কালীঘাটের চোর
এতদিন কালীঘাট বিখ্যাত ছিল মা কালীর জন্য, কেওড়াতলা মহাশ্মশানের জন্য, ভিখিরির জন্য, কুকুরের জন্য। ইদানীং বিখ্যাত হল ‘কালীঘাটের কাকু’-র জন্য। হয়তো ভবিষ্যতে কালীঘাট বিখ্যাত হবে চৌরসাম্রাজ্যের সূচনার জন্য।
তবু আমার দেখা সেরার সেরা চোর ছিল মনু। আমরা বলতাম মনুকা। মানে মনুকাকা। সারা পশ্চিমবঙ্গবাসী যেমন চোরের সঙ্গে দাদা-দিদি পাতায়, ভাইপো-ভাইঝি পাতায়, আমাদেরও তেমন চোর মনু ছিল মনুকাকা। মনুকাকা চুরি করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিল। তবে এখন বুঝি, মনুকাকা ভুল সময়ে জন্মেছিল, এখন জন্মালে কালীঘাটের কাকুকেও টপকে বেশ নেতা হতে পারত।
আপনারা তো কালীঘাট মানেই কয়লা, বালি, চাকরি এবং গোটা পশ্চিমবঙ্গ চুরির কথা ভাবেন, কিন্তু মনুকা ছিল ভিন্ন গোত্রের চোর। মনুকা কী চুরি করত জানেন, পাঁঠার মাথা! এটাতেই ওর স্পেশালাইজেশন। পালা-পার্বণে কালীঘাট মন্দিরে অসংখ্য পাঁঠা বলি হত। হাড়িকাটে একটা পাঁঠার যখন ব্যা বলে স্বর আটকে গেছে, তখন তার পিছনে লাইন দিয়ে অসংখ্য পাঁঠা আয়েশে মজাসে জবা ফুল আর বেলপাতা চিবুচ্ছে। হাঁড়িকাঠে পাঁঠা চড়েছে। ধ্বনি উঠছে— জয় মা কালী! একজন গায়ের জোরে পাঁঠার ঠ্যাং টানছে। খাঁড়া হাতে একজন পাঁঠার গলা তাক করছে। খাঁড়া নামছে। জয় মা কালী! টপ করে মুণ্ডু নেমে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। মুণ্ডহীন ধড় ছটকাচ্ছে। ঠেলাঠেলি আর গুঞ্জন চলছে। অনেকে কেমন ভয়ে ও বিষণ্ণতায় মুখে কাপড় দিয়ে। অনেকে ভক্তিতে তখনও গদগদ ‘জয় মা’, ‘জয় মা’ করছে। একফোঁটা রক্ত নিয়ে টিপ পরতে হবে। পরাতে হবে। কেউ কেউ বেলপাতায় সামান্য রক্ত নিচ্ছে। বাড়ির সদর দরজায় লাগাবে। তার মধ্যেই মনুকা অদৃশ্য হাতে সাঁট করে পাঁঠার মাথা টেনে নিয়েছে চটের ব্যাগে। পুরো শিল্পী!
কালীঘাট ও সন্দেহজনক গন্ধ!
পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১৯…
মনুকা কোথায় ছিল, ভিড় ভেঙে কখন এল, বোঝার আগেই মনুকা ধাঁ।
যারা মানত করেছিল তারা তখন ধড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কতটা মাংস হবে? কতটা মাংস হতে পারে, চোখে-চোখে মাপছে। আর যারা বলি দিয়েছিল, তাদের দু-জন পাঁঠার দুটো-দুটো ঠ্যাং ধরে চলেছে মালটাকে ছাল ছাড়িয়ে সাইজ করতে। এদের মধ্যে একজন হয়তো কথা ছুড়ে দিয়েছে— বাবুজন, আপনারা মাথাটা নে আসুন।
কিন্তু কোথায় মাথা? পাঁঠার মাথা চটের ব্যাগে ঢুকে চলে গেছে মদের চাট বানানো লোকের আন্ডারে।
এবার আপনার বলতে পারেন, যারা বলি দেয়, বা মন্দির চত্বরের লোকজন কি মনুকাকে চিনত না? চিনত। অবশ্যই চিনত। যেমন করে পশ্চিমবঙ্গবাসী ‘তাঁকে’ চিনতেন। এবং পশ্চিমবঙ্গবাসীর মতো মন্দিরের লোকজনও চোখ বন্ধ করে রাখত। পাঁঠার মাথা না পেলে বলির কাজের লোকজন মানত দিতে আসা লোকজনের থেকে টাকা আদায় করবে। দুঃখ-দুঃখ মুখ করে বলবে— ‘আপনাদের অবহেলায় মাথাটা গেল। দেন, মূল্য ধরে দেন।’ এই সুযোগে ওরা ডবল দাম উসুল করবে। কেননা পাঁঠার মাথা আর ছাল তাদের পাওনা।
মনুকা এই দুই পার্টির মধ্য দিয়ে ঢুকত। মনুকা বাজারেও হানা দিত। মাংসের দোকানে দুটো-তিনটে খাসি ঝুলছে, সামনে সার-সার খাসির মাথা সাজানো। সেখানেও রোববারের ভিড়ে খাসির মাথা টেনে নেয়। শোনা যায়, মনুকা চোলাইয়ের ঠেকে একটা মাটির ভাঁড়, প্লাস্টিকের গ্লাস নিয়ে অচেনা লোকের পাশে বসত। তারপর পাশের লোকটি একটু অসতর্ক হলে গ্লাস বা মাটির ভাঁড় বদলে যেত।
তবু মনুকাকে দেখলে, অনেকেই ডেকে চা খাওয়াত। তবু তাকে দেখলে কেউ কখনও ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করত না। তবু মনু, আমাদের মনুকার একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল।
আমরা মাঝে-মাঝে বলতাম, ‘ও মনুকা, তুমি চুরি করো কেন? পান্ডাগিরি করতে পারো? কাঁচালঙ্কা বিক্রি করতে পারো?’

মনুকার তাগড়াই জবাব ছিল, ‘আমি লোক ঠকানোর মধ্যে নেই। খুব ঝাল বলে কাঁচালঙ্কা দেব, বাড়ি গিয়ে দেখবি ঝাল নেই। আর মা কালী, নিজেই কেস খেয়ে জিভ কেটে দাঁড়িয়ে, পান্ডারা সেই মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে পাপী-তাপীকে হাজির করছে পাপ কেস ডিসমিস করতে? লোক ঠকাচ্ছে না?’
‘কিন্তু তুমি যে চুরি করছ, মানুষের মাল খাচ্ছ, এ তো ঘোরতর পাপ!’
‘ওরে আমি কসাইয়ের মাল মারছি, মাতালের মাল খাচ্ছি, কোনও পাপ করছি না। কেউ বলবে, মনু কারও একটা বাতাসা ঝেড়ে খেয়েছে?’
‘হক কথা।’
এই জন্যে বলছিলাম আমাদের মনুকারও স্ট্যান্ডার্ড ছিল। কারও চাকরি মারেনি, বালি-কয়লা সরায়নি, যা ঝেড়েছে তা কসাইয়ের, তা মাতালের!
কসাই! একটা সময় মনে হল, আমিও কসাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছি। আমিও যেন খাঁড়া হাতে দাঁড়িয়ে আছি। ঘ্যাচাং-ঘ্যাচাং করে সম্পর্ক কাটছি। ধড় আর মুণ্ড আলাদা করছি। তারপর রক্তাক্ত অতীতের ধড় নিয়ে চলেছি। রক্ত ঝরছে। আর কোনও এক মনুকা এসে স্মৃতির সম্পর্কের সেই কাটা মুণ্ড চটের বস্তায় ভরে অলক্ষে সরে যাচ্ছে।
আমি বড় হচ্ছি, আর ক্রমশ যেন আমার কাছে কালীঘাট অচেনা হয়ে উঠছে। দূষিত লাগছে। আদিগঙ্গা পাঁকে ভরে গেছে। একতাল মাটি নেই, পাঁক আছে। একশিশি গঙ্গাজল নেই, কালো তরল আছে। আমার সঙ্গে মহাকালী পাঠাশালায় পড়ত, যে তিন-চারজন গলির মেয়ে, হঠাৎ তারা কেমন বড় হয়ে গেছে।
আমার খেলার মাঠের গলাগলি-দলাদলির গলির-ছেলে-বন্ধুদের বোনরাও কেমন বদলে গেছে। আগে আমরা সব ওদের দাদার বন্ধু ছিলাম। কেমন ভয়ে-ভয়ে বিড়বিড় করে বলত, ‘দাদা ঘরে নেই, রেশন ধরতে গেছে—’, ‘দাদা কেরোসিনে গেছে—’, আমরা জানতাম ওদের গোটা বাড়ি নেই, ওদের সবার ঘর। বাড়ির লোক আর ঘরের লোকের তফাত বুঝেছি। গলির-ছেলে-বন্ধুদের বোনরা, সেই তারাই এখন ধমকচমক দিয়ে ডাকে। ঠোঁট মুচড়ে বলে, ‘ভাল আছ…!’
ওদের দেখে আমাদের গ্রুপের কারও কারও বুকে হিল্লোল জাগে। ঠেকে এসে বলে, ‘গোলকিপার শম্ভুর বোনটাকে আজ দেখলাম, কী খায় বলতো, কী গতর মাইরি! দেখলে থাকতে পারি না।’
আমি বুঝি, ওরা আর আমার-আমাদের বন্ধুর বোন নয়।
আমরা কসাইয়ের মতো সম্পর্ক কাটছি। শম্ভু, বান্টা, গোপালদের দেখলে অন্যদিকে মুখ ঘোরাই। রাস্তার এপার থেকে ওপারে চলে যাই। একই রেশন দোকানে লাইন দিয়ে, একই কেরোসিনের দোকানে লাইন দিয়ে অচেনা হয়ে থাকি। ওদের দেখে দেখি না। কিন্তু ওদের বোনদের লুকিয়ে দেখি। দেখতে-দেখতে একদিন আসে— সেদিন হয়তো রাস্তার ধারে শম্ভুকে দেখি চোলাই খেয়ে নর্দমায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে।
কিন্তু আমাদের বোনদের নিয়ে কেউ কখনও এমন কথা বলে না। কেউ বললে তাকে অন্যজন ছেঁচড়ে দেবে। মেরে মুখ ফাটিয়ে দেবে।
আমাদের সমবয়সি শম্ভু, বান্টা, গোপালরা এখন দারুণ করে গোঁফ রেখেছে। লম্বা জুলফি! কী তাদের চুলের ছাঁট। বেলবটস প্যান্টের নীচে চেন, পিছনের পকেটে চিরুনি। কখনও-সখনও ওদের গলির ভেতর আমাদের দেখলে, পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুল আঁচড়ে ফুঃ মেরে বলে— ‘আমাদের এদিকে, মাগি দেখতে ঢুকেছিস!’
এখন যেমন ‘আমরা-ওরা’, ‘হিন্দু-মুসলমান’ চলে, তখন থেকে আমি ‘আমরা-ওরা’ দেখেছি। তখন কেমন যেন অপরাধীর মতো মুখ করে বলতে হয়— ‘না রে, নাচনের কাছে এসেছিলাম, হাড়ভাঙা তেল নেব।’
নাচন বলে একজন ছিল যে, ব্যথা হ্যাপিস করা একরকম মালিশের তেল দিত। দারুণ কাজের জিনিস। সে ওই গলির বাসিন্দা!
শম্ভু, বান্টা, গোপালরা ক্ষুরের মতো চিরুনি নাচিয়ে নিজের বোনদের দেখিয়ে বলে, ‘তেল নিবি নে, এখানে এসে গলির মাগি পটাবি না।’
এখন ওদের কাছে দঙ্গল বাঁধা ওদের মা-বোন, মাসি, দিদি সবাই ‘মাগি’। ওরা এখন সবাই এদের চাষ করে খায়। এদের রক্ষা করে। তীক্ষ্ণ নজর রাখে, ভদ্রপাড়ার ছেলেরা চেনা-জানার ফাঁকফোকর গলে প্রেমপিরিতের টাচ দিয়ে মস্তি করে না যেতে পারে, না ঠকায়, সেটাও দেখে।
ওরা জানিয়ে দেয় অমোঘ কথা, ‘আমরা কিন্তু তোদের পাড়ায় যাই না, ভাই।’
ওরা আর আমরা।
পালটে যাচ্ছে। বিলকুল পালটে যাচ্ছে।
আমরা কসাইয়ের মতো সম্পর্ক কাটছি। শম্ভু, বান্টা, গোপালদের দেখলে অন্যদিকে মুখ ঘোরাই। রাস্তার এপার থেকে ওপারে চলে যাই। একই রেশন দোকানে লাইন দিয়ে, একই কেরোসিনের দোকানে লাইন দিয়ে অচেনা হয়ে থাকি। ওদের দেখে দেখি না। কিন্তু ওদের বোনদের লুকিয়ে দেখি। দেখতে-দেখতে একদিন আসে— সেদিন হয়তো রাস্তার ধারে শম্ভুকে দেখি চোলাই খেয়ে নর্দমায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে।
মনে পড়ে, গোলকিপার শম্ভু এভাবেই তো আমার পায়ের ওপর ঝাঁপ দিয়ে বল ধরে নিত। কত গোল ওর জন্য দিতে পারিনি। আজ কী ধরছে শম্ভু— জন্মের দোষ!
গোপালকে দেখি পা টেনে-টেনে হাঁটছে। কিছুদিন আগে পুলিশ মেরেছে। ইচ্ছে হলেও জিজ্ঞেস করতে পারি না— কেমন আছিস? ভাববে মজা করছি।
আর আমাদের ভদ্রপাড়ার চিন্টু গলির কার্তিক হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে আমরা লুকিয়ে কথা বলি। সারা পাড়া জানে ওর আর রুমির কথা। ওর মা মাথা নীচু করে বাড়ি থেকে বের হয়। ওর বাবার গলার জোর কেমন ভেঙে গেছে। ওর বাবা বাড়ির গেটে তালা মারে। চিন্টু রাতে পাঁচিল টপকে বেরিয়ে যায়। চিন্টু মদ খেয়ে, পান চিবতে-চিবতে, সিগারেট হাতে নিয়ে পাড়ায় ঢোকে। সরু ফিনফিনে গোঁফ রেখেছে। টুকরে এলাকা ছাড়া। মাঝে-মাঝে ঢুকে ব্যাপক সোডার বোতল চার্জ করে, বোম মারে, যাকে পায় তাকে কোপায়, তারপর শিয়ালদায় সোমেন মিত্রের কাছে চলে যায়।
আমি আশুতোষ কলেজে চলে গেছি। চিন্টুরও নাম লেখানো আছে চারুচন্দ্র কলেজে।
এনএলসিসি-র লক্ষ্মী বোস লাল পেনে, নীল পেনে গোপন সংকেত ভরা চিঠি লিখে আমাদের অনেককে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমরা এ-কলেজ ও-কলেজ করে ছড়িয়ে পড়েছি।
প্রিয়-সুব্রত ভার্সেস লক্ষ্মী বোস। বৈশ্বানর ভার্সেস কাবুদা।

কালীঘাট রোড দিয়ে হাঁটাচলা বন্ধ করে দিয়েছি। পাড়ার ভেতর দিয়ে মহিম হালদার স্ট্রিট ধরি। চক্রবর্তীপাড়া থেকে বেরিয়ে ডানদিক নয়, বাঁ-দিক ধরি। আমরা যারা ফুটবল খেলি। তারা খেলি। স্কুল-কলেজ, কোচিং আর খেলার মাঠে-মাঠে দিন যায়। তবু পাড়ায় তো একসঙ্গে হই।
লোডশেডিং হলে পাড়ার ঠেকে নানা গল্প শুনি।
সাদা মাঠের ধারে যে হাফ-গেরস্থ মেয়েটি প্রতিদিন দড়িতে পর-পর সাদা-কালো-লাল ব্রা টাঙিয়ে আমাদের খেলা বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছিল, তার কথা শুনি। তার কাছে এটা যুদ্ধ ছিল। তার ভাতের হাঁড়ি, তোলা উনুনের ওপর আমাদের বল হামলা করত যে।
সেই হাফ-গেরস্থ মেয়েটির ঘরে রাতে এখন আমাদের পাড়ার এক বন্ধু যায়। সেই বন্ধুটি দোকানদারি করে কালীঘাট বাজারে। লোডশেডিঙের ঠেকে তাকে পেলে আমরা মজায় মাতি।
‘হ্যাঁ রে ও তো তোর মাসির বয়সি!’
‘চুপ শালা, আমাকে কি এমনি দিচ্ছে, ঘরে গেলেই মিষ্টি পান নিয়ে যেতে হয়।’
‘শুধু পান!’
‘ইলিশ সিজিনে ইলিশ দিতে হবে— কন্ডিশন আছে।’
আমরা হাসি— ‘ইলিশ দিয়ে পেতনি ধরেছিস!’
আমি তখন পেতনি নয়, এক পরী পেয়েছিলাম, কালীঘাট পার্কের পাশে উইমেন্স খ্রিশ্চান কলেজ থেকে। তার নাম পিয়া ঘোষ চৌধুরী। তার এক বন্ধু ছিল সুস্মিতা ব্যানার্জি। পিয়া থাকত চেতলা দুর্গাপুর ব্রিজের নীচে। সুস্মিতা প্যারীমোহন রায় রোডে। পিয়ার সঙ্গে আমার ষোলো মাসের জমজমাটি প্রেমকাহিনি ছিল। আমাদের স্পেশাল কলেজ ছিল— ভারতী সিনেমা হলের ভেতর নীল অন্ধকারে। তখন ‘এক দুঁজে কে লিয়ে’ চলছে। আমরা সবাই কমল হাসান-রতি অগ্নিহোত্রী! আমাদের প্রেমপার্টিদের জন্য কাবুদা, মার খাওয়া বিক্ষুব্ধ ছাত্র পরিষদ নেতা, ভারতী সিনেমা হলে টিকিটহীন আনা-জানার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বৈশ্বানর চ্যাটার্জি তখন রোজ মার খায় এসএফআই-এর কাছে। পার্থ চ্যাটার্জির তখনও ফ্রেঞ্চ কাট, তবে রোগা ছিল। কলেজে এসে দুর্দান্ত একটা ভাষণ দিত, ‘ওরা এখানে মারলে, আমরা ওদের রাসবিহারীতে মারব। ওরা রাসবিহারীতে মারলে, আমরা ওদের বালিগঞ্জে মারব।’
আমি একদিন বলেছিলাম— ‘রাসবিহারীরটা রাসবিহারীতে হবে না কেন?’
পার্থ চ্যাটার্জি বলেছিল, ‘তোমাদের কংগ্রেসি পরিবার, সেটা তোমার দাদার কাছ থেকে জেনে নেবে।’
‘আমার দাদা তো সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন করে—’
‘তুমি পার্টি তো করো না ভাই, খবর আছে, সারাদিন যোগমায়ার একদঙ্গল মেয়ে নিয়ে প্রেমপার্টি করো।’
কেউ বলে উঠল, ‘দাদা ওর উইমেন্স খ্রিশ্চানের—।’
জীবন কেমন উল্টো চাল দেয় দেখুন, আমি যখন প্রেমপার্টি করা বন্ধ করলাম, পার্থদা তখন ধরা পড়ে খবর হল।
এর মধ্যে আশুতোষ কলেজের ছেলেরা প্রিন্সিপাল শুভঙ্কর চক্রবর্তীকে ভয়ঙ্কর চক্রবর্তী বলে আওয়াজ তুলল। সৌগত রায় ফিজিক্স পড়াচ্ছেন।

সবই কালীঘাট, মায়া হয়, কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখি। আমাদের প্রেমপার্টির সদস্য ছিল আর একজোড়া। সুকান্ত আর টুকুল। আশুতোষ আর বাসন্তী দেবী। একজনের বাবা ডাক্তার আর একজনের জানি না। চেতলায় পাশাপাশি বাড়ি। কিন্তু ওই যে আমরা সবাই কমল হাসান আর রতি অগ্নিহোত্রী— ‘এক দুঁজে কে লিয়ে’, একইসঙ্গে আমরা গায়ে গা ঠেকিয়ে দেখি। কিন্তু কী হল কে জানে, ওরা দু-জনে একদিন হাত বাঁধাবাঁধি করে লেকের জলে নেমে গেল। বড়ই বেদনার ছিল সেই মৃত্যু। তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। কলেজে খবর এল দুপুরে। আমাদের সবার মধ্যেকার প্রেম ওরা তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। আসলে মন খুব ছোট একটা শব্দ, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার স্যাপারগুলো বেশ জটিল। আমাদের মনগুলো বড় মনস্তাত্ত্বিক করে দিয়ে গিয়েছিল ওরা।
শেষ করি সেই পিয়া-সুস্মিতা আর আমার গল্প দিয়ে।
একদিন উইমেন্স খ্রিশ্চান কলেজের পিয়া বলল, ‘কালীঘাট নিয়ে যাবে তোমাদের পাড়া দেখাতে?’
আমি জানি ওরা ভাল মেয়ে, ওদের সাদা মনে কাদা নেই। আমি ওদের এখন যেখানে স্কাইওয়াক হয়েছে, সেদিক দিয়ে নিয়ে যাব বলে ঠিক করেছি। ওদের কলেজের উল্টোদিকে। ওরা বলল, না, এদিক দিয়ে যাব না। (যেদিকে প্রাক্তন সিএম-এর বাড়ি) ট্রামলাইন ধরে হাঁটব— তারপর ওদিক দিয়ে।
—ঠিক আছে, চলো।
আমরা তিনজনে হাঁটছি।
কালীঘাট পটুয়াপাড়ার মোড়ে এসে দেখলাম পিয়া আমাকে ছেড়ে সুস্মিতার ঘাড়ে ঢলে গেছে। দু-জনে খুব ফিসফিস করছে। ওদের বিস্মিত আর লজ্জা-লজ্জা চোখ ডানদিকে— যেদিকে সারি-সারি মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে বুক আর পেট দেখিয়ে। আমি বুঝলাম, ওরা নিষিদ্ধ কালীঘাট দর্শনে এসেছে। আমরা ঢুকে পড়েছি কালীঘাট রোডে। এই রোডে আমি আর হাঁটাচলা করি না। তখন তিনটে, সাড়ে তিনটে বাজে। রাস্তাঘাট ফাঁকা-ফাঁকা, আমি সামনে, ওরা দু’টিতে পিছনে। বারকয়েক তাকিয়ে দেখেছি, দু-জনের চোখে অসীম খিদে।
আমরা তবলা গলি পেরিয়ে গেলাম, ডানদিকে গলির পর গলি। খাটাল পেরিয়ে, দেবালয় পেরিয়ে হাঁটছি। বাঁ-দিক ঘেঁষে। ওই তো পাপ্পুদের গম ভাঙার চাকি। হঠাৎ আমার থেকে একটু দূরে শনিমন্দিরের পাশে ঝুমরি। বান্টার বোন। ঝুমরি ওখান থেকে আমার গোটা-গোটা নাম ধরে ডাকল। ডেকেও ওর সুখ হল না, আমার সামনে এসে দাঁড়াল। চিকন গলায় বলল, ‘এতদিন কোথায় ছিলে, তুমি আর এদিকে আসো না? কতদিন তোমাকে দেখিনি? ভাল আছ? এসো মাঝে মাঝে। ভুলে যেও না।’
এর পর কি আর কোনও মেয়ে তার প্রেমিককে বিশ্বাস করে, যতই সে রোগা হোক, যতই শান্ত আর ফাজিল হোক, যতই সে সরল বালক সেজে প্রেমের কবিতা লিখুক? প্রেমিকার মন বলে কথা, যা তখন জটিল মনস্তাত্ত্বিক হয়ে কসাইয়ের ছুরি ধরেছে প্রেমিকের পদ্মনালি গলায়।
ঠিক তার পর থেকেই তো আমার আমি কাব্যের নেশা ঘুচিয়ে, সেই মনুকার মতো নিজের খালি মাটির ভাঁড়টা বদলে অন্যের জীবন-চোলাই টেনে গদ্যে মাতাল হয়েছি।
কালীঘাট আমাকে প্রেমিকা দেয়নি, বরং বারবার কেড়ে নিয়ে গদ্যে ডুবিয়েছে।




