মাতা হারি-র মাথা হারিয়ে গেছে।
২০০০ সালের জুলাই মাস নাগাদ প্যারিসের ‘মিউজিয়াম অফ অ্যানাটমি’-র কিউরেটর রজার সবান এই কথা ঘোষণা করার পাশাপাশি বললেন যে, এই মাথা কোথায় কার কাছে আছে সে নিয়ে কোনও ধারণাই কারো নেই, যদি কোনও ব্যক্তির কাছে থেকে থাকে, তিনি অনুরোধ করছেন, তা যেন মিউজিয়ামেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এখানকার কর্তা-ব্যক্তিরা মনে করেন যে, ১৯৫৪ সালে এই মিউজিয়ামের স্থান পরিবর্তনের সময়ে কোনওভাবে খোয়া যায় মাতা হারি-র মাথা। এই মিউজিয়ামে নাকি রাখা আছে ৫০০০-টা করোটি, যার মধ্যে বেশির ভাগই আঠেরো, উনিশ আর কুড়ি শতকের কুখ্যাত অপরাধীর মাথা। এই সব সাংঘাতিক অপরাধীর মধ্যে জায়গা হয়েছিল মাতা হারি-র, সম্ভবত সবচেয়ে খ্যাতিসম্পন্ন অপরাধী হিসেবে, ফরাসি সরকারের চোখে যিনি ছিলেন ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহিলা গুপ্তচর’। তাঁর মৃত্যুর প্রায় একশো দশ বছর পরেও হয়তো কোনও পরিবারের গোপন ক্যাবিনেটে এক রহস্যময় জীবনের স্মৃতিবিজড়িত মাথাটি রয়ে গেছে।

কিন্তু তাঁর মাথা কী করে এসেছিল এই মিউজিয়ামে? তাঁর জীবনের গতিপ্রকৃতির রূপরেখা আজ যথেষ্ট পরিচিত আপামর বিশ্বের কাছে। আগস্ট মাসের সাত তারিখে, ১৮৭৬ সালে, ডাচ প্রভিন্সের একটি অখ্যাত শহরে মোটামুটি সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারে মার্গারেথা গিরত্রুইদা জিল্লা-র জন্ম হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর যেতে-না-যেতেই, ব্যাবসায় নিদারুণ ক্ষতির কারণে দেউলিয়া হয়ে গেলে তাঁর বাবা শহর ছেড়ে চলে যান আর এর ঠিক দু-বছর পরে মা মারা গেলে তাঁর কৈশোর বাঁধন ছেঁড়া নৌকোর মতো বিভিন্ন আবর্তের মধ্যে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এলোমেলো হয়ে যায়। যত দূর জানা যায়, প্রথম যৌন লালসার সম্মুখীন হন স্কুলের প্রিন্সিপালের থেকে। তারপর হঠাৎ, মাত্র আঠেরো বছর বয়সে, কাগজে ‘পাত্রী চাই’ ধরনের বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে বিয়ে করে ফেলেন ঊনচল্লিশ বছরের আর্মি ক্যাপটেন রুডল্ফ ম্যাক্লিয়ড-কে এবং সেই বিবাহিত জীবন ছিল ভয়ংকর। শারীরিক আর মানসিক অত্যাচারে জেরবার হয়ে যাচ্ছিলেন মার্গারেথা। যদিও এই বিবাহ তাঁকে নিয়ে আসে সমাজের উচ্চ বৃত্তে এবং টাকাপয়সা ওড়ানোর নেশায়। এরই মধ্যে জন্ম নেয় দুই সন্তান— পুত্র নরম্যান এবং কন্যা জেনি। নরম্যান অবশ্য মারা যায় অল্প কয়েকদিনের মধ্যে। শেষপর্যন্ত বছর সাতেকের মধ্যে ভেঙে যায় এই অসুস্থ দাম্পত্য। ভাগ্যান্বেষণে ঊনত্রিশ বছর বয়সে পাড়ি দিলেন প্যারিসে, সম্বল বলতে ছিল অতীতে শেখা নাচ আর তাঁর রূপের অদ্ভুত আকর্ষণ। তিনি যে দারুণ রূপসী ছিলেন এমন নয়, কিন্তু তাঁর ‘slender and tall with the flexible grace of a wild animal, and with blue-black hair’ শক্তিশালী চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত পুরুষকে। এক অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক লিখেছিলেন যে তাঁর মধ্যে ছিল ‘a strange foreign impression’, তাঁর সম্পর্কে আর-এক সাংবাদিকের ভাষা ছিল এইরকম, ‘so feline, extremely feminine, majestically tragic, the thousand curves and movements of her body trembling in a thousand rhythms’। নতুন নাম নিলেন ‘মাতা হারি’, যার অর্থ ‘ভোরের দৃষ্টি’ এবং নিজের পরিচয় দিলেন জাভা রাজবংশের সন্তান হিসেবে। তাঁর নাচের লাস্য আর উন্মুক্ত শরীরী বিভঙ্গে মেতে উঠল ফরাসি বিত্তবানপুরুষ, বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে থাকল টাকাপয়সা আর একই রকম ভাবে তা ওড়াতেও থাকলেন তিনি।
এই যশ আর বিলাস তুঙ্গে পৌঁছেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত। বিশ্বযুদ্ধের আবহে চারিদিকে সন্দেহের বাতাবরণে একদিকে যেমন তাঁর অর্থের প্রাচুর্যে ভাঁটা পড়ল, অন্যদিকে তিনিও হয়ে উঠলেন আন্তর্জাতিক গুপ্তচর বলয়ের ক্রীড়নক। আসলে তাঁর অজস্র প্রেমিকের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল প্রশাসন আর সেনাবাহিনীর তাবড় কর্তাব্যক্তি। ফলে বাইরে থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে বিভিন্ন গোপন খবর হয়তো তাঁর কাছে ছিল। তাঁর এই প্রবণতা আর প্রচুর অর্থের লোভকে হাতিয়ার করে কীভাবে তাঁকে জড়িয়ে দেওয়া হল গুপ্তচর বৃত্তির ফাঁদে, সে-কথা আজ অনেকটাই স্পষ্ট। যথার্থ গুপ্তচর হিসেবে তিনি যে কতটা অকিঞ্চিৎকর ছিলেন, তা জানা যায় জেলে থাকাকালীন লেখা অজস্র চিঠিতে। আসলে একা মহিলার সংগ্রাম এবং তার সঙ্গে হাড়ে মজ্জায় থাকা বিলাসের অভ্যাস বারবার তাঁকে নিয়ে গেছে এই বিপদের মধ্যে। কন্যাকে কিছুতেই কাছে পেতে দিতেন না তাঁর স্বামী ম্যাকলিয়ড, কন্যার প্রতি টান ভিতরে ভিতরে অদম্য হয়ে উঠেছিল মাতা হারি-র মধ্যে, আর ছিল চল্লিশ বছর বয়সে এক আহত রাশিয়ান সেনাকে ভালোবেসে সংসারে থিতু হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। শেষপর্যন্ত এই টানাপোড়েনের ফলই হল ‘প্যারিসের মিউজিয়াম অফ অ্যানাটমি’তে হাজার পাঁচেক কুখ্যাত অপরাধীর মধ্যে তাঁর করোটির জায়গা পেয়ে যাওয়া। জেল থেকে ভোরবেলায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া ফায়ারিং স্কোয়াডে। বন্দুক হাতে নিয়ে প্রস্তুত ছিল বেশ কয়েকজন। তারপর কী ঘটল সে-নিয়ে সামনে রাখা দরকার প্রত্যক্ষদর্শী ব্রিটিশ রিপোর্টার হেনরি ওয়েলস-এর রিপোর্টিং। গুলি করার আগে বন্দুক হাতে উদ্যত সেনার দিকে নাকি মাতা হারি শেষমুহূর্তে একটি উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়ে দেন। তারপর ছুটে আসে একের পর এক গুলি, তখনও চোখ সরাননি তিনি। তারপর ‘Slowly, inertly, she settled to her knees, her head up always, and without the slightest change of expression on her face. For the fraction of a second it seemed she tottered there, on her knees, gazing directly at those who had taken her life. Then she fell backward, bending at tha waist, with her legs doubled up beneath her’। পরিবার, স্বজন বা প্রেমাস্পদদের মধ্যে থেকে কেউ নিতে আসেনি মাতা হারি-র মৃতদেহ, যে দেহবল্লরী একসময়ে মনোরঞ্জন করেছিল, ঝড় তুলেছিল অগণিত পুরুষের মনে, তা পড়ে রইল একেবারে দাবিহীন অবস্থায়। কী করে যে দেহ থেকে মাথা ছিন্ন হয়ে স্থান পেল মিউজিয়ামে, সে কথা জানার আজ আর কোনও উপায় নেই।
কিন্তু সত্যি কি এখানে স্থান পাওয়ার কথা ছিল মাতা হারি-র? আজ কিন্তু এই প্রশ্নটার আর তেমন গুরত্ব নেই। সবাই জানে যুদ্ধের সময়ে মাঝে মাঝে দরকার পড়ে এমন কোনো মানুষের, যার ওপরে দোষ চাপিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলতে চায় দেশের কর্তারা। এ-দিক থেকে মাতা হারি-র মতো আর কেউ ছিলেন না, ফলে হাজার-হাজার ফরাসি সৈন্যের মৃত্যুর দায় তাঁর ওপরে চাপিয়ে তাঁকে মেরে ফেলা হল। কিন্তু এমন অসার তথ্যপ্রমাণ হিসেবে হাজির করার অন্য কোনও দৃষ্টান্ত আছে বলে আমার জানা নেই। তবে মৃত্যুর পর যেন নতুন করে জেগে উঠলেন মাতা হারি, রহস্যে রোমাঞ্চে রূপকথায় আবার ফিরে এলেন বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে।
আসলে মাতা হারি-র দুটো জীবন। এক জীবনে পেয়েছিলেন খ্যাতি আর ঐশ্বর্যের শিরোপা, নানা ঘটনায় ভরা তাঁর সেই জীবন। আর সেই জীবনের করুণ সমাপ্তির পর আর-এক খ্যাতির জীবন, তবে সে-খ্যাতি অলৌকিক, আশ্চর্যের, বিতর্কের এবং অবশ্যই সাধারণ মানুষের ভালবাসার। মৃত্যুর দুই দশকও যায়নি, আমেরিকার সিনে-কোম্পানি এমজিএম তৈরি করল মাতা হারি-কে নিয়ে সিনেমা— সেখানে মাতা হারি-র ভূমিকায় অভিনয় করলেন গ্রেটা গার্বো স্বয়ং। এরপর সিনেমায়, টিভি সিরিজে, তথ্যচিত্রে তাঁর অজস্র উপস্থিতি। কত যে উপন্যাস আর গল্প লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে, কত গানে আর অপেরায় তিনি রয়েছেন তার তালিকা যত দীর্ঘই হোক, তা সবসময়েই থেকে যাবে অসম্পূর্ণ।
আসলে মাতা হারি-র দুটো জীবন। এক জীবনে পেয়েছিলেন খ্যাতি আর ঐশ্বর্যের শিরোপা, নানা ঘটনায় ভরা তাঁর সেই জীবন। আর সেই জীবনের করুণ সমাপ্তির পর আর-এক খ্যাতির জীবন, তবে সে-খ্যাতি অলৌকিক, আশ্চর্যের, বিতর্কের এবং অবশ্যই সাধারণ মানুষের ভালবাসার।
মিথ্যে পরিচয় দেওয়ার সময়ে যে-জায়গার নাম নিয়েছিলেন মাতা হারি, সেই ইন্দোনেশিয়ার বালি অঞ্চলে এক ধরনের বিশেষ লাস্যময়ী পোশাক আজও জনপ্রিয় তাঁর নামে— ‘মাতাহারি দ্য লেবেল’, এখানেই আছে এক বিরাট ডিপার্টমেন্ট স্টোর চেইন তাঁর নামে। আছে অপূর্ব দেখতে মাতাহারি লেদার ব্যাগ, বিখ্যাত প্রসাধনী সংস্থা ‘রোলওভার রিয়্যাকশন’-এর মাতা হারি কালেকশন, এমনকী আছে ঘন লাল রঙের, গ্লোবের মতো আকার সদৃশ পিঁয়াজের কোম্পানিও। সেই পিঁয়াজের মন মাতানো হালকা ঝাঁঝ নাকি মনে পড়িয়ে দেয় ইতিহাসের মাতা হারি-কে।
আপনি যদি মাতা হারি-র মতোই ব্যতিক্রমী অস্ট্রিয়ান অ্যাবসিন্থের স্বাদ পেতে চান, যেটি জিভে লবঙ্গ আর দারচিনির অনুষঙ্গ বয়ে নিয়ে আসবে তাহলে আপনাকে যেতেই হবে মাতা হারি-র কাছেই, দীর্ঘ সরু বোতলে ‘অ্যাবসিন্থ মাতা হারি’ রয়েছে আপনারই অপেক্ষায়। ভারতে অবশ্য এই অমৃতসুরা পাওয়া যায় না। তবে এক বিকল্পের সন্ধান দিতে পারি। এক আউন্স ব্র্যান্ডি বা কগন্যাক, চা থেকে তৈরি মিষ্টি ভারমাউথ, লেবুর রস, এক বা দুই আউন্স সাধারণ সিরাপ আর এক আউন্স বেদানার রস একটি পাত্রে মিশিয়ে, বরফ দিয়ে ঝাঁকিয়ে মার্টিনি গ্লাসে ঢেলে ফেলুন। ওপর থেকে ছড়িয়ে দিন কয়েকটি অস্ফুট গোলাপ। স্বাদ নিন এই সুরার। এর নাম মাতা হারি ককটেল।



