স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার-হাজার মানুষ। কেউ হাততালি দিচ্ছে না। কেউ শুধু চিৎকারও করছে না। খেলোয়াড় এবং দর্শকরা সবাই একসঙ্গে মাটিতে বা গ্যালারিতে বসে ধীর ছন্দে বৈঠা বাওয়ার ভান করে শরীরকে ছন্দবদ্ধভাবে সামনে ও পিছনে দোলাচ্ছেন। তারপর একই তালে গর্জে উঠছে— ‘হু!’
এই দৃশ্যের নাম ‘ভাইকিং রোর’। এটা শুধু একটি ফুটবল সেলিব্রেশন নয়। এটা কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। একটা জাতির স্মৃতি। একটা সভ্যতার আত্মপরিচয়। নরওয়ের মানুষ যখন এই গর্জন তোলেন, তখন যেন সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে চলা ভাইকিং জাহাজগুলোর বৈঠার শব্দ আবার ফিরে আসে। উত্তর আটলান্টিকের বরফশীতল জলরাশির ওপর জীবন বাজি রেখে যে-মানুষগুলো নতুন পৃথিবী খুঁজেছিল, তাদের সাহস যেন আজও এই গর্জনের মধ্যে বেঁচে আছে।
ভাইকিংদের ইতিহাস শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়। এটা কঠিন প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের জয়লাভের ইতিহাস। বরফ, ঝড়, অন্ধকার, দীর্ঘ শীত আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকার ইতিহাস। সেখানে একজন মানুষ একা বাঁচতে পারে না। সবাইকে একসঙ্গে বৈঠা চালাতে হয়। একজনের ভুল মানেই পুরো জাহাজের বিপদ। তাই ভাইকিং সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, ঐক্য। হয়তো সেই কারণেই আজও নরওয়ের মানুষ বিশ্বাস করে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। নায়কের চেয়ে সমাজ বড়। সাফল্যের চেয়ে একসঙ্গে এগিয়ে চলা বড়।
আরও পড়ুন: উদ্বাস্তুকে ঘরে ফিরিয়েছে আফ্রিকার ফুটবল! লিখছেন আদিত্য ঘোষ…
‘ভাইকিং রোর’ সেই দর্শনেরই আধুনিক রূপ। হাজার মানুষের কণ্ঠে যখন একসঙ্গে সেই গর্জন ওঠে, তখন বোঝা যায়, একটা জাতি এখনও একসঙ্গে শ্বাস নিতে জানে। এই বিশ্বকাপে সেই গর্জন আবারও শুনল পৃথিবী।
সামনে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রতিভা— সবকিছুতেই ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হল, অতীত সম্মান এনে দেয়, জয় নয়। মাঠে নতুন করে সব প্রমাণ করতে হয়। সেই কাজটাই করল নরওয়ে। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ, আর্লিং ব্রাউট হাল্যান্ড।
ছোটবেলায় তাঁর জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও, তাঁর শিকড় নরওয়ের পাহাড়, ফিয়র্ড আর ভাইকিংদের দেশে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা তাঁকে শিখিয়েছিলেন প্রতিভা যথেষ্ট নয়, শৃঙ্খলাই মানুষকে বড় করে। হাল্যান্ডের ফুটবল তাই শুধু শক্তির নয়। এটা পরিশ্রমের গল্প। এটা প্রতিদিন নিজেকে আরও একটু ভাল করার গল্প। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে তাঁর দু’টি গোল শুধু স্কোরবোর্ড বদলায়নি। তা যেন ঘোষণা করেছিল, নরওয়ে আর শুধু সম্ভাবনার দেশ নয়, বাস্তবেরও শক্তি।
ভাইকিংদের ইতিহাস শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়। এটা কঠিন প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের জয়লাভের ইতিহাস। বরফ, ঝড়, অন্ধকার, দীর্ঘ শীত আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকার ইতিহাস। সেখানে একজন মানুষ একা বাঁচতে পারে না। সবাইকে একসঙ্গে বৈঠা চালাতে হয়। একজনের ভুল মানেই পুরো জাহাজের বিপদ। তাই ভাইকিং সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, ঐক্য।
কিন্তু সেই রাতের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা মাঠে ছিল না। ছিল ম্যাচ শেষের পর। স্টেডিয়ামে হাজার-হাজার মানুষ একসঙ্গে ‘ভাইকিং রোর’ তুলছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই দৃশ্য পৌঁছে গেল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার, লন্ডন, অসলো, বার্গেন, ট্রন্ডহাইম। যেখানেই নরওয়েজিয়ানরা ছিলেন, সেখানেই একই ছন্দ, একই গর্জন। একটা ফুটবল ম্যাচ যেন মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা একটি জাতিকে আবার এক সুতোয় বেঁধে দিল। এই কারণেই ফুটবলকে শুধু খেলা বলা যায় না। এটা সংস্কৃতির ভাষা। এটা ইতিহাসের ভাষা। এটা পরিচয়ের ভাষা। নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপের বড় মঞ্চ থেকে দূরে থাকা, বারবার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়া, হতাশা সবই ছিল। তবু তারা থামেনি। কারণ যারা ভাইকিংদের উত্তরসূরি, তারা জানে, সমুদ্র কখনও সবসময়ে শান্ত থাকে না। ঝড় আসবেই। কিন্তু বৈঠা থামানো যায় না। আজকের নরওয়ে সেই দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি।
একদিকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক রাষ্ট্র। অন্যদিকে মাঠে এক অসাধারণ লড়াকু ফুটবল দল। যেখানে তারকারা আছেন, কিন্তু তার চেয়েও বড় দল। যেখানে গোল আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিশ্বাস।
ভাইকিংদের ইতিহাস জুড়ে তারা অপেক্ষা করেনি অনুকূল সময়ের। তারা নিজেরাই সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। নিজেরাই পথ তৈরি করেছে। আজ নরওয়ের ‘ভাইকিং রোর’ আমাদের শুধু ফুটবল শেখায় না। শেখায় ঐক্য মানে শক্তি। সংগ্রাম মানে জীবন। ব্রাজিলকে হারানোর রাত হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে। হাল্যান্ডের জোড়া গোলও হয়তো নতুন-নতুন রেকর্ডের ভিড়ে একদিন চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু হাজার-হাজার মানুষের সেই একসঙ্গে ওঠা গর্জন, ‘হু!’ সেটা থেকে যাবে। কারণ কিছু শব্দ কানে শোনা যায়। আর কিছু শব্দ ইতিহাসের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে বেঁচে থাকে।
‘ভাইকিং রোর’ ঠিক তেমনই একটি প্রতিধ্বনি। একটি জাতির আত্মা। একটি সংস্কৃতির স্পন্দন। আর পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেওয়া এক চিরন্তন সত্য— একসঙ্গে হাঁটতে জানে যে-জাতি, তাকে হারানো কখনও সহজ নয়।



