অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ১৮

হাতে টানা রিকশাবিহার

আমি হাতি চড়েছি, ঘোড়া চড়েছি, কিন্তু উট চড়িনি।

‘সোনার কেল্লা’ দেখার পর ফেলুদা, তোপসে ও অবশ্যই জটায়ুর মতো উট চড়ার বাসনা ছিল। উটে চড়া একজন আমাকে বলেছিল, অনেকটা হাতে টানা রিকশার মতো। পরে চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি, প্রায় তার ধারেকাছেই ব্যাপারটা, অনন্ত স্টার্ট দেওয়ার সময়ে। যাঁরা উট চড়েননি, তাঁরা একবার সংকোচ কাটিয়ে হাতে টানা রিকশায় চড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই একজন লম্বা রিকশাচালক নেবেন। রিকশায় উঠতে কোনও অসুবিধে নেই। তারপরই রিকশাচালক যখন হ্যাঁচকা মেরে টেনে তুলবে, তখন মনে হতেই পারে— এই উল্টে গেল। 

অনেক রিকশাচালক কোমরের সামনে রিকশার হাতল ধরে টেনে নিয়ে যায়। অনেকে দেখবেন, হাতল রাখে বুকের সামনে, ডান্ডিদুটো চাপা থাকে দু-বগলে। এক্ষেত্রে রিকশার সামনের দিক অনেকটা উঠে যায়, পিছনদিক আরও পিছনে হেলে থাকে। আর সে যদি একটু ফাঁকা রাস্তা পেয়ে দৌড়তে পারে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! তারপর ট্রামলাইনের খাঁজে পড়বে আর উঠবে, দেখবেন রিকশা চড়া সার্থক। ওদের হাতের আঙুলে দড়িতে প্যাঁচানো ঘণ্টি টুংটুং করে মনের মধ্যে বাজবে, জলতরঙ্গ হয়ে ঘুরবে-ফিরবে।

অবশ্য এ-সময়ও কলকাতা শহরের কয়েক জায়গায় হাতে টানা রিকশা আছে। সেখানকার রিকশা-চলা রাস্তা ফাঁকা পেতে হলে আপনাকে গ্রিন করিডর করতে হবে। বাদবাকি হাতে টানা রিকশা আছে ছবিতে, স্ট্যাচুতে। তবে মেলা থেকে খেলনা একটা রিকশা কিনেও ব্যাপারটা বুঝে নিতে পারেন।

খাঁড়ার ঘা ও বেপাড়ার হিরোইন!
পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১৭…

চক্রবর্তীপাড়ার ভেতর এই রিকশা ঢুকত না। আমাদের রিকশা ধরতে যেতে হত কালীঘাট রোডের ওপর। রিকশা দাঁড়িয়ে থাকত বাজারের সামনে। কাছাকাছি কোথাও যেতে হলে রিকশাই ভরসা ছিল। তখন অত হাতে টানা রিকশার এমন নানা বাহারি নাম ছিল না। রিকশা মানে রিকশা। আর বেহালা টালিগঞ্জ, যেখানে পুকুর আছে, গাছপালা আছে, কাঁচা নর্দমা আছে, এমন অদ্ভুত-অদ্ভুত জায়গায় গেলে সাইকেল রিকশা ছিল। সেগুলোর হর্ন আছে। আমাদের ঘণ্টি!

কালীঘাটে আমাদের পছন্দের দু’জন রিকশাচালক ছিল। একজন রামপেয়ারি, অন্যজন পেয়ারিরাম। রামপেয়ারি লম্বা আর পেয়ারিরাম বেঁটে। আমার মা, দিদি, জেঠিমা, মাসিমাদের দ্বিতীয় জন পছন্দ ছিল। কেননা ওর রিকশায় উঠলে পিছনদিকে বেশি হেলতে হত না। এই পড়ে যাব, এই উল্টে যাব— ভাব হত না। না-ধরেও বসা যেত। পেয়ারিরাম দৌড়ত কম, হাঁটত বেশি। টুকটুক করে ছোট্ট পায়ে পৌঁছে দিত।

কিন্তু রামপেয়ারি উল্টো। লম্বা, রোগা কাঠ-কাঠ চেহারা তার। তার রিকশায় বসলে সে প্রথমে গামছা কাঁধে সেট করে নিয়ে একবার পিছনে তাকাত। তারপরই মার হ্যাঁচকা। আহ্‌! কী সুখ বুকের ভেতর চমকে উঠে যেন উল্টে যাচ্ছে। কিন্তু উল্টোবে না, কিছুটা আকাশমুখো হয়ে ছুটে চলা রাস্তার ওপর ভেসে থাকা। একটু ফাঁকা পেলে রামপেয়ারি দৌড়ত। আমি মা-মাসির কোলে চেপ্টে। হাত ছাড়লে উড়েও যেতে পারতাম।

মা-জেঠিমা ধমক কষাত, আস্তে চালাও! কিন্তু তার আগে হুস করে রামপেয়ারি পৌঁছে দিত। সে সুখ বড় সুখ।

আর দারুণ সুখের সন্ধান পেয়েছিলাম আর-একটু বড় হয়ে। নিমাইদা মাঝেসাঝে রাতের বেলা নেশায় ডগমগ হয়ে রিকশাবিহারে বেরত। তখন নিমাইদার সঙ্গে আমরা কেউ না-কেউ সওয়ারি হতাম।

এই সৌভাগ্য আমার দু-চারবার হয়েছিল।

মিষ্টি মিষ্টি কুমড়োর তরকারি সহযোগে রুটি ছোটবেলায় দারুণ ফেভারিট ছিল। ডুমো-ডুমো করে কাটা কুমড়োর ছক্কা হোক, বা কুমড়োর ঘাঁটা পেস্ট, যাই হত, চোখ বন্ধ করে খেতাম। কিন্তু গ্রীষ্মকালে এমন পটল-কুমড়োময় দিনে মাঝে-মাঝেই খেতে বসে দু-তিনটে রুটি চিবিয়েই বাবা বলত, ‘যা কাঁঠাল নিয়ে আয়।’ 

কালীঘাট রোডের ওপর রাত্রিবেলায় কাঁঠাল নিয়ে দোকানি বসত। ওরা কাঁঠাল ছাড়িয়ে বিক্রি করত। যেই খেতে বসে বাবা বলত কাঁঠালের কথা, হাতের মুঠোয় পয়সা চেপে আমি দৌড়তাম। দেখে-দেখে খাজা কাঁঠালও কিনতাম। ছোটবেলা থেকে আমি কিছু পারি না-পারি, বাজার করতে পারদর্শী। একদিন কাঁঠাল কিনে ফিরছি, ঠিক বাজারের উল্টোদিকে জ্যোতির ডাক্তারখানার আগে নিমাইদা। বাটিক প্রিন্টের লুঙ্গি আর হাফহাতা পাঞ্জাবি পরে রিকশায় উঠছে, রাত ভ্রমণে বেরচ্ছে। বললাম, ‘কোথায় চললে?’ নিমাইদা পানের পিক সামলে বলল, ‘এই তো পোটোপাড়ার দিকে!’ বললাম, ‘এত রাতে কাজে?’ যদিও নিমাইদা কুঁড়ের বাদশা, কোনওদিনই কোনও কাজ করেনি। বলল, ‘না, না, একটু হাওয়া খাব। যাব আর আসব। যাবি নাকি?’ 

সে-কথা আর বলতে, কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি রিকশায় নিমাইদার পাশে। রিকশা ছুটল। আমার হাতে কাগজের ঠোঙায় কাঁঠাল। টুংটুং করতে করতে কালীঘাট রোড ধরে রিকশা এসে থামল ট্রামলাইনের মুখে। এবার রিকশা মুখ ঘোরাবে। হঠাৎ নিমাইদা বলল, ‘এদিকে রাস্তায় বড় লোকজন রে— তুই পোটোপাড়ার দিকে চল দিকি, মুক্তদল থেকে ঘুরে আসি।’

মুক্তদল কালীপুজোর জন্য বিখ্যাত। কালীপুজোর সময় ওদের মণ্ডপের ভেতর ডাকিনি-যোগিনীমার্কা ঝমঝম আলো আর সাঁই-সাঁই শব্দ চলত। ভৌতিক আবহাওয়া। মিনি বায়োস্কোপ!

চলো মুক্তদল— আমিও হ্যাঁ-হ্যাঁ করে সায় দিলাম। ওদিকের রাস্তা ফাঁকা। টেনে নিয়ে দৌড়বে, কতক্ষণের আর ব্যাপার। ঊর্ধ্বাকাশে মুখ করে চলেছি। হাতের কাগজের ঠোঙা কাঁঠালের রসে ভিজে কোলের ওপর খসে পড়ল। নিমাইদা বলল, ‘খেয়ে নে!’ আমি আস্তে করে তুলে নিয়ে মুখে দিলাম। নিমাইদা খাবে না। পান জমে আছে কশের একপাশে।

রামপেয়ারি আর পেয়ারিরাম। ওই দু’জন ছিল আমাদের প্রাইভেট কারের ড্রাইভার। পয়সা ছাড়াও চড়ে বসতে পারি। পরে বাবার থেকে পয়সা চেয়ে নিত। এরা বিহার মুলুকে দেশে যাওয়ার আগে বাড়িতে এসে জানাত। মা-মাসিমা ওদের কত কিছু বোঁচকা বেঁধে দিত। কখনও-কখনও ওরা এসে ওদের বদলি কে আছে, কোন ভাইপো— তাকে দেখিয়ে যেত। সে বড় সুখের সময়। এদের নাম ভুল করলে বা উল্টে দিলেও এরা সাড়া দিত, সঠিক নামের জন্য জানান দিত না। পুজোর সময় ওদের নতুন ফতুয়া বা লুঙ্গিও দেওয়া হত।

রিকশা দৌড়চ্ছে। আমি একটা করে কাঁঠালের কোয়া মুখে দিচ্ছি। আহা, কী স্বাদ! কী সুখ! মুক্তদল পেরিয়ে হরিশ পার্ক ঘুরে যখন এলাম, ততক্ষণে ঠোঙা আছে কাঁঠাল নেই। কাঁঠাল খুইয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ির সবার খাওয়াদাওয়া শেষ। থমথমে মুখে মা বলল, ‘কোথায় গিয়েছিলি?’ সঙ্গে-সঙ্গে বললাম, ‘আমি কাঁঠাল কিনে আসছিলাম, রাস্তায় কুকুর তাড়া করেছিল। কুকুরটা রাস্তার মোড়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আমি কত ঘুরে-ঘুরে এলাম।’ মা দাঁত পিষে বলল, ‘মিথ্যে বলছিস? সত্যি করে বল—’ সঙ্গে-সঙ্গে মা-কালী! ‘মা কালীর দিব্যি— কুকুর তাড়া করেছিল। আমি আসতেই পারছিলাম না। কাঁঠালের গন্ধে ব্যাটা পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমি ভয়ে কাঁঠাল ফেলে দিয়েছি। তাও—’ মা সবে হাতপাখা ধরেছে, বাবা এসে আড়াল করল, বলল, ‘কাঁঠালের রসে জামা-পাজামা সব ভিজে গেছে। ওকে মেরো না। যা তুই জামাকাপড় ছেড়ে ফেল।’

সেদিন আমি আসছি না দেখে বাবা ফতুয়া পরে রাস্তায় গিয়ে ঘুরেও এসেছে। খবরও পেয়েছিল, রামপেয়ারির রিকশায় আমি নিমাইদার সঙ্গে উঠেছি। বাবা সেটা কাউকে বলেনি।       

রামপেয়ারি আর পেয়ারিরাম। ওই দু’জন ছিল আমাদের প্রাইভেট কারের ড্রাইভার। পয়সা ছাড়াও চড়ে বসতে পারি। পরে বাবার থেকে পয়সা চেয়ে নিত। এরা বিহার মুলুকে দেশে যাওয়ার আগে বাড়িতে এসে জানাত। মা-মাসিমা ওদের কত কিছু বোঁচকা বেঁধে দিত। কখনও-কখনও ওরা এসে ওদের বদলি কে আছে, কোন ভাইপো— তাকে দেখিয়ে যেত। সে বড় সুখের সময়। এদের নাম ভুল করলে বা উল্টে দিলেও এরা সাড়া দিত, সঠিক নামের জন্য জানান দিত না। পুজোর সময় ওদের নতুন ফতুয়া বা লুঙ্গিও দেওয়া হত। পাড়ার অনেক বাড়ি-ই দিত। এই দু’জনের পাশে গঙ্গাধর বলে একজন ছিল। গঙ্গাধর ব্ল্যাকলিস্টেড রিকশাওয়ালা। 

আমাকে আর ফুলকোদিকে একদিন ডাক্তার ভদ্রর কাছে যাওয়ার সময় কালীঘাট হাই স্কুলের সামনে উল্টে দিয়েছিল। ফুলকোদি নয় খুব ভারী ছিল, মোটাসোটা; কিন্তু আমি তো ফিনফিনে, ব্যালান্স করা উচিত ছিল। আমরা মাটিতে যখন পড়ে, ফুলকোদির চাপে আমি উঠতে পারছি না, চিঁ-চিঁ করছি, গঙ্গাধর তখন দু-বগলে রিকশার হ্যান্ডেল চেপে শূন্যে দোল খাচ্ছে। অনেক কেটেমেটে-ছড়েমড়ে গিয়েছিল।

সেই থেকে গঙ্গাধরের রিকশায় আমরা উঠতাম না। 

এইসব রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে আমাদের খুব বন্ধুত্ব ছিল। বিশু একবার পরীক্ষায় ফেল করলে ওর বাবা হ্যাঙার দিয়ে খুব পিটিয়েছিল, আর মারতে-মারতে বলেছিল— তুই রিকশা চালিয়েও খেতে পারবি না। সেইজন্য এক বনধের দিনে বিশু ঠিক করল, রিকশা প্র্যাকটিস করবে। রামপেয়ারি বা পেয়ারিরাম কেউ রিকশা দেবে না। চাকার সঙ্গে চেন-তালা মেরে দিয়েছে। একমাত্র ভরসা গঙ্গারাম। 

গঙ্গারামের সঙ্গে চিন্টুর খুব বন্ধুত্ব। কেননা, চিন্টু তখন মাঝে-মাঝেই ওর কাছ থেকে খইনি নিয়ে মুখে রাখার চেষ্টা করছে। চিন্টু বলল, ‘গঙ্গারাম দেবে, তোরা প্র্যাকটিস কর। সবকিছু শিখে রাখা ভাল। কখন কী কাজে লাগে।’ 

বিশু রিকশা নিয়ে এক বনধের দিন দুপুরে প্র্যাকটিসে নামল। খুব কঠিন। খালি রিকশা তোলার পর, রিকশা বিশুকে শূন্যে দোল খাইয়ে, ঘোল খাইয়ে ছাড়ল। হাত-পা ছড়ে বিশু বলেছিল, না রে, বাবা ঠিকই বলেছে, আমার রিকশা চালানোর যোগ্যতা নেই।

গঙ্গারাম ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল— ‘ভাইয়া তুমকো রিকশা চালানেকা জরুরত নেহি, তুম রিকশা চড়নে কা কাবিল বানো।’

খুব জ্ঞানগর্ভ কথা! গঙ্গারামের খুব বুদ্ধি। 

চিন্টুর মনে হয়েছে ফুলকোদিকে গঙ্গারাম ইচ্ছে করে উল্টে দিয়েছে। কেননা, ফুলকোদির ওই চেহারা, তার ওপর সঙ্গে সবসময় কাউকে নিয়ে রিকশায় উঠত। অন্য কোনও রিকশাচালক কেউ ফুলকোদিকে নিতে চাইত না, গঙ্গারামকে ধমকে-চমকে রিকশায় চড়ে বসত ফুলকোদি। 

সেবার কালীপাগলি যখন চিন্টুর মাথা ফাটিয়ে দিল। তার পরের ঘটনা।

চিন্টুর পকেটে আছে জনাতিনেক সিনেমার লোকের ঠিকানা। একজনের বাড়ি হরিশ চ্যাটার্জি রোড ধরে এগিয়ে বলরাম বসু রোডের দিকে। আমাদের বড্ড কাছাকাছি। জায়গাটা ঠিক কোথায়, চিন্টু বলেনি। বুঝে নিয়েছে। ঠিক হল, মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেই চিন্টু যাবে সেই সিনেমার পরিচালকের বাড়ি। ও, রুমি অ্যালবাম নিয়ে এসেছে। আমি আর চিন্টু উঠে পড়েছি গঙ্গারামের রিকশায়। টুংটুং করে যাচ্ছি। কালীঘাট রোড পেরিয়ে আমাদের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি, তখন সেটা আমাদের কাছে কার্তিকদের বাড়ি— পেরিয়ে চলেছি। কিছুটা যাওয়ার পর, কিছু একটা দেখে চিন্টুর গোনা শুরু হল। চিন্টু ডানদিকের গলি গুনছে।

এক-দু-তিন-চার। তারপর বলল— এই গলি। 

আমি বললাম— কী করে বুঝলি? চিন্টু বলল, মাংসের দোকান পেরিয়ে চার নম্বর গলি। শোন, আমরা গলির ভেতর ঢুকব। নাক তুলে রাখবি। যেখানে মুতের গন্ধ পাবি, সেখানেই থামব। ওখানেই দেখতে পাব ধবধবে সাদা একটা বাড়ি। ওটাই ঠিকানা। ওই বাড়ি।

গলিতে ঢুকেছি। দু’জনেই নাক তুলে ঘন ঘন নাক টানছি। কিন্তু মুতের গন্ধ পাচ্ছি না! 

তার মানে গলি ভুল হল। চিন্টু গর্জে উঠল— ভুলভাল ঘুঁসা দিয়া! গঙ্গারাম রিকশা থামিয়ে গামছায় মুখ মুছতে-মুছতে বলল—এ হি হোগা! পিন্টু ধমকে বলল, ‘নিকল চলো।’

চার নম্বর গলি থেকে রিকশা বেরিয়ে এল। আবার তার পরের গলি— নাক টানতে-টানতে চলি। গন্ধ পেলেই— সাদা বাড়ি। সেখানেও পেলাম না।

বললাম— কোথায়, রে? 

গঙ্গারাম সরু গলির মধ্যে ঢুকিয়ে, হাঁচোর-প্যাঁচোর করে রিকশা বের করে হাঁপাচ্ছে। 

চিন্টু বলল— এই ঠিকানাই তো দিয়েছে। মাংসের দোকানের পর চার নং গলি। গলিতে ঢুকে যেখানে মুতের গন্ধ নাকে পাবে, সেখানেই থেমে যাবে। সামনেই দেখবে— ধবধবে সাদা বাড়ি। সেই বাড়িতে চিন্টুর জন্য অপেক্ষা করছেন সিনেমার বিখ্যাত এক পরিচালক। 

—তোকে এই ঠিকানা কে দিয়েছে?

—বাবু সরকার। 

এই বাবু সরকার আর মালা সরকার ছিলেন বিখ্যাত মাচা শিল্পী। থাকতেন আমাদের পাড়ার ভেতর। চিন্টু ততক্ষণে আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করা শুরু করেছে— কোন গলির ভেতর সবাই মোতে?

তখন কলকাতা শহর এত শহুরে ছিল না। দু-একজন ধমক দিয়ে বলল— এত খোঁজাখুঁজির কী আছে, এখানেই করে নাও।

আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে মুতের গন্ধ পাইনি, সেই সিনেমার পরিচালকের বাড়িও পাইনি। 

পরে শুনেছি, বাবু সরকার বলেছিলেন, তোমরা ঠিকই গিয়েছিলে, কেন পেলে না, আমি কী করে জানব!

তার কয়েকদিন পরে, গঙ্গারাম-সহ আমরা বসে যখন গলি না-পাওয়ার অন্তর্তদন্ত করছি, তখন গঙ্গারাম বলল, সে ঠিকই ঢুকেছিল? চিন্টু তাকে জোর করে বের করিয়ে এনেছে। ওই গলিটাই হবে।

চিন্টু গলা ভারী করে বলল, কী করে বুঝলি? 

গঙ্গারাম খইনি ডলতে ডলতে বলল, শ্বাস রুখরাহা থা, বিচিঙের গন্ধ মালুম হচ্ছিল।

ও হরি! তাই তো! আসলে সেদিন চার নম্বর গলিতে কর্পোরেশন থেকে ব্লিচিং দিয়েছিল যে!