ঘড়ি দেখা বারণ
পায়ের নীচে পাহাড় আমার বরাবর না-পসন্দ। পাহাড়কে পায়ের নীচে রাখবেন দুঃসাহসী পর্বতারোহীরা। আমার মতো হিজিবিজি লোক ঘাড় উঁচু করে দেখবে বরফমোড়া পাহাড়চুড়ো। কিন্তু অনেক সময়ে কার্যকারণে পাহাড় চলে আসে নীচে কিম্বা পাশে, প্লেনের জানালা দিয়ে একটু উঁকি মারলেই সে ধরা দেয়। যেমন হল সান হোসে থেকে লাস ভেগাস যাওয়ার সময়ে। সিয়েরা নেভাদা পর্বতশ্রেণির ওপর দিয়ে উড়ে গেল প্লেন। আর একটু পরেই এল মরুভূমি, মোজাভে যার নাম। এয়ারহোস্টেস বলল, ‘ইউ আর লাকি। ডানদিকে সিট পেয়েছ। আর অপরাহ্ন বেলায় পাহাড়কে খুব সুন্দর দেখায়।’ অমনি আমার মনটা আরও ভাল হয়ে গেল। ওই যে বলল, সৌভাগ্যের কথা! আমার মতো অতি-পজিটিভ মানুষের স্বভাব হল, যে-কোনও পরিস্থিতিতে আলো খোঁজা। এখন আমার মনে হতে লাগল, ভাগ্যিস ফ্লাইট দেরি করে ছাড়ল, তাই তো বিকেল হয়ে এল, আর পাহাড়-মরুভূমির রূপ আরও খুলল।
গোধূলিবেলায় নামলাম লাস ভেগাস এয়ারপোর্টে। চোখধাঁধানো আলোর খেলা চারপাশে। বিশাল তো বটেই, মোট ৯০টা গেট। অত কিছু দেখার সময় নেই, তাড়ায় আছি। হোটেলে চেক ইন করার কথা দুপুরে, এ তো সন্ধে গড়িয়ে গেল। অবশ্য কাছেই বিখ্যাত (নাকি কুখ্যাত?) ভেগাস স্ট্রিপে হোটেল বুক করেছি আমরা। মাত্র আড়াইদিনের ট্রিপ, প্রথম থেকেই যদি সিন সিটির হৃদয়ের কাছাকাছি না থাকি, পাপের দুনিয়াটা দেখব কীভাবে? হোটেলের সামনে পৌঁছে ভেতরে ঢুকব কী, বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলাম মুগ্ধ হয়ে। আলোর খেলায় যেন স্বপ্নরাজ্য। এক্সক্যালিবার হোটেলটা অবিকল রূপকথার ক্যাসল, যেখানে থাকে সিন্ডারেলা, রাপুনজেল, স্লিপিং বিউটি। দলের একজন তাড়া দিল। ভেতরে ঢুকে চক্ষু চড়কগাছ। রিসেপশনের সবকটা ডেস্কের সামনে সাপের মতো লম্বা লাইন। আসলে এটা লম্বা উইকএন্ড, আমেরিকায় ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবসের ছুটি তার পরেও দিন পাঁচেক গড়ায়। তাই ট্যুরিস্টের এমন ভিড় ভেগাসে। ‘নাইট ইজ টু ইয়ং’ কথাটা নেহাতই ‘বাসি’ এই ফুর্তিবাজ শহরে, এখানে ঘড়ির কাঁটায় রাত মাপে না কেউ। সব মিটিয়ে ঘরে পৌঁছতে আটটা বাজলেও, তাই এতটুকু ঘাবড়ালাম না আমরা। সামনে পড়ে আছে গোটা রাত।
‘ওয়েলকাম টু ইন্ডিয়ান ল্যান্ড’ লেখা হলেও ভারতীয়দের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই এই দ্বীপের!
পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৪৭…
আমাদের দলে ছিল এক এক্সপার্ট ট্রাভেল ব্যবসায়ী, আগে বহুবার এসেছে ভেগাসে। সে দাবি করল, সে নাকি যতবারই ক্যাসিনোতে খেলেছে, ততবারই বিরাট টাকা জিতেছে। এরকম আমি আগে শুনেছি ভেগাস ফেরত লোকজনের মুখে, তাই বিশ্বাস করলাম না মোটেও। যদিও অসুস্থ থাকায় নিজে গেল না হোটেল ছেড়ে, কিন্তু সে অসাধারণ গাইড করল আমাদের। এক্সক্যালিবার থেকে ক্যাসিনোর প্রাণকেন্দ্র মান্দালয় বে পর্যন্ত ট্রাম যায় টানেলের ভেতর দিয়ে। আমাদের পথে নামতেই হল না। ট্রামে টিকিটও লাগে না। মহানন্দে আমরা চারমূর্তি মানে চার নারী পৌঁছে গেলাম মান্দালয় বেতে। পৌঁছেই ধাঁধাঁ লেগে গেল। চোখ, কান মাথা ভোঁ ভোঁ। মান্দালয় বে আসলে একটা বিরাট রিসর্ট। সেটা বড় ব্যাপার নয়, এর থেকে ঢের বড়-বড় হোটেল-রিসর্ট আছে ভেগাসে। তবে কেন সবাই ছোটে মান্দালয় বে-র দিকে? কেন একে বলা হয় এন্টারটেনমেন্ট ডেস্টিনেশন? কারণ এর নীচের তলা জুড়ে আছে বিশাল ক্যাসিনো, লাইভ মিউজিক, লাইভ শো। ‘দ্য লায়ন কিং’, ‘মাম্মা মিয়া’র মতো সাত থেকে সত্তরের জন্য সুপারহিট লাইভ শো যেমন আছে, তেমনি আছে কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য স্ট্রিপটিজ আর ক্যাবারে শো। ফ্যান্টাসি বা রুজ-এর পোস্টার দেখেই ভিরমি খাবে বাঙালি, মঞ্চে দেখা তো বদহজম!

মান্দালয় বে-র ভেতরটা একদম ভুলভুলাইয়া। কোথাও আলোর বন্যা, আবার কোথাও এমন আঁধার সৃষ্টি করে রেখেছে যে, পাশের লোকের মুখ দেখা যায় না। ড্রামস, গিটার, উকুলেলে, স্টিল প্যান কিছু বাকি নেই লাইভ মিউজিক কর্নারে। এর সম্মিলিত আওয়াজে কানে তালা ধরে গেছে শুরুতেই। নিজেদের মধ্যে দরকারি কথাও বলা যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার ফোন করছে ট্যুর অপারেটর, কাল আমাদের বুকিং আছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যাওয়ার। অনেক চেষ্টা করলাম কোনও একটা কোণে গিয়ে কথা বলার, কিন্তু বৃথা, এপার-ওপার কিছুই শোনা, বলা যাচ্ছে না। এদিকে টেনশন হচ্ছে, কাল ভোরে বাস নিতে আসার কথা হোটেলে, কিছু কি বদল হল শিডিউল? অতএব আমরা ঠিক করলাম, এখান থেকে বেরিয়ে বরং বাইরে ক্যাসিনোতে যাই। আওয়াজ কম হবে।
ক্যাসিনোতে আমরাই বোধহয় একমাত্র আজব জীব, যারা শুধুই বেড়াতে এসেছে। এখানে শ’য়ে শ’য়ে খেলুড়ের (নাকি জুয়াড়ি!) কথা একটা বিরাট গুঞ্জনের মত শোনাচ্ছে, আর মাঝে-মাঝে জেতা-হারার হুল্লোড়ে চিৎকার। ফোনে কথা শেষ হতেই, আমরা এলোমেলো ঘুরতে লাগলাম। জুয়া যে কত কিসিমের হতে পারে, ভেগাসে না গেলে কেউ জানবে না। কোথাও তাস, কোথাও চাকতি, কোথাও বা টেবিলজোড়া বোর্ড গেম। এর মধ্যে ‘রুলেট’, ‘পোকার’ এরকম দু-চারটে নাম ছাড়া বাকি অচেনা। ‘ব্ল্যাকজ্যাক’, ‘ক্র্যাপস’, ‘ব্যাকারটি’ এইসব নাম শিখলাম। একেবারে জেমস বন্ড সিনেমায় যে-রকম দেখায়, সে-রকম সোনালি চুলের, ছোট্ট পোশাক, লম্বা পায়ে ফিশনেট আর স্টিলেটোয় হাসিখুশি মেয়েরা ট্রেতে পানীয় নিয়ে এ-টেবিল, ও-টেবিল ঘুরছে। ডাক পেলে তারা বসেও পড়ছে টেবিলে। খেলছে না, চিয়ারলিডার হিসেবে চেঁচাচ্ছে বা হাততালি দিচ্ছে। এরা কিন্তু ভেগাসের বিখ্যাত শোগার্ল নয়, তাদের দেখা যায় বিচিত্র সাজে পথে, রসিকজন জানে কী করণীয়। এখানকার মেয়েরা শুধুই ওয়েট্রেস, তবে স্পেশাল ট্রেনিং নিতে হয় ভেগাসের ক্যাসিনোতে কাজ করার জন্য। বেশিরভাগ টেবিলে একদিকে ডলার রাখা স্তূপ করে, ঠিক যেমন দেখা যায় হলিউড মুভিতে। লালমুখো সাহেবরা খেলছে আর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে। খুব মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ খেলছে কেউ, এমনটা কিন্তু নজরে পড়ল না। ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে হাসতে-হাসতে, খোশগল্প করতে-করতে খেলছে। এক সঙ্গিনী বলল, ‘এটা কি দাবা যে সিরিয়াসলি খেলবে? জাস্ট ফর ফান ওরা খেলছে।’ ভাবলাম, তাহলে হার-জিতটাকেও কি সিরিয়াসলি নেয় না ওরা? সিনেমাতে যে দেখি, গুলিগোলা চলে ক্যাসিনোতে? আমাদের খেলার জন্য ডাকাডাকি করছিল ম্যানেজার গোছের লোকেরা। আমরা হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ক্যাসিনোর সবচেয়ে সহজ আর সস্তা খেলার জায়গা আলো জ্বলা স্লট মেশিনগুলো। চাকতি ঢোকালে ঘোরা শুরু, যেখানে থামবে সেখানেই হারজিতের ভাগ্য বাঁধা। টিপস একটাই, পেশাদার, অন্তত অভ্যস্ত খেলুড়ে না হলে, একবার জিতলেই পিঠটান দাও। আমরা অবশ্য না জিতেও ওই একবারেই ক্ষান্ত দিলাম। দু-চার ডলার গচ্চা গেল আর কী! ব্রেকফাস্টে একটা বার্গারের দাম হয়ে যেত, ভাবনাটা জোর করে সরিয়ে দিলাম। মধ্যবিত্ত মন আর পকেট নিয়ে কি আর খেলতে নামা যায়! ‘খেলা হবে’ বলতে দম লাগে!
কলকাতার পাতি বাঙালি হলে কী হবে, কয়েক ঘণ্টাতেই যে আমরা পাক্কা ‘সিনার’ (ঠাট্টা করে লাস ভেগাসের বাসিন্দাদের এই নামে ডাকা হয়) হয়ে উঠেছি, তার প্রমাণ, চারজনের কেউ ঘড়ি দেখিনি এতটা সময়। এবার দেখলাম আর চোখ কপালে তুললাম। বারোটার কাঁটা অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে। ভেগাসের পক্ষে সবে সন্ধে, কিন্তু আমাদের তো ‘দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি’ নয়। খবর নিয়ে জানলাম, লাস্ট ট্রাম চলে গেছে হোটেলের দিকে। তাও ভাবলাম, ঘাবড়ানোর কিছু নেই, হোটেল হাঁটাপথে মিনিট কুড়ি। শুনেছি, ভেগাস রাতে ঘুমোয় না। জমজমাট রাস্তা দিয়ে বেশ গল্প করতে করতে চলে যাব। ও হরি! মান্দালয় বের বাইরে পা রেখে দেখি, একেবারে শুনশান। আলো নেই তেমন, লোকজনও নেই। মাথায় আর কোনও বুদ্ধি খেলল না, পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম চারজনে।
শুনেছি এই শহরে ড্রাগের রমরমা। দেখছি দু’চারজন নেশাখোর বা পেডলার ঝিমোচ্ছে বসে। হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে আশ্চর্য মেয়েরা, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। কুড়ি মিনিটের পথ মনে হচ্ছে যেন অনন্ত। পেছন থেকে একটা দোতলা বাস আসছে দেখে আমরা চারজন রাস্তায় নেমে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দাঁড় করালাম। এই একটাই সোজা রাস্তা ভেগাস স্ট্রিপের দিকে গেছে, সুতরাং আমাদের হোটেলের সামনে বাসটা যাবে, এটুকু জ্ঞান হয়েছে গত কয়েক ঘণ্টায়। লাস ভেগাসে বাস চালান যখন, মধ্যরাতের ফুটপাথ বদল এই চালক অনেক দেখেছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু চার বিদেশিনীর এই বেপরোয়া বাস-দখল অভিযানে তিনি যারপরনাই বিস্মিত বোঝা গেল। যেখানে সেখানে হাত দেখিয়ে বাস দাঁড় করানোর কলকাত্তাইয়া অভ্যেস কাজে লেগে যাওয়াতে আমরা খুশি। বাসে আর দু-তিনজন যাত্রী ঝিমোচ্ছে। চালক নানারকম স্বগতোক্তি করতে করতে বাস চালাতে লাগলেন। হয়তো আমাদের সম্পর্কেই, ঠিক বুঝিনি। সত্যি, একটু পরে ওই তো দেখা যায় এক্সক্যালিবার, আলো ঝলমলে। আমরা তড়িঘড়ি উঠে দরজার দিকে এগোলাম। ভেবে রেখেছি, বাস থামলে ড্রাইভার সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে যাব টুক করে। একি! হোটেল পেরিয়ে গেল, বাস তো থামল না ধারেপাশে! সৌজন্য ভুলে হাঁই-হাঁই করে উঠলাম, ‘বলে রাখলাম যে নামব?’ খুবই ভদ্র গলায় চালক বললেন, ‘এখানে তো স্টপেজ নেই। অমুক জায়গায় নেমে পিছিয়ে আসতে হবে। আপনারা যেখান থেকে উঠলেন, সেটাও স্টপ নয়, কিন্তু আপনাদের দেখে মনে হয়েছিল ইউ লেডিজ, মাস্ট বি ইন ডেঞ্জার। তাই আমি বাস থামালাম। দিনের বেলা হলে তো পুলিস লাইসেন্স কেড়ে নিত।‘ শেষমেষ যেখানে নামলাম বাস থেকে, সেই জায়গাটা হোটেল থেকে বেশ দূর। রাত একটা বেজে গেছে, এই জায়গাটা আরও নির্জন, উল্টোদিকে লোহার ফেন্সিংয়ের ওপারে একটা ছোট প্লেন দাঁড়িয়ে আছে। ভাগ্যিস উবের নামক একটি আন্তর্জাতিক পরিবহণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল এই পৃথিবীতে। বেশিরভাগ দেশে একই অ্যাপ থেকে বুক করা যায় ক্যাব। এখানেও ত্রাতা উবের। কিছুক্ষণের চেষ্টায় উবের এল এবং আমরা হোটেল পৌঁছে গেলাম মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। ক্যাবে আলোচনার বিষয় ছিল, কেন মান্দালয় বে-র সামনে কারও মাথায় এল না উবেরের কথা? এক্সক্যালিবার হোটেলের চত্বরে ঢোকামাত্র ভোল পাল্টে গেল। আলো, বাজনা, কোলাহলে গমগম করছে। কলির সন্ধে যাকে বলে! কে বলবে বাইরে ঘোর সন্নাটা! আমাদের হাঁটাচলাও বদলে গেল। ভাবখানা এই, নিশির ডাকে আমরাও সাড়া দিতে জানি। শুধু কি বিগ বয়েজ? এই দেখো, বিগ গার্লস অলসো প্লে অ্যাট নাইট!




