
মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৮
বুঝতে পারি, আমার সবচেয়ে বড় ভয়টা আসলে অন্য জায়গায়। আমি এত বছরের আমার বাধ্য, অনুগত ‘আমি’-টাকে আর চিনতে পারছি না। যেন আমার সবকিছু বদলে গেছে। শরীর থেকে মস্তিষ্ক, ফিটনেস থেকে অনুভূতি— সবটাই যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে।

বুঝতে পারি, আমার সবচেয়ে বড় ভয়টা আসলে অন্য জায়গায়। আমি এত বছরের আমার বাধ্য, অনুগত ‘আমি’-টাকে আর চিনতে পারছি না। যেন আমার সবকিছু বদলে গেছে। শরীর থেকে মস্তিষ্ক, ফিটনেস থেকে অনুভূতি— সবটাই যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে।

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মনে করে মেয়েরা জন্মগতভাবে কাস্টমার কেয়ার এগজিকিউটিভ। প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্রত্যেক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা করা, প্রত্যেক কাজের কারণ জানানো— তাদের ফুলটাইম চাকরির অঙ্গ।

মাঝবয়সি মায়েদের সবচেয়ে বড় প্রতিভা হল, তারা যে-কোনও ঘটনাকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। ছেলে পাঁচ মিনিট বেশি ঘুমোল? নিশ্চয় শরীর খারাপ। দশ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠল? নিশ্চয় কোনও গোপন প্রেম চলছে। ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে? ড্রাগ নিচ্ছে না তো?

‘আসলে, আমাদের সমাজে মেয়েদের জীবন নিয়ে একটা অদৃশ্য সিলেবাস আছে। জন্মাবে, পড়াশোনা করবে, চাকরি করতে পারে, না-ও করতে পারে, কিন্তু গল্পটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামবে বিয়ে, সন্তান আর সংসারের ঘাটে।’

একসময় সিঁড়ি ভাঙা ছিল জীবনেরই একটা অংশ— দু’ধাপ একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠা, দেরি হয়ে গেলে হুড়মুড় করে চারতলা উঠে যাওয়া, তারপরও হাঁপ না ধরা। এখন সিঁড়ির সামনে দাঁড়ালেই হাঁটু আগে সতর্ক করে: আগে ভাবো, তারপর ওঠো।

‘আমার আত্মীয়-পরিজন আমার এই রূপান্তর দেখে মাঝে-মাঝে যখন অবাক হয়ে যায়, আমি তৎক্ষণাৎ কোভিডকে দায়ী করি। কোভিড ব্যাটাই আমার মাথার ঘিলুকে কিলাইকে কাঁঠাল পাকাইয়া দিয়া। কিন্তু এ-ব্যাপারে অভিজ্ঞ বয়স্ক মহিলারা অন্য এক ভিলেনকে দোষ দিচ্ছেন। সে হল: মাঝবয়স।’

পরের বার যদি কোনও মাঝবয়সি মহিলা আপনার সামনে রেগে যান, দয়া করে ভাববেন না— ‘উফ, আবার মেনোপজ!’ ভাবুন— ‘হয়তো এই মানুষটা এতদিন অনেক সহ্য করেছে!’ আর সেই সময় ভুলেও বলবেন না, ‘আরে ঠিক আছে ঠিক আছে, এখন শান্ত হও’, বা ‘তুমি বড্ড বাড়িয়ে ভাবছ।’

মননে কি সত্যিকারের বাঙালি হয়ে উঠতে পারবেন বাবু-বিবিরা? বাঙালি মননের অভিজ্ঞান কিন্তু রাজনীতির ময়দানের অশান্তি আর কথা-চালাচালি নয়, আর সেই নিয়ে রোজ-রোজ টিভির পর্দায় অসভ্যের মতো গলা ফাটানো নয়। সর্বক্ষণ বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাটের ইএমআই-এর হিসেব কষাও নয়।

অদৃশ্য হওয়া মানে তাই শুধু চোখে না পড়া নয়। অদৃশ্য হওয়া মানে গল্প থেকে বাদ পড়া— সিনেমা, বই, খবর, আলোচনায় অনুপস্থিত থাকা। অদৃশ্য হওয়া মানে সিদ্ধান্তের টেবিল থেকে সরিয়ে দেওয়া— পরিবারে, অফিসে, সমাজে। অদৃশ্য হওয়া মানে আকাঙ্ক্ষাকে অবৈধ ঘোষণা করা।

‘‘মজার কথা হল, এখনও অনেকেই এটাকে হিংসা বলতেই নারাজ। ‘ও তো অনলাইনে হয়েছে’, ‘ওসব পাত্তা দিও না’, ‘ব্লক করে দাও’, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকলে এগুলো একটু হবেই’— এইসব কথার মধ্যে আমাদের সমাজের পুরনো নিষ্ঠুরতা খুব আরামে হাই তোলে।’’

‘জানা গেল মাটির তলা দিয়ে ট্রেন যাবে, তারই প্রস্তুতি শুরু হবে। বলে কী! আমার ছোট্ট ব্রেনে নানারকম প্রশ্ন উদিত হতে থাকল। দিব্যি মাটির ওপর দিয়ে লোকজন যাচ্ছে, বাস-ট্রাম দৌড়চ্ছে, বাবা অফিস যাচ্ছে সেইসব চড়ে, তা হলে খামখা মাটির তলা দিয়ে ট্রেন যাবে কেন? কী করেই-বা?’

‘অনেক মা-বাবা খিদেয় কাঁদতে থাকা বাচ্চাকে শুধু গল্প বলছেন— ‘আজ কেন খাওয়া হবে না।’ গত চারমাস গাজায় কোনও ত্রাণ সামগ্রী ঢোকেনি। যেটুকু ঢুকছে, তাও কড়া-হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। খাবার নিতে লাইন দেওয়া, হুড়োহুড়ি-করা মানুষগুলোর উপর প্রায়ই গুলি চলছে। গাজায় তৈরি করা হল ম্যানমেড দুর্ভিক্ষ!’
This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.
©2026 Copyright: Vision3 Global Pvt. Ltd.