ক্র্যাশ
চাঁদনি চক মেট্রোর কাছের একটা সরু গলির ভেতর, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক, মেমরি কার্ড, পেনড্রাইভ সারানো দোকানের সারি। দোকানগুলোর সামনে বসে আছে একগুচ্ছের ছেলে, কারও হাতে ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার, কারও ঠোঁটে শিস, কারও কানে ইয়ারফোন। কোথাও পুরনো সিপিইউ খুলে ধুলো ঝাড়া হচ্ছে, কোথাও মোবাইলের স্ক্রিন বদলাচ্ছে, কোথাও কেউ বলছে— ‘ডেটা রিকভারির গ্যারান্টি নেই, কিন্তু চেষ্টা করব।’
এরকমই একটা দোকানের ভেতর কাঠের বেঞ্চিতে বসে আছে নীলা। মুখ শুকনো। চোখ লাল। সামনে টেবিলে তার কালো রঙের এক্সটারনাল হার্ডডিস্কটা পড়ে আছে, যেন অপারেশন থিয়েটারের রোগী। কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটা সফটওয়্যার চলছে। একটা সবুজ বার অনেকক্ষণ ধরে আটকে আছে সতেরো শতাংশে।
দোকানের ছেলেটা মাউস নেড়ে বলল, ‘ম্যাডাম, ড্রাইভটা ডিটেক্ট করছে, কিন্তু সেক্টর রিড করতে পারছে না। হেড ক্র্যাশও হতে পারে।’
ছবি তুলতে গিয়ে কি মুহূর্ত হারিয়ে ফেলছে মানুষ? পড়ুন ‘নীলা-নীলাব্জ’ পর্ব ২৫…
নীলা যেন কিছুই বুঝল না। শুধু বলল, ‘মানে ফাইলগুলো পাব তো?’
ছেলেটা গলা নামিয়ে বলল, ‘বলতে পারছি না। কিছু পেলে কপি করে দেব। কিন্তু সব পাওয়া মুশকিল।’
নীলা চুপ করে গেল। তার মনে হচ্ছিল কেউ খুব সাধারণ গলায় বলে দিল, ‘আপনার বাড়িটা আর নেই, পুড়ে গেছে। ভেতরের লোকগুলোও হয়তো নেই। দেখি যদি দুটো ফুলদানি বাঁচাতে পারি।’
ঠিক তখন দোকানের বাইরে থেকে সেই পরিচিত গলা, ‘কী ব্যাপার? মুখটা এরকম কেন? হার্ডডিস্ক ক্র্যাশ?’
নীলা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মুখে হাসি নিয়ে নীলাব্জ দাঁড়িয়ে।
নীলা বলল, “আজ প্লিজ না। আজ আমাকে বিরক্ত ক’রো না।”
নীলাব্জ একটু থামল, ‘কী হয়েছে?’
দোকানের ছেলেটা বলল, ‘ডেটা রিকভারি চলছে দাদা। ড্রাইভ ক্র্যাশ।’
নীলাব্জ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওহ। এই জন্য শোকসভা?’
নীলা রেগে যায়, ‘আমার সব চলে গেল! সব! বুঝতে পারছ না?’
নীলাব্জ : তাহলে বুঝিয়ে বলো।
নীলা প্রায় কেঁদে ফেলে, ‘আমার সব ছিল এতে।’
নীলাব্জ : আহা, সব মানে কী? ব্যাঙ্কের টাকা?
নীলা : ছবি। ভিডিও। অফিসের ডকুমেন্ট। কলেজের নোট। বাবার পুরনো স্ক্যান করা চিঠি। মায়ের রেসিপি। কিছু অডিও রেকর্ডিং। আমার লেখা। কত ড্রাফট। কতগুলো ছবি যেগুলো আর কোথাও নেই। ট্রিপের ছবি। তানিয়ার বিয়ের ভিডিও। পুরনো ফোন থেকে ট্রান্সফার করা সবকিছু। সব।
নীলাব্জ চুপ করে শুনছিল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, ‘না, সব চলে যায়নি। কপিগুলো চলে গেছে।’
নীলা কটমট করে রেগে তাকাল, ‘তোমার কি কোনও অনুভূতি নেই?’
‘ও মা! কেন থাকবে না? আমি বলছি, তুমি তো চলে যাওনি। তোমার স্মৃতির কিছু কপি চলে গেছে।’
‘আমি যা ছিলাম, তার অনেকটাই তো ওর মধ্যে ছিল।’
নীলাব্জ বেঞ্চির এককোণে এবার বসেই পড়ল। নীলার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি একটা হার্ডডিস্কে ছিলে?’
‘আক্ষরিক অর্থে না। কিন্তু মানুষ তো স্মৃতি দিয়েই তৈরি।’
‘তাহলে যার স্মৃতি চলে যায়, সে আর মানুষ থাকে না?’
“এইসব দার্শনিকতা এখন ক’রো না তো! ভাল লাগছে না।”
‘আমি দার্শনিকতা করছি না। তুমি বলছ মানুষ স্মৃতি দিয়ে তৈরি। আমি জিজ্ঞেস করছি, স্মৃতি যদি নষ্ট হয়, মানুষ কি নষ্ট হয়ে যায়?’
নীলা চোখ নামিয়ে বলল, ‘অনেকটাই যায়।’
‘কিন্তু তুমি তো মরোনি! তোমার হার্ড ডিস্কটা মরেছে।’
‘তুমি কত সহজে বলছ! বাইরে থেকে সবাই এরকম শক্ত শক্ত কথা বলতে পারে। যার যায় সে-ই বোঝে!’

নীলাব্জ : ঠিক। তাহলে একদম মন থেকে বলো। কোন জিনিসটার জন্য এত কষ্ট হচ্ছে?
নীলা একটুক্ষণ চুপ করে রইল। দোকানের ভেতর ফ্যান ঘুরছিল। পিছন থেকে সোল্ডারিং-এর গন্ধ আসছিল। পাশের দোকানের একটা ছেলে ফোনে কথা বলছিল, ‘না দাদা, পাসওয়ার্ড না দিলে আনলক হবে না।’
নীলা বলল, ‘বাবার একটা ভিডিও ছিল। খুব ছোট। মাত্র এক মিনিটের। এক পয়লা বৈশাখে তুলেছিলাম। বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমায় বলছিল, এত ছবি তুলিস না। তারপর নিজেই হেসে বলেছিল, আচ্ছা তোল, পরে দেখবি। ওই ভিডিওটা এখন আর কোথাও নেই।’
নীলাব্জ এবার কিছু বলল না।
নীলা বলল, ‘যতদিন ছিল, ততদিন প্রায় দেখিইনি। কিন্তু জানতাম আছে। এটাই শান্তি ছিল। এখন মনে হচ্ছে, কেউ বাবাকে আবার মেরে ফেলল।’
নীলাব্জ মাথা নিচু করল। তার মুখের হাসিটা এবারে উধাও।
নীলা বলল, ‘এখন বলো, কপি গেছে, তো কী হয়েছে? বড় বড় কথা যত!’
নীলাব্জ : ঠিক, ওটা ফিরে না পেলে কষ্ট তো হবেই।
নীলা যেন এই কথাটা শুনে কিছুটা ভেঙে পড়ল। চোখে জল এল। ‘আমি ব্যাকআপ নিইনি। ক্লাউডে আপলোড করিনি। শুধু ভাবতাম একদিন করব। সব সময় ভাবতাম, পরে। পরে। পরে। সেই পরে আর এল না।’
নীলাব্জ বলল, ‘পরে বলে একটা জায়গা আছে তো, যেখানে আমরা সব অসম্ভব কাজগুলো জমিয়ে রাখি।’
নীলা চোখ মুছল, “মজা ক’রো না।”
কম্পিউটারের স্ক্রিনে হঠাৎ বারটা নড়ল। সতেরো থেকে আঠারো। তারপর আবার থেমে গেল।
দোকানের ছেলেটা বলল, ‘দেখুন, স্লো চলছে। কিছু সেক্টর পড়ছে। কিন্তু অনেকগুলো ব্যাড।’
নীলা সামনে ঝুঁকে পড়ল। ‘মানে কিছু পাব?’
‘হতে পারে।’
‘কতটা?’
ছেলেটি বিরক্ত হয়, ‘বললাম তো, বলা যাচ্ছে না।’
নীলাব্জ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো, জীবনও এরকম। কেউ তো বলতে পারে না যে…’
নীলা : চুপ করো!
আচ্ছা।
কিছুক্ষণ দু-জনেই চুপ। বাইরে থেকে ট্রামের ঘণ্টার মতো একটা শব্দ এল, যদিও ওই রাস্তায় ট্রাম নেই। সম্ভবত কোনও সাইকেলওয়ালার ঘণ্টা। গলির ওপর দিয়ে ঝুলে থাকা তারের জটের ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো তেমন আসছিল না, শুধু ধুলো আর দোকানের নীল টিউবলাইটে সবার মুখগুলো খুব ক্লান্ত লাগছিল।
নীলা বলল, ‘তুমি জানো, ওই হার্ডডিস্কটা খুললে আমার পুরো জীবন সাজানো ছিল। বছর ধরে। ২০১২, ২০১৩, ২০১৪… কলেজ, প্রথম চাকরি, পুরী, মন্দারমণি, গোয়া, পুজো, জন্মদিন, অফিস পার্টি। অনেকগুলো ফোল্ডার খুললেই মনে হত, আমি আছি। আমি ছিলাম। আমার একটা ধারাবাহিকতা আছে।’
নীলাব্জ বলল, ‘ধারাবাহিকতা ফোল্ডারের নামে থাকে না।’
‘কোথায় থাকে?’
‘এই যে তুমি এখন বসে আছ। এটাই ধারাবাহিকতা।’
‘খুব বাজে এবং বোকা আঁতেল মার্কা কথা। আমি যদি আমার ছোটবেলার মুখটাই দেখতে না পাই …’
‘ছোটবেলার মুখ দেখতে হার্ডডিস্ক লাগে? একশো বছর আগে মানুষ এসব পারত?’
‘ফালতু কথা বলো না তো! একশো বছর আগে ঘরে-ঘরে এসিও ছিল না, ফ্রিজ-ও ছিল না। যাও তাহলে একশো বছর আগে গিয়ে থাকো। যাও গিয়ে গান্ধীজীর সঙ্গে ডান্ডি মার্চ করো! নুন তুলে খাও গিয়ে।’
‘আহা রেগে যাচ্ছ কেন?’
‘বাজে কথা বলবে আর রাগব না? আমার সব প্রমাণ চলে গেল আর তুমি ইয়ার্কি মারছ!’
‘প্রমাণ? যে তুমি বেঁচে ছিলে?’
নীলা থমকে গেল।
নীলাব্জ বলল, “কোর্টে পেশ করবে? ‘মাননীয় বিচারক, আমি সত্যিই বেঁচেছিলাম, এই দেখুন আমার সাড়ে তিন হাজার ছবি?”
নীলা একটু রেগে বলল, ‘তুমি সবকিছু খাটো করো কেন?’
‘খাটো করছি না। প্রশ্ন করছি। আমরা কি এখন বাঁচি, নাকি বাঁচার প্রমাণ জমাই?’
‘প্রমাণ দরকার হয় কারণ মানুষ ভুলে যায়।’
‘মানুষ ভুলে যায় বলেই মানুষ বেঁচে থাকে। জীবনটা এগিয়ে চলার।’
নীলাব্জ : তার মানে তোমার হার্ডডিস্কের মধ্যে শুধুমাত্র ভাল স্মৃতি ছিল না। ছিল কিছু যন্ত্রণা, কিছু সম্পর্কের অবশিষ্ট, কিছু কথোপকথন, কিছু স্ক্রিনশট, কিছু প্রমাণ, যেগুলো তুমি হয়তো কাউকে কোনওদিন দেখাতে না… শুধু নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলে যদি…
‘না, সব যন্ত্রণা ভুলে যাওয়ার নয়। ওসব পুরনো কথা, ওসব বাদ দাও এই বলে সব কাটিয়ে দেওয়া যায় না। ছবিগুলো থাকলে, চিঠিগুলো থাকলে, ভয়েস নোট থাকলে, কেউ পুরোটা অস্বীকার করতে পারে না।’
নীলাব্জ বুঝতে পারে আলোচনা কোন দিকে যেতে পারে, ‘মানে স্মৃতি শুধু মায়া না, সাক্ষীও?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর সাক্ষী মরে গেলে?’
নীলা এবার খুব নিচু গলায় বলে, ‘তখন অপরাধী বেঁচে যায়।’
নীলাব্জ : তার মানে তোমার হার্ড ডিস্কের মধ্যে শুধুমাত্র ভাল স্মৃতি ছিল না। ছিল কিছু যন্ত্রণা, কিছু সম্পর্কের অবশিষ্ট, কিছু কথোপকথন, কিছু স্ক্রিনশট, কিছু প্রমাণ, যেগুলো তুমি হয়তো কাউকে কোনওদিন দেখাতে না… শুধু নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলে যদি…
নীলা : যদি আমার জীবনের বিরুদ্ধে কেউ মিথ্যে বলে তাহলে এগুলো আমি তুলে ধরে বলতে পারতাম— না, মি’লর্ড! আসলে এরকম হয়েছিল।
নীলাব্জ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘সবকিছু আর্কাইভ করা যায় না নীলা।’
‘কেন?’
‘কারণ এটা জীবন!’
নীলাব্জ আরও বলল, ‘আগে মানুষ মারা গেলে দুটো ছবি থাকত, কয়েকটা চিঠি থাকত। এখন মানুষ মারা গেলে চার টেরাবাইট ডেটা পড়ে থাকে। তবু মানুষটাই থাকে না। তুমি ভয় পাচ্ছ কারণ তুমি ভাবছ ডেটা নেই মানে তুমি নেই। কিন্তু তুমি তোমার ডেটা নও।’
নীলা বলল, ‘তাহলে আমি কী?’
‘কারেক্ট প্রশ্ন! তবে সে তোমাকেই ভেবে বের করতে হবে! এই প্রশ্নের উত্তর যদি হার্ড ডিস্কে থাকে, তাহলে সত্যিই বিপদ।’
নীলা : কিন্তু ডেটা খুব দরকার, না-হলে লোকে যা খুশি বানিয়ে বানিয়ে বলবে আর অন্যেরা তা বিশ্বাস করবে।
নীলাব্জ : ডেটা দেখালেও কিছু গাম্বাট পাবলিক থাকবে যারা বিশ্বাস করতে চাইবে না। আর কেউ কিছু পড়ে না, লোকের মুখের কথা শোনে চলে।
দোকানের ছেলেটি বলল, ‘ম্যাডাম, কিছু ফাইল দেখাচ্ছে। কিন্তু নামগুলো করাপ্টেড। ওপেন হবে কি না দেখতে হবে।’

স্ক্রিনে কয়েকটা অদ্ভুত নাম দেখা গেল— FILE0001, FOUND.002, RAW_RECOVERY। কোনও পরিচিত ফোল্ডার নেই। কোনও বছর নেই। কোনও সুন্দর সাজানো স্মৃতি নেই। যেন ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে আজগুবি নম্বর দেওয়া কিছু ইট বেরিয়েছে।
নীলা বলল, ‘ওপেন করুন।’
ছেলেটা একটা ফাইল খুলল। স্ক্রিনে অর্ধেক ছবি ফুটল— ওপরের অংশে আকাশ, নিচে ধূসর ব্লক। আরেকটা খুলল— শুধু শব্দ, কোনো ছবি নেই। আরেকটা— খুললই না। তারপর একটা ছোট ভিডিও চলল। তিন সেকেন্ড। কেউ হাসছে। তারপর স্ক্রিন সবুজ হয়ে গেল।
নীলা শ্বাস বন্ধ করে দেখছিল। ‘আর?’
ছেলেটা– আর কিছু বোধহয় পাওয়া যাবে না।
নীলা ঠোঁট কামড়ায়।
ছেলেটা– কী করব ম্যাডাম?
নীলা মাথা নাড়ল, ‘যা পেয়েছেন, কপি করে দিন।’
দোকানের ছেলেটা একটা নতুন পেনড্রাইভে কিছু ফাইল কপি করতে লাগল। কাজ শেষ হতে-হতে সন্ধে হয়ে গেল। বাইরে গলিতে আলো জ্বলে উঠেছে। নীলা পেনড্রাইভটা ব্যাগে রাখল। হার্ড ডিস্কটা হাতে নিল। এতদিন যা ছিল তার ব্যক্তিগত মহাবিশ্ব, এখন সেটা একটা মৃত কালো বাক্স।
দু-জন বাইরে বেরল। চাঁদনি চক থেকে বড় রাস্তায় এসে নীলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মানুষ হাঁটছে, বাস যাচ্ছে, হকার চেঁচাচ্ছে, কেউ সস্তার হেডফোন বিক্রি করছে। পৃথিবী খুব স্বাভাবিক। যেন কারও কিছু যায় আসে না যে নীলার জীবনের কতগুলো ফোল্ডার আজ সারা জীবনের মতো মুছে গেছে।
নীলাব্জ বলল, ‘কোথায় যাবে?’
নীলা বলল, ‘জানি না।’
—চা খাবে?
—না।
—কিছু খাবে?
—ইচ্ছে করছে না।
তবু ওরা হাঁটতে লাগল। বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল, বাতাসে আর্দ্রতা। হঠাৎ কোথা থেকে ভীষণ চেনা একটা গন্ধ ভেসে এল। পাশেই কোনো দোকানে গাওয়া ঘি-এ লুচি ভাজা হচ্ছিল। সেই গন্ধ বাতাসে মিশে নীলার নাকে এল।

নীলা থেমে গেল।
নীলাব্জ বলল, ‘কী হল?’
নীলা উত্তর দিল না। চোখ বুজে শুধু ওই গন্ধটা শুঁকতে লাগল। মনে হল, এ তো শুধু গন্ধ নয়! এ যেন একটা দরজা। বহু দূরের একটা দরজা যা হঠাৎ খুলে গেল।
নীলা : জানো নীলাব্জ, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার একটা শৈশবের সকাল।
আমি তখন খুব ছোট। দমদমের পুরনো বাড়ি। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে অল্প রোদ ঢুকছে। ঠাকুমা গাওয়া ঘি-এর লুচি ভাজছে। বাবা খবরের কাগজ পড়ছে, কিন্তু বারবার রান্নাঘরে উঁকি মারছে। গরম লুচিতে প্রথম কামড় দিতেই জিভ পুড়ে গেছিল আমার। বাবা জল এনে দিয়েছিল। তারপর নিজের প্লেট থেকে একটু ভেঙে বলেছিল, ‘এবার ফুঁ দিয়ে খা।’
এই দৃশ্যের কোনও ছবি নেই। কোনও ভিডিও নেই। কোনও স্ক্যান করা চিঠি, কোনও ফোল্ডার— কিচ্ছু নেই। তবু কেমন পরিষ্কার ভেসে উঠল দেখো? আমি যেন টেবিলের নিচের ঠান্ডা মেঝেটা ছুঁতে পারলাম। সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ফিরে এল। একসঙ্গে। অবিকল হয়তো নয়, তবু জীবন্ত।
নীলার চোখে জল এসে গেল।
নীলাব্জ থতমত খেয়ে যায়। কী করবে বুঝতে পারে না।
নীলাব্জ : তুমি যে হঠাৎ প্রাউস্ট হয়ে উঠলে…
নীলা : প্রাউস্ট না মাউস্ট অত জানি না। যা মনে হল তাই বললাম।
নীলাব্জ নরম গলায় বলল : আজ তোমার এত স্মৃতির ফাইল চলে গেল, কিন্তু এটা তো গেল না। কোথায় ছিল বলো?
নীলা নিজের মাথার দিকে আঙুল দেখায়।
নীলাব্জ : প্রাইমারি মেমরি!
নীলা হাসে : মাথার কোথায় যে থাকে, কে জানে। কোন অচেনা বাঁশির সুর, কোন গন্ধ, কোন পাহাড়ের দৃশ্য এক নিমেষে আমাদের যে কোথায় নিয়ে যায়… কী তার ক্ষমতা!
নীলাব্জ : হ্যাঁ, কিন্তু জোর করে নয়। আচমকা আসতে হবে। অনিচ্ছাকৃত হতে হবে!
নীলা লক্ষ করে, নীলাব্জ কখন যেন নীলার হাতটা ধরেছে।
নীলা : কিন্তু এটা কী হচ্ছে? হাতটা কি ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃতভাবে ধরেছ?
নীলাব্জ ঘাবড়ে যায়। হাতটা ছেড়ে দেয়, ‘ইয়ে মানে, সরি।’
নীলা মৃদু হাসে, ‘বেশ। আজকে চলি। পরে কথা হবে।’




