কান ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সম্মানীয় চলচ্চিত্র উৎসব বলা হয় ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসব-কে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উৎসবের ইতিহাসের ব্যাপারে একটু পড়াশোনা করলেই জানা যায় যে, এই উৎসব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পিছনে ছিল এক রাজনৈতিক কারণ। কান-এর আগে আন্তর্জাতিক স্তরে একমাত্র চলচ্চিত্র উৎসব ছিল ইতালির ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বিশ্বের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র উৎসব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক দোরগোড়ায় যখন বেনিতো মুসোলিনি ইতালির ক্ষমতায়, তখন ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ছবির নির্বাচন থেকে শুরু করে পুরস্কার— সব কিছুর ওপরেই ছিল ফ্যাসিবাদী প্রভাব। এমনকী, ১৯৩৪ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত এক বিশেষ পুরস্কারও দেওয়া হত, যার নাম ছিল ‘মুসোলিনি কাপ’। এর মাঝামাঝি একটা সময়ে ১৯৩৭-’৩৮ সালে অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক দোরগোড়ায় ফরাসি কিংবদন্তি জঁ রেনোয়ার শান্তিবাদী ছবি La Grande Illusion-কে পুরস্কার না দিয়ে হিটলার-মুসোলিনি দুইয়ে মিলে বিচারকদের সিদ্ধান্ত না মেনেই তাদের হয়ে কথা বলা জার্মান ও ইতালীয় ‘প্রোপাগান্ডা’ ছবির হাতে পুরস্কার তুলে দেয়। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে বিচারকমণ্ডলীর একাংশ ফেস্টিভ্যাল বয়কট করে বেরিয়ে আসে। ঠিক তারপর ফরাসিদের উদ্যোগে জন্ম হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবের, যা জাঁকজমক করে অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে।

কাট টু ২০২৬। কান এখন শুধুই বিশ্বের সবথেকে বড় চলচ্চিত্র উৎসব নয়, বরং নামিদামী ব্র্যান্ড, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং আরও অনেকের লাল কার্পেটে হাঁটার একটা সুযোগও বটে। প্রত্যেক বছর ভারত থেকে কানে ছবি যাক বা না যাক, লাল কার্পেটে এরকম নানা কারণেই ভারতীয়রা বিদ্যমান। এরকম সময়ে দাঁড়িয়ে ঠিক কিছুদিন আগেই পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ কান চত্বরেই ফিল্ম সমালোচক সুচরিতা ত্যাগীর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই একটি মন্তব্য করেছেন, যা অপ্রিয় হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। সারসংক্ষেপে তিনি বলেছেন যে, ভারতীয়দের রেড কার্পেটে হাঁটা নিয়ে এক ধরনের গর্ববোধ আছে, কিন্তু যে কোনও চলচ্চিত্র উৎসবের মতোই কানেরও মূল উদ্দেশ্য বা সম্মানের জায়গা রেড কার্পেটের বাইরে, বড়পর্দায়।

আরও পড়ুন : কেন বাঘের আক্রমণ বাড়ছে অভয়ারণ্যে?
‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩০…

এই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন মানুষের হাতে-হাতে দামি স্মার্টফোন ও সীমাহীন ইন্টারনেট, তখন বিশ্বের একপ্রান্তের খবর এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যেতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে না। স্বাভাবিকভাবেই কান চলচ্চিত্র উৎসবের খবরও আমাদের কানে বা সর্বোপরি চোখে আসতে বিশেষ সময় নেয় না। খবর চোখে এলেও সাধারণত সেই উৎসবে প্রদর্শিত ছবিগুলি সেভাবে চোখে আসে না, চিরকালের মতো। অনেক বছর আগে অনুরাগ কাশ্যপ-ই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর ছবি নামিদামী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সাড়া ফেললেও নিজের দেশে হয়তো ঠিকমতো হলই পায় না। অনেককিছুর পাশাপাশি তার কারণটা অনেকটা রাজনৈতিকও বটে। এখন তাঁর ছবিগুলি ওটিটি-র মাধ্যমে ‘আইনিভাবে’ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লেও তাঁর থেকে কম পরিচিত কোন ছবিকরিয়ে-র ছবি হয়তো সিনেপ্রেমীদের মনে রয়ে গেছে কোনও ‘বেআইনি’ স্ট্রিমিং সাইটের জন্যই। কাশ্যপ এ-ও বলেছেন যে, ভারতের বড় প্রযোজকরা তাদের ছবির গায়ে ‘ফেস্টিভ্যাল’ ছবির তকমা-ও চায় না, কারণ এই ছবিগুলি মানুষের মনে দাগ কাটলেও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। এই কারণেই বেশিরভাগ প্রযোজকরা ফেস্টিভ্যালে ছবি পাঠাতে চায় না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এই সমস্ত ছবি পাঠানোর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছবি পাঠাতে পারেও না।

তবে মনে রাখার, ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে কানের সম্পর্ক আজকের নয়, বরং একদম গোড়া থেকেই। ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির শিরোপা (Grand Prix) পায় ম্যাক্সিম গোর্কি-র নাটক অবলম্বনে চেতন আনন্দের নীচা নগর, যা এখনকার পাম ডি’অর (Palme d’Or)-এর সমান। তারপরেও, এত বছরে ভারত থেকে কানের মঞ্চে প্রচুর ছবি প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। সত্যজিৎ রায়, বিমল রায়, মৃণাল সেন, মীরা নায়ার থেকে শুরু করে রীতেশ বাত্রা, নীরজ ঘেওয়ান, শৌনক সেন, পায়েল কাপাডিয়া-র মতো পরিচালকের ছবি কান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, আলোচিত হয়েছে, সম্মান এনে দিয়েছে। শেষ কিছু বছর ধরে কানের পর্দায় শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুরের প্রতিষ্ঠিত ‘ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ (FHF)-এর উদ্যোগে সংরক্ষিত ও পুনরুদ্ধৃত কিছু কালজয়ী ভারতীয় ছবির প্রদর্শন হয়েছে যার মাধ্যমে শ্যাম বেনেগালের মন্থন ও সত্যজিৎ রায়-র অরণ্যের দিনরাত্রি-র মতো ছবির পাশাপাশি গোবিন্দন অরবিন্দন-এর থাম্পু-র মতন নানান আঞ্চলিক ভাষার ছবি নিয়েও নতুন করে চর্চা হচ্ছে। এই বছরও FHF-এর উদ্যোগে নতুন করে 4K-রূপে ফিরে এসেছে মালায়ালি কিংবদন্তি পরিচালক জন আব্রাহাম-এর ১৯৮৬ সালের বিখ্যাত রাজনৈতিক ছবি আম্মা আরিয়ান। এর পাশাপাশি এই বছর পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট (FTII) থেকে মেহের মালহোত্রা নির্মিত পাঞ্জাবি ভাষার স্বল্পদৈর্ঘ্যেরশ্যাডোস অফ দ্য মুনলেস নাইটস ভারত থেকে একমাত্র প্রতিযোগী ছবি যা মনোনীত হয়েছে স্টুডেন্ট ফিল্ম ক্যাটেগরিতে। ১৯৪৬-এর নীচা নগর-এর পর ভারত থেকে সর্বোচ্চ সম্মানিত ছবি ছিল ২০২৪-এর ৭৭তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ (বর্তমানে Grand Prix) স্থানাধিকারী FTII-র পায়েল কাপাডিয়া-র অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট। এর আগেও পায়েল কাপাডিয়া-র ডকু-ফিকশন আ নাইট অফ নোইং নাথিং (২০২১)-এর পাশাপাশি FTII থেকে অস্মিতা গুহ নিয়োগী-র ক্যাটডগ (২০২০) ও চিদানন্দ এস. নায়েক-এর সানফ্লাওয়ারস ওয়ার দ্য ফার্স্ট ওয়ানস টু নো (২০২৪)-র মতো স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিও পুরষ্কৃত হয়েছে কানের মঞ্চে।

এভাবেই ভারতীয় সিনেমা বারংবার কানের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে, এনে দিয়েছে সম্মান। তবুও সেই ছবিগুলির ভারতে তেমন প্রচার তো দূরের কথা, বড় পর্দায় দেখার সুযোগও থাকে খুবই কম। যার কারণেই কাশ্যপের মতো পরিচালককে বারবার মুখ খুলতে হয় সেই পরিকাঠামো নিয়ে, যা হয়তো লাভের কদর করে, শিল্পের নয়। ভারতই সেই দেশ, যে সারা বিশ্বে সবথেকে বেশি সংখ্যক ছবি বানায়, অথচ ভারত থেকে কানের রেড কার্পেটে অনেক সময়ে যাদের হাঁটতে দেখা যায়, তাদের হয়তো সিনেমার সঙ্গে কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্কই নেই। তবুও তারাই সারা বিশ্বের সামনে দেশের প্রতিনিধি হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সিনেমার মুখ ঢেকে যায় একাধিক বিজ্ঞাপনে। তবুও শর্ট-ফর্ম কন্টেন্ট, ইন্টারনেট সংস্কৃতি ও বাহ্যিক জাঁকজমকের ভিড়েও মানুষ এখনও ধৈর্য ধরে বড় পর্দার জন্য ছবি বানায় এবং দেখে। সময়ের নিয়ম মেনেই সবকিছুর মতো কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেরও চেহারা বদলেছে, বদলেছে অনেক কিছুই। তবুও সিনেমা থেকে গেছে, কারণ স্বপ্ন থেকে গেছে।

কিন্তু, একটি প্রসঙ্গ অনুরাগ এই সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তুলে এনেছেন, যা আদতে কান উৎসব সম্পর্কে ভারতীয় সিনেপ্রেমীদের এক ব্যাপক ভ্রান্তিবিলাসকে নির্দেশ করে। অনুরাগ বলেছেন, কান চলচ্চিত্র উৎসবের মার্কেটপ্লেসের কথা। মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, ভূরি-ভূরি ভারতীয় ছবি জায়গা করে নিচ্ছে কান-এ, তার মধ্যে বাংলা থেকেও কিছু নাম থাকে। কিন্তু কান-এর মার্কেটপ্লেসের মজা, বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সহজেই যে কোনও, প্রায় যে কোনও ছবি জায়গা করে নিতে পারে এই বিশেষ বিভাগটিতে। তাই সেইসব ছবির কোনও সদর্থক ভূমিকাই থাকে না দিনের শেষে। হাতে রইল পেনসিলের মতো পড়ে থাকে আলিয়া ভাট কী পোশাক পরলেন, কতজন ফোটোগ্রাফার তাকে পাত্তা দিল— এই নিয়ে বাতুল আলোচনা।