কলকাতা, এলডোরাডো
কলকাতা এক রণক্ষেত্র। কলকাতা আর টিকবেই না হয়তো। কলকাতা ‘ডাইং সিটি’। এমন নানা টিপ্পনী মহানগর নিয়ে ছিল চিরকালই। মৃণাল সেন এই কলকাতাকে ভালবেসেছেন, ঘৃণা করেছেন, কলকাতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে, ক্রুদ্ধ করেছে একইসঙ্গে। নিজেই বলতেন, কোথাও থেকে যখনই কলকাতায় ফিরতেন, মনে হত, এই শহরটার মেয়াদ বুঝি ফুরল বলে। অথচ, জার্মান বন্ধু গুন্টার গ্রাস যাতে কলকাতা সম্পর্কে কোনও ভুল ধারণা নিয়ে ফিরে না যান, তার জন্য এই মৃণাল সেন-ই বারবার তৎপর হতেন। চাইতেন, তার এই বিদেশি বন্ধু ভালবাসুক এই শহরটাকে।
‘তৃতীয় ভুবন’-এ লিখছেন মৃণাল, গুন্টার গ্রাস প্রথম এই শহরে যখন এলেন, তখন অনেকের সঙ্গে সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাঁর সঙ্গেও। তখন ‘দ্য টিন ড্রাম’ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, বিশ্বসাহিত্যমহলে। তারপর এই গুন্টার গ্রাস-ই লিখলেন ‘দ্য ফ্লাউন্ডার’। সেখানে ভাসকো চরিত্রটির সংলাপে উঠে এল মৃণাল সেন ও গুন্টার গ্রাসের কথোপকথনের ছায়া। কিন্তু ভুলভাবে। মৃণাল যা বলেননি, তেমন একটি কথা বসানো হল ভাসকোর মুখে, বলা হল ভগবানের বর্জ্যপদার্থের খোঁয়াড় হল এই শহর, যে শহরকে ওই উপন্যাস পড়ে মৃণাল অন্তত চিনছেন, কলকাতা বলেই।
মাথায় রাখতে হবে, গুন্টার গ্রাস এসেছিলেন এমারজেন্সির সময়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে দগ্ধ শহরে। কোন কলকাতা তিনি দেখেছিলেন, তা আন্দাজ করা যায়। কিন্তু মৃণাল সেন সদর্পে বলছেন, ‘আমি একটি কথা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, এ-শহরটাকে আমি যেমন পবিত্র বলে মনে করি না, আবার এটাও মনে করি যে এ-শহরটা আমার এলডোরাডো।’ যদিও পরে এসে গুন্টার থাকলেন কলকাতা থেকে কিছু দূরে, আরও সময় নিয়ে লিখলেন ‘শো ইওর টাং’। কিন্তু বারুইপুর থেকে ট্রেনে করে কলকাতা আসার ‘নরকযন্ত্রণা’ গুন্টারকে হতাশ করবে, তার প্রভাব পড়বে তাঁর বইয়ে— এই ভয় মৃণাল কেন পাচ্ছেন? কারণ তিনি চাইছেন, এই শহরকে তিনি ঠিক যেভাবে চেনেন, যতটা ভালবেসে, আবার যতটা নির্মোহ ও নির্মম ব্যবচ্ছেদে— সেভাবেই এই শহরকে চেনেন গুন্টারও।

ভোট ও ভণ্ডামি!
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৭…
‘জীবনস্মৃতি আর্কাইভ’-এর আয়োজনে ১৪ মে, মৃণাল সেনের ১০৩তম জন্মদিনে, একটি অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হল। দেখানো হল মৃণাল সেনের ছবি ‘ক্যালকাটা, মাই এলডোরাডো’। ইন্দো-ইতালিয়ান উদ্যোগে হওয়া বারোটি ছোট ছবি নিয়ে ‘সিটি লাইফ’ নামের অ্যান্থোলজি ফিল্মটি হয়েছিল ১৯৯০ সালে। গায়ে কাঁটা দেয় এই ছবির পোস্টারে থাকা তালিকা দেখলে! ক্রিস্তফ কিসলভস্কি বানাচ্ছেন ওয়ারশ নিয়ে ছবি, বুদাপেস্ট নিয়ে ছবি করছেন বেলা তার, লুই গুয়েরিনের ছবি বার্সেলোনা নিয়ে, বুয়েনোস আইরেস নিয়ে ছবি করেছেন আলেহান্দ্রো আগ্রেস্তি। আর কলকাতা, যা তখন ক্যালকাটা, তা নিয়ে ছবি করছেন মৃণাল সেন। মার্লন ব্র্যান্ডোকে সত্যজিৎ রায় নিয়ে আসেন পার্ক স্ট্রিটের স্কাইরুমে, আবার আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে এই সত্যজিৎই যান স্ট্যানলি কুব্রিকের ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’-র শুটিং দেখতে। অন্যদিকে গুন্টার গ্রাস থেকে মার্কেজ— এই সমান্তরাল আন্তর্জাতিকতার শরিক হন মৃণাল সেন। শিলাদিত্য সেন ১৪ মে-র এই অনুষ্ঠানে এসে বলছিলেন, মৃণাল সেন এক পা বাড়িয়েই রাখতেন প্রবাসে। সেই প্রবাসের বোধটুকু নিয়েই তো কলকাতায় ফিরতেন মৃণাল, কিন্তু তিনি সদর্পে বলতে পারতেন, ‘আমার শহর আমারই। খারাপ, ভাল, উদাসীন যাই হোক না কেন, এ এমন এক শহর যাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে নিন্দুকেরা, যা আবার ভালবাসাও পেয়েছে প্রচুর। এটা ঠিক যে আমি এই শহরে জন্মাইনি কিন্তু মানুষ হয়েছি এখানেই। এই শহরের যে প্রান্তেই যাই, এই শহরের সঙ্গে অন্য কোনও শহরের তুলনা হয় না, বনিবনা তো হয়ই না। যে প্রান্তেই যাই না কেন, সে প্রান্তেই আমি নিজের সঙ্গে কথা বলি।’


গালিব যে শহরে থাকতে চেয়েছিলেন রাজা-উজিরের জীবন উপেক্ষা করে, সেই কলকাতা শহরেই গুলজার মাছ কিনতে যান একদিন। একদিকে গোলাগুলি চলছে, তাই দাঁত মাজতে-মাজতে এক সহনাগরিক দেখিয়ে দেন অন্য রাস্তা গুলজারকে। মাছের বাজারের রাস্তা। গুলজার হাসতে-হাসতে কাব্যিক দ্যোতনায় সেই গল্প শোনাচ্ছেন মৃণাল সেনকে, যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে রোজনামচার, সংঘর্ষের সঙ্গে রুজিরুটির, বারুদের সঙ্গে বাজারের সহবাসের আখ্যান। আর সেই শহরেই ছয়ের দশকের শেষে যখন একটু একটু করে অগ্নিসংযোগ হচ্ছে, তখন আসছেন লুই মাল। শহরের ভিড় নিয়ে ছবি করতে চেয়ে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধের মাঝে তাঁকে নিয়ে আসছেন মৃণাল সেন। সঙ্গে নিজের ছবির জন্য ফুটেজ সংগ্রহ করছেন তিনি। যা বোমার স্প্লিন্টারের মতো ছড়িয়ে ছাপ রেখে যাবে কখনও ‘কলকাতা ৭১’, কখনও বা ‘ইন্টারভিউ’, কখনও বা ‘কোরাস’, ‘পদাতিক’-এ। ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ বজায় রাখতে আসা পুলিশ অফিসার মৃণাল সেনকে চেনেন, তিনি চিনে ফেলছেন লুই মালকেও। সেই অফিসার রথীন ভট্টাচার্য তাঁর ভক্ত, যিনি কিছুক্ষণ পর হয়তো ছাত্র পেটাবেন— শুনে ঘাবড়ে যাচ্ছেন লুই মাল-ও। একই সঙ্গে অভিভূত হচ্ছেন, এই শহরের ‘দুরন্তপনা’ দেখে, ‘পাগলামি’ দেখে। শিলাদিত্য সেন সেই গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন আরও একবার। কুণাল সেন ভিডিও বার্তায় বলছিলেন, কীভাবে এই শহরকে চিনতে চেয়েছিলেন মৃণাল সেন, এই ছবি করতে-করতেই।
ছবির শুরুতেই ঘোষণা করা হয়, কলকাতার মতো ‘উইকেড’ শহর আর হয় না। মনে করাই যায়, ঔপনিবেশিক কলকাতার অপরাধজগৎ নিয়ে সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটির নাম ছিল ‘দ্য উইকেড সিটি: ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট ইন কলোনিয়াল ক্যালকাটা’। এই ছবির শুরুতে, উপনিবেশের প্রতিটি চিহ্নকে, আনন্দশংকরের সংগীতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যামেরা ধরতে থাকে লো অ্যাঙ্গেলে, ঘোড়ার মুখ থেকে লর্ড ক্লাইভ, ভয়ংকর হয়ে ওঠে সহজেই। ১৯৬৭ সালে উপনিবেশের এই স্মারকগুলোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। সেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, যা আজও সৌন্দর্যায়ন করে চলেছে কলকাতার। ভিক্টোরিয়ার চুড়োয় যখন সূর্যাস্ত হচ্ছে, তখন নেপথ্য ভাষ্যে শোনা যায়, সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যেখানে কখনও সূর্য অস্ত যেত না। কিন্তু এক স্বদেশি সংগ্রামীর কথাও বলা হয় এই অমোঘ প্রবচনের বিপ্রতীপে, রক্তও সেখানে কখনও শুকোয় না। এই কথা বলতে বলতে সূর্য অস্ত যায়, আলো জ্বলে ওঠার আগে কিছুক্ষণের জন্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ন্যাড়া হয়ে যায়, অন্ধকারাচ্ছন্ন সিল্যুয়েটে কেবলই একটি স্থাপত্যের কঙ্কাল তা, যার গায়ে নেই সূর্যরশ্মির শ্বেতশুভ্র ঔজ্জ্বল্য, নেই আলোমুখরিত ঝলমলানি।
চড়কের বাঁশের ওপরে যে ছেলেটি উঠে ঘুরতে থাকে, সে হুতোম প্যাঁচার মতোই দেখতে পায় শহরকে। সেখানে বাঘ নেই, কুকুরার বড়লোকের পোষ্য, আর নানা শ্রেণির, নানা গড়নের মানুষ সেখানে। সেই শহরেই স্ট্রাইক, সেই শহরেই কারখানায় তালা, মুহূর্তে বইমেলার সুললিত ভাষণ ও সাংস্কৃতিক ভিড়, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। রাস্তায় গণক্ষোভের বিস্ফার। নিউজপ্রিন্টের দাম বাড়ছে, ১৯৭৮-এর বন্যায় ভেসে যাওয়া শহর আবার উঠে আসছে জলের তলা থেকে। এই কলকাতা, ছবির শেষে চড়কের বাঁশে চড়া ছেলেটি বলে ওঠে, ‘কালকাতা কভি খতম নেহি হোতা।’
এই দৃশ্য থেকে সোজা চড়কে এসে পৌঁছয় ছবি। সেই চড়কের বাঁশের ওপরে যে ছেলেটি উঠে ঘুরতে থাকে, সে হুতোম প্যাঁচার মতোই দেখতে পায় শহরকে। সেখানে বাঘ নেই, কুকুরার বড়লোকের পোষ্য, আর নানা শ্রেণির, নানা গড়নের মানুষ সেখানে। সেই শহরেই স্ট্রাইক, সেই শহরেই কারখানায় তালা, মুহূর্তে বইমেলার সুললিত ভাষণ ও সাংস্কৃতিক ভিড়, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। রাস্তায় গণক্ষোভের বিস্ফার। নিউজপ্রিন্টের দাম বাড়ছে, ১৯৭৮-এর বন্যায় ভেসে যাওয়া শহর আবার উঠে আসছে জলের তলা থেকে। এই কলকাতা, ছবির শেষে চড়কের বাঁশে চড়া ছেলেটি বলে ওঠে, ‘কালকাতা কভি খতম নেহি হোতা।’ এই শহরেই বস্তি উচ্ছেদ, এই শহরেই দুর্গাপুজোর রংমশাল। এই শহরেই ফাঁকা রাজপথ, আবার এই শহরেই ‘চালচিত্র’-র দীপুর মতোই কোনও এক গলি থেকে বেরিয়ে আসেন অঞ্জন দত্ত, যিনি এই ছবির সহকারীও ছিলেন, ট্যাক্সি ধরার জন্য ভিড়ের মধ্যে তার ছুটে যাওয়া কেবলই একজন শহরবাসীর তাড়াহুড়োর প্রতিফলন নয়, বরং কোনও এক খোঁজ, কোনও এক সন্ধানের আলেখ্য।
কলকাতাকে এত সহজে খুঁজে পাওয়া যায়? ভিড়ভাট্টা, শিল্প-সংস্কৃতি, মিছিলমিটিং, উচ্ছেদ-উৎসবের এই শহর বৈপরীত্যে ঘেরা। এই শহর উনিশ শতকের বুলবুলি ওড়ানো বাবুয়ানির সাক্ষী, এই শহর সাক্ষী সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলনের, এই শহর সাক্ষী কবিতা, গল্প, সাহিত্যের। এলডোরাডো তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, এই শহরকে ভালবাসা এক পরিচালকের মানসে। এই ছবিও আদতে সেই খোঁজ। নস্টালজিয়ায় নয়, বর্তমানেই। চলতে থাকে এলডোরাডোর খোঁজ, যেভাবে খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর।




