পাথরের বয়স ৫০ লক্ষ
এক সিনিয়র সাংবাদিককে দেখেছিলাম, দেশ-বিদেশের হোটেল, সে ভাল-খারাপ যেমনই হোক না কেন, ছেড়ে বেরনোর সময়ে ঘরের মেঝেতে ঝুঁকে, হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করতে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কারণ। বলেছিলেন, ‘দু-চারদিন থাকলেও কেমন যেন মায়া পড়ে যায়। ভাবি, আর হয়তো কখনও আসা হবে না!’ হোটেলের ঘর নিয়ে এমন আবেগ আর কারও দেখিনি।
যাই হোক, লাস ভেগাস ছেড়ে আসার সময়ে, আমি একেবারে নিশ্চিত ছিলাম, আর কোনওদিন এখানে আসার কারণ ঘটবে না। এবার এসেছিলাম নিছক বেড়াতে। এই শহরে নিশ্চয়ই কোনও কাজে কেউ পাঠাবে না আমাকে। ভাগ্যে যদিও বিশ্বাসী নই, তবু সে-রকম কোনও দেবী বা দানবী থেকে থাকলে, আলক্ষ্যে হেসেছিলেন সেদিন। কারণ বছর পাঁচেকের মাথায় আবার যেতে হয়েছিল ভেগাসে, কাজে। বুঝলাম, পাপের ঘড়া প্রথমবারে পূর্ণ না হলে, সিন সিটি আবার ডাক পাঠায়। সে গল্প পরে বলছি। তার আগে প্রথমবারের সেরা অ্যাডভেঞ্চার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কথা না বললে বোঝা যাবে না, কেন আমি ভেবেছিলাম, অমন ভয়ংকর সুন্দরের কিনারায়, ‘সব চাওয়া সব পাওয়া’ ফেলে আসার পর আর ফেরার প্রয়োজন থাকে না।
ভেগাস থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দূরত্ব কম নয়, গাড়িতে ঘণ্টা পাঁচেক লাগে একটানা গেলে। কিন্তু গাড়িতে যান বা ট্যুরিস্ট বাসে, রাস্তায় হুভার ড্যাম না দেখে, কেউ যায় না। সেখানে কম করে ঘণ্টাখানেক লাগবেই। সকাল ন’টা নাগাদ যখন হুভার পৌছলাম, তখনই রোদের তেজে চাঁদি ফেটে যাওয়ার যোগাড়। আসলে মরুভূমি এলাকা বলে সকাল হতে-না-হতে এত গরম। এই গরমে কলকাতার লোক অভ্যস্ত নয়, যেন শরীরের সবটুকু তরল শুষে নেয়! টুপি, সানগ্লাস ভরসা করে হাঁটা লাগালাম। নদীর নাম কলোরাডো শুনেই তো আমার গায়ে কাঁটা দিল। সেই স্কুলে পড়তে গ্লোব সিনেমা হলে দেখেছিলাম, ‘ম্যাকেনাস গোল্ড’— গ্রেগরি পেক না ওমর শরিফ, কার প্রেমে পড়া উচিত ভেবে রাতের ঘুম উড়ে গেছিল। সিনেমায় আবার ওমর শরিফের নাম ছিল কলোরাডো। সোনার লোভে মরুভূমিতে সেই চেজিং সিন আজও ভুলিনি। কলোরাডো নদীর কথা সেই প্রথম শুনেছিলাম।
বিদেশের এই শহরে কেন ঘড়ি দেখা বারণ জানেন?
পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৪৮…
হুভার ড্যাম কলোরাডো নদীর ওপর। গত শতকের তিনের দশকে এই টেকনোলজি তাক লাগিয়ে দিয়েছিল পৃথিবীকে। একশো বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, আজও লক্ষ-লক্ষ ট্যুরিস্ট আসে এই ড্যাম দেখতে। একটা লম্বা ব্রিজ আছে, যেটা হেঁটে পেরোতে হয়। ঠা-ঠা রোদে, অনেকেই হয়তো সে চেষ্টা করেন না। কিন্তু পায়ের নীচে নদী তো বটেই, চারপাশে ব্ল্যাাক ক্যানিয়নের যে অসাধারণ রুক্ষ রূপ এই সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যায়, সেটা বলে বোঝানোর নয়। আরও একটা দেখার মতো জিনিস আছে কাছেই, তবে একযাত্রায় হবে না কারণ গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৌঁছনোর তাড়া। দুপুর যখন বিকেলের চৌকাঠে পা রাখে, তখনই রূপ খোলে ওই পাথুরে রূপকথার। হুভার ড্যামের জলাধার লেক মিড এতই বিশাল যে, ঢেউহীন সাগর বলে ভুল হতে পারে। আমেরিকার সবচেয়ে বড় জলাধার তো বটেই, পৃথিবীতে এত বড় কৃত্রিম জলাধার খুব কম আছে। সেবার লেক মিড না দেখার হাল্কা দুঃখ (হাল্কা কারণ সেই মুহূর্তে পাখির চোখ গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন) মিটেছিল দ্বিতীয়বারের ভেগাস সফরে। শুকনো মরু এলাকায় একটা লেক ১৮০ কিলোমিটার লম্বা আর ৫০০ ফিটেরও বেশি গভীর, তার জল আর ওপরের আকাশ একই রকম ঘন নীল, দৃশাটা কল্পনা করুন।
যথাসম্ভব তাড়াহুড়ো করে বাসে ফেরত আসার পরেও, কম গঞ্জনা শুনতে হল না। যারা যায়নি, তারা গজগজ করতে লাগল, ‘কত দেরি হয়ে যাবে ক্যানিয়ন পৌঁছতে। এদের দেখা আর শেষ হয় না!’ আমরা, অত্যুৎসাহীরা, বর্শার ফলার মতো রোদ উপেক্ষা করে, অত হাঁটাহাটি করে গনগনে লাল মুখ নিয়ে ফিরলাম, তারা অবশ্য এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বার করে দিলাম। বাসে যে আমেরিকান ট্যুরিস্টরা ছিল, তারা কিন্তু যাকে বলে সুপারকুল, কে কোথায় কেন দেরি করল তা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। যত বিরক্তি এশীয়দের, বাঙালির তো কথাই নেই। বাসের এসিতে বসে একটু দম নিয়ে জল খেয়েছি সবে, বাইরে তাকিয়ে দেখি ঘোর মরুভূমি। নেভাদা থেকে অ্যারিজোনায় ঢুকে পড়েছি আমরা। এ শুধু এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ঢোকা নয়, গোটা প্রকৃতিটাই পাল্টে যাওয়া।

আরিজোনার একটা দিক এই মোজাভে মরুভূমি। কমলা-হলুদ বালি কেটে চলে গেছে মসৃণ হাইওয়ে, পথের ধারে কোথাও পাথুরে টিলা। বাইরে তাকালে চোখ ঝলসে যায়। মানুষ তো দূর, কোনও প্রাণীর দেখা পাওয়া যাবে না। সারা বছর ট্যুরিস্টদের যাতায়াত কম নেই এই রুটে, কিন্তু না আছে গ্যাস স্টেশন, না আছে দোকানপাট। ভাগ্যিস সঙ্গে কেক-বিস্কুট-জল ছিল। কিন্তু প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য তো থামতেই হয় দু-একবার। রাতের বাসে নাহয় ওয়াশরুম থাকে, এই বাসে তো নেই। ভাবতে-ভাবতে, হঠাৎ বাস থামল, ধূ ধূ মরুভূমির মাঝখানে মরুদ্যানের মতো জেগে আছে একখান ম্যাকডোনাল্ডস। তার বিশাল হলুদ এম দেখা যায় দূর থেকে। এবার আর বাসে বসে থাকার লোক নেই, সব্বাই প্রায় ছুটে নামল। প্রধান আকর্ষণ অবশ্য ম্যাকডি নয়, তার পাশের পাবলিক টয়লেট। আমাদের দীঘার বাসের চা ব্রেকের মতো, এখানেও ম্যাকডির সামনে পার্ক করা গোটা চারেক বাস। ফলে লোকসংখ্যা কম নয়। সুলভ শৌচালয়ের সামনে লম্বা লাইন। ভাগ্যিস, একটা কমপ্লেক্সে অনেকগুলো টয়লেট, তাই বাঁচোয়া। তবে কেউ যদি ভাবেন সাহেবদের দেশ বলেই ঝকঝকে তকতকে, ভুল করবেন। বেশ নোংরা, হয়তো এই মরুভূমির মাঝখানে যথেষ্ট সাফাইকর্মী পাওয়া যায় না বলে। এই ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিলাম। তবে, আমেরিকার শহরের পাবলিক টয়লেটের মতো এখানে অন্য ভয় নেই, কারণ বেশিটাই ফ্যামিলি ক্রাউড। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় টয়লেটে ঢুকতে সাবধান, বিশেষ করে রাতে। ছিনতাইবাজ থেকে পাঙ্ক, ড্রাগখোর থেকে ক্রসড্রেসার, যে কারও খপ্পরে পড়ে যেতে পারেন। মরুর ম্যাকডিতে ঢুকে আমার বড় মায়া হল, সেলস্-বয় আর গার্লদের জন্য। আহা রে, এই ফুটফুটে ছেলেমেয়েগুলো দুটো পয়সার জন্য এই নির্বান্ধব জায়গায় পড়ে থাকে সারাটা দিন!
যথাসম্ভব তাড়াহুড়ো করে বাসে ফেরত আসার পরেও, কম গঞ্জনা শুনতে হল না। যারা যায়নি, তারা গজগজ করতে লাগল, ‘কত দেরি হয়ে যাবে ক্যানিয়ন পৌঁছতে। এদের দেখা আর শেষ হয় না!’ আমরা, অত্যুৎসাহীরা, বর্শার ফলার মতো রোদ উপেক্ষা করে, অত হাঁটাহাটি করে গনগনে লাল মুখ নিয়ে ফিরলাম, তারা অবশ্য এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বার করে দিলাম। বাসে যে আমেরিকান ট্যুরিস্টরা ছিল, তারা কিন্তু যাকে বলে সুপারকুল, কে কোথায় কেন দেরি করল তা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। যত বিরক্তি এশীয়দের, বাঙালির তো কথাই নেই।
একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল বাসযাত্রায়। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ প্রথমে একজন, তারপর সমস্বরে ওয়াও চিৎকারে ধড়মড়িয়ে উঠলাম। প্রথম চেঁচিয়েছিলেন ড্রাইভার। কী না, বৃষ্টি নেমেছে। আরিজোনা মরুভূমিতে নাকি বিরল ঘটনা। এই তো দু’মিনিট পিছনে ফেলে এসেছি রোদ ঝলমলে নীল আকাশ। এখন দেখি স্লেটরঙা মেঘ ঘনিয়েছে মরুর বুকে, বড়-বড় ফোঁটা আকাশ থেকে নামছে, বাসের উইন্ডস্ক্রিনে তার যত দাপাদাপি, পিচের রাস্তা পর্যন্ত, দু’পাশের বালি পর্যন্ত কি আদৌ পৌঁছচ্ছে? না কি, ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাচ্ছে তার আগেই? ড্রাইভার কিন্তু ভীষণ উত্তেজিত। মরুভূমিতে এই একঝলক বৃষ্টি নাকি গুড লাক। কার কে জানে! বাসভর্তি লোকের গণসৌভাগ্য? তবে বৃষ্টিটা সত্যিই একপশলা, ‘এসেই বলে যাই-যাই-যাই।’ যেন ম্যাজিকের মতো মুহূর্তে ভ্যানিশ মেঘের দল। আবার ঝাঁপিয়ে এল রোদ।

পিঙ্ক জিপে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভ্রমণ। পৌঁছে আপগ্রেড করলাম। কারণ বাস একটা পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে পারে। তারপর দিশাহীন হেঁটে লাভ নেই, ওই দিগন্তবিস্তৃত পাথরের সমুদ্রে। জিপ যাবে একেবারে খাদের কিনারা পর্যন্ত, উপরি পাওনা, চালকই ফ্রি গাইড। আমরা উঠলাম এলিজাবেথের জিপে। কোনও মহিলা সম্পর্কে ‘সুঠাম’ শব্দটা ব্যবহার করা যায় কি না জানি না, আমার কিন্তু বছর পঁয়তাল্লিশের এলিজাবেথকে দেখে এটাই মনে হল, যাকে বলে পেটানো চেহারা। ক্যানিয়নের ওই রুক্ষ এবড়ো-খেবড়ো জমিতে জিপ সামলানো কি সোজা কথা! মিষ্টি হাসি লেগে আছে ঠোঁটে, বলল, ছেলে পড়ে লস এঞ্জেলসের কলেজে, তার খরচ যোগাতে উদয়াস্ত গাড়ি চালায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কে।
জিপ আমাদের নিয়ে গেল একদম সাউথ রিমে। কী গভীর, কী বিশাল, কী মহিমাময় সেই গিরিখাত! আর রঙের কী খেলা পাথরের গায়ে! একদম নীচে, সরু ফিতের মতো কলোরাডো নদী। সেখানেও নামা যায়, ভেগাস থেকে সোজা হেলিকপ্টার আসে। চেনা একজনের মুখে সেই অভিজ্ঞতা শুনেছিলাম। কলোরাডোর তীরে কপ্টার নামার পর চেয়ার পেতে বসে, রেড ওয়াইনে চুমুক দেওয়ার মেজাজটাই আলাদা। কিন্তু সে-জন্য যে কড়ি, থুড়ি, ডলার গুনতে হয়, সেটা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তাই এই জিপই সই। সত্যি বলতে কী, কোনও আফশোস নেই। কপ্টারে এলে তো অ্যারিজোনা মরুভূমি কাছ থেকে দেখা হত না। আর প্রথমবার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখার, ছোঁয়ার, তার ওপরে পা রেখে হাঁটার, দু’দণ্ড বসার বিস্ময় এত প্রবল যে, সেই ঘোর কাটতেই একজীবন লেগে যায়। ভাবতে পারেন, ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন বছরের পুরনো এই নদী, এই পাথর। আমার আবার নুড়ি কুড়নো আর জমানো স্বভাব। সে উত্তরবঙ্গের মূর্তি নদী হোক, কি আমেরিকার ক্যানিয়ন, পাথর আমি কুড়বোই। ৫০ লক্ষ বছরের প্রাচীন পাথর নিয়ে এসেছি কলকাতায়, রাখা আছে ছোট্ট কাচের কৌটোয়।
সময় যত এগচ্ছে, রোদ যত রঙ বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টে যাচ্ছে দূর-দূর পর্যন্ত পাথরের রঙ। লাল থেকে কমলা, সুরকি থেকে মরচে, খয়েরি থেকে বেগুনি, হোলি খেলছে পাথর। কলোরাডো নদী আর তার অজস্র শাখানদী যেভাবে পাথরের স্তর কেটে এগিয়েছে, সে-ভাবে উচ্চতায় বেড়েছে এই মালভূমি। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আড়েবহরে বেড়েছে গিরিখাত। হাজার-হাজার বছর ধরে এখানকার গুহায় থাকত রেড ইন্ডিয়ানরা। আদিবাসীরা গ্রান্ড ক্যানিয়নকে পবিত্র তীর্থ বলে মানত। ১৫৪০ সালে এক স্প্যানিশ ভূপর্যটক প্রথম বাইরের মানুষ হিসেবে পা রাখেন এখানে। তারপর তো দিনে-দিনে প্রকৃতির এই আজব সৃষ্টি দেখতে, সারা পৃথিবীর লোক এসেছে। হোটেল থেকে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস, মিউজিয়াম থেকে স্কাইওয়াক, কী না তৈরি হয়েছে।
সন্ধে পর্যন্ত তো বসে থাকতেই হবে রঙের রায়ট দেখার জন্য। কেমন করে আঁধার ঘনায় এই রহস্যলোকে, তাও কি দেখব না? বসে ছিলাম পাথরে হেলান দিয়ে। ওঠার সময়ে, পাটা একটু হড়কে গিয়ে পিঠটা ঘষে গেল পাথরের গায়ে। সামলে নিলাম। কোমরের কাছে হাত দিয়ে ভেজা লাগল। বুঝলাম, হাল্কা ছড়ে গেছে। ভালই হয়েছে, ‘আঘাত সে যে পরশ তব, সেই তো পুরস্কার।’ হাঁটতে গিয়ে থমকে গেলাম, নীচু হয়ে ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকালাম। কেমন মনে হল, আর কখনও আসা হবে না। হবেই না।




