মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৯

Representative Image

ভাল থাকার সিলেবাস

মাঝবয়স এমন খতরনাক একটা সময় যে, সব সময় মন একটা তাড়াহুড়োয় থাকে। যৌবনের দামালপনা পেরিয়ে এসে, সংসার, সম্পর্ক, অফিস-কাছারি, আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কিত সব ধরনের ইকোয়েশন সামলাতে সামলাতে হঠাৎ দেখা যায়, ঝপাং করে মাঝবয়সের জলে পড়ে যায় মানুষজন। এবং প্রভূত নাকানি-চোবানি খাওয়ার পর খাবি খেতে খেতেই মনে হয়— এ বাবা! নিজের জীবনটা নিয়ে কী করলাম! এখনও তো আমার নিজের জন্য কিচ্ছু করা হল না। একা-একা পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া, একটা নতুন ভাষা শেখা, রোগা হয়ে পুরনো জিন্স পরে তাক লাগিয়ে দেওয়া, কুল-মম হয়ে ওঠা, রান্নার রিল বানানো, গিটার শেখা— কিচ্ছু করে উঠতে পারলাম না। যদি বা সালসা ক্লাসে ভর্তি হলাম, তা-ও রেগুলার যাওয়া হল না। তাহলে আমি ডেফিনিশন অনুযায়ী ভাল থাকব কী করে।

এই তো সেদিনও মনে হচ্ছিল, অনেক সময় আছে। ছেলে একটু বড় হোক, তারপর পাহাড়ে যাব। অফিসটা একটু গুছিয়ে নিই, তারপর গিটার শেখা যাবে। একটু রোগা হয়ে নিই, তারপর সেই পুরনো জিন্সটা বের করব। রান্নার এত প্রশংসা সবাই করে, একটা রিল বানাতে আর কতক্ষণ! স্প্যানিশ শেখার অ্যাপটা ডাউনলোড করা আছে। সালসা ক্লাসের নম্বরটাও সেভ করা। জীবনটা যেন একটা লম্বা ‘টু ডু লিস্ট’— যার সব কাজই শুরু হবে ‘তারপর’ থেকে।

মুশকিল হল, সেই ‘তারপর’-টা আর আসে না।

মাঝবয়সের সব দোষ কি হরমোনেরই?
পড়ুন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের কলমে মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ৮…

একদিন দেখি, ছেলের জুতোর সাইজ আমার সমান হয়ে গেছে। মায়ের ওষুধের তালিকা লম্বা হয়েছে। নিজের চশমার পাওয়ারও। আর আমি এখনও ভাবছি, গিটার কিনব কি না।

তখন শুরু হয় আসল কনফিউশন। অফিস-বাচ্চা সামলে কী করে রান্নার রিল বানাব? অথচ সবাই বলেছে, আমি দারুণ রাঁধি এবং সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা উচিত। কিন্তু মায়ের অসুখ, ছেলের পরীক্ষা আর অপিসের চাপ সামলে সময় কই। যদি বা জোর করে সময় বের করা গেল তো সন্তানের প্রতি অবহেলার অপরাধবোধ জাঁকিয়ে বসল। তৎক্ষণাৎ তার বায়োলজি নোটস তৈরি করতে শুরু করা গেল। সোলো ট্রাভেলে গিয়ে তো মন পড়ে থাকবে বাড়িতে। তাহলে আর গিয়ে কী লাভ! এদিকে আবার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। অতএব প্রেশার-কোলেস্টেরল আর মোটা শরীর নিয়ে একা পাহাড়ে যাওয়ার মুরোদ নেই।

কিন্তু নিজের মনকে ভুলভাল বোঝানোর জন্য নিজেকেই প্রশ্ন করি, আমি কি সময় পাচ্ছি না? না কি সময় বের করতে পারছি না? না কি সত্যিটা আরও নিষ্ঠুর? আমি আদৌ এত কিছু করতে চাই না? শুধু করতে চাওয়ার গল্পটা ভালবাসি?

বড্ড ভয় হয় এই প্রশ্নটায়। কারণ উত্তরটা যদি ‘হ্যাঁ’ হয়? যদি সত্যিই আমি একটু আলসে হই? একটু অগোছালো? একটু বেশি দায়িত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকি? তা হলে?

আবার দীর্ঘ তালিকার একটাতেও রাইট চিহ্ন না দিতে পেরে মন তো পারপিচুয়ালি ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে। নিজেকে অপদার্থ মনে হচ্ছে। তারপর আবার সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই দেখি, আমারই বয়সি এক মহিলা লাদাখে বাইক চালাচ্ছেন। আর-একজন ম্যারাথন শেষ করে মেডেল ঝুলিয়ে ছবি দিয়েছেন। কেউ নতুন ব্যবসা খুলেছেন। কেউ পঁয়তাল্লিশে এসে পিয়ানো বাজানো শিখছেন। কেউ আবার লিখেছেন, ‘Finally choosing myself.’ এই ‘choosing myself’ কথাটা পড়লেই আমার বুকের মধ্যে কেমন যেন লাগে। আমি কি তা হলে কোনও দিন নিজেকে বেছে নিইনি? তা হলে এতদিন কাকে বেছে নিয়েছিলাম? সকালে উঠে ছেলের টিফিন, অফিসের প্রেজেন্টেশন, মায়ের রিপোর্ট, বাজারের লিস্ট, ইলেকট্রিক বিল, কাজের লোকের ছুটি— এই সবের মধ্যে নিজেকে কোথায় রাখব? আলাদা একটা তাক আছে নাকি?

মাঝে-মাঝে মনে হয়, এখন ভাল থাকারও একটা সিলেবাস বেরিয়েছে।

একটা শখ থাকতে হবে। একটা সাইড প্যাশন থাকতে হবে। একটা ট্রাভেল স্টোরি থাকতে হবে। একটা ফিটনেস জার্নি থাকতে হবে। একটা মানসিক ভাঙন থাকতে হবে। সেটা কাটিয়ে ওঠার গল্পও থাকতে হবে। অর্থাৎ, শুধু ভাল থাকলেই হবে না, ভাল থাকার একটা সুন্দর এডিটেড ভার্সনও থাকতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয়, সব সময় জীবনটা এডিট করা যায় না।

তবু মাঝে-মাঝে খুব রাগ হয় নিজের ওপর। অন্যরা পারছে, আমি পারছি না কেন? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বিষাক্ত। কারণ এর মধ্যে ধরে নেওয়া আছে, অন্যরা সবাই খুব সুন্দর করে জীবনটা গুছিয়ে ফেলেছে। আসলেই কি তাই? না কি সবাই আমার মতোই রাতে শুয়ে ভাবছে— আজও কিছুই করা হল না?

সোশ্যাল মিডিয়ার একটা মজার ব্যাপার আছে। ওখানে কেউ নিজের অসমাপ্তির ছবি দেয় না। কেউ দেখায় না, সালসা ক্লাসে তিন দিন গিয়ে আর না-যাওয়ার গল্প। কেউ বলে না, ডুওলিঙ্গোতে তার তিনশো দিনের স্ট্রিক নয়, তিনশো দিনের অপরাধবোধ জমে আছে। কেউ পোস্ট করে না, গিটারটা এখনও বাক্সে আছে। সবাই পৌঁছে যাওয়ার ছবিটা দেয়। রওনা দেওয়ার আগের বিশৃঙ্খলাটা নয়। তারপর আমরা বসে বসে ভাবি, শুধু আমিই বোধহয় পৌঁছতে পারলাম না।

এই যে সব সময় মনে হয়, সময়টা হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে— এটা কি সত্যিই সময়ের ভয়? না কি অপূর্ণতার? আমার সন্দেহ, আমরা সময়কে ভয় পাই না। আমরা ভয় পাই, একদিন পিছন ফিরে তাকিয়ে যদি দেখি, অন্য সবার জীবন বেঁচে দিতে দিতে নিজের জীবনটার সঙ্গে আলাপই হল না। এই ভয়টার কোনও ছবি হয় না। কোনও রিল হয় না। কোনও মোটিভেশনাল বক্তৃতাও হয় না।

শুধু মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। আর মনে হয়, আচ্ছা, যে মেয়েটা একদিন ভেবেছিল একা পাহাড়ে যাবে, সে এখন কোথায়? মরে গেছে? না কি এখনও আছে? শুধু বাজারের ব্যাগ আর স্কুলের গ্রুপের নোটিফিকেশনের নিচে চাপা পড়ে আছে? আমি জানি না। যেমন এটাও জানি না, সত্যিই যদি একমাসের ছুটি পাই, তা হলে আমি পাহাড়ে যাব, না বাড়িতেই বসে ঘুমোব। সত্যিই যদি গিটার কিনি, রোজ প্র্যাকটিস করব, না তিনদিন পরে ধুলো জমবে। সত্যিই যদি একদিন সবাই আমাকে বলে, ‘আজ তোমার কোনও দায়িত্ব নেই’— আমি কী করব?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার কাছে নেই। শুধু এটুকু বুঝি, মাঝবয়সে এসে সবচেয়ে বড় বিপদ বয়স নয়। সবচেয়ে বড় বিপদ হল, হঠাৎ একদিন মনে হওয়া— হয়তো আমি আমার জীবনটা ঠিকমতো বাঁচছি না। আর তার থেকেও বড় বিপদ, পরের মুহূর্তেই মনে হওয়া— হয়তো এটাই ঠিকমতো বাঁচা।

এই দুই ‘হয়তো’-র মাঝখানেই বোধহয় মাঝবয়স থাকে। এবং আশ্চর্যের কথা, এই বয়সে এসে আমরা সময়ের সঙ্গে যতটা লড়াই করি, তার চেয়েও বেশি লড়াই করি নিজের বিরুদ্ধে।

কারণ ঘড়িটা দেওয়ালে টিকটিক করে। কিন্তু আসল শব্দটা হয় মাথার ভেতর।

সারাক্ষণ।

এখনও সময় আছে?’