উল্টো দূরবিন: পর্ব ১৯

Representative Image

গল্পের মতো, ইশকুল বাড়ি

বাগবাজার-লাগোয়া শ্যামবাজার। আদিতে নাকি, শ্যাম মল্লিকের একটা মস্ত পুকুর ছিল। সেটা শ্যামপুকুর নামে খ্যাত ছিল। সেই পুকুর ভরাট করে, বসতি হল। শ্যাম মল্লিকও রইল না, পুকুরও না। কিন্তু শ্যামপুকুর রয়ে গেল। এখানেই আকাশবাণীর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র-র বাড়ি, আকাশবাণীর বেলা দে-র বাড়িও এখানে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তথা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এখানেই কাটিয়েছেন ছোটবেলা। এই অঞ্চলেই তো সিনেমাপাড়া। বিধান সরণীর দু’পাশে, পর-পর সিনেমা হল ছিল— ‘দর্পণা’, ‘মিত্রা’, ‘মিনার’, ‘উত্তরা’, ‘শ্রী’, ‘রাধা’, ‘বিধুশ্রী’, ‘রঙমহল’, ‘স্টার’, ‘বিশ্বরূপা’… আমাদের কৈশোর-প্রথম যৌবনের রূপকথারা। 

বাগবাজারের লাগোয়া কুমারটুলি, আর একপাশে এই কুমারটুলি। শোভাবাজারে কতবার গিয়েছি হাঁটতে-হাঁটতে। কুমারটুলিতে ঠাকুর গড়া দেখতে গিয়েছি স্কুল পালিয়ে।

বাগবাজারের উত্তরসীমায়, টালাখালটা পেরোলেই— টালাব্রিজের উপর থেকে একটা দোতলা বাস একবার পড়ে গিয়েছিল। অনেকেই দেখে এসে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়েছিল। এরপর বাঁদিকে বেলগাছিয়া, বেলগাছিয়া থেকেই বগিরহাট, হাসনাবাদ বারাসাতের বাসগুলো সব ছাড়ত। আসলে ওখান থেকেই ছাড়ত মার্টিনরেল, ছোট রেল মিটারগেজ। চলে যেত বসিরহাট পর্যন্ত। যোগাযোগের রাস্তাটা ভাল হওয়ার পর, বাস চলতে শুরু করে। মার্টিনরেলের লোকসান হতে থাকে; ১৯৫০-৫২ নাগাদ বন্ধ হয়ে যায়। সেই লাইন চলে গিয়েছিল, দমদমপার্ক-প্রফুল্লনগর হয়ে। পূর্বপাকিস্তানের শরণার্থীরা ওই পরিত্যক্ত রেল লাইনের পাশেই, নতুন ঘর বাঁধে। আমার উপন্যাস ‘জলের উপর পানি’-তে এই উদ্বাস্তু উপনিবেশের কথা লিখেছি। 

 প্রথম ইস্কুল এবং বাল্যবন্ধুরা 

আমার হাতে খড়ি দিয়েছিলেন আমার দাদু। কৃষ্ণকমল। একটা কালো পাথরের থালা, উল্টো করে দাদু লিখেছিলেন— ‘অ’ আর ‘ক’। দাদু এই অক্ষর দুটোর উপর হাতবুলোতে বলেছিলেন। সে-দিন সরস্বতী পুজো ছিল, হাতে খড়ি হয়েছিল ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের লাল সিমেন্টের বারান্দায়। মা ঠাকুমারা সব উলু দিয়েছিল।

তার আগেই সম্ভবত আমি। ‘অ’, ‘আ’ ‘ক’, ‘খ’ চিনে গিয়েছিলাম। তবে লিখতে বোধহয় পারতাম না। হাতে খড়ি হয়েছিল নিশ্চয়ই শাস্ত্র-নিয়মে, পাঁচ বছরে। কিন্তু স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম, আরো দু’বছর পরে। তখন কেজি-ইনফ্যান্ট এসব যে একেবারেই ছিল না, এমন নয়। আগে তো হোলি চাইল্ড, সেন্ট মার্গারেট এসব ছিল। উত্তর কলকাতাতেই ছিল। কিন্তু যেসব স্কুল তখন বিখ্যাত, যেমন শ্যামপুকুরের শৈলেন্দ্র সরকার হাই স্কুল, টাউন স্কুল পার্ক ইনস্টিটিউশন শ্যামবাজার এ ভি স্কুল, এসব কোনওগুলোতেই কেজি দূরের কথা, ইনফ্যান্ট তো ছিল না ক্লাস ওয়ান থেকেই পড়া শুরু হত। 

উত্তর কলকাতাতেই ছিল তেলেভাজার একমাত্র ফাইভস্টার রেস্তোরাঁ?
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১৮…

আমি ভর্তি হয়েছিলাম ঠিক কত সালে, আমার মনে নেই। কে আমাকে ভর্তি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটাও মনে নেই। আমাকে একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল, একজন ধুতি পরা টাকমাথা মানুষ, হাতে একটা ছোট বেত, কতগুলো বেঞ্চি, বেঞ্চিতে কতগুলো ছেলে আমারই মতন। উনি বলছেন, ‘বেশি-বেশি কিছুই ভাল নয়। বৃষ্টি না হলে, গাছ মরে যায় আবার বেশি বৃষ্টি হলে, গাছের শিকড় পচে গাছ মরে যায়।’ কেন যে আজ ওই বাক্যটা মনে আছে, জানি না। এমন অনেক কথা মনে থেকে যায়, যার কারণ মন নিজেই জানে না। সেই স্যারের উপরের পাটির দাঁত ছিল না, উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘নয়ের পিঠে এক কত?’, ‘পাঁচের নামতা বলো দেখি?’ উনি বললেন, ‘ছাপ্পান্ন’ লেখা দেখি। আমি লিখলাম; উনি বললেন, কথায় লেখ। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না। উনি দেখালেন, ‘ছ’য়ের কাঁধে এই দিলাম আকার, ‘পা’য়ের ঘাড়ে ‘প’ উঠালাম, ‘দন্তন্ন’য়ের ঘাড়ে, ‘দন্তন্ন’… পড়ো তো দেখি…

এই এডমিশন টেস্টটাও দিব্য মনে আছে। কিন্তু কে নিয়ে গিয়েছিলেন, মনে নেই। কী আশ্চর্য! বাবা নয়, বড় পিসেমশাই, না কি বাবার বন্ধু অনিল কাকু… যাই হোক স্যর লিখে দিলেন— ক্লাস থ্রি… এক্কেবারে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হয়ে গেলাম। কিশালয় বই। ‘মৌমাছি-মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি/ ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল,  বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই…’  পাটিগণিত। না, ইংরেজি ছিল না। ইংরেজি শুরু হয়েছিল ক্লাস ফাইভ থেকে। এটা ১৯৫৮ সালের কথা বলছি।

মনে পড়ছে, যিনি আমার এডমিশন টেস্ট নিয়েছিলেন, তার নাম ছিল মানিকবাবু। উনি ড্রিলও শেখাতেন। ধুতি পরা ড্রিল স্যার, পায়ে বুট। বাংলা পড়ানোর সময়ে শার্টটা  ধুতির উপরে ঝুলত। ড্রিল শেখানোর সময়ে, শার্টটা ধুতির গিঁটের ভিতরে গুঁজে দিতেন। মাঠে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে, ইংরেজি মতে ড্রিল শেখাতেন। ‘এ…টে… এন…শন…!’

স্টান্টিজ… স্টান্টিজ মানে বুঝেছি অনেক পরে। ‘স্ট্যান্ড এট ইজ’। অনেক স্কুলে এটেনশনের বদলে,  সাবধান বলা হয়। স্ট্যান্ড অ্যাট ইজ এর পরিবর্তে বিশ্রাম। অ্যাটেনশন করার সময়ে, স্যর বুট জুতোর গোড়ালি, মাটিতে ঢুকে একটা শব্দ করতেন। আমাদের মধ্যে, মাত্র দু’জন বুট পড়ে স্কুলে আসত। সবাই চটি। কেউ কেউ কাবলিজুতো। দু’একজন কেড্‌স। খালি পায়েও দু’একজন যেত মাঝেমাঝে। চটি ছেঁড়া ছিল বলে, দু’চারবার আমিও খালি পায়েই গিয়েছি। স্কুল ইউনিফর্ম তো দূরের কথা, পোশাকের কোনওরকম নির্দেশই ছিল না। যে যেমন খুশি জামা প্যান্ট পড়ে, স্কুলে যেত। আমাদের লম্বা হবার বয়সে, প্যান্টগুলো একটু বড়ই কিনতেন আমাদের অভিভাবকরা। ফলে এই প্যান্টগুলো ঢোল-ঢোল করত, কেউ বেল্টের অভাবে কাপড়ের পার দিয়েও প্যান্টকে কোমরে বেঁধে রাখত। 

কথা হচ্ছিল ড্রিল শেখা নিয়ে। ওই প্রসঙ্গেই ফিরে যাই। ফের মানিকবাবু ধুতিতে শার্ট গুঁজে, ড্রিল শেখাতেন। ইংরেজি মতে, আর বাংলা মতে ব্রতচারী তখন শার্টটা গোঁজা থাকত না। উনি বলতেন, খেলার ছলে ব্যায়াম। নাচতে হতো গানের সঙ্গে। ‘চল কোদাল চালাই ভুলে মানের বালাই,/ ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই/ যত ব্যাধির বালাই, বলবে পালাই পালাই,/ এবার খিদের মুখে, খাব ক্ষীর আর মালাই।’ কোদাল চালানোর ভঙ্গিমা করতে হত। আমরা অপেক্ষা করতাম, গানের শেষ লাইনটার জন্য। ‘খাব ক্ষীর আর মালাই’ আমরা দু’হাতে যেন হাঁড়ি থেকে ক্ষীর আর মালাই নিয়ে মুখে পুরছি। মালাই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতাম না। মালাই বরফ জানতাম, ভাবতাম মালাই খুব ঠান্ডা হয়। তবে ক্ষীর জানতাম। খুব কম হলেও। ক্ষীর তৈরি করতেন ঠাকুর্মা। লুচি দিয়ে খেতে দারুণ কিন্তু লুচি হতই না। বছরে হয়তো একদিন লুচি খেতে পারতাম মেজপিসিমার ঘরে।

আমাদের স্কুলব্যাগ বলে কিছু ছিল না। বইপত্র নিতাম হাতে। আমার বাবার আমলে নাকি একটা চটের ব্যাগে ভরে একটা বসার আসন, স্লেট, খড়ি বই নিয়ে পাঠশালায় যেতে হত। এই চটের ব্যাগটাকে বলা হত, দপ্তর।

কাশিমবাজার স্কুলের ক্লাস থ্রির বন্ধুদের কয়েকজনের নাম মনে আছে, কয়েকজনের সঙ্গে আজও যোগাযোগ আছে। বেশ কয়েকজন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। বন্ধুদের মধ্যে শিবব্রতদের প্রদীপ সেনগুপ্ত মদনমোহন গুঁই এঁদের সঙ্গে এখনও ফোনে কথা হয়। একটি ছেলে ছিল, মুখের থুতু দিয়ে আশ্চর্য ওষ্ঠ দক্ষতায়, মুখ দিয়ে বাব্‌ল তৈরি করতে পারত। ওর নাম ছিল বোঁদে। নিশ্চয়ই একটা ভাল নাম কিছু একটা ছিল। কিন্তু ওই নামেই বিখ্যাত ছিল। এরকম ডাকনামে বিখ্যাত অনেকেই ছিল। ছনি-মনি দুই জমজ ভাই, ট্যাড়া, নাটা, লম্বু— এরকম আকৃতি বা শরীর খোঁচা মারা নাম। তখন বডিশেমিং ব্যাপারটাই সামাজিক মননে ছিল না। ততটা। বোঁদে ডাক নামটা তখন অনেকেরই ছিল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নাকি বাণীকুমারকে একান্তে বোঁদে নামেই ডাকতেন। আসলে বোঁদে ছিল, বৈদ্যনাথের সংক্ষিপ্ত রূপ। মদন হয়ে যেত মদনা, মানিক হয়ে যেত মান্‌কে আরও পরে মাঙ্কি। এই মাঙ্কি নামমাহাত্মে কি না জানি না, বাঁদরের মতোই পাইপ বেয়ে ওঠা-নামা করতে পারত। একজন ছিল, উত্তমকুমার ওর ঘাড়ের দিকটা ছাঁটা থাকত, ইউ আকৃতিতে। সামনের চুল ছিল ফাঁপানো-ফুলানো। উত্তম কুমারের ডায়লগ ও বলত। অমরনাথ বিশ্বাস নামে একটা ছেলে ছিল, খুব বড়লোক ওরা ও টিফিনে স্যান্ডউইচ খেত। জীবনে প্রথম স্যান্ডউইচ দেখলাম ওর কৃপায়। দু’চারবার খাইয়েছে ওর থেকে ভেঙে। পাতলা পাঁউরুটির ভিতরে, মাখন জড়ানো, মুরগির মৃদু মাংস, সঙ্গে শসা।

অমরনাথদের ছিল বন্দুকের ব্যাবসা। মেট্রো সিনেমার ঠিক পাশেই, একটা বন্দুকের দোকান ছিল ওদের। অমরনাথের বাড়ি ছিল বৃন্দাবন মিত্র বাই লেনে। ও একবার আমাদের, ওর বাড়িতে সিনেমা দেখার নিমন্ত্রণ করে। ওদের বাড়িতে দেওয়ালে সিনেমা দেখি। লরেল-হার্ডির। জীবনের প্রথম লরেল-হার্ডি। লরেল লম্বা, হার্ডি বেঁটে। ওদের মজার-মজার কাণ্ডকারখানা নিয়ে, নির্বাক সিনেমা। এর কিছুদিন পরও আবার ডাকল। এবার দেখি দেওয়ালে অমরনাথ ঘুরে বেড়াচ্ছে। হ্যাঁ, দেওয়ালে! অবাক কাণ্ড! ওরা মুভিক্যামেরা কিনেছিল, সেই মুভি ক্যামেরায় ছবি তুলেছে দিল্লিতে। লালকেল্লা-কুতুবমিনার-হুমায়ুনের সমাধি— অমননাথের দাদা-বৌদি, মা-বাবা সবাইকে দেখা যাচ্ছে। এ বড় আশ্চর্য ব্যাপার দেখলাম।

আমাদের ক্লাসে গুপীনাথ শীল আর শিবনাথ শীল নামে দুই খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাই ছিল। ওদের নিজেদের গুদাম ছিল। সিমেন্টের ব্যাবসা। টিফিন-বেলায় ওদের বাড়ি থেকে একজন চাকর আসত। টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে। স্কুলের বাইরে রোয়াকের উপর রাখতো গুপিনাথ। শিবনাথ ওখানে গিয়ে টিফিন খেত লুচি কিংবা পরোটা তরকারি দিয়ে। একটা করে মিষ্টি, তারপর দুধ হাতের চেটোয় ঠোঁট মুছতে-মুছতে দু ভাই চলে আসতো। কী কী টিফিনে খেত, সেটা বলেছিল মাঙ্কি। ও নাকি ল্যাম্পপোস্ট বেয়ে উঠে, শীল-ভাইদের টিফিন সমারোহ দেখেছিল।

এরকম ডাকনামে বিখ্যাত অনেকেই ছিল। ছনি-মনি দুই জমজ ভাই, ট্যাড়া, নাটা, লম্বু— এরকম আকৃতি বা শরীর খোঁচা মারা নাম। তখন বডিশেমিং ব্যাপারটাই সামাজিক মননে ছিল না। ততটা। বোঁদে ডাক নামটা তখন অনেকেরই ছিল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নাকি বাণীকুমারকে একান্তে বোঁদে নামেই ডাকতেন। আসলে বোঁদে ছিল, বৈদ্যনাথের সংক্ষিপ্ত রূপ। মদন হয়ে যেত মদনা, মানিক হয়ে যেত মান্‌কে আরও পরে মাঙ্কি। এই মাঙ্কি নামমাহাত্মে কি না জানি না, বাঁদরের মতোই পাইপ বেয়ে ওঠা-নামা করতে পারত।

ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেই বাড়ি থেকে টিফিন আনত না, অল্প কয়েকজনই আনত। রুটি-গুড় আনত কেউ-কেউ। রুটি-আলুচচ্চড়ি পাঁউরুটিতে জেলি মাখিয়ে, কিংবা মাখন মাখিয়ে, আনত অমরনাথ, মণিলাল। মণিলালের বাবা ডাক্তার। তখন ওইসব ইস্কুলে, উকিল-ডাক্তার-ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলেরা যেমন পড়ত, বস্তির ছেলেরাও পড়ত। আমি টিফিনে আনতাম না, বাড়ি থেকে কখনওই টিফিন নিতে বলেনি।

টিফিন বেলায় স্কুল গেটের সামনে কয়েকজন খাবার নিয়ে বসত। একজন ছিল গৌর। একটা টিনের বাক্স নিয়ে আসত। বাক্সে দুটো বড়-বড় ডালডার টিন। একটা ছোট-ছোট আলুর দম, অন্যটায় চাপঘুগনি। আলুর দমটা বেশ ঘন, শালপাতায় পরিবেশন করত মশলা ছিটিয়ে। মশলা ছেটানোর কায়দাটা ছিল দেখার মতো। আলুরদমের উপর একটা কাঠি পুঁতে দিত। ঘুগনিটা ছিল খুব ঘন। শালপাতাকে গোল করে কেটে রাখা থাকত, তার ওপর ঘুগনি দিয়ে, খালি করে কেটে রাখা দু’পিস নারকোল উপরে সাজিয়ে দিয়ে, মশলা ছিটিয়ে, আরও ছোট করে কেটে রাখা শালপাতার চামচ দিয়ে হাতে তুলে দিত। আহা! একজন নিয়ে বসত কেক-বিস্কুট-প্যাটিস। ও নাকি নিজে তৈরি করত। ওর কাছে একটা চ্যাপ্টা ধরনের কড়কড়ে বিস্কুট থাকত। টোস্ট বিস্কুট গোল হলে যেমন হয়। এই বিস্কুটটার নাম দিয়েছিল দেবদাস। কেন এমন নাম, জানি না। একটা দেবদাস কিনে, গৌরের কাছে নিয়ে যেতাম। ও বিস্কুটের উপর সেই চাপ ঘুগনি হালকা করে মাখিয়ে দিত। এখন যাকে বলে ‘টপিং’। এটার এক আশ্চর্য স্বাদ ছিল। একটা প্যাটিসের দাম ছিল চার আনা। এত দাম দিয়ে প্যাটিস কিনবার উপায় ছিল না। অবরে-সবরে দু’জনে দু’আনা করে দিয়ে, ভাগ করে খেতাম। একজন বুড়ো হজমিওয়ালা ছিল বাখারির স্ট্যান্ডের উপর, একটা বড় গোল থালায়, খোপে-খোপে রাখা মশলা আর বয়ামে ভরা গোল মার্বেল-সাইজের হুজমিগুলি, একটা কাগজের টুকরোর উপর খয়রি রঙের হজমি গুলিটা, দু’আঙুলে পিষে, চার-পাঁচরকম মসলা ছড়িয়ে, বেশ ভাল করে দলাই-মালাই করে, তার উপর একটা কালো রঙের গুঁড়ো ছড়িয়ে, একটা শিশি থেকে দু’ফোঁটা তরল ফেলে দিলে একটা কেমন বুটবুটি হত। একটু ফেনা মতো জিভে ঠেকালে, শির-শির করত। ওই কালো নুনটাকে বলতাম ইলেকট্রিক নুন ওটা যে কি পদার্থ ছিল আজও জানি না। আর তরল পদার্থটাই বা কী ছিল! যখন কলেজে কেমিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, একবার মনে হয়েছিল হজমি ওয়ালাদের কাছ থেকে ওই নুনের স্যাম্পেল নিয়ে এসে, স্যারদের দেখাযই কিন্তু সেই সময়ে, ১৯৬৮-৬৯ সালে হজমিওয়ালাদের কাছে ওই গুঁড়ো পাইনি। 

আজ তাদের বয়স অনেকটাই বেশি। যাঁরা উত্তর কলকাতায় থাকতেন, তাদের হয়তো ওরকম নুনের স্মৃতি মনে আছে। যে-কাগজে হজমি মেখে দেওয়া হত, একবার দেখি ওটা আমারই করা লসাগুর অংক। মানে আমারই রাফ খাতা। একটা শেষ হয়ে যাওয়া রাফ খাতা, একটা হজমি এবং কয়েকটা টোপাকুলের বিনিময়ে দিয়ে দিতাম। হ্যাঁ এই হজমিওয়ালারা টোপাকুলও বিক্রি করত। ছোট-ছোট লাল-লাল কুল। টোপাকুলের টক-মিষ্টি স্বাদ। বিটুনুন-ঝাললুন ইত্যাদি ছড়িয়ে দিত। টিফিনের সময়ে বাইরে থেকে কিছু কিনে খাওয়া আমার কমই হত। বাড়ি থেকে টিফিন খাওয়ার পয়সা আলাদা করে দেওয়া হত না। কেউ-কেউ টিফিনের জন্য এক আনা দুই আনা করে পেত। ‘এই একটু খাওয়া না মাইরি’ বলার মতো কেউ কেউ ছিল। ওরা অনায়াসে হাত পেতে দিত।

আমাদের ক্লাসের আরও কিছু সহপাঠীর কথা মনে পড়ছে। টেরু ও টুটলে। টেরুর একটা চোখ টেরা ছিল। ওর ভালো নাম ছিল তপন। টুটলের ভালো নাম জানি না ওরা কেউ আজ আর বেঁচে নেই। ওদের পদবী ছিল ব্যানার্জি ওদের বাড়িতেই পঞ্চাননের মন্দির ছিল। শিশুদের রোগব্যধি কন্ট্রোল করেন। অনেক পরে আমি তখন ৬০-এর কাছাকাছি, ও পাড়া গেছি, দেখি টুটলে পায়ে জল ঠেকিয়ে,  ফুঁ দিচ্ছে।  জলপড়া নেবার জন্য, ছয়-সাতজন মা বসে আছেন কোলে সন্তান নিয়ে। কত ফ্ল্যাট বাড়ি… এলাকার মানুষজন কত পাল্টে গেছে তবুও পঞ্চাননের জল পড়া নেবার মানুষ থেকে যায়।

সমীর নামে একটা ছেলে ছিল, খুব ভাল গান গাইত। বেঞ্চি বাজিয়ে গান গাইত। মানবেন্দ্র মুখার্জির গান গাইতে বেশি। ‘ও আমার চন্দ্রমল্লিকা এত যে তোমায় ভালোবেসেছি…’ একদিন হেডস্যর ঢুকেছিলেন। টিফিনবেলায় ভালবাসার গান হচ্ছিল। তখন স্যর ঢুকতেই, সমীর চুপ। কানে হাত। আর করব না স্যর, হেডস্যারের নাম ছিল যতীন চক্রবর্তী। পাতলা ছিপ-ছিপে চেহারা, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। বলেছিলেন, গান করতে না করেছি? মাঠে গিয়ে, ক্লাসে নয়। কিন্তু মাঠে তো টেবিল নেই, তাল হবে কী করে? সমীর বলেছিল, জলের ট্যাংকি বাজিয়ে ঠিক করে নেব স্যার। উনি হেসে দিয়েছিলেন। সমীর ছাড়াও আর-একজন গান করতে পারত। দেবকুমার গুহ। একটি ছেলে ছিল, ভোলানাথ ব্যানার্জি। বাগবাজার ট্রাম ডিপোর পাশে, ব্যোম কালীর মন্দিরের সেবায়তদের বংশধর। মা কালী নাকি ওর সঙ্গে কথা বলতো। আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কথা বলার সময় কি জিভ বের করা থাকত? না কি, জীব যেখানে থাকার সেখানেই থাকত। ও বলত, জিভ বের করাই থাকত। তবু কী করে কথা বলতেন, সেটা মায়ের ব্যাপার। আমি আমার জিভ বের করে বলার চেষ্টা করতাম, ‘বাবা ভোলানাথ তোকে বের করে দিচ্ছি অংকে ১০০ পাবি।’ ভোলা বলত, তুই মাকে ভেঙাচ্ছিস দেখিস তোর কী হয়! ভোলার সঙ্গে দীর্ঘকাল দেখা হয়নি। কেমন আছে জানি না, যে বাড়িতে থাকত সেই বাড়ি ভেঙে নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি হয়েছে। দেখা হলে বলতাম, মা কালীকে ভেঙানোর শাস্তি এতদিনে ফলতে শুরু করেছে। একটার-পর-একটা দুর্যোগ চলেছে রে ভোলা। কাজল নামে একটি ছেলে পড়তো ও শ্বেতপাথরের টুকরো নিয়ে আসত।

মালগাড়িতে শ্বেতপাথর আসত চিৎপুর রেলইয়ার্ডে। ওখানে টুকরো-টাকরা পাওয়া যেত। এই শ্বেতপাথরের টুকরো আমার খুব প্রিয় ছিল। আমার দাদু পেপার ওয়েট করত। একটি ছেলে ছিল, ওর পকেটে ব্যাংক কটকটি থাকতো। একটা টিনের চ্যাপ্টা দ্রব্য, ব্যাঙের আকৃতি, তলার দিকে একটা লোহার পাত। টিপলে কটকট আওয়াজ হতো। যখন-তখন বাজাত। ক্লাসেও দু’চারবার বাজিয়ে বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়েছে। ক্লাসে অন্যায় করার শাস্তির যতগুলো স্তর ছিল, সবচেয়ে কম শাস্তি দাঁড়ানো। এর পরের গ্রেড বেঞ্চের উপর দাঁড়ানো। পরবর্তী স্তর, বেঞ্চির উপর কান ধরে দাঁড়ানো। ক্লাসের বাইরে, নীলডাউনও একই প্যাটার্নের। মেঝেতে হাঁটুতে ভর করে বসে থাকা, কান ধরে নীলডাউনের পরবর্তী ধাপ। আমাদের বাবাদের সময়ে শুনেছি মাথায় ইঁট চাপিয়ে রাখার শাস্তি ছিল। বেত মারা তো ছিলই, তবে হাতে স্কেল মারার শাস্তি আমাদের সময়ে ছিল। দু’জন স্যার ছিলেন স্কেল মারায় পারদর্শী। টুটলে নানা রকমের দুষ্টুমি করতে বলে, ওকে প্রায়শই হাত পাততে হত স্কেলের বাড়ি খাওয়ার জন্য। কিন্তু আশ্চর্য দক্ষতায় ও হাত সরিয়ে নিতে পারত। ধীরেনবাবুর সঙ্গে টুটলের স্কেলের বাড়ি খাওয়ার খেলা, সাপ আর বেজির যুদ্ধের পর্যায়ে চলে যেত। ক্লাস থ্রি-ফোর-ফাইভ-সিক্স কেমন যেন একসঙ্গে চলে আসছে। দৃশ্যাবলী আলাদা করতে পারছি না। ক্লাস ফাইভে, এবিসিডি শিখলাম, তো ‘প্যাট এ কেক প্যাট এ কেক মাদার মাইন, বেক মি এ কেক সো সফ্‌ট অ্যান্ড ফাইন’ কবে মুখস্থ করলাম? ‘টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার’-ও আমরা পড়িনি, ‘ব্যা-ব্যা ব্ল্যাক শিপ’ও পড়িনি…