ফিরে আসার গল্প

Representative Image

শিরা উপশিরার মতো এই বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত দেশ। শিকড়ের মতো মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে অপু-দুর্গারা। মনে হয় সাদা-কালো সিনেমার চিত্রপট। মনে হয় নিজেরই আত্মজীবনী। এই মানুষগুলো কি আমারই প্রতিবেশি? আমার মতোই তো ওদের উচ্ছ্বাস। আমার মতোই তো প্রতিদিন ওদের হেরে গিয়ে আবার চলতে থাকা। পায়ে-পায়ে ওরা ছুঁয়ে রেখেছে ফুটবল, বুকে রেখেছে স্মৃতি। জ্বর সারলে একদিন রেলগাড়ি দেখতে যাওয়ার আশায় যেমন মজেছিল বাঙালি, ঠিক তেমনই ওই ১১ জনের খেলা দেখতে আসবে বলে অপেক্ষা করেছিল, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার উদ্বাস্তু কত মানুষ!

ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত ছোট্ট দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। আয়তন ও জনসংখ্যায় খুব বড় না হলেও, আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে এই দেশের নাম উচ্চারিত হয় এক গভীর ট্র্যাজেডির স্মারক হিসেবে। একসময়ে দেশটি ছিল যুগোস্লাভিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পর শুরু হয় এক নির্মম গৃহযুদ্ধ, যা প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে গোটা দেশকে রক্তাক্ত করে তোলে।

আরও পড়ুন: বিশ্বকাপে প্রিয় দল জিতলে বা হারলে, সঙ্গীর ওপর কেন বাড়ছে শারীরিক নিগ্রহ?
লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…

এই যুদ্ধে মুখোমুখি হয় তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠী, বসনিয়াক (মূলত মুসলিম), সার্ব এবং ক্রোয়াট। জাতিগত বিদ্বেষ, ভূখণ্ড দখলের লড়াই এবং রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে প্রায় এক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়। হাজার-হাজার পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অসংখ্য শিশু হয়ে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস-সহ ইউরোপের নানা দেশে চলে যায়।

যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ছিল, স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা, যেখানে কয়েকদিনের মধ্যেই আট হাজারেরও বেশি বসনিয়াক পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আদালত গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে ডেটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান হলেও, ক্ষত রয়ে যায় মানুষের মনে। আজও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনে সেই বিভাজনের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু যুদ্ধ একটি বিষয় কেড়ে নিতে পারেনি, নিজেদের দেশকে ভালোবাসার অনুভূতি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ-লক্ষ বসনীয় আজও নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। আর সেই সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায় একটি জায়গায়, জাতীয় ফুটবল দলে। তাই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় ফুটবল দল কেবল একটি ক্রীড়াদল নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির স্মৃতি, উদ্বাস্তু জীবনের বেদনা, হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত প্রতীক।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় ফুটবল কখনওই শুধু একটি জনপ্রিয় খেলা ছিল না। ছিল মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি এবং একে অপরের সঙ্গে সংযোগের অন্যতম মাধ্যম। যুগোস্লাভিয়ার অংশ থাকাকালীন দেশটির ফুটবলাররা যুগোস্লাভ জাতীয় দলে খেলতেন। সেই সময় থেকেই বসনিয়ার শহরগুলিতে ফুটবল ছিল জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘এফকে সারায়েভো’, ‘এফকে জেলিয়েজনিচার সারায়েভো’ কিংবা ‘এফকে ভেলেজ মোস্তা’-রর মতো ক্লাব শুধু ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ছিল না। ছিল স্থানীয় মানুষের গর্ব ও পরিচয়ের প্রতীক। যুগোস্লাভিয়ার স্বর্ণযুগে অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে এসেছিলেন বসনিয়ার মাটি থেকেই।

কিন্তু ১৯৯২ সালে যুদ্ধ শুরু হলে, ফুটবলও থেমে যায়। স্টেডিয়ামগুলো কখনও আশ্রয়কেন্দ্রে, কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। বহু খেলোয়াড় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন, কেউ প্রাণ হারান, আবার অসংখ্য তরুণ ফুটবলার পরিবার নিয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন। যুদ্ধ শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়নি; ভেঙে দিয়েছিল ফুটবলের স্বাভাবিক বিকাশকেও। যে-শিশুরা একদিন সারায়েভো, মোস্তার বা বানিয়া লুকার মাঠে খেলত, তারা পরবর্তী জীবনে জার্মানি, সুইডেন, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড কিংবা নেদারল্যান্ডসের ফুটবল অ্যাকাডেমিতে বড় হয়ে ওঠে।

১৯৯৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, নতুন করে গড়ে ওঠে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় ফুটবল দল। শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল অবকাঠামো এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন— সবকিছুর মধ্যেই দলটিকে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হয়েছে। কিন্তু ধীরে-ধীরে বিদেশে বেড়ে ওঠা বসনীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা জাতীয় দলে যোগ দিতে শুরু করেন। তাঁদের কাছে এই জার্সি শুধু একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব ছিল না; এটি ছিল হারিয়ে যাওয়া শিকড়ে ফিরে আসার এক যাত্রা।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় পতাকা

দীর্ঘ সংগ্রামের পর আসে ইতিহাস গড়ার মুহূর্ত। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ‘2014 FIFA World Cup’-এ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সেটিই ছিল তাদের প্রথম বিশ্বকাপ। যোগ্যতা অর্জনের খবর প্রকাশের পর শুধু সারায়েভো নয়, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী লক্ষ-লক্ষ বসনীয় রাস্তায় নেমে উদ্‌যাপন করেন। কারণ এটি কেবল একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির আন্তর্জাতিক মঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়ানোর মুহূর্ত।

বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা খুব দীর্ঘ না হলেও, তা ছিল অত্যন্ত স্মরণীয়। গ্রুপ পর্বে তারা মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া এবং ইরানের। উদ্বোধনী ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হলেও, দলটি দুর্দান্ত লড়াই করে এবং গোল করেন ভেদাদ ইবিশেভিচ, যা ছিল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল। এরপর নাইজেরিয়ার কাছে বিতর্কিত ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে হেরে নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। তবে শেষ ম্যাচে ইরানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে, তারা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নেয়। সেই জয়ে গোল করেছিলেন এদিন জেকো, মিরালেম পিয়ানিচ এবং আভদিয়া ভ্রশায়েভিচ।

পরিসংখ্যান বলবে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা মাত্র দু’বার বিশ্বকাপে খেলেছে। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। কারণ এই দলের সাফল্য ট্রফি বা নকআউট পর্বে ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নামতেন এমন সব ফুটবলার, যাঁদের অনেকেই যুদ্ধের কারণে শৈশবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁরা যখন বসনিয়ার নীল-হলুদ জার্সি পরে জাতীয় সংগীত গাইতেন, তখন তা ছিল হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ছিন্নমূল পরিবার এবং মাতৃভূমির প্রতি অটুট ভালবাসার এক নীরব ঘোষণা। এ-কারণেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় ফুটবল দলকে অনেকেই শুধু একটি ফুটবল দল হিসেবে দেখেন না। এটি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির পুনর্জন্মের প্রতীক, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা উদ্বাস্তু মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রতীক এবং প্রমাণ কখনও-কখনও ফুটবল একটি দেশের ইতিহাসও লিখতে পারে।

কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। কারণ এই দলের সাফল্য ট্রফি বা নকআউট পর্বে ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নামতেন এমন সব ফুটবলার, যাঁদের অনেকেই যুদ্ধের কারণে শৈশবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁরা যখন বসনিয়ার নীল-হলুদ জার্সি পরে জাতীয় সংগীত গাইতেন, তখন তা ছিল হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ছিন্নমূল পরিবার এবং মাতৃভূমির প্রতি অটুট ভালবাসার এক নীরব ঘোষণা।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় ফুটবল দলের অধিকাংশ তারকার জীবন শুরুই হয়েছিল এক অস্থির সময়ে। অনেকেই তখন শিশু, যখন যুদ্ধের গোলা-বারুদ তাঁদের শৈশব কেড়ে নিয়েছিল। কারও বাবা-মা রাতারাতি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউ উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ নতুন দেশে গিয়ে শূন্য থেকে জীবন শুরু করেছেন। ফলে তাঁদের শৈশবের স্মৃতি জুড়ে যেমন রয়েছে নতুন দেশের স্কুল, ভাষা ও ফুটবল অ্যাকাডেমি, তেমনই রয়েছে বাবা-মায়ের মুখে শোনা যুদ্ধের গল্প, হারিয়ে যাওয়া বাড়ির স্মৃতি এবং ফেলে আসা স্বদেশের আকুলতা। অনেকেই হয়তো জন্মেছেন বা বড় হয়েছেন জার্মানি, অস্ট্রিয়া কিংবা সুইজারল্যান্ডে, কিন্তু তাঁদের ভেতরে বেঁচে ছিল বসনিয়া বেঁচে ছিল ভাষা, গান, খাবার, উৎসব আর যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের স্মৃতি।

এ-কারণেই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো তাঁদের কাছে শুধু একটি ক্রীড়া সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল নিজের পরিচয়কে স্বীকার করার এক আবেগঘন ঘোষণা। তাঁরা এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, যেখানে হয়তো তাঁদের শৈশব কাটেনি, কিন্তু তাঁদের শিকড় প্রোথিত ছিল। অনেক খেলোয়াড়ের জন্য জাতীয় সংগীত গাওয়ার মুহূর্তটি ছিল নিজের বাবা-মায়ের ত্যাগ, উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম এবং হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা নিবেদনের মুহূর্ত। এই আবেগের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে ওঠেন অধিনায়ক এদিন জেকো। তিনি সারায়েভো অবরোধের সময় যুদ্ধের বিভীষিকা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ছোটবেলায় তাঁর দিন কেটেছে বোমা হামলা, গোলাগুলি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। পরবর্তীকালে ইউরোপের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হয়ে উঠলেও তিনি বারবার বলেছেন, বসনিয়ার জার্সি তাঁর কাছে অন্য যে-কোনও ক্লাবের জার্সির চেয়ে বেশি মূল্যবান। একইভাবে, মিরালেম পিয়ানিচের পরিবার যুদ্ধের সময়ে দেশ ছেড়ে লুক্সেমবার্গে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। বিদেশে বড় হলেও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে বসনিয়াকেই বেছে নেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু ফুটবলীয় নয়, ছিল নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত। ফলে জাতীয় দলের প্রতিটি ম্যাচ ধীরে-ধীরে এক অন্য অর্থ ধারণ করে। সারায়েভো, জেনিৎসা কিংবা ইউরোপের যে-শহরেই বসনিয়ার খেলা হোক-না-কেন, গ্যালারিতে জড়ো হন হাজার-হাজার প্রবাসী বসনীয়। অনেকের হাতে যুদ্ধের আগে তোলা পরিবারের ছবি, অনেকের চোখে অশ্রু, অনেকের কণ্ঠে জাতীয় সংগীত। নব্বই মিনিটের জন্য তারা আর জার্মান, সুইডিশ বা অস্ট্রিয়ান নাগরিক নন, তারা শুধু বসনীয়। ফুটবল তাদের কাছে দেশকে জেতানোর চেয়েও বড় কিছু, এটি নিজের হারিয়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরে যাওয়ার এক মানসিক যাত্রা।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার যোগ্যতা অর্জনের আনন্দ তাই শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্যের উল্লাস ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার মুহূর্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ-লক্ষ বসনীয় রাস্তায় নেমে উদ্‌যাপন করেছিলেন, কারণ তাঁদের কাছে এই বিশ্বকাপ ছিল প্রমাণ যে দেশটিকে একদিন যুদ্ধ ভেঙে দিয়েছিল, সেই দেশ এখনও বেঁচে আছে; তার মানুষ এখনও নিজেদের এক জাতি বলে বিশ্বাস করে। দীর্ঘ বারো বছরের অপেক্ষার পর, ২০২৬ সালে আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। ২০১৪ সালের অভিষেকের পর বহুবার ব্যর্থতার হতাশা সঙ্গী হলেও এবার ইউরোপীয় প্লে-অফ পেরিয়ে তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল, এই পথচলায় তারা শক্তিশালী ইতালিকে প্লে-অফে হারিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় যে-জয় সমগ্র বসনিয়ার কাছে নতুন আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপের মূলপর্বেও বসনিয়ার লড়াই ছিল তাদের জাতীয় চরিত্রেরই প্রতিচ্ছবি। নতুন ’৪৮ দলের বিশ্বকাপে তারা নকআউট পর্বে উঠে এলেও, শেষ পর্যন্ত রাউন্ড অব ৩২-এ আমেরিকার কাছে ২-০ গোলে পরাজিত হয়ে বিদায় নেয়। স্কোরলাইন হয়তো পরাজয়ের কথা বলে, কিন্তু বসনিয়ার গল্প কখনও কেবল ফলাফলের গল্প নয়।

২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপও প্রমাণ করল, যুদ্ধ, উদ্বাস্তু জীবন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস বহন করা এই দলটির আসল শক্তি ট্রফিতে নয়, বরং বারবার ফিরে আসার ক্ষমতায়। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের প্রতিটি উপস্থিতি যেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বসনীয়দের কাছে একটি বার্তা মানচিত্র বদলাতে পারে, প্রজন্ম বদলাতে পারে, কিন্তু একটি দেশের স্মৃতি, পরিচয় এবং আপনত্বের অনুভূতিকে নির্বাসনে পাঠানো যায় না। এই কারণেই আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় ফুটবল দলকে ‘সিমবল অফ বিলংগিং’ বলে অভিহিত করেছে। এই দলের আসল শক্তি গোল, জয় কিংবা ট্রফিতে নয়, এর আসল শক্তি নিহিত রয়েছে সেই মানুষগুলোর মধ্যে, যারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থেকেও একটি নীল-হলুদ জার্সির মাধ্যমে নিজেদের ইতিহাস, স্মৃতি এবং মাতৃভূমির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখেন। বসনিয়ার ফুটবল দল তাই একটি জাতির কাছে কেবল একাদশ খেলোয়াড়ের সমষ্টি নয়, এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া ঘর, বেঁচে থাকা ইতিহাস এবং অমলিন আত্মপরিচয়ের আরেক নাম।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবলের গল্প পড়তে-পড়তে, বাঙালির ফুটবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় বারবার মনে পড়ে। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা লক্ষ-লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের কাছে ইস্টবেঙ্গল এফসি শুধু একটি ফুটবল ক্লাব ছিল না, সেটি ছিল হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, আত্মমর্যাদা এবং নতুন সমাজে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার এক প্রতীক। মাঠের প্রতিটি জয় ছিল অপমান, বঞ্চনা ও বাস্তুচ্যুতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় ফুটবল দলও ভিন্ন এক ইতিহাসে একই রকম সামাজিক ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধে ছিন্নমূল হয়ে ইউরোপের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়া বসনীয়দের কাছে জাতীয় দল একটি ফুটবল দল নয়; এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া বাড়ি, মাতৃভাষা, স্মৃতি এবং জাতিসত্তার বহমান প্রতীক। দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস এক নয়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলাদা। তবু ফুটবল দুই ক্ষেত্রেই উদ্বাস্তু মানুষকে একটি অভিন্ন পরিচয়ের নিচে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে। একদিকে ইস্টবেঙ্গল উদ্বাস্তু বাঙালির ক্লাব, অন্যদিকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় দল উদ্বাস্তু একটি জাতির প্রতীক। ফুটবল তাই কখনও-কখনও শুধু গোলের খেলা নয়, এটি মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঘরে, ফিরে আসার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।