! ডাক্তারি পড়তে-পড়তে একটা কথা একজন শিক্ষক প্রায়ই বলতেন, ‘এখন তো ঘরে-ঘরে বিধান রায়!’ তখন ভাল বুঝতে পারিনি কথাটার অর্থ। সাড়ে তিন দশক ডাক্তারি করবার পর, আজ কথাটার মর্ম বুঝি হাড়ে-হাড়ে! গত শতাব্দীর আটের দশক পর্যন্ত, এই কলকাতা শহর থেকে গ্রামবাংলা পর্যন্ত অসংখ্য চিকিৎসকের দূরদৃষ্টি ছিল প্রখর। নীলরতন সরকার, রাধাগোবিন্দ কর, সুন্দরীমোহন দাস, কেদারনাথ দাসের মতো চিকিৎসকরা হারিয়ে গেছেন কবে! স্মৃতির অতলে একটু-একটু করে তলিয়ে যাচ্ছেন, ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। ভাগ্যিস বছরে মাত্র একদিন মনে পড়ে তাঁকে! নইলে খামখেয়ালি, মহার্ঘ রিভলভিং চেয়ার থেকে প্রেসক্রিপশন লেখার লেটারহেড পর্যন্ত দেখতে পাওয়া, অদূরদর্শী চিকিৎসকদের ডাক্তারি ছেড়ে, ‘নারায়ণ নারায়ণ’ জপ করতে হত এখনকার অসংখ্য চিকিৎসককে। তবু নিভে যায়নি সব আলো। বিধান রায়ের উত্তরসূরিরা আজও আছেন এই দেশের নগরে-নগরে, গ্রামেগঞ্জে। নবীন-প্রবীণ এমন ডাক্তার সংখ্যায় কম হলেও, আছেন।

ডাক্তারদের নিয়মনিষ্ঠ করে তুলতে কিছুদিন আগে পর্যন্ত রাজধানী দিল্লিতে ‘মেডিকেল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ বা ‘এম সি আই’ নামে যে-সংস্থাটি ছিল, তার জন্ম হয়েছিল ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের একক প্রচেষ্টায়। দেশের প্রত্যেকটি মেডিকেল কলেজ পরিদর্শন করে, ডাক্তারি শিক্ষার মান দেখে কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিতেন ‘এম সি আই’-এর পরিদর্শকরা। লবিবাজি একেবারে ছিল না এই সংস্থার সব সদস্যই যে ছিলেন ধোয়া তুলসীপাতা, তা নয়। তবু ডাক্তারি শিক্ষার গুণমান ধরে রাখতে, ডাক্তার বিধান রায়ের স্বপ্নের সংস্থা ‘এম সি আই’, দশকের পর দশক জুড়ে সফল হয়েছিল অনেকটাই। অশিক্ষিত রাজনীতিকদের অনুপ্রবেশ ঘটবার সঙ্গে-সঙ্গে, ধীরে-ধীরে মৃত্যু হতে থাকে ডাক্তার বিধান রায়ের স্বপ্নের। কিছুকাল আগে রাজনীতিকদের প্রবেশ আরও সরল করতে, ‘এম সি আই’-এর নাম বদ,লে ‘এন এম সি’ বা ‘ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন’ তৈরি করবার সঙ্গে-সঙ্গে ডাক্তার বিধান রায়ের স্বপ্ন ডুবে গেছে মহাসমুদ্রের অতলে।

ফিরে আসা যাক দূর থেকে দেখেই রোগীর রোগ ধরে ফেলবার ‘ডাক্তারি চোখ’ বা ‘ক্লিনিকাল আই’-তে। ‘হারিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারি চোখ’ নিয়ে হাহুতাশ করে লাভ নেই! যে-ডাক্তার দেখেন বেশি, লেখেন কম, এমন ডাক্তারদের ‘সেকেলে’ ভাবতে শিখে গেছি আমরা! ডাক্তারি পড়তে-পড়তে একটা কথা একজন শিক্ষক প্রায়ই বলতেন, ‘এখন তো ঘরে-ঘরে বিধান রায়!’ তখন ভাল বুঝতে পারিনি কথাটার অর্থ। সাড়ে তিন দশক ডাক্তারি করবার পর, আজ কথাটার মর্ম বুঝি হাড়ে-হাড়ে!

‘বড় বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে’— গানটা রবীন্দ্রনাথের মনের অতল থেকে উঠে এসেছিল সেই কবে। বিধান রায়ের কথা ভাবতে-ভাবতে বারবার কানে ভেসে আসে গানটা। বিধান রায় স্বাধীনতার আগে জেল খেটেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে। ১৯৪৮ সালে ইংরেজের রেখে যাওয়া নিঃস্ব, রিক্ত এপার বাংলাকে, নতুন করে গড়ে তুলতে প্রায় অসম্ভব কাজে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অমানুষিক পরিশ্রম করে গেছেন হাসিমুখে। ডাক্তারির পাশাপাশি ভেবেছেন, রাজ্যের ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। অফুরন্ত কর্মশক্তি না থাকলে, বড় মনের মানুষ না-হলে, একজন চিকিৎসক হয়েও এত ভার বহন করতে পারতেন না ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। দেশের মধ্যে আমাদের রাজ্যেই তৃণমূল স্তর পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছড়িয়ে পড়েছিল ডাক্তার রায়ের আমলে।
দুর্গাপুর আর কল্যাণী, এই দুই উপনগরী আজীবন অকৃতদার ডাক্তার বিধান রায়ের দুই মানসসন্তান। ডাক্তার নীলরতন সরকারের কন্যা কল্যাণীর প্রেমে পড়ে বিধান রায় উপনগরীর নাম দিয়েছিলেন কল্যাণী, এমন হাস্যকর কথা আজও শুনতে পাওয়া যায়! নীলরতন সরকারের কল্যাণী নামের কোনও কন্যাই ছিলেন না, ইতিহাস তাই বলে।

নব্য-ইতিহাসে আস্তে-আস্তে বদলে যাচ্ছে অতীত। ঘৃণার রাজনীতি দ্রুতলয়ে ভুলিয়ে ছাড়বে পার্কসার্কাস থেকে গড়িয়াহাট পর্যন্ত এক প্রখ্যাত চিকিৎসকের নামে রাখা রাস্তাটির নাম। হয়তো বদলে যাবে ইসলামিয়া হাসপাতালের নামও। হতাশা ছেড়ে চলুন, একটু মজার গল্প মনে করা যাক। ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা বানাবেন সত্যজিৎ রায়। টাকার অভাবে মাঝপথে শুটিংয়ের কাজ বন্ধ হবার পথে। কারও মাধ্যমে সিনেমাটির জন্য অর্থ সাহায্যের আবেদন গেছে ডাক্তার বিধান রায়ের কাছে। এক মুহূর্ত না-ভেবে কিছু টাকা মঞ্জুর করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়। অর্থদপ্তর থেকে জানতে চাওয়া হল, ‘টাকাটা কোন দপ্তর থেকে দেওয়া হবে স্যর?’ ‘‘পথের ব্যাপার তো? পথ মানে রাস্তা এটাও জানেন না! রাস্তা বানান যাঁরা, সেই ‘পি ডব্লিউ ডি’-র দপ্তর থেকে টাকাটা এখনই মঞ্জুর করে দিন,’’ একটুও না-ভেবে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন ডাক্তার বিধান রায়!

তিন তিনজন ‘সিএম’কে সামলানো খাস বেয়ারার একটি সাক্ষাৎকার বেরিয়েছিল বাংলা একটি পত্রিকায়। বৃদ্ধ খাস বেয়ারা জানিয়েছিলেন, ‘ডাক্তার রায় ছিলেন প্রবল ভোজনরসিক। দুপুর দুটোয় অ্যান্টিচেম্বারে ঢুকে আমার সাজিয়ে দেওয়া রাজসিক খানা খেতেন তারিয়ে-তারিয়ে। তারপর সহকারীকে ডেকে বলে দিতেন, একমাত্র প্রাইম মিনিস্টার ছাড়া অন্য কেউ ফোন করলে শুধু নামটা জেনে রাখলেই চলবে।’ —‘খুলে বলুন।’ —‘ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে ঘড়ি ধরে ৪৫ মিনিট যোগনিদ্রা দিতেন ডাক্তারবাবু।’

শব্দ ফুরিয়ে আসছে। চুপিচুপি একটা বইয়ের নাম বলে দিই। ‘বিধান রায়ের মন্দ ভাল’। ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এ বইটি রয়েছে। ডাক্তার বিধান রায়ের সম্পর্কে মজার-মজার অনেক তথ্য রয়েছে এই বইটিতে। ভোজনদোষ থাকলেও, বিধান রায়ের পানদোষের কথা আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেননি। তবে রবীন্দ্রনাথের শেষ অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ডাক্তারবাবু, কবির মতোই কবির ডাক্তারবাবু সম্পর্কেও কেচ্ছা ছড়াবার মানুষের অভাব ছিল না এই বাংলায়। ছড়া লিখে, বঙ্গনারীদের নলিনী (জনশ্রুতিতে ‘কল্যাণী’) আর বিধান সম্পর্কে সাবধান হবার পরামর্শ দেওয়া হত মাঝেমধ্যেই! সাগরময় ঘোষের ‘একটি পেরেকের কাহিনী’ বইটি সর্বত্র পাওয়া যায়।

এক গ্রাম্য পাঠশালায় যে-বিধানের শিক্ষা শুরু হয়েছিল, তিনিই একদিন হয়ে উঠেছিলেন ধন্বন্তরী। ডাক্তার নীলরতন সরকারের প্রিয় ছাত্র। রবীন্দ্রনাথের শেষ অস্ত্রপাচারের সময়ে স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ নীলরতন ছিলেন গিরিডির বাড়িতে। তার আগেই সেলিব্রাল স্ট্রোকে আক্রান্ত নীলরতনকে সঙ্গে করে পুরীর সমুদ্র ঘুরিয়ে এনেছেন। জন্ম আর মৃত্যু একদিনে যে-চিকিৎসকের, সেই দিনটাতে প্রণাম নয়, দু’ফোঁটা অশ্রু যেন ঝরাতে পারি পর্বতপ্রমাণ চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়ের যন্ত্রণার্ত ডাক্তারি জীবন নিয়ে ভাবতে-ভাবতে।