সময়-অসময়ে এই দুনিয়ায় বুকে বোমার মতো এক-একটা মানুষ এসে দুম করে ফাটে। একা-একাই একটা বিপ্লব ঘটিয়ে, অনেক কিছু উল্টেপাল্টে দিয়ে, বাঁধ ভেঙে, নদী কেটে, পাহাড় ফুঁড়ে যেমন এসেছিল, তেমনই দুম করেই চলেও যায়। ভাবখানা যেন, ‘আমার কাজ যা করার করেছি, এবার কাটলাম; তোমরা যেমন হাফ-মরে বেঁচে ছিলে তেমন চালিয়ে যাও চিতায় ওঠা পর্যন্ত।’ এইসব রোয়াব এদের মানায়, কারণ এদের বিপ্লব একান্ত আড্ডায়, কাফেতে, বারে, ড্রইং রুমে বা বন্ধ বাথরুমের আয়নার সামনে জন্মায় না, এদের বিপ্লব এদের ভয়ংকর সব কাজে বেঁচে থাকে। অ্যান্ডি ওয়ারহল সেরকমই এক ‘বোমা’, যার কম্পন এখনও থিতিয়ে যায়নি।
‘পপ কালচার’ নিয়ে একটু নাক সিঁটকানো বরাবরই আছে। আমাদের ছোটবেলায় ‘পপ’, ‘হিপি’, ‘বোহেমিয়ান’ শব্দগুলো, বাপ-মায়ের কথা না-শোনা ইয়ং জেনারেশনের ওপর প্রয়োগ হত হরদম। রীতিমতো গালাগাল-সদৃশ! স্বাভাবিক— পপ, হিপি, বোহেমিয়ানি-সম সবক’টি মুভমেন্টই বুনিয়াদ ভাঙার মুভমেন্ট, যা চলছে তা যত উৎকৃষ্টই হোক না কেন, তাতে শামিল না হয়ে, যা চলবে না, তাকে চালানোর মুভমেন্ট; কারন ওই ভাষা আর আমাদের টানে না, আর তোমরাও আমাদের মনের হদিস কিস্যু জানো না। একধরনের সুচারু, মার্জিত, সংশোধনীয় এবং ইমারতি সংস্কৃতির হাড় জ্বালিয়ে এই মুভমেন্টগুলিও বারবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এক-একজন অ্যান্ডি ওয়ারহলের তালে তাল মিলিয়ে, সব ঘেঁটে, গুলিয়ে দিয়ে।
১৯২৮ এর ৬ অগাস্ট, আমেরিকার পিটসবার্গ শহরে উদ্বাস্তু রুসিন পরিবারে, এক-কামরার এক মজদুর-বস্তির ঘেটোতে জন্মেছিল অ্যান্ডি। বাপ মারা যায় ছোটবেলায়। চির-রুগ্ন, ‘মেয়েলি’ স্বভাব আর ফিনফিনে চেহারার ছেলেটিকে না-জানি কতরকম অপমানের মধ্যে দিয়ে বড় হতে হয়েছে। দ্রোহ কখনও সমাজ বা সংস্কৃতির ওপরের ভাগ থেকে তৈরি হয় না, ছিন্নভিন্ন জীবন থেকেই বারবার উঠে আসে অন্য দেখা আর ভাবনারা।
রহস্যের অন্য অন্দরমহল উঠে আসত কিইগো হিগাশিনোর লেখায়!
লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…
১৯৫০-এ অ্যান্ডি যখন তাঁর আকা ছবিগুলি নিয়ে নিউ ইয়র্কের গ্যালারিগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন তাকে খেঁদিয়ে দেওয়া হয়েছে কাজগুলিকে ‘অতিরিক্ত গে, মেয়েলি আর বাজারি’ বলে। ১৯৫০-এর পাশ্চাত্য তখনও ‘abstract expressionist art’-এ বুঁদ। নিউ ইয়র্কের স্টোন অয়াল রায়ট, যা কিনা LGBTQ মুভমেন্টের প্রথম মাইলফলক হিসেবে গণ্য, তা হতে এক দশকেরও বেশি সময় বাকি। ফেমিনিজম-ও তখন আঁতুড়ে— এহেন সন্ধিক্ষণে ছোট্ট আধ ইঞ্চি চারাগাছের মতো গজিয়ে ওঠা ‘পপুলার কালচার’-এর, ডাকনাম ‘পপ’, হোতা হয়ে উদয় হলেন অ্যান্ডি অয়ারহল। ঠিক যে-যে জিনিসগুলো ঘিরে আমাদের ভয় আর লজ্জা, মুখ ঘুরিয়ে রাখা, সেগুলিকে নিয়েই অ্যান্ডির পরীক্ষানিরীক্ষা— কাম ও সমকাম, উচ্চাভিলাষ, মৃত্যু। মৃত্যু নিয়ে সব শিল্পীর রোম্যান্টিকতা আছে, কিন্তু মৃত্যু নিয়ে ‘পপ আর্ট’ একটি বিস্ময়কর এক্সপ্রেশন। উগ্র রঙের বাহারে, প্রস্ফুটিত লাল, হলুদ, ফ্লুরোসেন্ট, নিয়নে মেরিলিন মনরোর (তাঁর কালজয়ী একটি সাদা-কালো ছবি থেকে রিক্রিয়েট করা) অ্যান্ডির পোর্ট্রেইট তাঁকে একধাক্কায় বড়লোক বানিয়ে দেয়। কন্ট্রাক্ট শিট-এর মতো পরপর চৌখুপিতে একসঙ্গে প্রায় পঞ্চাশটা মেরিলিন— একসঙ্গে এতগুলি মেরিলিন আর তার ওই পৃথিবী পাগল করা হাসি, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবির আবেদন আর রহস্য থেকে তীব্র রঙের রায়টে, মেরিলিনের সুইসাইডের তিন-চার মাসের মধ্যে—যেন একটা বিরাট বড় খিল্লির মতো করে তুলে ধরলেন অ্যান্ডি— ‘মেরিলিন ডিপটেক’।

সেলিব্রিটিদের অনুরাগী ছিলেন অ্যান্ডি। যেটাকে খুবই অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে ধরা হয়। তিনি খুল্লমখুল্লা বলেন, “My idea of a good picture is one that’s in focus and of a famous person”, তিনি একইসঙ্গে ছিলেন খুল্লমখুল্লা সমকামী এবং খুল্লমখুল্লা আর্ট বেচে খাওয়ার পক্ষে। আর্ট আর কমার্স-এর যুযুধান যুদ্ধ চিরকালীন। আমাদের শিক্ষাই হল শিল্পী ও শিল্প, টাকাপয়সা, বাজার থেকে শত হস্ত দূরে থাকবে, আদর্শগত দিক থেকে এরা চিরশত্রু। ভুল-ঠিক পরের আলোচনা, কিন্তু অ্যান্ডি ওয়ারহল সেই শিল্পী, যিনি কমার্শিয়াল আর্টকে ওয়ার্ল্ড আর্ট করে তোলেন। অ্যান্ডির কোকা কোলার ড্রয়িং, ক্যাম্পবেইল টম্যাটো স্যুপ-এর ক্যান দিয়ে ইনস্টলেশন এবং ড্রয়িং— সেই কাজগুলো ঘিরে উত্তেজনা, জনপ্রিয়তা এবং বাজার ছাড়ানো দাম ওঠা হঠাৎ করে ভাবতে বসায়— শিল্প এবং বাজারের ডুয়েলে শেষ বাজিটা জিতবে কে!
অ্যান্ডি ওয়ারহল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী শিল্পীদের অন্যতম। অ্যান্ডি ওয়ারহল আমাদের ভাবতে বাধ্য করে— আমরা কি আদৌ জানি, আমাদের মন কীসে সত্যি আকর্ষিত হয়, আর যদি সে আকর্ষণ আদর্শের পরাকাষ্ঠার বাইরে হয়, তবে কি তাকে এক ঢোক গিলে ফেলতে হয় না কি তার সামনে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। অ্যান্ডির কাজ শুধু যে পপুলার বা ছবির বাজারে বা আর্ট-মার্কেটে দারুণ দামি কাজ, তা তো নয়, সে কাজ তো একইসঙ্গে দারুণ এক্সপেরিমেন্টাল— একদম নতুন, বৈপ্লবিক। অ্যান্ডিকে ঘিরে বিতর্কেরও শেষ ছিল না তবু এতটাই বাঁধনভাঙা তাঁর কাজ; যে সেগুলিকে বলা যেতে পারে পরবর্তী সময়ের নিরীক্ষামূলক চর্চার শুরু।


১৯৬৩ সাল থেকে থেকে অ্যান্ডি সিনেমা বানাতে শুরু করেন। একেবারেই নিরীক্ষাধর্মী সেসব ছবি। তবে বাজার অ্যান্ডি ভাল বুঝতেন শুধু না, ভালবাসতেনও। আমেরিকার বুকের ওপর বসে বেমালুম তার উল্টোস্রোতে গিয়ে ‘স্লিপ’, ‘ব্লো জব’-এর মতো সব আঁভা-গার্দ ছবি বানিয়েছেন অ্যান্ডি। আমেরিকান ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ ফিল্ম মুভমেন্টও তখন মধ্যগগনে। পোর্ট্রেইট ফিল্ম, স্প্লিট স্ক্রিনের ব্যবহার তার আগে খুব একটা দেখা যায়নি।
অ্যান্ডি ওয়ারহলের আরেকটি অন্যতম বিখ্যাত কাজ ‘ফিফটিন মিনিটস অফ ফেম’। এটি ১৯৮০-তে টিভির জন্য বানানো ক্যাপসুল সিরিজ। ছোট-ছোট ইন্টারভিউধর্মী বুলেট নিউজ— সমসাময়িক সেলিব্রিটিদের নিয়ে বা নতুন যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের নিয়ে। অ্যান্ডি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে সবাই পনেরো মিনিটের জন্য পৃথিবীবিখ্যাত হবে। কী অদ্ভুত ভবিষ্যৎবাণী!
বস্তুত, অ্যান্ডির কথা লিখতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছে রীতিমতো গা-ছমছমে দূরদর্শিতা ছিল তাঁর। আজকের দিনের কমার্শিয়াল ভিস্যুয়াল আর্ট, ভিস্যুয়াল স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ডি একলা সম্রাটের মতো সেই যুগ থেকে শুরু করেছেন। রুপোলি পরচুলা, চোখে অন্য রঙের লেন্স, লিঙ্গ-উদাসীন পোশাক— নিজের একটি অনবদ্য ব্র্যান্ড তৈরি করেছিলেন অ্যান্ডি। ব্র্যান্ডিং, সেলিব্রিটিদের ঘিরে কাজ, এমনকী, সেলফি— আজকের সময়ের বাজার জাঁকিয়ে বসা সবক’টি হাতিয়ার নিয়ে তাঁর সময়ে চুটিয়ে কাজ করেছে অ্যান্ডি। সদ্য বাজারে আসা পোলারয়েড ক্যামেরাতে তার সেলফি ফোটোগ্রাফের সিরিজ, সে সময়ের ছকভাঙা কাজ।

আজকের সময়ে ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হচ্ছে শিল্প নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন মাধ্যম আর ভাষা— ডিজিটাল আর্ট, মিক্সড মিডিয়া কাজ, নিউ মিডিয়া কাজ, পারফরমেন্স ইনস্টলেশন, বডি আর্ট, মেমোরি আর্ট এবং জেন্ডার আর্ট এবং আরও কত কিছু। এই খণ্ডিত সময়ের ভেতর খণ্ডিত পরিচিতি খুঁজে বেড়ান, প্রকাশ খুঁজে ফেরা মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে আর্ট। যা প্রচলিত চর্চার থেকে অনেক আলাদা। অথচ, ফিরে তাকালে দেখা যায়, অ্যান্ডি ওয়ারহল কয়েক দশক আগে এই সবক’টি মাধ্যমে কাজ করেছেন। সিল্ক-স্ক্রিন প্রিন্টিং আর হাতে আঁকা ছবি, তার সঙ্গে ফোটোগ্রাফি মিলিয়ে মিক্সড মিডিয়া কাজ, যা আজকের ডিজিটাল আর্ট-এর পূর্বসূরিও বটে, অ্যান্ডি শুরু করেছেন সেই ১৯৬০-এর গোড়ায়।
১৯৭৪-এ তার টাইম ক্যাপস্যুল নামের ইনস্টলেশন-এর কাজে অ্যান্ডি বিভিন্ন কার্ড বোর্ডের বাক্সে, তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রর অগোছালো সমাহার ডিসপ্লে করেন—ঠিক যেমন আমাদের মস্তিষ্ক এক-একটি খোপে জমিয়ে রাখে এক-একটি ঘটনা বা অধ্যায়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা টুকরোটাকরা জিনিসপাতি, হয়তো একটা কালির দোয়াত, মায়ের রংচটা ছেঁড়া রুমাল বা অন্য কিছু। মেমরি আর্ট। অ্যান্ডির ওপর একবার প্রাণঘাতী হামলা হয়, তারই এক সময়ের সহকর্মীনি গুলি ছোড়েন তাঁকে, দু’টি বুলেট মিস হয়, তিন নম্বরটি ফুঁড়ে দেয় পেট। বহু কাটাছেঁড়ার পর বেঁচে ওঠেন অ্যান্ডি, তবে শরীরে ক্ষতের মানচিত্র নিয়ে। বুক থেকে পেট অবধি চক্রাবক্রা সার্জারির দাগওয়ালা নিজের শরীরের সেই সাদা-কালো ছবির সিরিজ তাঁর সবচেয়ে চমক-ধরানো কাজগুলোর অন্যতম।
অ্যান্ডির সংসার ছিল তাঁর মা আর পঁচিশটি বেড়ালেকে নিয়ে। প্রেমিকরা এসেছে ও চলে গেছে। একটি বাদ দিয়ে তাদের সবক’টি বেড়ালের নামই ছিল স্যাম। তাঁর ব্যক্তিজীবন ঘিরে বিতর্কের শেষ ছিল না। প্রবল ধর্মাচারী, চার্চে যাওয়া, ঈশ্বরবিশ্বাসী বৈচিত্রে এবং বৈপরীত্যে ভরা এই পুরোদস্তুর আঁভা-গার্দ এই শিল্পীটি, পপ কালচারের হোতা অ্যান্ডি অয়ারহল বলেছিলেন, ‘আমি বুঝতে পারি, আমি যে কাজই করি, তা আসলে মৃত্যুর থেকে উঠে আসা।’ বস্তুত, ‘পপ’, ‘হিপি’ বা ‘বোহেমিয়ান’ কালচারে উদযাপিত রং আর স্পিরিট-এর অভ্যন্তরে থেকে যায় একটা ধু-ধু করা শূন্যতা আর চারপাশের পৃথিবীর থেকে বিছিন্ন হওয়ার উদাসীনতা। ব্যথা বা কষ্টবোধ নয়, একটা বস্তুভিত্তিক, কেয়ার না-করা স্পিরিট; হয়তো খানিকটা খিল্লির কায়দাতেই, আর তাই দুম করে চলে যাওয়া অ্যান্ডি ওয়ারহল অনায়াসে বলেন—“Don’t think about making Art, just get it done!”



