ভি এম এল ইউনাইটেড কিংডম। ব্রিটিশ মুলুকের অন্যতম জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন সংস্থা, যারা এক অদ্ভুত ক্যাম্পেন চালিয়েছে বিশ্বকাপ আবহে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও কয়েকটি দেশের পতাকার ছবি তারা ব্যবহার করেছে বিভিন্ন মেয়েদের মুখ-চোখ-হাত সহ বিভিন্ন অংশের ক্ষতচিহ্নের ওপর। কেন এরকম ক্যাম্পেন? তার পিছনে লুকিয়ে থাকা গল্পটি সামনে নিয়ে আসাই লক্ষ্য।
একটি পরিসংখ্যানের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিক্ষেপ করায় এই সংস্থা। ইংল্যান্ডের ল্যাংকাস্টার ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ম্যাচের দিন যদি ইংল্যান্ড জেতে, তাহলে মহিলাদের ওপর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের ঘটনা ২৬% বেড়ে যায়; এবং ইংল্যান্ড হারলে তা বেড়ে যায় প্রায় ৩৮%। শুধু ইংল্যান্ড না, এমনই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে ইউরোপের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও। ইউরোপের এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দ্য চ্যারিটি উইমেন্স এইড ‘দ্য আদার কিক অফ’ বলে একটি ক্যাম্পেন চালু করে, যাতে দেখা যায়, ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ পুরুষেরা যে-সময়ে খেলা শেষে ঘরে ফিরছেন, সেই সময়েই হিংসার ঘটনা বাড়ছে প্রত্যেক ম্যাচ ডে-তে।
আরও পড়ুন: প্যালেস্তাইনের পতাকা হাতে প্রতিবাদী, আবার স্বৈরাচারীরও পক্ষে?
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…
প্রিয় দল ম্যাচ জিতলে কিংবা হারলে, দুই ক্ষেত্রেই এই হিংসার ঘটনার কারণ কী? এর উত্তরটি দিচ্ছেন দ্য উইমেন্স এইড-এর সিইও ফারাহ নাজির। তিনি বলছেন, এই প্রবণতা বাড়ছে এক বিশেষ আচরণগত প্রবণতা থেকে। একজন নিগ্রহকারী, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই হিংসার মাত্রা বাড়িয়ে চলেছেন। তিনি অবচেতনে স্ত্রী, গার্লফ্রেন্ড কিংবা মায়ের ওপর হিংসার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন তারই ভেতরে শৈশব থেকে গড়ে ওঠা লিঙ্গ-বৈষম্যের শিকড়টির টানে।
মেয়েদের খেলা দেখা প্রসঙ্গে যে-সহজাত তাচ্ছিল্য প্রতি মুহূর্তে ছুড়ে দেয়া হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায়— ‘বল তো অফসাইড কীভাবে হয়’ কিংবা ‘মেসি কোন দেশে খেলে বল তো’-র মতো ক্লিশে এবং গতে-বাঁধা অপমানের মধ্যে যে-সাবলীল হিউমর লুকিয়ে আছে বলে পুরুষেরা মনে করেন, তাদের ভেতরেই আসলে লুকিয়ে থাকে এক প্রকার হিংস্রতা। শারীরিক বল ও পৌরুষের আস্ফালন যে-সামাজিক নির্মাণ গড়ে তুলেছে এতকাল, যেখানে একজন পুরুষের চোখে ফুটবলের মতো বডি কনট্যাক্ট গেম-এ একজন নারীর ভূমিকা কেবলই দর্শকাসনে বসা স্বামী কিংবা বয়ফ্রেন্ডের পাত্রে সুরা ঢেলে দেওয়া এবং রাতে জয়-পরাজয়ের উচ্ছ্বাস থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ডিনার টেবিল সাজানো— সেই নির্মাণই বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টে উন্নত-অনুন্নত সমস্ত দেশে বাড়িয়ে দেয় ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স৷
ব্রাজিলের মার্তা, ইউএসএ-র মেগান র্যাপিনোরা স্বতন্ত্র দ্বীপ হয়েই থাকেন আজও। ফুটবল বিশ্বকাপের আগে ‘মহিলা’ শব্দটি না বসালে যেমন তা পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার কায়েমের মঞ্চ হয়ে যায়, যে-মঞ্চে যাবতীয় স্ট্যাটিস্টিক্সই লেখা হয় কেবল পুরুষদের বিশ্বকাপের হিসেবকে মাথায় রেখে— তেমনই বিশ্বব্যাপী ফুটবলের সবচেয়ে বড় ইভেন্টে প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের উচ্ছ্বাস কিংবা বিষাদের পর যে-অ্যাড্রিনালিন রাশ, তা লিঙ্গবৈষম্যের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে দেয়। প্রথম বিশ্বের তাবড়-তাবড় দেশে যেখানে লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে মানবাধিকার রক্ষাকারী ও মহিলাদের সুরক্ষাপ্রদানকারী বিরাট সংস্থারা সারা বছর কাজ করেন, সেখানেই এই হিংসার ঘটনা ঘটে সর্বাধিক। বহু গবেষক অবশ্য এর জন্য খানিক দায়ী করেছেন অ্যালকোহলকে, কিন্তু গবেষণা থেকে প্রতিদিন আরও দৃশ্যমান হয়ে যায় যে এই প্রবণতার শিকড় অনেক গভীরে।
আমাদের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা লিঙ্গবৈষম্যের বীজটি কখন যে মহীরুহ হয়ে ওঠে, তা বোঝা দুষ্কর। আর মজার বিষয় হল, খেলার জয়-পরাজয়ে সামান্য অবদান রাখতে না পারার যে-খেদ, মাঠে নেমে বলে সপাটে শট করতে না পারার যে-গ্লানি, তা-ই বেরিয়ে আসে শারীরিকভাবে দুর্বলের ওপর আঘাত করার মধ্যে দিয়ে। আবার উচ্ছ্বাসের মুহূর্তে, ঠিক যে-মন আমাদের দিয়ে অসহায় কুকুর কিংবা বিড়ালের ল্যাজে পটকা ফাটানোর মতো ঘৃণ্য কাজকে অনুমোদন করে, সেই মন-ই ঘরে থাকা শারীরিক শক্তিতে কম দড় মানুষটির গায়ে হাত তোলার লাইসেন্স জুটিয়ে দেয়। ল্যাংকাস্টার ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপিকা বলছেন, শারীরিক নিগ্রহ তবু নথিবদ্ধ থাকে বলে তার হিসেব পাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বকাপ চলাকালীন মহিলাদের ওপর ঘটে চলা ‘ভার্বাল অ্যাবিউজ’টির কোনও বিচার নেই আজও।
‘তুই কিছু বুঝিস ফুটবলের?’— এই হালকা চালের কথা দিয়ে যে-অপমান শুরু হয়, তা-ই বাড়তে-বাড়তে ঢেকে দেয় আকাশ৷ বিশ্বকাপের আকাশে যে দুর্বল ও সবলের পূর্ব-নির্ধারিত ধারণাটিকে ভেঙে গুড়িয়ে দেবার রোদ ওঠে— সে-রোদে একদিন স্নান করবে এই অন্ধকারটুকুও।




