সাক্ষাৎকার। শিন্টু বাগুই
সদ্যই পাশ হয়েছে ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট বিল। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন অর্থাৎ এসআইআর-এ বাদ পড়েছে লক্ষাধিক রূপান্তরকামীর নাম। এবারের প্রাইড মান্থ ছিল এইসব দাবি নিয়ে লড়াইয়ের। ভারতজুড়ে নতুন রূপান্তরকামী আইন ও এসআইআর-এ রূপান্তরকামীদের বঞ্চনা নিয়ে যাঁরা প্রতিবাদে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম শিন্টু বাগুই। মাটির থেকে উঠে আসা সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এই আন্দোলনের সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। শিন্টু বাগুই, লোক আদালতের প্রথম রূপান্তরকামী বিচারকও বটে। তাঁর সঙ্গে কথোপকথনে তিতাস রায় বর্মন।
আপনি একজন ট্রান্স উওম্যান। পুরুষ শরীরে জন্মগ্রহণ করেছেন, কিন্তু নিজেকে একজন নারী হিসেবে চিহ্নিত করেন। জানতে চাইব, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এই পথটা কেমন ছিল।
ছোটবেলাতে তো কেউ-ই জেন্ডার নিয়ে সচেতন হয় না, আমার ক্ষেত্রেও তাই ছিল। তার ওপর আমি বড় হয়েছি ব্রথেল এরিয়াতে, আমার মা একজন সেক্স ওয়ার্কার ছিলেন। সেখানে এই ধরনের কোনও সচেতনতা ছিল না। তবে ছোটবেলায় স্যান্ডো গেঞ্জির ওপর গামছা দিতে পছন্দ করতাম। আমার মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পুতুল খেলতে বা খেলনাবাটি খেলতে ভাল লাগত। ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলতে চাইতাম না। তখন নিজেকে শুধুই ‘মেয়েলি স্বভাবের ছেলে’ ভাবতাম। মনে হত, কেন আমি আর-পাঁচটা ছেলের মতো নই? কেন ক্রিকেট ভাল লাগে না? বাড়ি থেকেও একধরনের চাপ আসত ‘ছেলে’ হয়ে ওঠা নিয়ে। পাড়ার লোক, স্কুলের লোকে পিছনে লাগত।
কিন্তু প্রাইমারি স্কুলে বিষয়টা এরকম ছিল না। আমরা চার বন্ধু ছিলাম, স্কুলে শাড়ি-চুড়ি পরে এসে মাস্টারমশাইকে নাচ দেখাতাম, ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’ ও ‘রামজি’ গানে। এই তিনজনই পরে কাম আউট করেছিলাম, দু’জন ট্রান্স উওম্যান, একজন ট্রান্স ম্যান। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল ছিল একশো মিটারের মধ্যে। সেখানে কিন্তু কোনও ধরনের ডিসক্রিমিনেশন ছিল না। কেউ ভাবেওনি যে আমরা আলাদা।
কিন্তু উচ্চবিদ্যালয়ে এসে প্রথম বুঝলাম ডিসক্রিমিনেশন কাকে বলে। হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যেতে অস্বস্তি হত। কিন্তু এদিকে আমি বাড়িতে হাফপ্যান্ট পরেই ঘুরি, অসুবিধে হয় না। কিন্তু স্কুলে অসুবিধে হত, বুলিং-এর কারণে। স্কুলের হাজার-বারোশো ছেলের মধ্যে নিজেকে খুব আলাদা মনে হত, কারও সঙ্গে কথা বলতাম না, বাথরুমে হ্যারাসড হতাম। ফলে বাথরুম যাওয়া নিয়ে ভয় ছিল, সবার বাথরুম হয়ে গেলে তবে যেতাম। ক্লাসে দেরি হয়ে গেলে দিদিমণিরা বকা দিত, কিন্তু বলতে পারতাম না কেন দেরি হল। তখন থেকেই জেন্ডার ক্রাইসিস শুরু আমার। তবে পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করতে আমার অনেক সময় লেগেছে, ২০১৬ সালে প্রথম আমি কাম-আউট করি। সবে দশ বছর হল আমি বাড়ি থেকে শাড়ি-চুরি পরে বেরতে শুরু করেছি।
নেপালে প্রথম সমকামী বিবাহের রায় কোন আলো দেখাল?
লিখছেন কনিনীকা মজুমদার…

স্কুলের পর কাজের জগতে ঢোকা এবং নিজের জেন্ডার পজিশনকে তুলে ধরাও নিশ্চয়ই কঠিন ছিল।
আমি ক্লাস সেভেনের পর আর পড়াশোনা করিনি, সেটা ২০০৩ সাল। বাড়ির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভাল ছিল না। আমাকে কাজে ঢুকতেই হত। বাবার বিজনেস ঠিক করে চলছিল না, মা অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। মাসে ৪০০ টাকায় শেওড়াফুলি কালীবাড়ির এক মনোহারি দোকানে কাজ নিই। প্রথম ৪০০ টাকা পেয়ে সে কী আনন্দ। তখন আমি কান ফোটালাম। নাক ফুটিয়েছি কিন্তু অনেক পরে, ২০২৩ নাগাদ। আমার বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে। তো সেই সময় কান ফুটিয়ে সন্ধেবেলা সেজেগুজে বেরতাম, নানা ধরনের কানের দুল পরতাম, কাজল লাগাতাম, পারফিউম ব্যবহার করতাম, বড় চুল ছিল তখন আমার। চুল বড় রাখা নিয়ে বাড়িতে তুমুল অশান্তি হয়েছিল। তাই শাড়ি পরার সাহস তখনও দেখাতে পারিনি, পালাজো, পাটিয়ালা, কুর্তি পরতাম। ঋতুপর্ণ ঘোষ যেমন পরতেন, তেমন জামাকাপড় কেনা শুরু করলাম। জিন্স পরা একেবারে ছেড়ে দিলাম। ২০১৬ সালে ইউএস-এর একটা প্রোজেক্টের জন্য সিনেমা বানালাম— ‘আনটিল অ্যান্ড আনলেস’, সেই সিনেমার কাজ করতে করতে আমার শাড়ি পরা শুরু, যা আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল। আমি যখন কম বয়সে জাগরান শো করতাম, সেখানে আমাকে সবসময় হনুমান বা শিবের চরিত্র দেওয়া হত, আমি বলতাম, কেন বাপু আমাকে এমন চরিত্র দাও? সীতার চরিত্র দাও না কেন?
জাগরানের কাজ কবে থেকে শুরু করলেন? তার মানে আপনার পারফরম্যান্সের প্রতি ঝোঁক ছিল?
সত্যি বলতে, এই কাজটা আমি রুজি-রুটির জন্য করতাম। টাকা অনেকটা বেশি ছিল। এই শো-গুলো করতে আমাদের বিহার, ঝাড়খণ্ড, দিল্লি, রাজস্থান যেতে হত। ২০০৯ সালে প্রথম শো করেছিলাম বিহারে। প্রত্যন্ত গ্রামে। মধুবনী স্টেশনে দুপুরে নেমে বাসে করে ৯টা নাগাদ নেমেছিলাম সেই গ্রামে। খাওয়াদাওয়ার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। এখনও স্পষ্ট মনে আছে। দুর্গাপুজোর সময় টানা জাগরানের শো হত। মাতাজির চৌকিতে। টানা পাঁচ-ছ’দিন কাজ করার পর ৪০০০ টাকা পেয়েছিলাম। এই টাকাটা তখন আমার কাছে অনেক। জাগরানে সবাই আমাদেরই কমিউনিটির মানুষ, তবুও সেখানে বড় নখ রাখা বা চুল রাখা নিয়ে সমস্যা ছিল। আসলে কী বলো তো, এরকম না করলে কাজ পেতে অসুবিধা হত লিডারদের। কিন্তু যেখানে নিজের সত্তাকে লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে, সেখানে তো কাজ করা মুশকিল। এরপরই জাগরানে শো করা বন্ধ করে দিই। কারণ ততদিনে আমি নিজেকে প্রকাশ করার সাহস পেয়েছি। আর তো পিছিয়ে আসা যায় না। তবে, শেষের দিকে কয়েকটা মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করতে পেরেছিলাম।

অ্যাক্টিভিজমে কি আসা এর পরই?
যেহেতু আমি ব্রথেলে বড় হয়েছি, তাই খুব কম বয়সেই বুঝেছিলাম সেক্স ওয়ার্কারদের আন্দোলন কতটা জরুরি। ২০০৯ সালে প্রথম শেওড়াফুলিতে ‘দুর্বার’-এর এইচআইভি ইন্টারভেনশনে পিয়ার এডুকেটর হিসেবে জয়েন করি, তখন আমার বয়স ২০ হয়েছে সবে। তারপর ২০১০-এ ‘দুর্বার’-এর এলজিবিটিকিউ উইং ‘আনন্দম’-এর দায়িত্ব দেওয়া হল। তখন আমি নানা রকমের নেটওয়ার্কিং-এর কাজ করেছিলাম। এভাবেই আমার এলজিবিটিকিউ অ্যাক্টিভিজমে ঢোকা। ‘আনন্দম’-এর কাজের উদ্দেশ্য ছিল ব্রথেল এরিয়া-র এলজিবিটিকিউ কমিউনিটির মানুষদের নিয়ে, কিন্তু আমার মনে হল কাজটাকে এইখানে না বেঁধে নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা কুইয়ার মানুষদের নিয়ে কাজ করা দরকার। তারপর পরীক্ষা দিয়ে আমি ‘দুর্বার’-এর এইচআইভি ইন্টারভেনশনের প্রোজেক্ট ডিরেক্টর হলাম। ২০১৬-এ চাকরি ছেড়ে আমি বাড়িতে একটা খাবার হোটেল শুরু করলাম। এই হোটেলটাও আমার অ্যাক্টিভিজমেরই অংশ ছিল। সেক্স ওয়ার্কারদের খাবার দেওয়া ছিল এই ক্লাউড কিচেনটার কাজ। তবে যেটা হল, এই দু’বছর আমি আমার নেটওয়ার্কিংটার থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। আবার দুর্বার থেকে ডাক এল। এই সময়ই ডকুমেন্টারিটার কাজ শেষ হল, আমি দু’মাসের জন্য আমেরিকা চলে গেলাম। ফিরে এসে আমি দুর্বার থেকে পাকাপাকিভাবে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে আমরা, সব সদস্যরা মিলে নিজের একটা সংগঠন করলাম ‘কলকাতা আনন্দম ফর ইকুয়ালিটি অ্যান্ড জাস্টিস’ নামে। ২০২০-তে যখন লকডাউন হয়ে গেলে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম আমার কমিউনিটির মানুষেরা, সেক্স ওয়ার্কার মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকবে? তাদের খাবার জোগান দেবে কে? দিন নেই, রাত নেই, ঘুম নেই— পাঁচশো জন কমিউনিটির মানুষকে সার্ভাইভ করালাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে ফান্ড তুলতাম, ফেসবুকে পোস্ট দিতাম, কিছু কিছু কোম্পানি টাকা দিল, এমনকী, আমার বাড়ির লোকও আমাদের সাহায্য করল। ৫০০ জন মানুষের বাড়িতে খাবার পৌঁছলাম। দু’বার কোভিড হল আমার। কোনও মতে ২১ দিন কাটিয়ে আমি আবার রেশন নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাওয়া শুরু করলাম। হাঁটতে পারতাম না, মাথা ঘুরে যেত, কিন্তু আমাকে যেতে হতই। ওই ২১ দিন যে কী চিন্তায় ছিলাম, আমি বসে গেলে এতজনের খাবারের কী হবে? এভাবে দু’বছর চললাম। ইতিমধ্যে ‘আনন্দম’ এখন রেজিস্টার্ড অর্গানাইজেশন, আমরা এই সংগঠনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের রূপান্তরকামী মানুষ ও সেক্স ওয়ার্কারদের সঙ্গে কাজ করি।
তোমার একটা বইও আছে। বই লেখার চিন্তা কীভাবে এল?
হ্যাঁ, ‘আঁধারে স্বপ্ন খোঁজা’। গত ডিসেম্বরে বইটা প্রকাশ হয়। ইউসিএলএ-র সঙ্গে একটা কাজ করেছিলাম আমরা। কাজটা হল কমিউনিটির মানুষদের কর্মক্ষেত্র ও অর্থনৈতির অবস্থা নিয়ে। আমরা কমিউনিটির মানুষেরা সবসময় মেক আপ প্রোডাক্ট ব্যবহার। এটা আমাদের করতেই হয়। এই প্রোডাক্ট কেনার খরচ সবাই মেটায় কীভাবে? আমরা পশ্চিমবঙ্গের ৫টা জেলা ধরে একটা সার্ভে করলাম, সেখানে দেখতে চাইলাম কতজন মানুষ বছরে ৩ লাখ রোজগার করে, কতজন ১ লাখের নীচে রোজগার করে। কতজন মানুষ নিম্নবর্গের, অসাংগঠনিক ক্ষেত্রে কাজ করেন। আমরা খালি ভাবি, ট্রান্স মানুষেরা শুধু সেক্স ওয়ার্ক আর লন্ডা ডান্স করেই রোজগার করে। আমরা দেখলাম, কেউ হোটেলে কাজ করে, কেউ বাড়িতে-বাড়িতে কাজ করে, কেউ বাড়ি-বাড়ি রান্নার কাজ নিয়েছে, কেউ মালি, কেউ ঠাকুর তৈরি করে, কেউ র্যাপিডো চালায়। এই গবেষণা করতে গিয়ে বুঝলাম, এই সার্ভে কতটা জরুরি ছিল।

আপনার কাম আউট ও লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়, যে শ্রেণি থেকে উঠে আসছেন। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যে জাতি পরিচয় থেকে উঠে আসছেন।
দেখো, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কিন্তু শ্রেণির লড়াইটা স্পষ্ট সবসময়। জাতের লড়াই এত স্পষ্ট ছিল না। ধীরে-ধীরে এখন জাতের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। আমার কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল, আমার শ্রেণি থেকে উঠে এসে আমাদের লড়াইয়ের প্রশ্নকে মূল স্রোতে তুলে ধরা। কত-কত সময় যে আমার কথা মানুষের কানে পৌঁছয়নি, আমাকে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। অনেক লড়াইয়ের পর আজ আমার কথা শহুরে মানুষের কানে পৌঁছেছে। এখন শহরের অ্যাকাডেমিক অংশ বা নারীবাদী অংশ আমার কথা শুনতে পায়। তার প্রধান কারণ আমি আমার কাজে জলের মতো স্বচ্ছতা বজায় রেখেছি, আমার কমিউনিটির মানুষকে ক্রমাগত রিপ্রেজেন্ট করে গিয়েছি। কাস্টের কথা যদি বলো, তাহলে আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। আমি যেহেতু ব্রথেলে বড় হয়েছি, সেখানে জাতের কোনও ভেদাভেদ ছিল না। কেউ জানতই না, কার কী জাত। কিন্তু অবমাননা করা হয়েছে কর্মক্ষেত্রটাকে। সেক্স ওয়ার্ককে আজও নীচু চোখে দেখা হয়, আজও এরা কর্মীর মর্যাদা পায়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমি একেবারে প্রান্তিক জায়গা থেকে উঠে আসা মানুষ হলেও আমাকে জাতের লড়াই লড়তে হয়নি। আমার কাছে কোনও রিসোর্স ছিল না, আমার কাছে ম্যানপাওয়ার ছিল না, আমার তো শিক্ষাও ছিল না। আমি যেখানে গেছি, শুধু এটা বলেছি— তুমি আমাকে সিম্প্যাথির চোখে দেখো না, এম্প্যাথির চোখে দেখো। তাহলেই চিত্রটা পরিষ্কার হয়, আমার লড়াইও তোমার চোখে পড়বে। আজ তো কত মানুষ তাদের কাজের জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এগুলো আমার পাওনা। আমাদের অফিসে দুটো কায়দার চেয়ার নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই চেয়ারে আমি বসি না। চেয়ারে বসলেই আমি জানি, আমি কোরাপ্ট হয়ে যাব। চেয়ারের অহংকার আমি চাই না। চেয়ার খুব খারাপ জিনিস। আমি মাটির মানুষ, আমি মাটিতেই থাকতে চাই, আমি ওপরে উঠতে চাই না। রাজধানী-কেন্দ্রিক মানুষ ও প্রান্তিক মানুষদের লড়াইয় তাই আলাদা। প্রান্ত থেকে উঠে আসা মানুষের কাছে তো ভাষাটাই নেই, পুঁথিগত শিক্ষার সুযোগ নেই। সেই লড়াইটা লড়তেই কত সময় চলে যায়।
আপনার মায়ের লড়াইও কম নয়, আপনার মায়ের লড়াই ও আপনার লড়াই কোথায় আলাদা ও কোথায় এক।
আমার মা মারা গেছেন ২০১২ সালে। আমার পাড়ার যে মা-বোনেরা আছে, আমি তাদের দেখে লড়াই শিখেছি, তারা আজও আমার ইন্সপিরেশন। আমার মা খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, কম কথা বলতেন। ওনাকে দেখে আমি এথিক্স শিখেছি। কিন্তু আন্দোলনের স্পৃহা আমার পাড়ার মা-মাসি-বোনেদের থেকে পাওয়া, ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনের লিডার থেকে শেখা।
আপনি কাম আউট করার সময় কে বা কারা আপনাকে সাহায্য করেছিল। বা কে বা কারা ছিল আপনার অনুপ্রেরণা?
আমার কাম আউটের জার্নিতে একটা মানুষের বড় অবদান রয়েছে, তিনি হলেন ড. সোমা রায়। যিনি আমাদের সংগঠনের অ্যাডভাইজার। আমি শাড়ি পরা শুরু করেছি যখন, তখন তিনি আমার বাড়িতে এসে আমাকে লিপস্টিক পরিয়ে দিয়েছেন। আমাকে বলতেন, তুমি পারবে, এটা তোমার জায়গা। বন্ধুদের থেকে শিখেছি, কীভাবে কাজ করতে হয়। কমিউনিটি সাহায্য করে তো বটেই। আমি গ্রাসরুট থেকে উঠে আসার পরও আমি বলব, আমি খুব প্রিভিলেজড। আমি ফ্লাইটে চড়েছি, যেটা আমার পরিবারের কেউ কোনও দিনও চড়েনি, আমার পাড়ার কেউ চড়েনি, আমার কমিউনিটির অনেক বোনেরাই চড়েনি। একা মানুষ কিছু করতে পারে না। কমিউনিটি সাহায্য করে, ইন্সপায়ার করে, এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেখায়।

আপনার পরিবারের সঙ্গে লড়াইটা কেমন ছিল?
গতকালই দিদি বলছিল, মা তোর এতকিছু দেখেই যেতে পারল না। দেশ-বিদেশ ঘুরছিস, মা জানতেই পারল না। এখন তো আমার বাবাও আমাকে নিয়ে খুব গর্বিত। কিন্তু শুরুতে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। বাবা গ্রামের বাড়িতে থাকে, ওখানে সবাই বাবাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার ছেলে এরকম কেন? বাবা তাদের উত্তর দেয়, ও তো যাত্রা করত, তাই এরকম পোশাক পরে। আমার জেঠু-জেঠির সঙ্গে এতকাল কোনও সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু আজ ওরাও আমাকে মেনে নিয়েছে। আমার কাছেই তারা আবদার করে, বাবু এটা খাওয়া-ওটা খাওয়া। ২০১৯ সালে যখন লোক আদালতে যাই, তখন আমার বাবা খুব খুশি হন। কিন্তু আমার পরিবারের সবাই আমাকে ছেলে হিসেবেই ট্রিট করে। দিদিরা ভাই বলে। আমি কখনও ওদের ভাইফোঁটা থেকেও বঞ্চিত করিনি। কারণ আমি সবসময় ভেবেছি আমার এই লড়াইয়ের জন্য আমার পরিবারের চাহিদাগুলো যেন অপূর্ণ না থাকে। আমাকে এই চাহিদাগুলো পূরণ করতেই হত। এদিকে আমার দিদিই আমার জন্য ব্রেসিয়ার কিনে আনে, সালোয়ার কিনে আনে। সেই জন্যই আমি আমার নামও বদলাইনি।
হ্যাঁ, এটাও আমার প্রশ্ন ছিল, নাম পরিবর্তন করার কথা ভাবেননি?
আমি বদলাইনি নামটা। কারণ এই নামটা আমার মায়ের দেওয়া। তার ওপর আমার নাম নিয়ে কোনও পরিচয়গত সংকট, যাকে বলে ‘ডিসফোরিয়া’, তা হচ্ছে না। যাঁদের নামে ডিসফোরিয়া আছে, তাঁদের তো নাম বদলাতেই হবে। তার ওপর আমার পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই এই নামেই চেনে। আমি নাম বদলালে কাজেও আমার সমস্যা হত। যদিও এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু রূপান্তরকামী মানুষ নিজেদের প্রকাশ করেছেন, কনটেন্ট ক্রিয়েট করছেন। আপনার কী মনে হয়, সোশাল মিডিয়ার দৌলতে রূপান্তরকামী মানুষদের নিয়ে সামাজিক ভ্রান্তি দূর হয়েছে, না কি কিছু ভ্রান্তি বেড়েছে?
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আমি সবসময়ই সাধুবাদ জানাই। তাদের পরিচিতি বাড়ছে সমাজে, এটা খুব ভাল চিহ্ন। তাদের ডেকে-ডেকে কত মানুষ ছবি তোলে, আশীর্বাদ করে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, তাদের কথার কিছু অংশ তুলে ধরে ভাইরাল করা হচ্ছে, যেটা আসলেই ক্ষতি করে সচেতনতার ক্ষেত্রে।
সাম্প্রতিক ট্রান্সজেন্ডার আইনটি একমাসের মধ্যে লাগু করে দেওয়া হল। শত প্রতিরোধ সত্ত্বেও। এই আইনটি কীভাবে আপনাদের জীবন ও সম্মানকে আহত করে। তার ওপরে রয়েছে এসআইআর-এ নাম ওঠেনি লাখের ওপর ট্রান্সজেন্ডার মানুষের। রাজনৈতিকভাবে এই বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টা নিয়ে কী বলবেন?
আমরা সবাই হতাশার মধ্যে রয়েছি। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু হয়ে গেল। কত মানুষের কাগজ আর বৈধ নয়। এই আইনে নন-সার্জিক্যাল মানুষদের আর কোনও জায়গাই রইল না। জেন্ডার বাইনারিতে ঢুকতেই হবে। তাই যদি হয়, তাহলে ট্রান্সজেন্ডার মানুষরা কোথায় যাবে? সবাই তো মেল-ফিমেলের বাইনারি ঢুকতে চাইবে না। ট্রান্স আমব্রেলায় কারা থাকবে তাহলে? আর সার্জিক্যাল মানুষদের যে মেডিক্যাল টেস্টের কথা বলা হয়েছে, সেটাও তো সাংঘাতিক। যারা বয়স্ক ট্রান্সজেন্ডার মানুষ, তাদেরও আবার মেডিক্যাল টেস্ট হবে? যতক্ষণ না পলিসি আসবে, আমরা কিছু বুঝতে পারছি না। এই হতাশা কালেকটিভ ও ইন্ডিভিজুয়াল-ও। এক-একজনের সরকারি ডকুমেন্টসের বিষয় এটা। বেঁচে থাকার যে মর্যাদা, আমরা এখনও এই লড়াইটা চালাচ্ছি। আমাদের না আছে স্বাস্থ্যের অধিকার, না আছে শিক্ষার অধিকার, না আছে চাকরির অধিকার, না আছে খাদ্যের অধিকার, না আছে বাসস্থানের অধিকার। সম্প্রতি একটা খবর বেরিয়েছে, যারা ট্রেনে ভিক্ষা করে, তাদের ২০০০ টাকা জরিমানা হবে। যে মানুষটা ভিক্ষে করে হয়তো ৫০০ টাকা কামায়, তার গুরুকে দিতে হয় ২০০ টাকা। তাহলে তার কাছে পড়ে রইল ৩০০। এদিকে জরিমানা দিতে হবে ২০০০। এরা কাজ করবে কী করে? পশ্চিমবঙ্গে কমপক্ষে ৪০০০ কমিউনিটির মানুষের কাজ চলে যাবে এই আইনের পর। তাদের আবার সেক্স ওয়ার্কে ফিরে যেতে হবে, কন্ডোম ছাড়া কাজ করবে। হেপাটাইটিস বাড়বে, এইচআইভি বাড়বে। তাহলে এত লড়াই করে কী লাভ হল? এই যে হকার উচ্ছেদ হল, এখানে কতজন ট্রান্স মানুষের কাজ গেল, তার কোনও হিসেব আছে? তাদের তো কোনও সহায়তাই করে উঠতে পারলাম না। এসআইআর-এ বাদ যাওয়া ট্রান্স মানুষেরা কোন পথে নিজেদের বৈধ প্রমাণ করবে বলো তো! আমরা তো এই লড়াইয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছি। নাগরিকত্ব ও ভাতের চিন্তাই এখনও দূর হল না আমাদের।
ভারতে ট্রান্স আন্দোলন এখন কোনদিকে যাওয়া উচিত বলে মনে হয় আপনার?
দেখো, ভারতে গোটা এলজিবিটিকিউ আন্দোলন ভেঙে পড়ছে। ভেঙে পড়ার অনেক অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম বিষয় হল অর্থনৈতিক অবস্থা। মানুষের কাছে কাজ নেই, প্রতিদিন ভাতের জোগান হচ্ছে না। এদিকে আমাদের সকলেরই আন্দোলনটাই হচ্ছে ভাতের আন্দোলন। একটা সময় পেটে গামছা বেঁধে আন্দোলন করত মানুষ, আজকের বাস্তব কি এটা? যে মানুষটা পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে একা বাঁচছে, তার ওপরেও দুটো মানুষ নির্ভরশীল। কেমনভাবে? যে বাড়িতে সে ভাড়া রয়েছে, সেই বাড়িওয়ালা, যে দোকান থেকে সে রেশন তোলে, তার টাকা। দু’মাস বাড়িভাড়া না দিলে সে ছাদহারা, একমাস মুদির দোকানে টাকা না দিলে সে এরপর থেকে ক্ষুধার্থ থাকবে। এর জন্য প্রতিটি স্তর থেকে আওয়াজ তোলা উচিত, বড় আন্দোলনের ডাক দেওয়া উচিত, যাতে বদল আসবেই। সবার আগে ট্রান্স অ্যামেন্ডমেন্ট বিলটা বাতিল করা হোক।
পরবর্তী প্রজন্ম, যারা নিজেদের শরীরে স্বচ্ছন্দ নয়, তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বক্তব্য রাখবেন?
আমরা লড়াই করে উঠেছি, আমরা চাইছি সচেতনতা বাড়াতে, প্রশ্ন করতে, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের কিছু সুবিধা হয়, তাদের পরিবার থেকে যাতে বাধা না আসে, তাদের চাকরির সুরক্ষা দিতে। তোমরা নিজেরা লড়াই করে জায়গা করো। আন্দোলনে শামিল হও।



