মহাকাব্যের খামতি

নস্টালজিয়া শব্দটা এসেছে গ্রিক শব্দ ‘nostos’ থেকে। ইংরেজি অভিধান এ শব্দ ধার নিয়েছে ‘ওডিসি’ থেকে। এর মানে বাড়ি ফেরার তীব্র আকুতি। কিন্তু যে-কোনও মহাকাব্যের মতোই তার বাইরেও আছে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ আখ্যানের চোরাস্রোত। ‘ইলিয়ড’-‘ওডিসি’র মতো মহাকাব্যের বুনট প্রাগৈতিহাসিক। কেউ ঠিক করে লেখকের কোনও হদিশ দিতে পারে না। হোমারিক কোয়েশ্চেন তো সেই সভ্যতার প্রত্যুষে জন্ম নেওয়া লেখকসত্তার চিরন্তন খোঁজ। ব্যাসের মতোই কেউ জানে না, হোমার আসলে কে? তন্দ্রার অতীত থেকে যেন ভেসে ভেসে আসে কিছু শব্দ — A face. A fleet. A war. A man. A thought. A trick. — একটা মন্তাজ।

বিষ্ণু দে ‘সন্দ্বীপের চর’ কাব্যগ্রন্থের ‘কাসান্ড্রা’ কবিতায় লিখেছিলেন —‘আমরা কখনো হেরিনি হেলেন, সে মায়াননে আমরা খুঁজিনি মর্ত্যরূপের ঐশী সীমা,ইথাকায় কভু কলাকৌশলে কিনিনি নাম তবু কেন মরি ঘরে বসে লোভী ট্রয়ের রণে…।’ ‘সন্দ্বীপের চর’ বেরোচ্ছে ’৪৭ সালে। ’৪৩-এর মন্বন্তর, ’৪৫-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি, ’৪৬-এ নোয়াখালি আর কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, আর ’৪৭ এ দেশভাগ। এই অসহায় সময়ের মধ্যে বসে বিষ্ণু দে টেনে আনেন ট্রয়ের এক পরাজিত রাজকন্যাকে — অ্যাপোলোর অভিশাপে যার সত্যভাষণ কেউ বিশ্বাস করে না। বিষ্ণু দে’র কবিতায় কাসান্ড্রা তাই আর গ্রিক পুরাণের চরিত্র থাকেন না, সমকালের পৃথিবীতে সে ট্র্যাজিক মোটিফ। কেন বিষ্ণু দে দিয়ে শুরু করলাম? কারণ ঘরে বাইরে ওডিসির যত অনুবাদ হয়েছে, তার বেশিরভাগেই অনিবার্যভাবে রয়ে গেছে সময়ের টিপছাপ ।

আরও পড়ুন: মার্কিন অপরাধের অন্ধকার বারবার উঠে এসেছে স্করসেসির ছবিতে! লিখছেন সৌহার্দ্য প্রামাণিক

সপ্তদশ দশকে জর্জ চ্যাপম্যানের হোমারের ইংরেজি অনুবাদ হোমারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদ। সেখানে ওডিসিয়াস খ্রিস্টীয় সহনশীলতার পরাকাষ্ঠা। এই অনুবাদই 1816 সালে রোমান্টিক কবি কিটসের লেখা কবিতায় অমরত্ব লাভ করবে — ‘On First Looking into Chapman’s Homer’। আলোকজান্ডার পোপ নিও ক্লাসিকাল ঘরানায় Heroic couplet ব্যবহার করে হোমারের অনুবাদ করেন। ছন্দের অনুবাদ ছন্দে। কিন্তু সমকালের বিশিষ্ট সমালোচকের কাছে তাঁকেও টিপ্পনী শুনতে হয় — ‘পোপ মশাই কবিতাটা ভালোই লিখেছেন। কিন্তু আর যাই বলুন, ওটা হোমার নয়!’ আবার আরেক বিখ্যাত চিন্তক স্যোশাল কন্ট্রাক্ট থিওরির উদ্গাতা, লেভিয়াথান এর লেখক টমাস হব্স প্লেটোর মতোই বিশ্বাস করতেন কবিরাই আসলে যত গণ্ডগোলের মূলে এবং তারা যথেষ্ট অরাজাগতা সৃষ্টি করে সমাজে। সেই তিনিই কিনা শেষ বয়সে সময় কাটাতে হাত মকশো করেছিলেন হোমার অনুবাদ করে! তাঁর বুড়ো বয়সের অনুবাদ খুব একটা সম্ভ্রম আদায় করতে পারেনি বটে, কিন্তু তাঁর ওডিসিয়াসকেও দেখা যায় হোমারকে যথেষ্টই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি যা যা বিশ্বাস করতেন, সেই সেই মূল্যবোধের অনুকূলেই গড়ে তুলেছেন।

ভিক্টোরিয়ান কবি টেনিসন লিখেছেন ‘লোটাস ইটার্স’ আর ‘ইউলিসিস’ কবিতা। ইউলিসিসে আবার দান্তের নরকের স্তরে স্তরে ভ্রমণ এসে ইউলিসিসের যাত্রাপথে মেশে। আবার আধুনিককালের চৌকাঠে এসে জয়েস লিখবেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস ইউলিসিস, যা আধুনিক সাহিত্যের সংজ্ঞা বদলে দেবে। ডেরেক ওয়ালকট লিখবেন জেলেদের গল্প ওমেরস যা ঔপনিবেশিকোত্তর পৃথিবীর খুব গুরুত্বপূর্ণ রচনা। মহিলা লেখকদের মধ্যে লুই গ্লাকের মিডোল্যান্ড, মার্গারেট অ্যাটউড এর দি পেনেলোপিয়াড, ম্যাডেলিন মিলারের সার্স দুর্দান্ত সব revisionist readings। এ তালিকা আরও অনেক লম্বা। কিন্তু মোদ্দা কথা, যাঁরা অনুবাদ করেছেন, রূপান্তর ঘটিয়েছেন, পুনঃপাঠ করেছেন, তাঁরা সবাই নিজের নিজের সময়ের নিরিখে, নিজের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ওডিসিকে ফিরে ফিরে আবিষ্কার করেছেন নতুন-নতুন ভাবে।

এবার প্রশ্ন, সেই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েই ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ ছবিটা তাহলে কীভাবে স্বতন্ত্র? প্রথমেই আসে ‘বাজার’। নোলানের ছবি বিজ্ঞাপনের জোয়ারে আর নোলান-আইম্যাক্স যুগলবন্দির ব্র্যান্ডের জেরে আড়াইশো মিলিয়ন ডলারের বাজেটে মুক্তির দশ দিনের মাথাতেই বিশ্বজুড়ে সাড়ে ছ’শো মিলিয়নের ঘর পার করেছে। নিঃসন্দেহে নোলানের জীবনের সেরা ওপেনিং। কিন্তু যে-ছবি বাণিজ্যিক, তাকে বাণিজ্যিক ছবি হিসেবেই দেখা উচিত এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ‘ওডিসি’ আদতে হলিউড এরই প্রোডাক্ট। এ-ছবির গোড়া থেকে শেষ অব্দি তোলা হয়েছে IMAX ৬৫মিমি ফিল্মে। এর জন্য বানানো হয়েছে এমন এক নতুন প্রজন্মের নিঃশব্দ ক্যামেরা, যাতে ওই বিশাল যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়েও অভিনেতারা সংলাপ বলতে পারেন। অথচ আক্ষেপের বিষয়, নোলান ছবিটা তুলেছেন এমন এক ফরম্যাটে, যার জন্য ঠিকঠাক হল পাওয়াই মুস্কিল। সত্যিকারের IMAX ৭০মিমি প্রজেকশন হয় গোটা দুনিয়ায় মোটে একচল্লিশটা পর্দায়, তার পঁচিশ-ছাব্বিশটাই আবার আমেরিকায়। বাকি জায়গায় নোলানের ফ্রেমের পঁচিশ-সাতাশ শতাংশ বাদ পড়ে। এ জন্য অনেকে তাঁর ফিল্ম বানানোর ধরনকে উন্নাসিক এবং এলিটিস্ট ও বলেছেন।

আবহের জন্য লুডভিগ গোরানসন সাবেকি অর্কেস্ট্রা বাতিল করে ব্রোঞ্জ যুগের বস্তুময়তা ফিরিয়ে আনতে ব্যবহার করেছেন পঁয়ত্রিশটি ব্রোঞ্জ গং, প্রাচীন আউলোস, আলবেনীয় মেষপালকদের ইসো-পলিফনিক গান। শ্যুটিং হয়েছে মূল কাহিনির ভূমধ্যসাগরীয় পরিসর ছাড়িয়ে অনেক দূরে দূরে, যেমন মরক্কো (ট্রয়ের জন্য), গ্রিস (সাইক্লপের গুহা), আইসল্যান্ড (হেডিসের পাতাল), মাল্টা (ক্যালিপসোর গুহা), সিসিলি (ইথাকা) আর স্কটল্যান্ডে (সার্সের দ্বীপ)। অথচ বহু ‘কিন্তু’ রয়ে যায়। আইডেন্টিটি পলিটিক্সের যুগে নোলানের কাস্টিং চয়েস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে প্রচুর — ইলন মাস্ক রেগে এক্স এ পোষ্ট করছে এ সিনেমার বিরুদ্ধে, আমেরিকার দক্ষিণপন্থীরা এ সিনেমার বিরুদ্ধে একদম খড়্গহস্ত।

তবে সিনেপ্রেমী হিসেবে আমাদের বেশি চিন্তা হওয়া উচিত অন্য এক বিষয় নিয়ে। যখন এমন এক মহাকাব্যিক মাত্রার টেক্সটকে পর্দায় রূপান্তরিত করা হল, তার চরিত্রগুলো কি আদৌ যথেষ্ট পূর্ণাঙ্গ চরিত্র হয়ে ওঠার সুযোগ পেল? লুপিতা নিওং’ও কৃষ্ণাঙ্গী হেলেন বলে, তাঁর বিরুদ্ধে একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ঝড় বইছে, সেটা ভিত্তিহীন। বরং যে-প্রশ্নটা ওঠা উচিত ছিল, তা হল হেলেন কি আদৌ তাঁর স্ক্রিন প্রেজেন্সের সময়টা ঠিকঠাক ব্যবহার করার সুযোগ পেলেন? শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বাইনারির বাইরে যেটা দেখা উচিত, তা হল চরিত্রায়ণের মুন্সিয়ানা। ডেঞ্জেল ওয়াসিংটনও দ্য ট্র্যাজেডি অফ ম্যাকবেথ এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু তাতে ম্যাকবেথের চরিত্রের প্রতি এতটুকু অবিচার করা হয়নি। বরং ‘ওডিসি’তে কোনও চরিত্রই যেন সেভাবে ঠিক আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেলেন না। অ্যান হ্যাথওয়ে যে পেনেলোপির চরিত্রায়ন করেছেন, সেটাকেও অনেকাংশে সরলীকৃত করা হয়েছে। পেনেলোপির যেসব পাণিপ্রার্থী এসে প্রাসাদের অন্ন ধ্বংস করছে, তারাও যে শুধুই খারাপ, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা বদমাসের দল, এমন অতি সরলীকরণ যে শুধু গল্পের ক্ষতি করে তা-ই নয়, বরং মহাকাব্যের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, নৈতিকতা- অনৈতিকতার নাটকীয় দোলাচলকেও অনেকাংশে লঘু করে দেয়।

ওডিসির চরিত্রটির কথাই ধরা যাক না কেন। সে নায়ক ঠিকই, কিন্তু নৈতিকতা ও আদর্শের প্রতিভূ এমন সবসময় বলা যায় না। সে ধূর্ত এবং বুদ্ধিমান। কিন্তু সেই বুদ্ধির বিস্তার শুধুই ট্রয়ের ঘোড়া বানিয়ে শেষ হয় না। সাইক্লপের গুহা থেকে বুদ্ধি প্রয়োগ করে বেরিয়ে আসা তার দুর্দান্ত উদাহরণ। কে তার চোখ অন্ধ করেছে জানতে চাইলে ওডিসিউস তার নাম জানায় No body, তার আর্তনাদে অন্যান্য সাইক্লপরা কে আঘাত করছে জানতে চাইলে সে জানায় No body আঘাত করছে। শেষমেশ ভেড়ার দলের গায়ে ঝুলে ঝুলে তারা সেই গুহা থেকে মুক্তি পায়। কারণ সে দৈত্য অন্ধ অবস্থাতেও গুণে গুণে ভেড়া বের করছিল, যাতে কোনো মানুষ বেরিয়ে যেতে না পারে। সিনেমায় দেখিয়েছে গায়ে খড় এঁটে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। কিন্তু ওডিসিউসের আসল Hubris তো আসলে সে নিজেই তৈরি করে ফেলে, যখন মুক্তির পর জাহাজ ছাড়ার আগে নিজেই চিৎকার করে নিজের নাম জানিয়ে দেয় অহংকারে। ওই যে নামটি প্রকাশ পেয়ে গেল, তারপরেই নাছোড়বান্দা পোসাইডন ওডিসিউসের যাত্রাকে এত সমস্যাসঙ্কুল করে তুলবে। এসবের কোনওটাই নোলানের ‘ওডিসি’তে নেই। বরং নোলানের সিনেমায় ইঙ্গিত, যে সে ওডিসিউস তার সব নাবিক সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে চাইবে, সে চাইবে যে একটিও যেন প্রাণহানি না হয়, আর সেই জেদেই সবাই মারা পড়বে।

এমিলি উইলসন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক এবং ওডিসি-র প্রথম মহিলা ইংরেজি অনুবাদক। নোলান তাঁর অনুবাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং তাঁর অনুবাদকেই নাকি অনেকাংশে নোলান অনুসরণ করেছেন। এদিকে এমিলি নিজে ‘লন্ডন রিভিউ অফ বুকস’-এ নোলানের ওডিসি নিয়ে যা লিখেছেন, তার শিরোনামেই একটা খোঁচা লুকিয়ে — ‘An Uncomplicated Man’। এমিলির নিজের অনুবাদের সেই বিখ্যাত প্রথম পঙ্‌ক্তি, ‘Tell me about a complicated man’, নোলান নিজে যেটিকে ম্যাট ডেমনের ওডিসিয়াস গড়ার ধ্রুবতারা বলেছিলেন, উইলসন সেই লাইনটাকেই উল্টে খোঁচা দিলেন তাঁর লেখার শিরোনামে। তারপর যা লিখলেন, সে-কথা আরও অন্তর্ঘাত করে — এ ছবি বিরক্তিকর নয় ঠিকই, কিন্তু সে-কৃতিত্ব আসলে মূল মহাকাব্যের, সিনেমা যতই জোলো হোক, মহাকাব্যের উপাদানকে নোলান শতচেষ্টাতেও পুরোপুরি মাটি করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, এমিলি লিখেছেন, ‘আমি লজ্জা পেতাম এই চিত্রনাট্যের এক লাইনও লিখলে’। এত জোরালো প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই এমিলির বিরূদ্ধেও কলম ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্য নোলানের সিনেমার জন্যেই এমিলির বইয়ের যে কাটতি বেড়ে গেছে, সেটা কি অস্বীকার করা চলে?

ওডিসির চরিত্রটির কথাই ধরা যাক না কেন। সে নায়ক ঠিকই, কিন্তু নৈতিকতা ও আদর্শের প্রতিভূ এমন সবসময় বলা যায় না। সে ধূর্ত এবং বুদ্ধিমান। কিন্তু সেই বুদ্ধির বিস্তার শুধুই ট্রয়ের ঘোড়া বানিয়ে শেষ হয় না। সাইক্লপের গুহা থেকে বুদ্ধি প্রয়োগ করে বেরিয়ে আসা তার দুর্দান্ত উদাহরণ।

কথা তো ঠিকই। স্পেক্‌টাকল (spectacle) মানে জবরদস্ত দৃশ্য। কিন্তু বহুবচনে স্পেক্‌টাকলস (spectacles) মানে চশমা। একটা দিয়ে অন্যটা দেখতে হয়। মজার ব্যাপার, এই যে, কত কোটি বক্স অফিসে ‘কামালো’, কত বাজেটের সিনেমা, অভিনেতাদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন, একেকটা সেট ডিজাইন করতে কোথা-কোথা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে, এ-সবই তো সেই বিপণনের অংশ। ঝগড়া, কেচ্ছা, কুৎসাও সেখানে এই বৃহত্তর বাজারেরই অংশ। সিনেমার পর্দা তো শুধু ছবিই দেখায় না, যে-চশমা চোখে পরিচালক বা প্রযোজক ছবি দেখাতে চাইছেন, পর্দার ছবি সেই চশমাটাও দেখিয়ে দেয়। এক একটা বিশেষ যুগে আমাদের তাই বিশেষ বিশেষ ধরনের ছবি দেখার অভ্যাস তৈরি করিয়ে দেয় সেই সময়কার দৃষ্টির অভ্যাস। অনেক গবেষক একে বলেন ‘স্কোপিক রেজিম’ বা দৃষ্টির শাসনতন্ত্র।

কথাটা একটু খুলে বলা দরকার, কারণ এখানেই আমাদের যুক্তির শিরদাঁড়া। চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক ক্রিস্টিয়ান মেৎস প্রথম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেন; পরে ইতিহাসবিদ মার্টিন জে তাঁর একটি প্রবন্ধে দেখান, কোনও যুগেরই দেখার একটিমাত্র ‘স্বাভাবিক’ পদ্ধতি বলে কিছু হয় না। প্রতিটি সমাজ, প্রতিটি কাল ঠিক করে দেয়, কোনটা দেখা ‘দেখা’ বলে গণ্য হবে, কোনটা দেখার যোগ্য, দর্শক আর দৃশ্যের সম্পর্কটাই-বা কেমন। রেনেসাঁর পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভর দৃষ্টি এক রকম শাসন, বারোক-এর ঝলমলে বাহুল্য আর-এক রকম। প্রত্যেকেই চোখকে শিখিয়ে দেয়, কীভাবে কোথায় তাকাতে হবে, কোন দৃশ্যের ব্যাখ্যা কী হবে। নোলানের নন্দনতত্ত্বের নেপথ্যে আছে তেমনই এক দেখার অভ্যাস, ছবি দেখে বিশেষ ধরণের এক ভাবনার অভ্যাস।

নোলানের ছবি পোস্ট-সেকুলার যুগের মহাকাব্য। সমাজ ধর্মকে অতিক্রমণ করার চেষ্টা করেও শেষ অব্দি সফল হয়নি। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেপথ্যে সে ধর্মীয় নজরদারি আজও বর্তমান। ছবির শুরুতেই দেখি কালো স্ক্রিনে লেখা ফুটে ওঠে — ‘A TIME OF APPARENT MAGIC’। ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ পত্রিকার এ-মাসের সাক্ষাৎকারে নোলান জানিয়েছেন যে, সেই প্রাগৈতিহাসিক সময়ের মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি, যখন মানুষের কাছে সব বিষয়ের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা থাকত না। তখনকার মানুষ তাই বহুকিছুরই ব্যাখ্যা করতেন তাঁদের ধর্মীয় দৃষ্টি দিয়ে। এমন বিষয় নিয়ে সিনেমা বানানো তো সহজ কথা নয়। টেক্সট আর টেক্সটাইল সমগোত্রীয় শব্দ। পেনেলোপি যে টেক্সটাইল বুনে রোজ রাতে খুলে ফেলে, সেই নক্সিকাঁথার স্তরে স্তরে পাওয়া যাবে কত কাহিনির খোঁজ! সভ্যতার আদিম অন্ধকারে ট্রয়ের যুদ্ধযাত্রা শুরু হওয়ার আগে দেবতাদের তুষ্ট করার জন্য অ্যাগামেমনন জানতে পারে যে দেবতারা তার মেয়ের বলি চায়। মেয়ে ইফিগেনিয়াকে কিছু না জানিয়েই এনে দেবতাদের কাছে বলি দেওয়া হয়। তার প্রতিশোধে ক্লাইটেমনেস্ট্রা হত্যা করে তার স্বামী অ্যাগামেমননকে, আবার সেই হত্যার প্রতিশোধে অরিস্টিস ক্লাইটেমনেস্ট্রাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়। মাতৃহত্যার পাপ অরিস্টিসকে বহুদিন তাড়া করে ফেরে।

এস্কাইলাস, ইউরিপিডিস, সফোক্লিসের মতো গ্রিক নাট্যকারদের প্রায় সক্কলেই এই প্রতিশোধপরায়ণ পরিবার নিয়ে নাটক লিখেছেন। পাশ্চাত্যের নাটকের ইতিহাসে সেসব টেক্সটের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। নোলানকে তাই দেখতে পাই এক নাগাড়ে যেন সবকিছুই ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু কিছুতেই থিতু হতে পারছেন না। আগেই বলেছি, সমকালের চোখে দেখা মহাকাব্যিক আখ্যান। তাই সিনেমায় কোনো দেবতাকে দেখতে পাই না আমরা। একমাত্র এথেনাকেই দেখা যায় ওডিসিউসের সাথে সাথে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু শেষে গিয়ে দেখা যায় সেও তো দেবতা নয়! (কী তা বললে স্পয়লার হয়ে যাবে)। জাদুকর সার্সের পুরুষ জাতির প্রতি সপাট ঘেন্না — ‘ Men. With their appetites…’, এবং ইউরিলোকাসের এর মনুষ্যরূপ ফিরে পাওয়ার পর ওডিসিউসকে সেই প্রশ্ন, যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যুগ যুগ ধরে করে এসেছে — ‘ওকে বাঁচতে দেবে? she’s a witch!’ প্রত্যুত্তরে ওডিসিউসের উত্তর ‘Who gave her powers? Your Gods.’ মানুষ বনাম দেবতার এক্কাদোক্কা চলতে থাকে গোটা সিনেমা জুড়েই। Trauma, PTSD, লিঙ্গ বৈষম্যের অন্তরীণ সন্ত্রাস — এ সবই এক-এক করে মহাকাব্যের সময়োপযোগী পাঠকে নির্মাণ করে ঠিকই, কিন্তু পেনেলোপি যেন সে-ই ‘নাথবতী অনাথবৎ’ হয়েই রয়ে গেলেন, স্বকীয়তায় ভাস্বর একটি স্বতন্ত্র চরিত্র আর হলেন না। অথচ তার জন্য সব উপাদান মূল মহাকাব্যেই উপস্থিত ছিল, এমন নয় যে নতুন করে নির্মাণ করতে হত।

ভাল-মন্দের যে সাদাকালো ক্যানভাস নোলান তৈরি করেছেন, সেখানে চরিত্রদের কামনাবাসনার সূত্রগুলো ভালোভাবে খুঁড়ে দেখাই হল না। সেন্সর বোর্ডের কাঁচি বাঁচিয়ে সর্বাধিক দর্শকের কাছে পৌঁছনোর তাড়নায় বাজারের যূপকাষ্ঠে বলি প্রদত্ত হয়েছে মহাকাব্যের অনেক অনুসঙ্গই। যে দৃষ্টির শাসনতন্ত্রের কথা বলছিলাম, তা কিন্তু শুধু পর্দায় থেমে থাকে না। নোলানের মতো সিনেনির্মাতার জনপ্রিয়তা বোঝার জন্য তাঁর সিনেমার প্যারাটেক্সট বোঝা প্রয়োজন।

প্যারাটেক্সট বলতে সাধারণত বই শুরু করার আগে আমরা যে মলাট, শিরোনাম, ভূমিকা, হরফ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা যে মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করি, সেটাকেই বলা হয়। এই প্যারাটেক্সট আসলে আমাদের পড়ার ভঙ্গিটা বেঁধে দেয়। জোনাথন গ্রে তাঁর ‘Show Sold Separately’ বইয়ে আবার এই ধারণাকেই টেনে আনলেন সিনেমায়।

তাঁর কথায়, ট্রেলার, পোস্টার, মিম, রিল, এমনকী সাক্ষাৎকার, প্রতিটি প্যারাটেক্সট যেন এক-একটা এয়ারলক, যা টেক্সটের ভেতরে ঢোকার আগেই আমাদের একরকম পড়ার কৌশল ধরিয়ে দেয়।‘দ্য ওডিসি’-র বেলায় এর চেয়ে নিখুঁত উদাহরণ আর হয় না। মুক্তির আগের পোস্টারে তারকাদের মুখ নেই, ছবির নামটুকুও গৌণ, বোল্ড হরফে জ্বলজ্বল করছে শুধু দুটো শব্দ: ‘NOLAN’ আর ‘IMAX’। অন্য ব্লকবাস্টারের গায়ে সেঁটে দেওয়া ছ’মিনিটের প্রোলগ। আর ইনস্টাগ্রামে ঘুরপাক খাচ্ছে হয় আগামেমননের সেই বিতর্কিত শিরস্ত্রাণ, নয়তো আথেনার ছিন্ন মূর্তির মাথা। ছবিটা তৈরি হওয়ার, দেখা হওয়ার অনেক আগেই এইসব টুকরোগুলো ঠিক করে দিয়েছিল, ওডিসি দেখার প্রস্তুতি। সিনেমার চেয়ে বেশি একে দেখতে হবে ‘ইভেন্ট’ হিসেবে, দর্শনীয় বস্তু হিসেবে। ছবির মানে খানিকটা তৈরিই হয়ে গিয়েছিল পর্দার বাইরে।ক্রিষ্টোফার নোলান দৈনন্দিন জীবনে নিজে ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রায় ছুঁয়েও দেখেন না, হালফিলের স্মার্টফোন পর্যন্ত ব্যবহার করেন না, সেলুলয়েডের জন্য যাঁর নাছোড় টান, সেই তিনিই কীভাবে ইনস্টাগ্রাম-প্রজন্মের কাছে আইকন হয়ে উঠলেন তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। একদিকে জেন ডায়া আর টম হল্যান্ড এর টানে হলমুখী হবে নতুন প্রজন্ম, অন্যদিকে এলিয়ট পেজ, লুপিতা নিওং’ও প্রমুখের কাস্টিং নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। কালার-গ্রেডিং এর রিল, আইএমডিবি আর রটেন টম্যাটোজ এর রেটিং, এসবের মধ্যে দিয়েই সিনেমার প্যারা টেক্সটের নির্মাণ হতে থাকে। অ্যানালগ দুনিয়ার সিনে নির্মাতা অতর হয়ে ওঠেন ডিজিটাল বৈঠকখানায়। এই যে ডিজিটাল নেটিভ প্রজন্ম, তাঁর সিংহভাগই নব্বইয়ের দশকের শেষে জন্মানো। সোশ্যাল মিডিয়ায় সদা-সক্রিয় যে-দর্শকের কাছে নোলানের এই ছবি এপিক অ্যাডাপ্টেশন ‘মাস্টারপিস’, তাঁদের জন্য ফিরে দেখা যেতেই পারে সেলুলয়েডের অন্যান্য অতিকায় অতর-চালিত ছবিগুলো। আমাদের ভেবে দেখা উচিত, ওডিসি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ঠিক কতগুলো শটের কম্পোজিশন আমাদের মনে রয়ে যায়? এর ঠিক কতগুলো দৃশ্য আমাদের মনে এমনভাবে ছাপ ফেলে যেখানে শুধু ছবি আর ফ্রেমিং সেই দমবন্ধ করা অস্বস্তি, বা চরিত্রের সঙ্গে একাত্মবোধ তৈরি করে? ওডিসিতে এমন কতগুলো দৃশ্য আছে, যা দর্শককে স্পেকট্যাকল এর নেপথ্যের দর্শন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে? আক্ষেপ, খুব বেশি নয়। মহাকাব্যিক স্কেলের কথা উঠলেই আমাদের মনে পড়বে বেলা তারের ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’, সাড়ে সাত ঘণ্টার সাদা-কালো ছবি, যার গোটাটায় শট মেরেকেটে দেড়শো, যেখানে ক্যামেরা মিনিটের পর মিনিট চেয়ে থাকে বৃষ্টিভেজা কাদা-রাস্তার দিকে, থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ‘দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স’, যেখানে একটিমাত্র ট্র্যাকিং শটের ভেতরে বদলে যায় গ্রিসের গোটা একটা রাজনৈতিক দশক, কালাতোজভের ‘আই অ্যাম কিউবা’, কুব্রিকের ‘ব্যারি লিন্ডন’, বা যদি নোলানের নিজের উল্লেখ মতোই তারকভস্কির ‘আন্দ্রেই রুবলেভ’ বা কুরোসায়ার ‘র‍্যান’ কেই বা যদি ধরি, সেসবের তুলনায় নোলানের এ ছবি কি কালোত্তীর্ণ হবে? হয়তো হবে, হয়তো নয়।

নোলান যে-সময়ের চলচ্চিত্র নির্মাতা, সেই সি জি আই এবং এ আই সম্পৃক্ত সময়ের নিরিখে তাঁকে মনে রাখা হবে স্রোতের বিপরীতে হাঁটার জন্য। সাইট অ্যান্ড সাউন্ডের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন স্টপ মোশন অ্যানিমেশনের পথিকৃত রে হ্যারিহাউসেনের কথা। উপযুক্ত অর্থ না থাকায় হ্যারিহাউসেন কাজ করেছেন বি সার্কিটে। কিন্তু তাঁর কাজের প্রতি যত্ন, হাতে ধরে প্রতিটা খুঁটিনাটি নিয়ন্ত্রণ এসব নোলানকে অনুপ্রাণিত করেছে। নোলানের কাজ দেখলে তাঁকে তারকভস্কির ছাত্র যতটা না মনে হয় তার চেয়ে বেশি অ্যানালগ পদ্ধতিতে স্পেশাল এফেক্ট তৈরির চেষ্টায় তিনি হ্যারিহাউসেনের ছাত্র হিসেবে যেন স্বাক্ষর রাখেন বেশি।

হলিউড ধাঁচের এভারেজ শট লেন্থ, বিশাল স্পেক্টাকল, নায়কের অমিত শক্তির নেপথ্যে নৈতিকতার প্রশ্ন, ঘরে ফেরার অমোঘ টান, আমেরিকান ইংরেজিতে পরিবেশন, সিনেমায় দর্শনের সঙ্গে থ্রিলারধর্মিতার মিশেল — এই সবের মাধ্যমে তিনি যে নিজের অতর পরিচিতি তৈরি করেছেন, তার বাইরে ওডিসি এবং তাঁর নাম যদি ইতিহাসে থাকে, তবে তা হয়তো এই কারণে রয়ে যাবে, কারণ তিনি অ্যানালগ মিডিয়ামের ক্ষমতা এবং স্পর্ধাকে শুধু বিজ্ঞাপনী প্রচারে ব্যবহার করেই নয়, বরং ডিজিটালের সাথে লড়াইয়ে অ্যানালগের খেলার মাঠটাকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন; সাধারণ দর্শককে আবার হলমুখী করেছিলেন এমন একটা সময়ে, যখন সামগ্রিকভাবে সিনেমা নামের মাধ্যমটাই ছিল সংকটের মুখে।