তাঁর কাছে কিশোর কুমারের প্রথম পরিচয় ‘বাপি’। তবে ঘরোয়া-অন্তরঙ্গ মানুষটিই যে খ্যাতনামা এক শিল্পী, সে-কথা বুঝেছেন অনেক পরে। বড় হয়ে। তখন কিশোর পরলোকে। একদিকে অজস্র স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন করে কিশোরের গায়কসত্তার আবিষ্কার— পরবর্তী সময়ে কিশোর কুমারকে এভাবেই নিজের ভেতরে লালন করে চলেছেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী শ্রমণা চক্রবর্তী (গুহঠাকুরতা)। কিশোর কুমারের জন্মশতবর্ষ থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে, তাঁর জন্মদিনে, জানালেন ব্যক্তিগত নানান কথা। ডাকবাংলা.কম পত্রিকার পক্ষ থেকে কথা বললেন জয়দীপ রাউত।
কিশোর কুমার। এই নামটা কীভাবে আপনার কাছে প্রথম পৌঁছেছিল? সেটা কি পারিবারিক সূত্র থেকে, মানে আপনার মা রুমা গুহঠাকুরতার মাধ্যমে? না কি মাইক, রেকর্ড, রেডিয়ো ইত্যাদির মারফত আপনি একদিন কিশোর কুমারকে শুনলেন?
কিশোর কুমারকে আমি ছোট থেকেই বাপি বলে জানতাম। আমার দাদাভাই, মানে অমিত কুমার আমাদের বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতেই বড় হয়েছেন এবং আঠারো বছর বয়স অবধি সেখানেই থেকেছেন। তারপরে বম্বেতে শিফট করে যান। কিন্তু তারপরেও যতবারই কলকাতায় আসতেন, আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। ওঁরা এবং ওঁদের পরিবারের সবাই অত্যন্ত ভাল এবং আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। মা-ও তো বয়সকালে আবার দাদাভাইয়ের কাছে ‘গৌরীকুঞ্জ’-তেই ফিরে গেছিলেন। সেটা বাপি, মানে কিশোর কুমারের মৃত্যুর অনেক পরের কথা অবশ্য।
তাহলে, আপনার দাদাভাই অমিত কুমার বাপি বলে ডাকতেন তাঁর বাবাকে, সেখান থেকেই আপনি এই ডাকে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন?
আমার ঠিক মনেও নেই। তবে এটা ঠিক, আমি ছোটবেলা থেকে ‘বাপি’ বলেই কিশোর কুমারকে চিনে এসেছি। আমরা বম্বে গেলে ওঁর কাছে থাকতাম। মা-বাবা হয়তো হোটেলে থাকতেন। আমি দাদাভাইয়ের কাছে, কিশোর কুমারের কাছে…
আরও পড়ুন: ‘শোলে’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল কিশোর কুমারের গান? লিখছেন জয়দীপ রাউত…
সেইসব স্মৃতি কতটা মনে পড়ে?
অনেক কিছুই মনে পড়ে। কারণ সেইসব দিন ছিল ভীষণ আনন্দের। শুধু যে আমি যেতাম তা-ই নয়, বাপি বিদেশে গেলে প্রত্যেকবার আমার জন্য নানারকম খেলনা নিয়ে আসতেন। সেইসব খেলনা দাদা ভাইয়ের হাত দিয়ে আমাদের কলকাতার বাড়িতে আমার কাছে পাঠাতেন। একবার আমার কঠিন একটা অসুখ হয়েছিল, ব্রেন টিউমার। সেটা অপারেট করতে হয়। এটা অনেক বছর আগের কথা। তখন আমাদের দেশে ব্রেন সার্জারি তেমন উন্নত ছিল না। এখন অবশ্য খুবই ভালো! তো যাই হোক, আমাকে বিদেশে নিয়ে যেতে হয়। আমার মনে আছে, বাপি কী ভীষণভাবে মরাল সাপোর্ট দিয়েছিলেন মা-বাবাকে।
সেই দিনটার কথা বলি। আমাদের ফ্লাইট ছিল কলকাতা টু বম্বে, বম্বে টু হিথরো। বম্বে যখন পৌঁছলাম, মা-বাবারা হোটেল উঠলেন। আমার কাকাও গিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে, কিন্তু বাপি চাইলেন যে আমি সারাদিনটা বাপির কাছে থাকি। তো আমি বাপির কাছেই ছিলাম। বাপি এবং লীনাজির স্নেহ তো কখনও ভুলবার নয়! তারপরে রাত্রিবেলা একটা খুব ভাল চাইনিজ রেস্টুরেন্ট খেতে গেলাম। যদিও সেই রেস্টুরেন্টের নাম আর আজ মনে নেই। তারপর দাদাভাই আমাদের এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে এলেন। বাপির বাড়ি থেকে আমি যখন এয়ারপোর্টের দিকে যাব, তখন বাপি আমাকে জাপটে জড়িয়ে ধরে থাকলেন কিছুক্ষণ। খুব আদর করলেন। বাপি এবং লীনাজির ওই ভালবাসা আমি আজীবন বহন করব…

আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি। কখনও আপনার সামনে, নিজের ঘরে, নিজের মনে কিশোর কুমার গুনগুন করে গাইছেন, এরকম কি কখনও হয়েছে?
হ্যাঁ, সে তো অনেকবার! তাছাড়া উনি আমার জন্য একটা গানও করেছিলেন। একটা সিনেমা করবেন ভেবেছিলেন ‘দিনু কা দীনানাথ’ এই নামে। ভাই-বোনের গল্প। দাদাভাই আর আমার সেখানে অভিনয় করার কথা হয়েছিল। সেই গান আমাকে উনি তখনকার টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তবে শেষপর্যন্ত তো সিনেমাটাই হয়ে উঠল না!
কিশোর কুমারকে আপনি যখন পাচ্ছেন, তখন আপনি শিশু। একজন শিশুর সঙ্গে কিশোর কুমারের মেলামেশার ধরনটা আমার জানতে ইচ্ছে করছে।
একদম আতুপুতু করে কথা বলতেন না কখনওই। কিন্তু হ্যাঁ, আদরে বাঁদর করা, আবদার মেটানো এসব ছিল। তারপর মনে আছে, আমাকে প্রথম চার্লি চ্যাপলিন, মার্কস ব্রাদার্স কিংবা নানান ভিভো ফিল্মের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়েছিলেন বাপিই। এইসব সিনেমা তিনি আমাকে দেখাতেন।
কিশোর কুমারের হরর ফিল্মের একটা বিরাট ব্যক্তিগত কালেকশন ছিল। সেইসব ভূতের ছবি দেখাতেন না আপনাকে কখনও?
হ্যাঁ, বাপির হরর ফিল্মের বিরাট কালেকশন ছিল। হরর ফিল্ম ভীষণ ভালবাসতেন উনি। তবে আমি ভালবাসতাম না বলে আমাকে দেখাতেন না কখনও। আমাকে মজার ছবি দেখাতেন। ভয়ের বা দু:খের ছবি কখনও নয়।
‘দুঃখ’ শব্দটা থেকে একটা কথা জানবার ইচ্ছে হল। কিশোর কুমারের দাদা, অশোক কুমারের স্ত্রী যেদিন মারা যান, সেইদিন আপনি সেখানে ছিলেন…
হ্যাঁ, মুম্বইতে। আসলে জেঠিমা, মানে অশোক কুমারের স্ত্রীকে আমিও অসম্ভব ভালবাসতাম। জেঠিমা দারুণ রান্না করতেন। দাদাভাইয়ের জন্মদিনের দিন সব সময়ে পায়েস রান্না করে নিয়ে আসতেন। আমার মায়ের পক্ষে হয়তো সব বার সম্ভব হত না। অশোক কুমারের স্ত্রী যখন বিয়ের পর বাপিদের বাড়িতে আসেন, আমার বাপি তখন ছোট। তিনি বাপির কাছে মায়ের মতো ছিলেন।

অশোক কুমার কিশোর কুমারের থেকে কুড়ি বছরের বড়।
সেই কারণেই জেঠিমা বাপির কাছে ছিলেন ‘অ্যানাদার মাদার’। আমার একদম পরিষ্কার মনে আছে সেদিনের কথা। দাহ শেষ হতে সবাই ফিরে আসেন। জেঠুমণি, মানে অশোক কুমার বাপিকে ‘ইয়ে জীবন হ্যায় ইস জীবন কা ইহি হ্যায় রং রূপ’, এই গানটা গাইতে বলেন। বাড়িতে হারমোনিয়াম, পিয়ানো, এসব ছিল। থাকা সত্ত্বেও, বাপি খালি গলায় এই গানটি গাইলেন এবং শেষে গাইতে-গাইতে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেললেন।
কিশোর কুমার হারমোনিয়াম-পিয়ানো ইত্যাদি বাজাচ্ছেন, এরকম ছবি পাওয়া যায়। তবে কেউ-কেউ বলেন যে, উনি নাকি এসব বাজাতে পারতেন না।
সে কী! পারবেন না কেন? পরিষ্কার বাজাতে পারতেন। যখন কিশোর কুমার সুর করতেন, অধিকাংশ সময় দেখেছি হারমনিয়াম নিয়ে সুর করতে বসেছেন।
এই সুর করার প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করি, কিশোর কুমার যে-ক’টি গানে সুর করেছেন, সেই সংখ্যাটা কম নয়! দেখা যায় যে, সেই গানগুলোর বেশির ভাগই মূলত রাগ-রাগিণী নির্ভর। ‘আমার দীপ নেভানো রাত’, ‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে’, ‘বেকারার দিল আরে তু গায়ে যা’ ইত্যাদি অনেক গানের কথা বলা যায়। আমার প্রশ্ন হল, একজন সেই অর্থে গান না শিখে এই সুরগুলো করলেন কীভাবে!
বাপি ছোট থেকে ভারতীয় রাগসংগীত শুনে বড় হয়েছিলেন। বড়-বড় ওস্তাদদের গান নিয়ম করে শুনেছেন। এবং তিনি ছিলেন প্রচণ্ড মাত্রায় অনুপ্রাণিত… মানে, ভারতীয় রাগসংগীত তাঁকে চিরকাল প্রেরণা জুগিয়েছে। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে প্রচুর বিদেশি গানও শুনতেন। এই সমস্ত সুর তাঁর ভিতরে গেঁথে গিয়েছিল।

ধরুন, একজন কবি একটি কবিতা লিখল, একজন সাধারণ মানুষ পড়লেন, এবং একজন কবি পড়লেন সেই কবিতা, এই দুজন পাঠকের মধ্যে ফারাক আছে। তেমনই আমার বা একজন সাধারণ শ্রোতা আর আপনার গান শোনার মধ্যেও ফারাক থাকবে। কারণ আপনি নিজে গান শিখেছেন, গান জানেন, আপনার কাছে গায়ক কিশোর কুমারের মূল্যায়নটা কীরকম?
কিশোর কুমারের মূল্যায়ন করার আমি কে! কিশোর কুমার এইসব মূল্যায়নের অনেক ওপরে। আমার মনে হয়, কিশোর কুমারের মূল্যায়ন করা কারওর পক্ষে সম্ভব না, কারণ ওরকম ট্যালেন্ট শুধু আমাদের দেশ বলে না, সারা পৃথিবীতেই বিরল। কিশোর কুমারের মতো গায়ক-সুরকার, আমি অন্তত আমার জীবনে দেখিনি। আধুনিক সংগীতে তো বটেই!
গান নিয়ে আপনাকে কখনও পরামর্শ দিতেন?
না, ঠিক ওরকম পরামর্শ নয়। তবে বলতেন, গলা ছেড়ে গান গাইতে। এটা আমাকে সব সময়ে বলতেন। এবং এটা আমি এখনও মেনে চলি।
আপনি নিজে যেহেতু রবীন্দ্রসংগীত শিখেছেন, গেয়েছেন, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতেও গেয়েছেন, সেই জায়গা থেকে একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে বা বলা যায় আমার একটা পর্যবেক্ষণ আপনার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইছি। সেটা হল, কিশোর কুমারকে আমরা তিনটি আলাদা ক্ষেত্রে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে শুনেছি। একটা হল, তিনি সিনেমার জন্য রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন। দুই, বেসিক অ্যালবামের জন্য গেয়েছেন। তিন, ফাংশনে গেয়েছেন। ফাংশন-প্রসঙ্গ যদি বাদ দিই, তাহলে সিনেমার রবীন্দ্রসংগীত এবং নিজের অ্যালবামের জন্য গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে আমরা দুই ভিন্ন কিশোর কুমারকে পাই। আমার ব্যক্তিগতভাবে, সিনেমার জন্য গাওয়া কিশোর কুমারের রবীন্দ্রসংগীত বেশি প্রিয়। ‘সঘন গহন রাত্রি’ এই গানটিকে আমি আলাদাভাবে আমার পছন্দের তালিকায় রাখছি…
এটার কারণ হল, কিশোর কুমার যখন সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন, তখন তিনি অনেক স্বাধীনতা পাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে গাইছেন এবং বাকি সবই হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনায়। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বাপি যখন কাজ করছেন, তখন তিনি অনেক স্বাধীন। কেননা সেই সময়ে বিশ্বভারতীর অনুমোদন ইত্যাদি অনেক ব্যাপার ছিল, যেগুলো বাপিকে সামলাতে হচ্ছে না। সত্যজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো সাহস বিশ্বভারতীর কোনওদিন ছিল না। কিন্তু যখন বাপি নিজের জন্য রেকর্ড করেছেন, তখন অনেক বাধার মধ্যে পড়তে হয়েছে। মানে স্বরলিপির এখান থেকে ওখানে সামান্য যাওয়া যাবে না, ইত্যাদি-ইত্যাদি। যখনই গান একটা বাধার মধ্যে পড়ে যায়, তখন তার একটা ছাপ পড়ে। গাইবার আনন্দের যে-স্বাধীনতা, সেখানে প্রভাব পড়ে।

সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গ যখন এল, আপনার পরিবারের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক সম্পর্ক। আমরা জানি যে কিশোর কুমারের সঙ্গেও সত্যজিতের দারুণ একটা মধুর সম্পর্ক ছিল। আপনি কখনও এই দুজনকে একসঙ্গে দেখেছেন?
হ্যাঁ, কিন্তু সেটা বাড়িতে নয়। হসপিটালে।
১৯৮০-তে কিশোর কুমারের প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয় কলকাতায়…
হ্যাঁ, ওই সময়ে বাপির কাছে, বাপিকে দেখতে রোজ যেতেন সত্যজিৎ রায়। নিয়মিত। আমিও যেতাম, ফলে তখন দুজনকে একসঙ্গে দেখেছি।
কিশোর কুমারের মতো প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন মানুষ হাসপাতালে শুয়ে আছেন। সেই দিনগুলোর কথা বলুন-না একটু…
বাপি তিন মাস ছিলেন হাসপাতালে। আমি যেতাম। যখন আইসিইউতে ছিলেন, তখন নয়, কিন্তু যখন ওঁকে প্রাইভেট রুমে নিয়ে যাওয়া হল, তখন আমরা যেতাম। অনেক কিছুই মনে আছে। বাপির সঙ্গে থাকা মানে বাপির গল্প করা, হাসাহাসি করা এইসব। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার পথে বাপির বুকে ব্যথা শুরু হয়। সেইবার বাপি হোটেল হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনালে উঠেছিলেন। তো সেখান থেকে রাত্রিবেলা মা-কে ফোন করা হয়। মা তখনই চলে যান। মা এবং আমার ছোড়দাও। তাড়াতাড়ি বাপিকে বেলভিউতে ভর্তি করা হয়। আমি রোজ যেতাম। আমাকে গল্প শোনাতেন নানারকম , বিশেষ করে বাপির ফেলে আসা দিন। জন্মস্থান খান্ডোয়া… এই সবের গল্প শোনাতেন। নিজের ছোটবেলার কথা, দাদির কথা।
দাদি, মানে কিশোর কুমারের মা? গৌরী দেবী?
হ্যাঁ, আমি তো দাদিকে দেখিনি কোনওদিন, বাপির মুখে শুনতাম। উনি কীরকম রান্না করতেন, সেইসব গল্প। আশ্চর্য হল, অসুখের দিনগুলোতেও মজা করতেন।
নব্বই দিন শুয়ে আছেন হাসপাতালে। কোনও মনখারাপ, কোনও মৃত্যুচিন্তা, এসব ছিল না কিশোর কুমারের?
আমি কখনও দেখিনি। বিষণ্ণ হয়ে থাকা বা এরকম কিছু আমার সামনে অন্তত কখনও দেখাননি। বরং উলটো। আসলে হাসপাতালের দিন হোক কি অন্য সময় হোক, কিশোর কুমার মানে আমার স্মৃতিতে এক দারুণ হাসিখুশিভরা মানুষ। যিনি খাদ্যরসিক, যিনি ভীষণ মজার আবার তার পাশাপাশি একজন ভীষণ সিরিয়াস, চূড়ান্ত সেন্টিমেন্টাল মানুষ।

কিশোর কুমার মাছ খেতে খুব ভালবাসতেন?
কিশোর কুমার সব খেতে ভালবাসতেন। বিশেষ করে বাঙালি খাবার। রফি সাহেবও ভীষণ খেতে ভালবাসতেন। দুজনে জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতেন, মনে আছে। দুজনের দারুণ সম্পর্ক ছিল। আমাদের বাড়িতে আমার ছোটবেলা থেকে মদনদা বলে একজন ছিলেন। আমার মা তাঁকে রান্না শিখিয়েছিলেন। তখন সত্তরের শেষদিক হবে, মায়েরর কাছে বাপি বললেন, আমাকে একজন ভাল রান্নার লোক পাঠাও, যে বাঙালি রান্না করতে পারে। মা তখন মদনদাকে পাঠিয়ে দিলেন। মদনদা কিশোর কুমার যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তো ছিলেনই, তার পরেও অনেকদিন গৌরীকুঞ্জের রান্নাঘর সামলেছেন। আমার বাপি দই খেতেও খুব ভালবাসতেন। আর মনে আছে, গয়না বড়ি। মেদিনীপুরে তৈরি হয়। সেই বড়ির ওপর আবার পোস্তদানা ছড়ানো। বাপির জন্য মা সেই গয়না বড়ি পাঠাতেন। এছাড়া পায়েস খুব প্রিয় ছিল কিশোর কুমারের।
কিশোর কুমার প্রথম বাংলা গান গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘লুকোচুরি’ ছবিতে। এবং সেই ছবির জন্য প্রথম রেকর্ড করেন যে-গান, সেটি হল ‘এই তো হেথায় কুঞ্জছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে’, আপনার মায়ের সঙ্গে। এই তথ্য আমাকে দিয়েছিলেন মেগাফোন কোম্পানির কর্ণধার, কিশোর কুমারের বন্ধু কমল ঘোষ। আপনার মা, রুমা গুহঠাকুরতাকে কখনও ঘরে, কাজের ফাঁকে এই গান গুনগুন করতে শুনেছেন?
না। মা কোনও গানই গুনগুন করছেন, এরকম কোনও অভিজ্ঞতা আমার নেই। মা রেওয়াজ করতেন তানপুরা নিয়ে। ক্যয়ারের জন্য রিহার্সাল করতেন। গুনগুন করে গান গাইছেন কিংবা ঘুরতে-ফিরতে গান গাইছেন, সেটা বরং বাপির মধ্যে বেশি দেখেছি। তার মানে এই নয় কিন্তু যে, বাপিও সারাক্ষণ গান করছেন। বাড়িতে গান গাইছেন, আমার কাছে এই স্মৃতি মায়ের থেকে বাপিরই বেশি।

কিশোর কুমারের পাগলামি নিয়ে অনেক গল্প আছে। আপনার সেই বিষয়ে কোনও অভিজ্ঞতা?
কী জানো, ওসব লোক দেখানো! আমি বেশ পাগল, এরকম একটা ধারণা তৈরি করে দেওয়া। আসলে, তার ভিতরে কিশোর কুমার এক অন্য মানুষ। গভীর, ভাবুক, অসম্ভব সেন্টিমেন্টাল, এবং ভীষণ-ভীষণ ভাল একজন মানুষ।
এই যে আপনি ‘ভাবুক’ শব্দটি বললেন, আমি শুনেছি যে কিশোর কুমার তাঁর বাড়ির বাগানের গাছেদের সঙ্গে নাকি কথা বলতেন?
হ্যাঁ, বলতেন তো! এটা সায়েন্টিফিক্যালি প্রুভড যে, গাছেদের সঙ্গে কথা বললে গাছ বেশি ভাল ফুল-ফল দেয়। কিশোর কুমার গাছেদের সঙ্গে একা-একা কথা বলতেন, এটা সত্যি কথা। আসলে কিশোর কুমার এক আশ্চর্য শিল্পী শুধু নয়, এক আশ্চর্য মানুষ। ভীষণ নরম মনের। কত মানুষকে যে কতরকম সাহায্য করেছেন! কাউকে জানতে দেননি।
আমার শেষ প্রশ্ন। কিশোর কুমারের ৯৭ বছর বয়স হচ্ছে। তাঁকে আপনি নিজের ‘বাপি’ হিসেবে দেখেছেন। কাছে পেয়েছেন। গায়ক কিশোর কুমার না বাপি, কে বেশি আপনার হৃদয় জুড়ে রয়েছেন?
অবশ্যই বাপি! যে-ভালবাসা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে, তা-ই মন জুড়ে রয়েছে। আমি তাঁকে পেয়েছি আমার আঠারো বছর বয়স অবধি। কিশোর কুমার যে একজন ভারতবিখ্যাত শিল্পী, এসব আমি বুঝেছি তাঁর মৃত্যুর পরে। তাঁকে তো বাড়ির মানুষের মতোই পেয়েছি চিরকাল! তাঁর কত গান রিলিজের অনেক আগে শুনতে পেতাম আমরা। বিশেষত রাহুল দেব বর্মণের সুর করা গান বাপি গাইলেই, দাদাভাই একটা করে কপি বাড়িতে নিয়ে আসতেন। আমরা শুনতাম। অন্যান্য শ্রোতার মতো করে তো তখন তাঁকে শুনিনি! আজ বুঝি…




