অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ১৯

সন্দেহের গন্ধ

প্রণম্য কথাসাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় একদিন গন্ধ সম্পর্কে আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি রাতে কোনও ফাঁকা জায়গায়, ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ আপনার মনে হল, কেমন এক সুগন্ধ যেন বয়ে গেল আপনার পাশ দিয়ে! আশপাশে কোনও ফুলের গাছ নেই। কেউ ধূপধুনো দেননি। তাহলে? বা উল্টোও হতে পারে, আপনি হঠাৎ দুর্গন্ধ পেলেন। যেন কেউ পচা একটা জিনিস নিয়ে চলে গেল আপনার ঘাড়ের পাশ দিয়ে। কিন্তু কেউ তো ধারে-কাছে নেই! তাহলে এই সুগন্ধ বা দুর্গন্ধের উৎস কী? সুগন্ধ মানে তখনই হয়তো কোনও মহাপুরুষের আত্মা, কোনও ধার্মিক ভাল মানুষের আত্মা আপনার সামনে দিয়ে চলে গেছে। তেমনই দুর্গন্ধ মানে তখন হয়তো কোনও পাপী, পিশাচের আত্মা আপনার পাশ দিয়ে চলে গেছে। তেমনভাবে হয়তো বিপদেরও গন্ধ পাওয়া যায়। অনেকে তো পায় শুনেছি। সব জায়গার নিজস্ব কিছু গন্ধ থাকে। যা আপনার চিন্তা-চেতনাকে ছুঁয়ে যায়। 

আমি আমার সময়ের কিছু পুরনো গন্ধের কথা বলছি, এই সময়ের নয়। এ-সময়ে ঘেঁটে সব ঘ। কালীঘাট কালীমন্দিরের চত্বরে এলেই আপনি প্রথম দিকে ফুলের গন্ধ পাবেন। সকালবেলা এলে ফুলের পাশাপাশি দুধ মেরে ক্ষীর করা পেঁড়ার গন্ধও মুখে জল এনে দিতে পারে। এবার পায়ে পায়ে মন্দিরের ভেতর ঢুকুন, সেখানে ফুলের গন্ধের সঙ্গে মিশবে ধূপধুনো। আবার আপনি ঠিক মন্দিরের পিছনদিকে যান, দমচাপা বেলপাতা, থ্যাঁতলানো জবা-র গন্ধ পাবেন। পায়ে-পায়ে এদিকে চলে আসুন। হঠাৎই একটা বদ গন্ধ! যেন বদ হাওয়া লেগেছে পালে। ভাল করে দেখুন, নির্ঘাত সেখানে হাড়িকাট আর রক্তের গন্ধ। তখন বলি দেওয়ার জায়গা ঘেরা ছিল না। দু’টি হাড়িকাঠ তার পাশে কিছুটা জায়গা এক ইট সমান উঁচু করে ঘেরা। এখন সেখানে রাজকীয় বলি-ঘর। 

কালীঘাট কালী মন্দিরের ওই জায়গাতে অদ্ভুত একটা গন্ধ সদা বিরাজমান। চারদিকে ফুল, ধূপধুনোর মাঝে রক্তের গন্ধ আপনাকে কেমন দিশেহারা করে দেবে। আমি প্রখর গ্রীষ্মে দেখেছি, শুকনো রক্তের গন্ধ। আবার অঝোর বৃষ্টির দিনেও দেখেছি, সেই একই গন্ধ। যখন যাই, যে বয়সেই যাই, একই গন্ধ পাই।

হাতে টানা রিকশার গল্প ও কালীঘাটের রাস্তা!
পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১৮…

অনেক আগে আদিগঙ্গার ধারে দাঁড়ালে মাটির গন্ধ পাওয়া যেত। কিন্তু আমার বড় হয়ে ওঠার সঙ্গেই যেন সে-গন্ধ ফুরিয়ে গেছে। পরে পেতাম কাঁচা পাঁকের গন্ধ। তারপর প্রবল দুর্গন্ধ। আসলে খারাপ গন্ধ এমনই, ভাল ঘ্রাণের স্মৃতি মুছে দেয়। 

রাতের দিকে ঘাটের কাছে গেলে পোড়া গন্ধ! চিমসে একটা গন্ধ চারদিকে। গাঁজার গন্ধ। গাঁজারির চোখ ঢোলে আর ঠোঁট আমসি হয়ে ঝোলে। এদের হাফ পাঞ্জাবি, ফতুয়া আর লুঙ্গি খুব পছন্দ। নাহলে হাঁটুর কাছাকাছি খেটো ধুতি। 

মন্দির থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকে শ্মশানের দিকে গেল— কাঠ পোড়া গন্ধ। মানুষ পোড়া গন্ধ। তখন ইলেকট্রিক চুল্লি তৈরি হচ্ছে, চালু হল। কিন্তু সমানতালে কাঠের চুল্লি বিরাজমান। অবস্থাপন্ন মানুষজনের কাঠের চুল্লিতে দাহকার্য সম্পন্ন হয়। গরিব মানুষ পোড়ে ইলেকট্রিক চুল্লিতে। এমনকী, পাড়ার শবযাত্রায় গিয়ে এমনও শুনেছি— ইলেকট্রিকে দিল? কাঠে দিতে পারত, ছেলেরা এটুকু খরচ করবে না! কাঠে গোটা একটা মানুষ পোড়ার গন্ধ প্রবল। শীতকালে সে গন্ধ বাড়ে। অনেক দূর-দূর পর্যন্ত চলে আসে। শীত-রাতে শবযাত্রার হরিধ্বনিও অনেক দূর পর্যন্ত জাগিয়ে দেয়।

আর মন্দির থেকে বেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে চললে প্রথমে কালীঘাট বাজার। এখানে থেকেই আপনার নাক সরেস হলে রাতে তড়কার পিঁয়াজ-ফোড়নের সঙ্গে হালকা চোলাই বাংলা মদের গন্ধ পাবেন। এসব দিকে একধরনের মানুষ দেখবেন, মাকড়সার মতো। এদের হাত-পা সরু সরু, পাছা নেই, পেটটা ঢ্যাপ হয়ে আছে। বুকের খাঁচার পাখি যে-কোনও সময় উড়ে যাবে। কাছে গেলে ঘ্যারঘেরে সাউন্ড বক্স বাজছে। এদের মুখগুলো ন্যাসপাতির মতো। মাথার দিকে সরু, মুখের কাছে গোল, চকচকে তেলা। এদের যাওয়ার সময় আসন্ন। ফতুয়া পরে কাউকে কোনওদিন চোলাই খেতে দেখিনি। 

রাত যত বাড়বে উড়ু-উড়ু চোলাই গন্ধ কালীঘাট রোডের আনাচকানাচে উঁকি মারে। গলির মুখে-মুখে পানের দোকান, তীব্র জর্দার গন্ধওয়ালা মানুষও পানের পিক সামলে তৃষ্ণার্ত চোখে গলির বাসিন্দাদের জরিপ করে। 

আপনি হাঁটতে শুরু করুন। ভোরের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে ট্রাম-লাইন টপকালে, আর যদি ঠিক বিশ্বকর্মা পুজোর আগে-পরে যদি হয় নির্ঘাত খড়ের গন্ধ পাবেন। খড় আর মাটির মিশেলে সুন্দর গন্ধকে আপনি ভোরের গন্ধও ভাবতে পারেন।

গন্ধের কথায় আমি হয়তো গন্ধমাদন হাজির করলাম।

আমাদের পাড়ার মেয়ে হল তাপু। ওর সঙ্গে আমাদের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ও হুটহাট আমাদের সঙ্গে পাড়া চষতে বেরুত না, কিন্তু সব খবর থাকত ওর কাছে। তাপু সারাদিন থাকত হয় জানলা, নয় বাড়ির সদর দরজার মুখে। তাপুকে ঠিক মতো ট্রেনিং দিলে দারুণ রিপোর্টার হতে পারত বলে আমার বিশ্বাস। খুব নরম শান্তশিষ্ট মেয়ে। খুব মায়া ওর। আমরা অনেক সময় ওর কাছ থেকে পয়সা ধার করে সিনেমা যেতাম। সে পয়সা ফেরত দিতাম না। জানলা বা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তাপু পুরো সিনেমার গল্প জানত, সংলাপ জানত, কোন গান কে গেয়েছে, সুরকার-গীতিকার পর্যন্ত ওর মুখস্থ। কিশোরবেলায় এগুলো চোখে পড়েনি। বড় হয়ে সংবাদপত্রে চাকরি করতে গিয়ে বুঝছি, চোখ-কান খোলা তাপুর একজন পারফেক্ট রিপোর্টার হওয়ার গুণ ছিল। সেই সঙ্গে ছিল পড়াশোনা। খুব ভাল রেজাল্ট করত বলে ওর বেশ সুনাম ছিল। আমাদের সবাইকেই কোনও না কোনওদিন তাপুর উদাহরণ তুলে বাবা-মা খোঁটা দিয়েছেন।

তাপু ছিল আমাদের কাছে ব্যাঙ্ক। যেখানে লোন করা যায়, শোধ দেওয়ার ঝক্কি নেই। ওর বাবা বড় কোনও সরকারি অফিসার ছিলেন। তিনি ঘুষ খেতেন। এটা আমাদের তাপু-ই বলেছে। প্রথম যেদিন আমাকে আর বাপিকে ওর বাবার ঘুষ খাওয়ার কথা বলেছিল, আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এসব তো সিনেমায় দেখি, গল্পে পড়ি। বাস্তবের এমন একটা মানুষ আমাদের তিনটে বাড়ি পরে থাকে, সকাল বিকেল তাকে দেখি, এ যেন আমার বিশ্বাস হয়নি। তাপু বলেছিল, আমি প্রমাণ করে দিতে পারি। আমরা যদি প্রমাণ চাইতাম, ও কীভাবে প্রমাণ করত আমি জানি না। তবে আমি এত ভীতু ছিলাম যে, প্রমাণ চাইনি। 

তবে আমি একবার আলতো করে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— তাপুর বাবা কোথায় কাজ করে?

বাবা কিছু একটা বলেছিলেন, যত দূর সম্ভব এয়ারপোর্টের কার্গো। উত্তর শুনে আমি বলেছিলাম, ওইখানে কী ঘুষ খাওয়া যায়? বাবা থমথমে মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, তুমি বড় বেয়াড়া প্রশ্ন করো। বাবা সাধারণত আমাকে তুই বলতেন, বাবার মুখে ‘তুমি’ মানে আমি ডেঞ্জার জোনে ঢুকে পড়েছি। 

এই ছিল প্রাথমিকভাবে আমাদের তাপু। আমরা সবাই মিলে বড় হচ্ছি। তখন টেনের প্রথম দিক। তাপু সারাদিন জানলার সামনে বই নিয়ে। ও ভাল রেজাল্ট করে, আরও ভাল করবে। কিন্তু হঠাৎ কী হল, তাপু কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কারও সঙ্গে কথা বলে না। তাকায় না পর্যন্ত। যত দিন যায়, ও আর সদর দরজার কাছে আসে না। স্কুল থেকে ফিরেই বিছানা নেয়। ওর চোখে-মুখেও সবসময় কেমন একটা উদভ্রান্ত ভাব। আমার প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল, ও অঙ্কের মাস্টারের সঙ্গে প্রেম করছে। মাস্টারটা বেশ দামড়া লোক মতো। আমরা তখন কোচিং-এ পড়তে যাই, ওর সব প্রাইভেট টিউটর। ওর রকমসকম দেখি, কখনও-সখনও ওর জানলায় টোকা মেরে ডাকি। ও জানলা খোলে, দু চারটে কথা বলে। মাঝেসাঝে জ্ঞান দেয়— ‘টাকা দিচ্ছি, কিন্তু এই কটা দিন খেলা টুর্নামেন্টগুলো একটু কমা।’ ব্যস! তারপরেও সেই তাপু আর নেই। সবসময় যেন মরমে মরে আছে। 

সে-সময় আমার একটা নতুন বর্ষাতি হয়েছিল। গাঢ় নীল রঙের রেনকোট। মানে বৃষ্টি পড়লে আর ছাতা নিয়ে যাব না। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য, বৃষ্টি আর আসে না। রোজ রেনকোট দেখি। মাঝে হালকা করে ট্যালকম পাউডার দিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষায় দিন গুনি। বৃষ্টি আর আসে না। কিন্তু অচিরেই অপেক্ষার পালা শেষ হল— একদিন সকাল থেকে মেঘ। দুটো-আড়াইটে নাগাদ ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হল। আমিও রেনকোট পরে রাস্তায়। কেউ নেই। পাড়া ফাঁকা। কাকে দেখাই আমার নতুন রেনকোট? দেখলাম, জানলার পাশেই তাপু। আমাকে দেখে বিষণ্ণ-মার্কা হাসি দিল। আমি বললাম, ‘ভাল করে হাস— বৃষ্টি পড়ছে কতদিন পরে?’

তাপু বলল, ‘তোর নতুন রেনকোটটা খুব সুন্দর!’ 

আমি এটা শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। যাক, তাহলে মানিয়েছে। আমি বললাম, ‘তোর কী হয়েছে রে, প্রেম করছিস? নাকি প্রেমে কেটে গেছে, সবসময় মড়ার মতো মুখ করে থাকিস।’

তাপু বলল, ‘কই কিচ্ছু না তো— সামনে পরীক্ষা সব মনে হচ্ছে ভুলে যাচ্ছি।’

‘তুই আমার কথা ঘোরাচ্ছিস, সবাই বলছে— ওই অঙ্কের মাস্টারের সঙ্গে কী তোর প্রেম হয়েছে? না-হলে তুই এমন প্রেমরোগীর মতো কেন হয়ে থাকিস?’

আমার কথা শুনে তাপু হেসে ফেলল, ‘ওই অঙ্কের মাস্টার। ওর বউ ছেলে আছে। যা! আমার কী মরণ হয় না।’

‘তাহলে তুই হঠাৎ যেন কেমন হয়ে গেছিস। সবসময় জানলার সামনে উদাস হয়ে বসে থাকিস, বিধবামার্কা মুখ!’

তাপু বলল, ‘মা কালীর দিব্যি, আমার কিচ্ছু হয়নি।’

তাপু জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধও ছুঁল, বলল, ‘বিশ্বাস কর, আমার কিচ্ছু হয়নি।’

যাই হোক ব্যাপারটা যখন মেটামিটির পর্বে। তখন আমি বারদুয়েক নাক টানলাম। বললাম, ‘কী সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছে, না!’ 

আমাদের পাশেই শ্যামলদা-বিশ্বনাথদাদের একটা বড় বাড়ি ছিল, ওদের সারা বাড়ি গাছ আর গাছ। ছাতিম, জামরুল আর আম-গাছ আকাশ জুড়ে থাকত। আরও-আরও গাছ ছিল। তখন ওসব দিকে কিছু কিছু মাটিও ছিল। আমি বললাম, ‘প্রথমে মাটির সোঁদা গন্ধ পাচ্ছিলাম, এখন জামরুল ফুলের গন্ধ! আহ্‌!’

ওদের ঘরের ভেতর ফিনফিনে মোমবাতির আলো। ওদের এমারজেন্সি আলো-ও আছে, একটু পরেই জ্বলে উঠবে নিশ্চয়ই। অথবা তাপু নিভিয়ে রেখেছে। আমি ওদের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম কথাটা বললাম, ‘তুই আমাকে ডাকলি— সেদিন তুই খুব খারাপ করেছিস। আমি তোকে কী বলেছি! তুই অত কাঁদলি কেন? আমি তোকে মাটি আর জামরুল ফুলের গন্ধের কথা বলছিলাম, আর তুই— গন্ধ আমার শত্তুরটত্তুর বলে মুখের ওপর জানলা বন্ধ করে দিলি।’

আমি এত গন্ধের কথা বলছি, মাটির সোঁদা গন্ধ, জামরুল ফুলের গন্ধ— কিন্তু তাপু নিশ্চুপ। যেন পাথর! আমি বললাম, ‘কী রে, কথা বলছিস না কেন? তোর নাক নেই? গন্ধ পাচ্ছিস না?’

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তাপু কাঁদতে শুরু করল। এত জোরে কান্না, তা যেন বৃষ্টির আওয়াজ ছাপিয়ে যাবে। আমি বুঝতে পারছি না, কী অন্যায় করলাম। আমি বিব্রত মুখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই, আমি কী করলাম?’

তাপু বলল, ‘তুই না, গন্ধ! গন্ধ আমার বড় শত্তুর রে!’

কথা শেষ করেই তাপু ঝপ করে জানলা বন্ধ করে দিল। আমি বোবা হয়ে বাড়ি ফিরে থম মেরে বসে থাকলাম। গন্ধ কারও শত্রু হয়? ছেলেদের হয় কিনা জানি না, তবে তাপু যখন বলল, তখন হয়তো মেয়েদের হয়। 

ক্লাস সেভেন নাগাদ, আমার মা একদিন আমাকে স্পষ্ট গলায় বলে দিয়েছিলেন, তোমাদের ছেলেদের আর আমাদের মেয়েদের অনেক ব্যাপার আলাদা। সব ব্যাপারে কৌতূহল দেখাবে না। যা জানার ইচ্ছে, মনে করবে তুমি আপনা হতেই জেনে যাবে। রোজ-রোজ একটু-একটু করে জেনে যাওয়া মানে বড় হওয়া।

আমি সেই আশায় বসে থাকি। মেয়েদের গন্ধ কী করে শত্তুর হয়? আশা করি, বড় যখন হচ্ছি, তখন একদিন ঠিক জেনে যাব।

আমি আর সান্ধ্যকালীন কোনওদিন তাপুর জানলায় গিয়ে দাঁড়াই না। আসলে সেদিনটা আমার খুব খারাপ লেগেছিল। ও সামান্য কথায় এত কাঁদবে!

ক’দিন পেরিয়ে গেছে, এর মধ্যে হঠাৎই একদিন লোডশেডিং হল সাড়ে আটটা নাগাদ। আর পায় কে, যথারীতি বই-খাতা ফেলে বাড়ির বাইরে পা দিয়ে দু’চোখ জ্বালিয়ে সুকুদাদের বাড়ির মুখে দেখছি— কেউ কী এল? চিন্টু, বাপি, মানু, গৌতম, পাপ্পু, কালটা? কিংবা রিন্টুদা, সুকুদার বাবা? এমন সময় তাপু আমাকে জানলার ভেতর থেকে মিহি গলায় ডাকল। ‘একবার এদিকে আয়।’

ওদের ঘরের ভেতর ফিনফিনে মোমবাতির আলো। ওদের এমারজেন্সি আলো-ও আছে, একটু পরেই জ্বলে উঠবে নিশ্চয়ই। অথবা তাপু নিভিয়ে রেখেছে। আমি ওদের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম কথাটা বললাম, ‘তুই আমাকে ডাকলি— সেদিন তুই খুব খারাপ করেছিস। আমি তোকে কী বলেছি! তুই অত কাঁদলি কেন? আমি তোকে মাটি আর জামরুল ফুলের গন্ধের কথা বলছিলাম, আর তুই— গন্ধ আমার শত্তুরটত্তুর বলে মুখের ওপর জানলা বন্ধ করে দিলি।’

তাপু খুব শান্ত গলায় বলল, ‘চিৎকার করিস না। কাউকে বলবি না। তোকে একটা কথা বলব—।’

‘বল, কাউকে বলব না।’ আমি সঙ্গে-সঙ্গে গলা নামিয়ে বললাম।

তাপু বলল, ‘আমার বাবা বেশ্যাবাড়ি যায়।’

আমি ঢোঁক গিললাম। আমাদের চেনা মানুষজনের মধ্যে, নিমাইদা যায়। আমি জানি, আমার এক দাদা যায়। কিন্তু তারা দু-জনেই কারও বাবা নয়। তাপুর বাবা বেশ্যাবাড়ি যায়, এ কেমন কথা! হতেই পারে না।

তাপু কথাটা আবার রিপিট করল।

আমিও আমার বাবার মতো করে ওকে বললাম— ‘তুই বড় বেয়াড়া কথা বলিস।’

তাপু ঠান্ডা হিমশীতল গলায় বলল, ‘আমার কাছে প্রমাণ আছে। আমি জানি, আমি নিশ্চিত!’

এর আগে ওর বাবার ঘুষ খাওয়ার কথায় ও বলেছিল— ওর কাছে প্রমাণ আছে। আমি ভয়ে সে প্রমাণ দেখতে চাইনি। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বলেই ফেললাম, ‘কী প্রমাণ বল।’

তাপু চুপ করে থাকল। বলল, ‘আমি গন্ধ পাই।’

‘কী? মদের গন্ধ পাস?’ আমি সবে বলতে যাচ্ছিলাম, কত লোক তো এমনি-এমনি মদ খায়, তারা কি অত খারাপ?

তাপু বলল, ‘মদের গন্ধ তো আছেই, তার সঙ্গে ডেটলের গন্ধ পাই!’

‘ডেটলের গন্ধ!’

তাপু নিশ্চিত আর চাপা গলায় বলল, ‘বাবা রোজই তো প্রায় মদ খায়। কই সেদিন তো চান করে না। যেদিন ওখানে যায়, সেদিন মদ খায় আর ফিরে এসে চান করে। ওদিনগুলোতে খুব করে সাবান মাখে। তারপর ডেটল দিয়ে চান করে। রাতে এত সাবান মাখে কেন? ডেটল কেন? ফর সেফটি। যাতে কোনও অসুখবিসুখ না হয়। তুই খোঁজ নিয়ে দেখিস, যারা ওখানে যায়, তারা রোগভোগের ভয় পায়। বাড়ি ফিরে ডেটল দিয়ে চান করে। তুই এমন যাদের যাদের চিনিস, তাদের কাছ থেকে খোঁজ নিবি, আমার হয়ে।’

আমি বিড়বিড় করলাম, ‘হয়তো কোনও-কোনও দিন চান করতে ইচ্ছে করে—।’

তাপুর চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে, গলা কান্নায় বোজা, ‘আমি ভুল করছি না। বাবা সেদিনের জামা-প্যান্ট পরের দিন পরে না। কাচার জায়গায় ফেলে দেয়। সকালে মাকে বলে— ডেটল দিয়ে কাচবে। কেন? উঃ আমি ডেটলের গন্ধ সহ্য করতে পারি না। ওই গন্ধ আমার শত্তুর! তুই খোঁজ নিবি।’

সত্যি সত্যি আমি খোঁজ নিয়েছিলাম, সেই সন্দেহজনক গন্ধের, তবে সেটা তখন-তখন না। অনেক বছর পরে, বেশ বড় হয়ে। তখন নিমাইদার সঙ্গে অনেক খোলামেলা কথা বলতাম। চিন্টু ছাড়াও আমাদের আর এক বন্ধু বেশ্যাসক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের কাছেই কথা প্রসঙ্গে জেনেছি— ওসব জায়গা জার্মের ডিপো। ওরা খুব ডেটল ভরসা করে। মনে করে ডেটল দিয়ে ভাল করে স্নান করলে… ফর সেফটি! 

তাপুর বাবার অকালমৃত্যু, ওদের বাড়ি বিক্রি করে দাদুর বাড়ি চলে যাওয়া আমরা থাকতে-থাকতেই হয়েছিল। একবার শুনেছিলাম— তাপু ডাক্তার হয়েছে। সেই গন্ধ এখন হয়তো ওর নিত্য সঙ্গী! সেই গন্ধে কি ওর বাবার কথা মনে পড়ে? আর সেই গন্ধ নিশ্চয়ই ওর শত্তুর নয়!