অলিগলির কালীঘাট: শেষ পর্ব

Representative Image

পাঁকেও পদ্ম ফোটে!

থাক। আর লিখব না। অলিগলির কালীঘাটে আর হাঁটব না। শিশুদের কন্ট্রোল থাকে না, আর বুড়োদের কথায় হোক, কী লেখায়, সব আগল খুলে যায়। আমারও নাকি তেমন হচ্ছে! এক বন্ধু ফোন করেছিল— কী লিখছিস! তুই লেখক হয়েছিস, তুই এসব বললে তোর গায়ে কেউ কাদা দেবে না। কিন্তু আমাদের সংসার কাছে, বউ-ছেলে-বউমা-নাতি-নাতনি নিয়ে থাকি। লিখিতভাবে এসব থাকা কি ঠিক? আমরা সমাজে থাকি।

না ঠিক নয়। আসলে যে-কোনও শিল্পীই হয়তো সমাজচ্যুত মানুষ হন, অন্তত যখন লিখতে বসেন। কিছুদিন আগে, আমার সঙ্গে দেবুর দেখা হল। সেও এ-কথা, সে-কথার পর হালকা গলায় বলল, ‘তুই খোকনদাকে নিয়ে কিছু লিখেছিলি? নাম বদলে দিয়েছিলি বটে, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ওটা খোকনদা চেনা যাচ্ছিল। ওর মেয়ের সঙ্গে একদিন দেখা, অভিযোগ করল, ‘বাবা কবে মরে গেছে। এখন মাতাল বললে কেমন লাগে কাকু…বাবার জ্বালা আমরা সবচেয়ে বেশি ভোগ করেছি। তবু দেখো, আমাদের ঘরের দেওয়ালে বাবার ছবি আছে, সেখানে ফুলও দিই, আসলে বাবা তো…’

ঠিক কথা। আমি বললাম, ‘কী করি বলত? মানুষ ছাড়া কি কালীঘাট হয়? লিখতে বসলে, গুটি-গুটি পায়ে চেনাজানা লোকজন চলে আসে।’
‘আরে বাঁধ দে। মুখে হাত চাপা দে।’
‘তাই করতে হবে।’
‘আহা, আমরা চুনোপুঁটি— আমাদের ছেড়ে দে না, ভাই। লেখ না, ওই বাড়ি, ওই পরিবারের কথা লেখ। পাবলিক খাবে। খুব তো যেতিস। এক ভাই তো তোর খুব বন্ধু হত। খেলা-পড়া, দিন-রাত একসঙ্গে ছিলি। শুনেছি, পরে তোদের অফিসে গেলে, তোর পাশে গিয়ে বসে পড়ত। আর তারপরে নিশ্চয়ই চিনতে পারত না। সেই সব কথা লেখ। সাউথ সাবার্বান ভার্সেস মিত্র স্কুলের ম্যাচ। লিখে দে, হরিশ পার্কটাও গিলে খেয়ে নিয়েছে। ওর পারমিশন ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না।

দেবু, মিত্রতে পড়ত। হরিশ পার্কে শিবাজিদার কাছে জুডো শিখত। ওকে বোঝানোর চেষ্টা করি, লেখায় বিদ্বেষ থাকে না। প্রতিশোধও নয়। তবে প্রতিবাদ থাকে। এক্ষেত্রে আমার কোনও ফিলিংসই নেই। আসলে সাহস নেই। দেবু আবার ফিসফিস করে। এর কথা লিখলি, ওর কথা লিখলি, পাপাইয়ের কথাটাও লেখ। লিখে দে— গল্পের মতো করে। দেবুর ইন্ধন দেওয়া দেখে হাসি পায়। পাপাইয়ের সব খবরই আমি জানি, কিন্তু লিখিনি, লিখব। কত কিছুই তো বাকি থেকে গেল। ভয় হয়, আমি কাউকে আঘাত করলাম না তো? লেখার সময়ে কতজন কথা বলতে চাইল, তাদের মুখ চাপা দিলাম। আমি কে হে তোমাদের বঞ্চনার কথা লিখব? কতজন চিৎকার করল, তাদের রাগ ক্ষোভ উগরে দিল, শুনলাম না। কেউ হয়তো কাঁদল, দেখলাম না। ছ’মাস বয়েস থেকে ক্লাস টুয়েলভ। এটি প্রথম পর্ব। তারপর কলেজ জীবনে আসা যাওয়া, দ্বিতীয় পর্ব। আর তৃতীয় পর্বে চাকরিজীবনের ফাঁক-ফোকরে ছেঁড়া-ছেঁড়া কালীঘাট আমার পথচিত্রের পাথেয়।

কালীঘাটের চোরদেরও স্ট্যান্ডার্ট ছিল এককালে!
পড়ুন: অলিগলির কালীঘাট পর্ব ২০…

বাবা ভয় পেয়ে কালীঘাট থেকে টুয়েলভে পড়ার সময়েই আমাদের নিয়ে হরিদেবপুরে চলে এসেছিলেন। বাবাও হয়তো ভয় পেয়েছিলেন। তাইজন্যে কালীঘাট ছেড়েছিলেন। আমার এক দাদা, সম্পূর্ণ ভাবে মাতাল, নিষিদ্ধপল্লিতেও তার যাতায়াত ছিল। অন্য এক দাদা কংগ্রেসী মস্তান। আমি এক পুত্র। কথায় বলে— এক তরকারি নুনে পোড়া হলে চলবে কেন? বাবা তাই কালীঘাট ত্যাগ করাই সাব্যস্ত করলেন। বন্ধু-বান্ধব, পুরো শৈশব-কৈশোর কালীঘাটের অলিগলি ও মাঠেঘাটে রেখে চলে এলাম। নিজেকে কেমন যেন বিতাড়িত লাগত। শহর ছেড়ে অমন পচা গ্রামে। আমার যাত্রা বড়ই করুণ ছিল। তুমুল বৃষ্টির মাঝে ছিল আমার সেই যাত্রা। মানুষজনকে অচেনা মনে হত।

অন্ধকার রাস্তা। সরু-সরু পথ। হয় এবড়োখেবড়ো, নয় কাদা। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হলে কানকো ভর করে উঠোনে কই মাছ চরে, বেশি বৃষ্টিতে শোল মাছ এসে, ঘরের দুয়ারে আছড়ে পড়ে। দিনে দুপুরে এ-পুকুর থেকে ও-পুকুরে রাস্তা পারাপার করে কচ্ছপ! সাপ দেখলে আতঙ্কে থাকি, মা বলে— ধুস্স ও জলঢোড়া! দু’দিন ছাড়া-ছাড়া বাড়িতে চিতি-বোরা সাপ বের হয়। মা মারে। সাপও মাকে কামড়ায়। তবু মা খুব খুশি। নদীর ধারের মেয়ে, পুরনো জীবন ফিরে পেয়েছেন। আর, আমি-দিদি-বোন— সব হারিয়ে ফেলেছি। দু’চোখে অন্ধকার। বাবাকে বুঝতে পারি না। আমার ভরসা কবিতার বই। আমি কাদের সঙ্গে মিশব— ওদের সবার খালি গা, পরনে লুঙ্গি। অল্পবয়সি মেয়েরা আমাদের জ্যাঠাদের পুকুরে চান করে, আর অদ্ভুতভাবে আমাকে দেখে হাসে। ওরা তুমুল বাঙাল কথা বলে। যার অনেক কথাই আমি বুঝি না। হরিদেবপুরে কারেন্ট চলে গেলে ভাবতাম, এখন কি কালীঘাটে লোডশেডিং? তাহলে আমাদের সব বন্ধুরা এখন বেরিয়ে পড়েছে— এদিকে-ওদিকে ভূত হয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
কালীঘাটে ভূতের ভয় ছিল না, সাপের ভয় ছিল না, গুণ্ডা মস্তানের ভয় ছিল না। হরিদেবপুরে যা ছিল, ইঞ্চিতে-ইঞ্চিতে। প্রতি মুহূর্তে ভূত যেন জড়িয়ে ধরত। এদিকে-ওদিকে সাপ বেরুত। দু’একদিন ছাড়া-ছাড়া লাশ মিলত। আমি কালীঘাটের দিকে ছুটে যেতাম। ওদের হাঁ করে নতুন এক দেশের গল্প শুনত।

ক্রমশ আমার কাছে, কালীঘাট হল হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা! সকাল বিকেল ও রাতে ডাকে। কলেজ যাই। ফেরার পথে পাড়ায় ঢুকি। বেশিরভাগ সময়েই কাউকে পাই না। সন্ধের মুখে বাড়ি ফিরি। দেরি হলে— মায়ের জর্জরিত প্রশ্ন— তুই কি কালীঘাট গিয়েছিলি? কালীঘাট তো যেতেই হবে— কলেজ যে আশুতোষ। বন্ধুরা যে ওখানে।

সে-সময়ে চিন্টু সম্পূর্ণভাবে গলির ভেতর হারিয়ে গেছে। ওই পর্বে একদিন শুনলাম, রুমির প্রমোশন হয়েছে, রুমি নাকি কালীঘাট ছেড়ে সোনাগাছি চলে গেছে। যে খবর দিল, সে হাসতে-হাসতে বলল— রুমির আর মডেল হওয়া হল না। চিন্টু হেরে গেল। তবে ক’টা শাড়ির দোকানের বিজ্ঞাপন করেছিল। চিন্টু প্রবল মদ খায়। পান খায়, সিগারেট খায়, খইনি খায়। যে বন্ধুর বাবাদের দোকান ছিল, তারা ব্যাবসায় বসে গেছে। কয়েকজন চাকরির চেষ্টা করেছে। পড়াশোনা শেষে, চাকরি করতে ঢুকেছি। নাইট-ডিউটি থাকলেই, আগেভাগে সন্ধের দিকে কালীঘাট চলে যাই। আড্ডা মেরে ২০৪ নং বাস ধরে অফিস ঢুকি। এমনই এক রাতে, হাজরা মোড়ের এক মহিলা, আমার থেকে টাকা চাইল। সে কোনও খদ্দের পায়নি। চেনা-জানা লোকের কাছ থেকে যেমন মানুষ ধার চায়, তেমন। ধার দিলাম। ফেরত পেয়েছি। পরে তাকে নিয়ে গল্পও লিখেছি, ‘হাজরা মোড়ে চকচকে রোদ’। এইসব ধুলোকণা আমার কাছে অমূল্য। জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। রবীন্দ্রনাথ আঁকড়ে ধরেছি।

মর্নিং-ডিউটি হলে, সন্ধেবেলায় চক্রবর্তী পাড়ায় চলে আসি। রাতে বাড়ি ফিরি। সেই পর্বে দেখি, চিন্টুর বাবা নেই, মা নেই, একার অদ্ভুত এক জীবন। খুব কষ্টে ওঁরা পৃথিবী ছেড়েছেন। চিন্টুর অভিভাবক ও অ্যাসিস্টেন্ট এখন এক কাঠের মিস্ত্রি। সে ওই বাড়িতেই থাকে। সে ভাত থেকে মদ সব গুছিয়ে রাখে। খইনি ডলে দেয়। একদিন দুম করে চিন্টু বিয়েও করে ফেলল, এক মাচা গায়িকাকে। ওদের পুত্রসন্তান হল। আমি তখন চাকরি করি। চিন্টু কী করে জানি না। ওর বউ গান করে।

ওই পর্বের পরের দিকে একদিন, একজন খুব আক্ষেপ করে বলল— ‘চিন্টু তোর বন্ধু। তুই ওকে একটা কথা বলবি? তুই তো মাঝে-মাঝেই ওদের বাড়ি যাস, আড্ডা মারিস শুনি—।’ ‘কী কথা বলো?’ ‘ওর বউ, ওর কোলে ছেলে দিয়ে রাস্তায় পাঠায়। যাতে চিন্টু মদের ঠেকে না যেতে পারে। আর ও কী করে জানিস? গলির মেয়েদের কাছে ছেলেকে জমা করে, মদের ঠেকে যায়। ওর ছেলে গলির মাগিদের কোলে-কোলে ঘোরে। বল এটা কি ঠিক?’ ঠিক বা বেঠিক আমি জানি না। ক্লাস এইট-নাইনে পড়ার সময়ে চিন্টু গলির মেয়েদের কোল পেয়েছে। ওকে আমি কী বলব? শুনবে কেন? আমি চিন্টুকে কিছু বলিনি। ওর স্ত্রী আমাকে আড়ালে ডেকে বলে— ‘তুমি একটু বোঝাও, ও মদে ডুবে যাচ্ছে। সংসার আমি টানি, আর ও ওর বাবা মায়ের কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা নানা ভেঞ্চারে উড়িয়ে দিচ্ছে।’

চিন্টুর নব্যবন্ধু, বিখ্যাত অজয় বিশ্বাস, আমার দাদা। যারা সকালে মদ দিয়ে মুখ ধোয়। আমাকে দেখলে হেঁকে ডাক দেয়। যেন আমি কত ছোট—! আরও পরে একদিন, খবর পেলাম চিন্টু মরে গেছে। একজন দাঁত ঘষে বলল— আপদ গেছে! আপদই বটে।

কালীঘাট গেলে, অল্প বয়স থেকেই আমি মৃত্যুর খবর পাই। কাউকে চিনি, কাউকে শত চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত— গলির যে-সব ছেলেমেয়েরা ছেলেবেলায় আমার সঙ্গীসাথী ছিল, তারা কেউই বেঁচে নেই। চল্লিশ পর্যন্ত ওদের কোটা। ওরা বুড়ো বা বুড়ি হয় না। তার আগে জীবনলীলা শেষ করে। অথচ, মন্দিরের দিকে গেলে— এখনও কত চেনা মানুষ, বাজারের দিকে গেলে এখনও কতজন ডেকে ওঠে। হকার্স কর্নারগুলোতে গিয়ে, একজনের খোঁজ করলে— কতজন বেরিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখে। চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দেয়। তারা সবাই বৃদ্ধ হয়েছে। মাঝে-সাঝে আচমকা আরও কত চেনা মানুষ দেখি শহরের নানা জায়গায়। চাকরি জীবনের প্রথমদিকে, এক মাস্টারমশাই একদিন বললেন, ‘পাপাইয়ের খবর শুনেছিস?’
‘কী খবর?’
‘পাপাই গলির একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। বাড়ি ঘর, বাবা-মা ছেড়ে চেতলার দিকে ঘর ভাড়া নিয়ে আছে।’
পাপাই! অবাক হলাম। ও কবে ওদিকে চলে গেল?
তিনি বললেন— ‘কালীঘাটের বড় টান! তুই এত কেন আসিস এখানে? তোর বাবা-মা কিন্তু তোকে নিয়েও খুব ভয় পান।’
‘কী ভয়?’
‘পড়িসনি? বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।’

কালীঘাট যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিলাম। ভাবতাম— বাবা-মা কি আমাকে নিয়ে ভয় পান! ওঁরা দাদাদের কীর্তি দেখেছেন, দু’একজন বন্ধুর পদস্খলনের কথা শুনেছেন। আমার দিকেও কি ওঁরা ভয়ে-ভয়ে তাকান? হরিদেবপুরের সঙ্গে মানিয়ে নিলাম দাঁত চেপে। ক্রমশ বুঝলাম, মানুষগুলো ভাল। সবাই পূর্ববঙ্গীয়। তারাও প্রবলভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি নতুন প্রাণ পেলাম। তারপর লেখা আর পত্রিকা। অফিস-অফিস-অফিস!

এখন বাবা-মা নেই। তা-বলে ভয় নেই তা নয়। ভয় এখন চারিত হয়েছে আমার স্ত্রী-পুত্রের মধ্যে। একদিন দুপুরে খেতে বসে টিভিতে দেখলাম— এক মহামানব আবিষ্কার হয়েছে। তাকে সারা পশ্চিমবঙ্গবাসী ‘কালীঘাটের কাকু’ বলে সম্বোধন করছে। ‘দিদি’, ‘ভাইপো’, তারপরে এই ‘কাকু’। আমি এক ঝটকায় টিভির দিকে তাকিয়ে বললাম— এ আমাদের স্কুলে পড়ত। ওখানেই তো বাড়ি। ওদের পাশের বাড়িতে হিরন্ময় থাকত, আমার বন্ধু। ওর বোন নূপর। খুব সুন্দরী, কটা চোখ। মহাকালী পাঠশালায় পড়ত আমার বোনের সঙ্গে। স্ত্রী বলল, ‘তুমি কোন মেয়ের কোথায় বাড়ি— সেই দিয়ে রাস্তা চেনো, এগুলো মেনে নিয়েছি। কিন্তু কাকুটাকু চেনার চেষ্টা করো না।’ ছেলে বলল, ‘একই রকম দেখতে হবে— লোকটা তো বেশ বয়স্ক! তোমার বন্ধুর মতো হবে কী করে?’ ওকে বোঝাতে পারলাম না, সে একটা সময় ছিল, যখন বাবার বন্ধুও আমার বন্ধু হত। তার নাম পাড়া। ওরা পাড়া বোঝে না। স্ত্রী বলল, ‘সবাইকে দেখে তোমার চেনা মনে হয়? যত খারাপ লোকজনকে মনের মধ্যে ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছে!’
ছেলে পরামর্শ দিল, ‘ভুলে যাও, নাহলে টিভি চ্যানেলে গিয়ে বলো। খিল্লি হবে।’ আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। ‘আরে ও তো ভাল ছেলে। সাইড ব্যাকে খেলত। বল নিয়ে ঢোকা যেত না। খুব ঠান্ডা মাথার ছেলে! দারুণ ব্লক করত।’

আমি পদবি সুদ্ধু নামও বলে দিলাম। স্ত্রী বলল, ‘ঠান্ডা মাথার ভালছেলে বলেই তো বড়-বড় চোরের তহবিল সামলাত। চোর-দলের ম্যানেজার হয়েছে।’ চুপ করে বসে থাকলাম। ভাল মানুষ ছিল। একসময় ছিল। এখন তার অন্য পরিচয়ে সে ‘কাকু’ হয়ে হারিয়ে গেছে। হয়তো আমি যাকে চিনতাম, এ সে নয়। একই রকম দেখতে, এক নামে দুটো মানুষ থাকতেই পারে। আমি তো আমার চেনা কালীঘাটকে চিনি না। ওখানে হাঁটলে নিজেকেও চিনতে পারি না। এই লেখার শুরুর দিকে, কালীঘাটে ঘুরতে গিয়ে ব্যারিকেডে আটকে গিয়েছি। ব্যারিকেড উঠলে, আর নতুন করে পুরনো রাস্তা দেখার প্রবৃত্তি হয়নি। স্কাইওয়াকে উঠলে ঘামগন্ধ, জবাফুলের গন্ধ পাবেন না। দুপুরেও ঘুষ দিয়ে মন্দিরে ঢোকা যায়। হাঁড়িকাঠ ঘিরে এখন বলিঘর, তবে বোকা পাঁঠা এখনও হাঁড়িকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে গলার বেলপাতা চিবুচ্ছে! কুণ্ডপুকুর যেন সুইমিং পুল। আমি চিনতে পারিনি। সে-দিন মন্দিরের এক সুইপার দেখাল (ঝাড়ুদার নয়)। ওই পুকুরেই রঙিন মাছ ছিল, ওই পুকুরেই কি পাড়ার দু’জন ছেলেকে ভেসে উঠতে দেখেছিলাম? চিনতে পারি না। আদিগঙ্গায় একটা সরু রঙিন ব্রিজ। নীল-সাদা আলো। নৌকা বাঁধা নেই। চিনতে পারি না। হারান মাঝির দোকানে দেখি পেতলের বড়-বড় গামলা নেই। পেতলের ডেকচি নেই। অ্যালুমিনিয়ামের গামলায় চ্যাপ্টা রসগোল্লা ভাসছে! কাঠের বারকোশে গুলি-সন্দেশ হাসছে! দোকানি বলছে— সময় সব খেয়ে নিয়েছে। দুধওয়ালা পার্ক ভ্যানিস হয়ে গেছে। কাঠের চিতে নেই। শীতের রাতেও হরিধ্বনি আসে না। রাস্তায় খই আর খুচরো পয়সা ওড়ে না। সময় বড়ই বলবান। তবে খাঁড়া হাতে এখনও মা কালী আছেন। উন্নয়ন চলছে। আমরা বদলে গিয়েছি। মেনগেট এখন পিছনের দরজা হয়েছে। নির্মল হৃদয় আছে। ভিখিরি আছে, কুকুরের সঙ্গে ভাগ করে খিচুড়ি খায়। দিন বদলাইনি। চোলাই আছে, গাঁজা আছে, মাগিবাড়ি আছে! আছে নয় বেড়েছে। গলি ছেড়ে রাস্তা দখল নিয়েছে। কালীঘাট রোড। ওটা তো সাধারণের যাওয়ার আসার রাস্তা ছিল— ওই রাস্তা দিয়ে আমি স্কুল যেতাম। খেলতে যেতাম। এমন তো ছিল না! যা ছিল, তা আড়ালে ছিল। গলির ভেতর ছিল। কবে বাইরে এল, রাস্তায়? কবে ওটা গলি থেকে বেরিয়ে এসে, গলির মেয়েরা এমন করে দখল করে নিল? তাদের চূড়ান্ত অসভ্যতা, বিশৃঙ্খলতা সাধারণ মানুষের পথচলার দায় হয়ে উঠল! এমন তো ছিল না? ‘ওরা’ গলির বাইরে আসত না। এখন তো হাজরা মোড় পর্যন্ত দখল নিচ্ছে। আর পুলিশের দল সব বড়-বড় ভ্যান ওখানে রেখে, ওদের সঙ্গে দাঁত কেলিয়ে গপ্প করত, আর অপর দিকের দুর্গ আগলাত! এখন জানি না। আর যাইনি অবরুদ্ধ কালীঘাট মুক্ত হতে তাকে নতুন করে খুঁজে পেতে।

এখন বাবা-মা নেই। তা-বলে ভয় নেই তা নয়। ভয় এখন চারিত হয়েছে আমার স্ত্রী-পুত্রের মধ্যে। একদিন দুপুরে খেতে বসে টিভিতে দেখলাম— এক মহামানব আবিষ্কার হয়েছে। তাকে সারা পশ্চিমবঙ্গবাসী ‘কালীঘাটের কাকু’ বলে সম্বোধন করছে। ‘দিদি’, ‘ভাইপো’, তারপরে এই ‘কাকু’। আমি এক ঝটকায় টিভির দিকে তাকিয়ে বললাম— এ আমাদের স্কুলে পড়ত। ওখানেই তো বাড়ি।

সবার মতোই আমার একটা ডাকনাম ছিল। আমি এখনও ছেলেবেলা খুঁজে পাই আমার ডাক নামে। আর সেটা কালীঘাটেই। তার বাইরে আমার কোনও ডাক নাম নেই। ডাক নামটা কালীঘাটের অলিগলিতে ছেড়ে এসেছি। অনেক বছর পরে, হঠাৎই একদিন পাপাইয়ের সঙ্গে দেখা। দীঘায়। স্ত্রী-কন্যা নিয়ে বেড়াতে এসেছে।
পাপাই বলল, ‘তুই একা? তোর বউ কোথায় রে?’
আমি আমার স্ত্রী-ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু পাপাইকে এড়াতে চাইলাম। আলগোছে বললাম— ওরা আছে অন্য কোনদিকে, দেখছি নাতো…। আমি পাপাইয়ের স্ত্রী-কন্যার সঙ্গেও সে-ভাবে আলাপ করতে চাইলাম না। বললাম, ‘ওরা ঘুরছে, আর ওদের ডাকিস না।’ পাপাই বুঝেছিল। ওদের বিচে এগিয়ে দিয়ে হঠাৎ আমাকে বলল— ‘তুই কী ভাবছিস আমি জানি? এ সে নয়।’
‘মানে? আমি তোর কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
‘আমার প্রথম স্ত্রীকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। বা সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’
আমি ওর কথায় কোনও সাড়া দিলাম না। বলল, ‘অনেক চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ভাল জীবন দিতে। ব্যর্থ হলাম। আমি অফিস গেলে কাজের লোকের কাছে মেয়েকে রেখে ও চলে যেত ওর মা-মাসিদের কাছে। বলত আড্ডা দিতে যাচ্ছি। আসলে বিয়ার খেতে যেত। প্রথমদিকে শুনে খুব আপত্তি করেছিলাম। একদিন ওর ব্যাগ সার্চ করে বেশ কিছু টাকা দেখলাম। সন্দেহ হল। ও গৃহবধূ সেজে হোটেলে খেপ খাটতে যাচ্ছিল। কয়লার কালি, ঘুচল না। জানতে পেরে কেঁদেছি। আচ্ছা করে মেরেওছি। তারপর নিজেই চলে গেছে। শুধু মেয়েটাকে ভিক্ষা চেয়ে নিয়েছি। এখন চোদ্দো বছর। চ্যালেঞ্জ নিয়েছি, মায়ের ছায়া পড়তে দেব না। শহর ছেড়ে বারুইপুর চলে গেছি। একটু বড় হতে, ওর মায়ের পরিচয় গোপন করিনি। সব বলে দিয়েছি।’
আমি ওর দিকে তাকিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না, চিন্টুকে জানতাম, রাজুকে জানতাম, তুই কবে ওদিকে গেলি? বাবা-মা, দুই বোন আর পাপাই— সব মিলিয়ে কী সুন্দর পরিবার! তুই তো ভাল করে ফুটবলে লাথি মারতে পারতিস না, সমাজকে লাথি মেরে, একটা গলির মেয়েকে বিয়ে করলি— এটা কেমন করে পারলি! কী সাহস তোর! ততক্ষণে আমার ছেলে লাফাতে-লাফাতে এগিয়ে আসছে, পিছনে আমার স্ত্রী।
পাপাই মাথা নীচু করে চলে গেল।


আমি মাস্টারমশাইয়ের কথা, যা আসলে লীলা মজুমদারের কথা, সেটা ভাবছিলাম— বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না। ভুল, ভুল, এ-কথাটা যেন ভুল হয়। লীলা মজুমদারকে কাউন্টার করি— জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভাল। পাপাইয়ের চ্যালেঞ্জ যেন সফল হয়, ওর মেয়ে সুস্থ ভাল জীবন পাক।
আরও একটা ঘটনা দিয়ে এই লেখা শেষ করে দেব।

হরিদেবপুরে বাড়ি করে চলে আসার পরপরের ঘটনা। একদিন মা বলল— ‘জানিস, একটা বউ মাঝে-মাঝে ভোরবেলা আমাদের বাড়ির সামনে আসে, তারপর ঘুরে চলে যায়। কিছু একটা দেখে। তাকালেই চলে যায়। কিছুই বুঝতে পারি না।’
প্রয়োজন ছাড়া ভোরে ওঠার অভ্যাস নেই। মায়ের বলা কথাটাও ভুলে গেছিলাম। কী এক কাজে একদিন ভোর-ভোর উঠে, আমিও দেখলাম একজন মহিলা। তিনিও আমাকে দেখতে পেয়েই প্রায় পড়ে যেতে-যেতে পালালেন। আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। বেশ কয়েকদিন পরে এক ভোরবেলায় তাঁকে আবার দেখতে পেয়ে, হাতের ইশারায় ডাকলাম। উনি যেন আমার ডাকের অপেক্ষায় ছিলেন। বললেন, ‘আমি দেখেছি, তোমরা এখানে বাড়ি করে এসেছ। আমিও খুব কাছকাছি থাকি। তুমি কোনওদিন কাউকে আমার কথা বলো না।’ আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। ‘আমার ছেলে মেয়ে আছে। ওরা স্কুলে পড়ে। আমার জন্য ও কালীঘাটের পাট তুলে এখানে চলে এসেছে। অথচ কী কপাল দেখ— তোমরা ঠিক এখানেই এলে! আমি ভাল হয়ে গেছি। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদ— সবাইকে নিয়ে আছি। সবাই আমাকে খুব ভালবাসে। আমার সর্বনাশ করে দিও না, ভাই, পায়ে পড়ি। তাহলে আমাকে গলায় দড়ি দিতে হবে।’ আমি চুপ করে শুনছি। ‘আমি তোমাকে এ-কথাটা বলব বলেই, কতদিন ধরে ঘুরছি। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছি না।’ আমি খুব আস্তে আস্তে বললাম, ‘কাকিমা আপনার মনে হয় কিছু ভুল হচ্ছে। আমি আপনাকে চিনি না। আপনার কি কালীঘাট মন্দিরের সামনে ফুলের দোকান ছিল? আপনি কি ফুল বিক্রি করতেন? আমি কেন বলতে যাব? আর ফুল বিক্রি করা কি খারাপ?’ উনি আমার দিকে তাকালেন, একটা স্বস্তির শ্বাস নিলেন। তারপর প্রশান্ত মুখে চলে গেলেন।


আমি লীলা মজুমদারকে ভুল প্রমাণ করে, বড্ড শান্তি পেলাম। পাশাপাশি মনে হল, উনি তো জানোয়ারের কথা বলেছেন, মানুষের নয়। জানোয়ার আর মানুষের মধ্যে এটাই তফাত। এই তফাতের আরও একটা প্রমাণ আছে। যার মা সন্ধের পর নিজের ঘর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতেন। তাঁরই মেয়ে আমাদের গর্বিত বন্ধু একজন সফল খেলোয়াড়, কোচ। দারুণ চাকরি করে। ভিনরাজ্যে সসম্মানে বসবাস করে। আহা জীবন!

আদিগঙ্গার জল কালো থেকে আরও কালো হয়েছে, লড়াকু মানুষও পচে গেছে। খসে গেছে। তবু কালীঘাটের পটচিত্র থেকে কালীঘাটের পথচিত্রে শেষপর্যন্ত মানুষ জিতেছে। মানুষ জিতবে। পাঁকেও পদ্ম ফোটে!
সমাপ্ত