তেমন-তেমন ডিরেক্টর কাজটা করতে-করতেই বুঝতে পারেন, ছবিটির মক্কা কোথায়, কতদূর এর দৌড়! আঠাশ বছর বয়সি ছোকরা পরিচালক গুরু দত্ত ছবিটি শুট শুরু করেই বুঝতে পারছিলেন, এই ছবিটির এলেম আছে। শুধুমাত্র বোম্বাই-এর সিলভার জুবিলি হিট হওয়া নয়, এই ছবি ঠিকমতো করতে পারলে, এর মক্কা সময়ের গেঁথে দেওয়া গণ্ডি পেরলেও পেরতে পারে। ছবিটির নাম ‘প্যয়াসা’, যে-ছবি ভারতীয় চলচ্চিত্রের মানচিত্রে একটি ইতিহাস।
গুরু দত্ত-র সব ক’টি ছবিই কোনও-না-কোনও বিদেশি ছবির অনুপ্রেরণায় তৈরি। ‘প্যয়াসা’-ই একমাত্র ছবি, যা একদম স্বকীয় বা অরিজিনাল। ছবিটি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ভাবনাচিন্তা করছিলেন গুরু দত্ত। অবশেষে যখন শুটিং শুরু করলেন, তখন তাঁর মনে হল, একইসঙ্গে অভিনয় আর পরিচালনা না করে, নির্মাণে সবটুকু মন দেবেন। তাছাড়া বিজয়ের মতো একটি চরিত্র যদি আরও দক্ষ এবং স্টার অভিনেতার হাতে পড়ে, তাহলে তো কথাই নেই! গুরু ও তাঁর বেশিরভাগ ছবির চিত্রনাট্যকার এবং সংলাপ লেখক, সতীর্থ, ‘সাহেব বিবি অউর গুলাম’-এর পরিচালক, আবরার আলভি গেলেন দিলীপ কুমারের বাড়ি। তাঁরা ঠিক করলেন, গুরু দত্ত-র অভিনয়ে যতটা শুট হয়েছিল সেটা ফেলে দেবেন দিলীপ কুমার রাজি হলে। রাত আড়াইটেতে স্ক্রিপ্ট ন্যারেশন শেষ হলে, দিলীপ কুমার বলেছিলেন, একটা রাস্তার মেয়ে, ‘ল্যাম্পপোস্টের তলা’-য় দাঁড়িয়ে থাকা, শরীর-বেচে-খাওয়া মেয়ে কিছুতেই একটি ভারতীয় ছবির নায়িকা হতে পারে না। তিনি বলেন, মীনা (মালা সিনহা) চরিত্রটিকে নায়িকা করে সেটি আরেকবার লেখা দরকার এবং সেই চরিত্রে অবশ্যই মধুবালাকে নেওয়া দরকার।
আরও পড়ুন : বিষাদকে কীভাবে মহৎ করে তুলতে হয়, শিখিয়েছিলেন গুরু দত্ত!
লিখছেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়…

আলভির বয়স তখন ছাব্বিশ। এমনই বয়স, যা তখনও আস্তিন গুটিয়ে রাখে। তিনি দিলীপ কুমারকে স্পষ্ট বলে দেন, এইসব হবে না। ছবিটি যেমন লেখা হয়েছে, ঠিক তেমনটি থাকবে। দিলীপ কুমারের দাপট তখন বোম্বাই শহরের সবচেয়ে উঁচু হাইরাইস-কেও টেক্কা দেয়। সহকারী পরিচালক বা অন্যান্য ইউনিট মেম্বারদের রেগে গিয়ে চড়থাপ্পড় মেরে দেওয়ার এক-আধটা ঘটনাও ঘটিয়েছেন। এহেন বোম্বাই ফিল্মি দুনিয়ার চূড়ায় বসে রাজ করা ম্যাটিনি আইডলকে উঠতি রাইটার বলে বসলেন, দিলীপ কুমারের কথামতো চিত্রনাট্য সে পালটাতেই পারে কিন্তু সেটা হতে হবে আদ্যন্ত অন্য একটি ছবির জন্য, গুরু দত্ত-র ‘প্যয়াসা’-র জন্য নয়।
অনেক তর্ক-বিতণ্ডার পর এই একগুঁয়ে, দাম্ভিক যুবকের কথা মেনে নেন দিলীপ কুমার। আলভি, তাঁর ‘টেন ইয়ারস উইথ গুরু দত্ত’ বইটিতে বলেছেন, সেই মিটিং-এ গুরু একটি কথাও বলেননি, শুধু শান্ত হয়ে বসে শুনে গেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, তাঁর ষোলো আনা সাপোর্ট ছিল আলভির দিকে। পরের দিন টাকাপয়সার কথা বলতে গিয়ে যখন দিলীপ কুমার দেড় লক্ষ টাকা, তাঁর সেই সময়ের পারিশ্রমিক, চেয়ে বসেন— তখন হাল ধরেন গুরু। বলেন, এই ছবির বাজেটে এত টাকা সত্যিই দেওয়া সম্ভব নয় দিলীপ কুমারকে। এবং ডিস্ট্রিবিউটর বদল করা বা গুরুর সঙ্গে কাজ করা পুরনো ডিস্ট্রিবিউটরদের হঠাৎ টাকার অঙ্ক বাড়াতে বলাও সম্ভব নয়; গুরু কথার খেলাপ করবেন না। এমন কাণ্ড দিলীপ কুমারের সঙ্গে আর কখনও হয়েছে কি? তবে ভদ্রলোক শেষমেশ হাল ছেড়ে দেন। ‘ঠিক আছে, দেখা যাক কী হয়’ বলে পরের দিন কলটাইমে ফ্লোরে পৌঁছে যাবেন কথা দেন। এবং, পরের দিন, কলটাইমের ঘণ্টাচারেক পরেও তিনি শুটিং-এ পৌঁছন না।

এদিকে সকাল থেকে সারা ইউনিট বসে। সময় চলে যাচ্ছে, বাড়ছে শিফট। ক্যামেরা পজিশনে, লাইট রেডি, বাকি সব অভিনেতা তৈরি হয়ে বসে রয়েছে— কিন্তু কোথায় দিলীপ কুমার! ফোনের পর ফোন যেতে থাকে তাঁর বাড়ি, তাঁর পরিচিত ও বন্ধুদের বাড়ি— দিলীপ কুমার বেপাত্তা। শুটিং ফ্লোর-এর একটা চলতি কথা আছে, টাইম ইজ মানি। বেলা চারটের সময়ে আলভি এসে গুরুকে বলেন, ‘চলো, ওঠো, মেক-আপে বসো, শুট শুরু করতে হবে এবার।’ আলো জ্বলে ওঠে, সাউন্ড চালু হয়, কিরকির শব্দে ঘুরতে থাকে ক্যামেরা। ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ায় ‘প্যয়াসা’-র পরিচালক-প্রযোজক-অভিনেতা গুরু দত্ত— যাকে ছাড়া ‘বিজয়’ চরিত্রটিতে অন্য কোনও অভিনেতাকে কেউ কস্মিনকালেও কল্পনা করতে পারে না।
‘প্যয়াসা’-র বিজয় হিন্দি সিনেমার দলিলে এমন এক আশ্চর্য ‘হিরো’, যে কিনা আপাদমস্তক পরাজিত পুরুষ। বিজয় একজন কবি। আমাদের কলকাতার প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া ছবিটিতে হয়তো সে এক বাঙালি কবিই, যে উর্দু ও হিন্দুস্তানিতে কবিতা লেখে। এই কবি, গায়ে ছেঁড়া তেনা পরে, ভয়ানক আত্মাভিমানকে সঙ্গী করে বগলে কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে, আধপেটা খেয়ে ঘুরে বেড়ায়। শিক্ষিত হয়েও চাকরির জন্য ছুটে মরে না। চারপাশের মানুষদের— নিজের পুরনো প্রেমিকা, বড় দাদা, কলেজের বন্ধু, সমাজের উঁচুতলার সংস্কৃতি-কপচানো মানুষদের পচাগলা আচরণ সে দুটি নীরব-ব্যথিত চোখ দিয়ে দেখে চলে। রুখে দাঁড়ায় না, রাগে ফেটে পড়ে না, শত অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে হিন্দি সিনেমার হিরোদের মতো হাত ওঠে না তার— ‘উফ না কহেঙ্গে/ লভ সিল লেঙ্গে/ আঁসু পি লেঙ্গে’। বিজয়ের প্রতিবাদ তার কবিতায়, তার প্রত্যাখ্যানে, ‘ইয়ে মহলো, ইয়ে তাখতো, ইয়ে তাজো কি দুনিয়া/ ইয়ে ইনসান কে দুশমন, সমাজো কি দুনিয়া/ ইয়ে দউলাত কে ভুখে রিয়াজো কে দুনিয়া/ ইয়ে দুনিয়া আগর মিলভি যায়ে তো কেয়া হ্য…’। সাহির লুধিয়ানভির চাবুকের মতো লেখনী।

সিনেমার পর্দায় দেখা ‘হিরো’দের থেকে কয়েক যোজন আলাদা ‘প্যয়াসা’র বিজয়। বিজয় সে-ই চরিত্র, যে-চরিত্রগুলি একটা সময় অবধি মধ্যবিত্ত-আবেগপ্রবণ মানুষ হতে চেয়েছে মনে-মনে, অন্তত তার আদর্শকে কিছুটা সম্মান করেছে। এখনকার নিরিখে এই চরিত্র বাজারে অচল পয়সার মতো, বেফালতু। এমন একটি চরিত্রকে ঘিরে কমার্শিয়াল ছবির প্লট গড়ে তোলা কম কথা নয়। ‘বিজয়’ কখনওই ‘বিজয়’ হয়ে উঠত না, যদি দিলীপ কুমার এই চরিত্রে অভিনয় করতেন। ‘হিরো’র মিথ ‘হিরো’কে দিয়ে ভাঙা যায় না এবং সেই কারণেই হিন্দি কমার্শিয়াল ছবির দুনিয়ায় ‘প্যয়াসা’ আজও একটি ‘মিথ-ভাঙা সিনেমা’।
ছবির নায়কের মতো ‘প্যয়াসা’-র নায়িকার চরিত্র নির্মাণেও সমস্ত মিথ ভেঙেছিলেন গুরু দত্ত। গুলাব হতেই পারত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চন্দ্রমুখীর মতো একটি চরিত্র। এক দেহোপজীবিনী মেয়ে, যার অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে ভালবাসা আসে মরমে মরে-মরে। নায়ক এমন মেয়ের কাছে দুঃখের দিনে আশ্রয় পায়, সেবা আর প্রেম পায়, এবং দিনান্তে অবধারিতভাবে ফিরে যায় সেখানে— যা ভদ্রসমাজ। ‘বেশ্যা’ মেয়েটি ‘বেশ্যাবৃত্তি’-তে ফিরে যায়, কারণ ‘রাস্তার মেয়ে’-রা ‘নায়িকা’ হতে পারে না। নায়ক এই মেয়েদের প্রেমে পড়তে পারে না, তাদের এঁটো শরীর সসম্মানে কামনা করতে পারে না। গুলাবো সেই নায়িকা, যে তার পেশা নিয়ে একবারও কাঁদুনি গায় না, যার ভালবাসা নিভৃত অথচ সোচ্চার। যে-মেয়ে নায়কের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি ধরে সগর্বে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যায়। ‘আমার এই অপবিত্র শরীর আমি তোমাকে দিতে পারব না’ বলে যে সমাজের দেগে দেওয়া নিয়মের ভয়ে পেছিয়ে আসে না। আলভির বইটি থেকে জানা যায়, গুলাবো-র চরিত্রটি নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন ছিল অনেক। বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে আমজনতার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে জল্পনা চলে বিস্তর, ঝুঁকি নিয়ে ছবির বাজার বিগড়োতে চায় না কেউ-ই। আলভি নিজে চেয়েছিলেন চরিত্রটির ভাষা, হাবভাব, পোশাক-আশাক বাস্তবনির্ভর হোক। খর্রা, রুক্ষ। কিন্তু গুরু দত্ত গুলাবোকে যত্ন আর সম্ভ্রমে গড়ে তুলেছিলেন— তিনি চাননি, গুলাবো করুণা অথবা অসম্মানের পাত্রী হোক। গুলাবোকে এমন একটি আলোকিত চরিত্রে উপস্থাপন করেছিলেন, যার কাছে নায়ক ফিরে আসছে সমাজ-সংসার সব ছেড়ে। শেষ দৃশ্যের সংলাপগুলি সে-কারণেই তেমন স্মার্ট এবং প্রেমময়—
‘তুমি?’
‘হ্যাঁ গুলাবো, বলতে এসেছিলাম আমি চলে যাচ্ছি।’
‘ওহ্, এটুকুই কথা ছিল তোমার?’
‘না, জানতে চাইছিলাম, তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?’
হাত ধরে ব্যাক-টু-ক্যামেরা দূরের এক আলোর পথে এগিয়ে যায়। ভেসে আসে কীর্তনিয়ার সেই সর্বস্ব উচাটন করা গান, ‘আজ সজন মোহে অঙ্গ লাগা লো/ জনম সফল হও যায়ে’।

গুলাবো চরিত্রটি আজও সিনেমার প্রেক্ষিতে একটি কাল্ট নারীচরিত্র। ওয়াহিদা রেহমান অসামান্য অভিনয় করেছিলেন। প্রসঙ্গত, বেশ কিছু বছর পরে, ১৯৬২-তে সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ ছবিতে ওয়াহিদা ‘গুলাবি’-র চরিত্রে অভিনয় করেন। এও এক ‘রাস্তার মেয়ে’-র চরিত্র আর এখানেও ছবির নায়ক সিংজি শেষে গুলাবিকে নিয়ে চলে যায়। ‘অভিযান’ সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জুটির একটি অনবদ্য ব্যতিক্রমী কাজ। দুটি কাজই ‘নয়্যার’ জঁরের ছবি।
ভারতীয় সিনেমায় ‘নয়্যার’ ছবির গুরু, গুরু দত্ত। ‘প্যয়াসা’ আর ‘কাগজ কে ফুল’-এর নয়্যার ট্রিটমেন্ট সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। গুরু দত্ত-র বোন, শিল্পী ললিতা লাজমি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ছোটবেলায় তিনি লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখতেন বড়দা (গুরু দত্ত) একা-একা দেওয়ালে নানারকম ছায়া ফেলে খেলা করে চলেছে। গুরু দত্ত-র সিনেমার বিশেষত্ব ছবিগুলির দৃশ্যকল্প ও শটের অনবদ্য বৈচিত্র— একটির পর একটি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লং শট থেকে বিগ ক্লোজ-আপ শট থামিয়ে দেখতে হয় শহরের তির্যক-জ্যামিতিক আলোছায়ার বিন্যাস, রাতের হাই-কন্ট্রাস্ট দৃশ্যাবলি। ব্যাক লাইট, কাট লাইট-এর কী যে নান্দনিক প্রয়োগ! ক্লাসিক নয়্যারের মতোই গুরু দত্তর ছবি বিষাদময়। এক উদাস বিষণ্ণতায় মজে থাকে গুরু দত্তর ছবির নায়ক— যে একটুকরো ব্যথা তার নিজের মুখেও লেগে থাকে একচিলতে জলভরা মেঘের মতো। তাই গুরুর ছবির হিরোর চরিত্রে অভিনয়, গুরুর নিজের থেকে ভাল আর কেই-বা করতে পারত!
আদতে, সত্যিই গুরু দত্ত-র ছবির গল্পের আলো-আঁধারিতে মিশে আছে তাঁর নিজের বেঁচে থাকার গল্প, অথবা উল্টোটা— গুরু দত্ত-র বেঁচে থাকা, তাঁর জীবন বুনে উঠেছে তাঁর সিনেমার মতো করেই। ১৯৫৯-এ বানানো ‘কাগজ কে ফুল’ ছবিটি বক্স অফিসের হিসেবে ‘ফ্লপ’ হয়, অথচ আগামী বছর তিরিশের ভেতর একই ছবি ‘কাল্ট ক্লাসিক’ হয়ে ওঠে। ছবিটি দেখতে-দেখতে অবাক হয়ে ভাবি যে, ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৬— এই কয়েক বছরের মধ্যেই গুরু দত্তর জীবন যেন এই ছবিটিকে ফলো করে এক অলৌকিক সমাপতনে মিলেছে।
মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়েসের মধ্যে প্রবাদ হয়ে যাওয়া এই ফিল্মমেকারটি তাঁর সিনেমার নায়কদের মতোই এই ক্রমাগত হতাশ-করে-চলা দুনিয়া আর দুনিয়াদারিকে সদর্পে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শোনা যায়, তাঁর চোখ ছিল আধখোলা, হাতের ভঙ্গি ছিল এমন যেন কিছু একটা বলতে শুরু করেছিলেন।
সিনেমাগুলিতে ওয়াহিদা রেহমান তাঁর প্রেয়সী, তাঁর বেঁচে থাকার গল্পেও তাই; গীতা দত্ত তাঁর সব ক’টি সিনেমার নেপথ্য নারীকণ্ঠ, আসল জীবনে তাঁর সঙ্গী, তাঁর স্ত্রী গীতা। জনি ওয়াকার তাঁর সিনেমা থেকে রোজকার ওঠাবসায় জিগরি দোস্ত। এভাবে ‘রিল’ আর ‘রিয়েল’-এর একে অপরকে আঁকড়ে, জড়িয়ে-মড়িয়ে মিশে যাওয়া এক বিস্ময়। যে-বিস্ময় আজও ফুরনোর নয়। ‘প্যয়াসা’র মূল চরিত্র, ‘বিজয়’ নামের মাথা-না-ঝোঁকানো কবিটি অথবা ‘কাগজ কে ফুল’-এর জীবনের কাছে হেরে যাওয়া এক সময়ের দাপুটে ফিল্মমেকার ‘সিনহা সাহাব’ অথবা আশ্চর্য এক প্রতিভাদৃপ্ত যুবক, বসন্ত কুমার শিবশঙ্কর পাডুকন, পরবর্তী সময়ে গুরু দত্ত পাডুকন এবং আরও পরে শুধুই গুরু দত্ত নামে যিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৬ অবধি কিছু অদ্ভুত ব্যতিক্রমী বলিউড ছবি বানিয়ে তিনবারের বার আত্মহননের চেষ্টায় সফল হয়ে মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে আস্তিনটি গুটিয়েই বিদায় নিয়েছিলেন— এদের মধ্যে কে যে কার চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কে যে বাস্তব আর কে বাস্তবাতীত, তা গুলিয়ে যায়।
মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়েসের মধ্যে প্রবাদ হয়ে যাওয়া এই ফিল্মমেকারটি তাঁর সিনেমার নায়কদের মতোই এই ক্রমাগত হতাশ-করে-চলা দুনিয়া আর দুনিয়াদারিকে সদর্পে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শোনা যায়, তাঁর চোখ ছিল আধখোলা, হাতের ভঙ্গি ছিল এমন যেন কিছু একটা বলতে শুরু করেছিলেন। কে জানে কী বলতে চাইছিলেন গুরু দত্ত শেষ সময়টুকুতে! তবে মনে পড়ে যায়, ‘প্যয়াসা’-র দেশ-কাল-সময়ের সীমানা পেরনো গানগুলির একটি— ‘জানে উও কেইসে লোগ থে জিন কো প্যার সে প্যার মিলা’ (সুরকার, অবশ্যই এসডি বর্মন)র একটি শট— রাশি-রাশি বই ঠাসা তাকে হেলান দিয়ে, একদিকে ঈষৎ হেলে দাঁড়িয়ে আছেন ‘বিজয়’, ক্যামেরা পিছনে ট্র্যাক করে, বইয়ের তাকটাকে ক্রস-এর মতো লাগে এবার আর তার সামনে হাতদুটো দু-পাশে এলিয়ে ক্রসবিদ্ধ গুরু দত্ত, যে লাইনটি গাইছেন তা হল— ‘দেঙ্গে উওহি যো পায়েঙ্গে ইস জিন্দেগি সে হম’।




