অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ১৭

খাঁড়ার ঘা ও বেপাড়ার হিরোইন

একটু চিন্টুর কথা বলি।

আমাদের কিশোরবেলায় চিন্টু ছিল স্বঘোষিত ক্যাপ্টেন। ওকে কেউ মানুক, না-মানুক— ও ক্যাপ্টেন। আমি সবসময় সবকিছুতেই পিছনের সারিতে থাকি। এটা আমার স্বভাব। পিছনে বসলে সামনের সবকিছু দেখা যায়। বড় হওয়ার পর কেউ-কেউ মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করেছিল— সামনে যেতে হবে, গুঁতিয়ে এগিয়ে যাবে, সামনের চেয়ারে বসবে, স্টেজে ঠ্যাং তুলে বসবে, জোরে কথা বলবে। বড়বেলায় শিখেছি, ভদ্রতা দুর্বলতা। কানের মধ্যে ঠুসে দেওয়া হয়েছে ভাল মানুষ চাই না, চাবকানোর লোক চাই। চিন্টু ছিল এমন। বারবার ওকে আমরা বলতাম, তুই মাতব্বরি কেন করতে যাস? চিন্টু গম্ভীর হয়ে চারমিনারের প্যাকেটে সিগারেট ঠুকত। ও আমাদের সবার আগে সিগারেট খাওয়া শিখেছিল। তখন ক্লাস সেভেন-এইট হবে। টেন-ইলেভেনের সময় বিড়িও ফুঁকত, কারণ ও বিশাল বড় হয়ে গেছে। ক্লাস নাইনের আগেই গ্রীষ্মের দুপুরে চিলড্ বিয়ার খাওয়ার কথা বলত। তখনও আমরা রোববার পালন করতাম কাঠের গুঁড়ো চাপা বরফ নিয়ে এসে লস্যি বানিয়ে।

ওর বেচাকাকা পাগলা কুকুর বধ করার পর সেটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। ওর বাবা জ্যাঠার নাক ছিল আর্জেন্টাইন কোচ কার্লোস বিলার্দোর মতো, তাঁদের গলার জোর ছিল প্রচণ্ড। ফলে, আমরা সারা ছোটবেলায় একটু চমকে থাকতাম, তারপর ওর কাকা পাগলা কুকুর মেরে দিল! হিরো বেচাকাকা নয়, হিরো হল চিন্টু!

চিন্টুও এমন একটা কিছু খুঁজছিল— যাতে সে সত্যিকার হিরো হবে। এমনিতে যেখানে খেলা সংক্রান্ত যা গোলমাল হত, আমরা মার-ই খেতাম। কোথাও তেমনভাবে মার দিয়ে আসতে পারতাম না। কেউ আরও মারতে পারে ভেবে শরণাপন্ন হতাম বাঘাদার। পরে আমাদের অস্ত্র এল, টুকরে। আমাদের আর ভয় নেই। টুকরের বোম ব্লাস্ট করে মৃত্যুপর্বের আগে আমাদের বন্ধুদের কোনও ভয় ছিল না। আমি শুনতাম, উল্টে আমার বন্ধুদেরকে-ই অনেকে ভয় পায়।

কালীঘাটের কুকুর হইতে সাবধান!
পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১৬…

আমি সারাজীবন ভয় পেয়েই এসেছি, ভয় পাওয়াতে পারিনি। যাই হোক চিন্টুর কথা বলি। বারবার ক্রস কানেকশন হয়ে আমি ঢুকে পড়ছি।

কালীঘাট রোডের একটা পাগলি ছিল। তার নাম ছিল, কালী। তাকে দেখে আওয়াজ দিলেই হল— জয় তারা! সে গর্জন করে পাল্টা বলত— জয় কালী! ব্যাপারটা যদি ঠিক বুঝতে না পারেন তবে টিভি খুলে একবার ‘জয় শ্রীরাম’ আর ‘জয় বাংলা’ শুনে নিন, ক্লিয়ার হয়ে যাবে। সেই কালীপাগলি বা খাঁড়াপাগলি কালীঘাট মন্দির টু পটুয়াপাড়া রাজত্ব করত। খুব বেশি তার বাইরে যেত না। এখন আমাকে প্রশ্ন করুন— কেন যেত না? পাগল-ছাগল মানুষ ঘুরতে-ঘুরতে পায়ে-পায়ে বাইরেই চলে যেতে পারে। সে যেত না কারণ, এটুকুর বাইরে সে খাবার পেত না। মানুষ আর কুকুর খাওয়ার বাটির পাশেই বাঁচে। আরও একটা জিনিস ছিল, যা কিশোরবেলায় চোখ সরিয়ে নিতাম। সে মাঝে-মাঝেই অঙ্গের সব কাপড়চোপড় বিসর্জন দিয়ে উদোম হয়ে যেত। পুরো নগ্ন হয়ে পচা জবার মালা পরে খাঁড়া হাতে ঘুরত। তার কাছে ছিল একটা পুরনো খাঁড়া। কালীপুজোর ভাসানের সময় বেশ বড় এই খাঁড়াটা কালী গঙ্গা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। সেটায় জং পড়েও গিয়েছিল। দু-একবার কালীপুজোর ভাসানের পর দেখেছিলাম, তার হাতে নতুন খাঁড়া, কিন্তু সেগুলো সব পুঁচকে। তাই ওসব ছোটখাট অস্ত্র তার ভাল লাগেনি, তার একে ফর্টিসেভেন ছিল ওই বড় খাঁড়াটা। ওটা দিয়ে ঘ্যাচাং ফু করতে হবে না, টাচ করলেই ইঞ্জেকশন নিতে হবে। এমনিতে খুব একটা হইহল্লা করত না। কিন্তু খাবারের খোঁজে বাজার এলাকায় ঢুকলে এবং তখন যদি খদ্দের হালকা থাকে তবে চারদিক থেকে হুঙ্কার উঠত— জয় তারা! জয় তারা! আর সে খাঁড়া উঁচিয়ে তারা শব্দটা কেটে কালী বসানোর আপ্রাণ চেষ্টা করত।

দুমদাম কাপড়চোপড় খোলার জন্য কালীপাগলিকে আমাদের পাড়ার ধারে-কাছে এলেই  তাড়িয়ে দেওয়া হত। কোনও বাড়ি থেকে কেউ বেরত না, খাবারও দিত না। তাই ও কোনওসময় আমাদের পাড়ামুখো হত না, সদাসর্বদা কালীঘাট রোডের ওপরই বিরাজ করত। দু-দশদিন ছাড়া ছাড়াই কালীপাগলি কাপড়চোপড় খুলে উদোম হয়ে ঘুরত। সেসময় সবাই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেত। যেন দেখতে পেত না। তখন কোনও না-কোনও গলির মেয়ে এগিয়ে এসে ওকে কাপড়স্থ করত। কিছু একটা পরিয়ে দিত। অনেকে সময় আমি ওকে নাইটি পরে, কাপ্তান পরে ঘুরতে দেখেছি, অনেক সময় শুধু স্কার্ট বা ঢোলা টি-শার্ট। গলির মেয়েরা যে ওকে কাপড় দান করে, এটা আমি পরে জানতে পারি চিন্টুর কাছ থেকে।

শনিবার স্কুলে হাফ ছুটি। দুপুর-দুপুর বাড়ি ফেরার পথেই শুনলাম চিন্টুর মাথা ফেটে গেছে। দু-তিনটে সেলাই পড়েছে। কে ফাটাল? কালীপাগলি। বিকেলবেলার খেলা মাথায় উঠেছে। চিন্টু মাথা ফেটেছে— ফাটিয়েছে কালীপাগলি। কথাটা শুনে আমাদের যত না দুঃখ হয়েছিল, তার থেকে বেশি আমোদ হয়েছিল। ঠিক আনন্দ নয়। বেশ আমোদ হয়েছিল। যে যেখানে পারছি বলছি, আর বলে হেসে গড়িয়ে যাচ্ছি। একা-একা ভেবেও হাসছি। চেনাজানা সবাই জানতে চাইছে, কী হয়েছে? চিন্টু এবং কালীপাগলির কথা মুখে মুখে ঘুরছে। এখন প্রশ্ন— কী দিয়ে ফাটাল, খাঁড়া না কি ডাণ্ডা!

চিন্টুর বাড়ির লোক কিছু জানে না। বাড়িতে আছে বলতে ওর মা। কাকিমার কাছে কেউ খবর পৌঁছে দেবে না। ওদের বাড়ির সঙ্গে সারা পাড়ার দূরত্ব। আমরা সবাই হন্যে হয়ে চিন্টুকে খুঁজছি, কোথায় তার দেখা পাই।

চক্রবর্তীপাড়ার মুখে একটা মাড়োয়ারি বাড়ি ছিল। বিশাল বাড়ি, বড় পরিবার। সেই বাড়ির একজন আমাদের গ্রুপের সদস্য। কালীঘাট রোডের ওপর ওদের মশলার দোকান, আটা-ময়দার গদি, আরও কীসব দোকানপত্র আছে। বড়বাজারেও দোকান ছিল। মহাবীর তলার ফুড কর্পোরেশনের গোডাউন ওদের জায়গার ওপর। ওর নাম ছিল পাপ্পু। পাপ্পু নিঁখুত বাংলা বলত। পাপ্পু কোনওদিন ওদের বাড়ির ভেতর আমাদের ডাকেনি। কোনওদিন মাছ খায়নি। চিকেন খেয়েছিল, শুনেছি। কিশোরবেলায় আমাদের বাড়ির ভেতরও সহসা আসেনি। অদ্ভুত একটা দূরত্ব সবসময় বজায় রাখত। আর একজন ছিল রাকেশ। ওরা ভাড়া থাকত। রাকেশের কথায় একটু টান ছিল। ওরা ইউপির। রাকেশ স্বচ্ছন্দে আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ত। ওদের বাড়িতে ডাকত। ওদের বাড়িতে একবার তুমুল কাণ্ড হয়েছিল। মহাকাণ্ড! ডাকাত পড়ার মতো ঘটনা। ওর মায়ের বুক চাপড়ে কান্না। এ-বাড়ি-ও-বাড়ি, সব বাড়ির মা-মাসিমা-কাকিমারা ফিসফিস করছে। আমরা সব বুঝতে পারছি না, কী ঘটেছে। রাকেশও বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। স্কুল যাচ্ছে না। ক’দিন আগে ওর বাবা ফিরল পাটনার চাকুরিস্থল থেকে। এমন কী হল? ওর বাবা কি আবার বিয়ে করল? রাকেশ কি এবার বাপের বিয়ে খেতে যাবে? নতুন মা আসবে? সাতসতেরো আমাদের প্রশ্ন, কিন্তু কোনও উত্তর মিলছে না।

এমনটাই যখন ভাবছি তখন খবর পেলাম পুরো উল্টো। আসলে পাড়া কালচারে সব গোপনীয়তাই দু-দশ ঘণ্টা থেকে বড়জোর একদিনের। গোপন সূত্রে খবর এল— সঞ্জয় গান্ধীর দাওয়াই। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরে রাকেশের বাবা ‘নাসবন্দি’ করে এসেছে। তাই ওর মায়ের হাহাকার করা কান্না!  

তেমনই গোপন সূত্রে পাপ্পু এসে খবর দিল চিন্টু কোথায় আছে। পাপ্পুর গোপন সূত্র ছিল ওদের দোকানের কর্মচারীরা। আর পাপ্পুর একটা কথা সবসময় বলত— আমি কিছু জানি না, আমি শুনলাম, তাই বললাম।

সে শুনেছে, তাই বলেছে। চিন্টু কোথায়? পাপ্পু ফিসফিস করে বলে দিল— মার খেয়ে মাথা ফাটিয়ে রুমির আশ্রয়ে আছে। মানে গলির মধ্যে, গলির মেয়ের ঘরে!

এদিকে গলির ভেতর তখন একটা বেশ চাপা হইহই-রইরই ব্যাপার। অনেকটা সেই আগেকার দিনে বিয়ে বাড়ির বরযাত্রী বেরনোর আগের মুহূর্ত। সবাই সাজছে। এ-ঘরে, ও-ঘরে রূপটান চলছে। আয়নায়-আয়নায় মানুষ লেগে। আমি মুক্তার সঙ্গে চলেছি। সব ঘরে আলো জ্বলছে। দিনের বেলা এই ঘরগুলো ঘুপচি, অন্ধকারমতো। রাতের বেলা বেশি পাওয়ারের আলো জ্বলে। দেওয়ালগুলো হয় সবুজ, নয় গোলাপি। লক্ষ্মী-কালীর ছবির সঙ্গে ক্যালেন্ডারের ছড়াছড়ি।

বিকেল গড়িয়ে গেছে? সন্ধের আগে-আগে এই সময় গলির মধ্যে যাওয়া কি ঠিক হবে? তার ওপর রুমির ঘর চিনি না। তখন সবে চিন্টুর সঙ্গে রুমি-রুমি শুনছি। দু-একদিন ওকে কথা বলতেও দেখেছি। সাত-পাঁচ ভাবছি। বাড়িতে খবর গেলে রামক্যালানি খাব। এমনতেই চিন্টুর দুর্নাম ছড়াচ্ছে। গালে হাত দিয়ে আমরা বেশ কয়েকজন চিন্তিত। আসলে, হয়তো সবাই চিন্টু মাথা ফাটানোর ছবিটা দেখতে চাইছি। মাথা তো ফাটল, ক’টা স্টিচ পড়ল, কতখানি রক্ত বেরুল? চিন্টুকে না পেয়ে অনেকে কালীপাগলির খবর এনে দিল—

এসময় মুক্তা আমার কাছে এসে বলল— যাবি? আমি ফিসফিস করলাম— কেউ জানবে না? মুক্তার পরিষ্কার কথা— আমি বলব না। কিন্তু তোর পেটে কথা থাকে না। তুই বলার জন্য আঁকপাঁক করিস।

বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। এরপর আরও যাওয়া যাবে না। বাড়ির আলো, পাড়ার লাইটপোস্টে আলো জ্বলার আগে গলির মুখের পান-বিড়ির দোকানে লালচে আলো ছড়িয়ে যায়।

মুক্তাকে বললাম— চ’ তাহলে, যাই।

আমি সারা জীবন ধরে দেখেছি, কোনও মেয়ে দায়িত্ব নিয়ে সামনে থাকলে আমার ভরসা থাকে বেশি। মনে হয়, আমি বিপদে পড়ব না। সামনের জন ঠিক উদ্ধার করে আনবে। তো চলে গেলাম মুক্তার সঙ্গে।

এদিকে গলির ভেতর তখন একটা বেশ চাপা হইহই-রইরই ব্যাপার। অনেকটা সেই আগেকার দিনে বিয়ে বাড়ির বরযাত্রী বেরনোর আগের মুহূর্ত। সবাই সাজছে। এ-ঘরে, ও-ঘরে রূপটান চলছে। আয়নায়-আয়নায় মানুষ লেগে। আমি মুক্তার সঙ্গে চলেছি। সব ঘরে আলো জ্বলছে। দিনের বেলা এই ঘরগুলো ঘুপচি, অন্ধকারমতো। রাতের বেলা বেশি পাওয়ারের আলো জ্বলে। দেওয়ালগুলো হয় সবুজ, নয় গোলাপি। লক্ষ্মী-কালীর ছবির সঙ্গে ক্যালেন্ডারের ছড়াছড়ি। উঁচু-উঁচু তক্তাপোশে কোথাও বিছানা রোল করে গোটানো, কোথাও টান-টান সাজানো। নিজের সাজা শেষ হলে বিছানা সাজবে। আর আছে বড় একটা আয়না। সেই আয়নার সামনে পুরো গলির মানুষজন যেন!

আমার বারান্দা পেরিয়ে যাচ্ছি। এ-ঘর থেকে ও-ঘরে একজন সায়া-ব্লাউজ পরে কাঁধে শাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের দেখে থমকে গেল। আমরা ঘর-ঘর পেরিয়ে যাচ্ছি। ও-ঘর থেকে এ-ঘরে একজন স্কার্টের ওপর বডিজ (তখন ব্রা বা ব্রেশিয়ার নয়) পরে ঢুকতে গিয়ে আমাদের ঘুরে দেখল। মুক্তা বলল— তুই প্যাটপ্যাট করে দেখছিস কেন? আয় আয়! মুক্তা বলল, এই ঘর। দরজা ভেজানো। মুক্তা দরজায় টোকা দিল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বেরিয়ে এল রুমি। আমাদের দেখে বলল— চিন্টু এখানে।

চিন্টুর মাথায় ফেট্টি বাঁধা। সিনেমার হিরো বা ডাকাতের কায়দায়। বিছানার পাশে দুধের খালি গ্লাস আর ওষুধ। চিন্টু আমাদের দেখে বলল— বস। রুমি বলল— বসবে না। তোমরা ওকে নিয়ে যাও। চিন্টু বলল— আমি তোদেরই কারও জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পাড়ার খবর কী? সবাই জানে? আমি বললাম, কী করে হল?

রুমি বলল— ‘ওর বেশি বেশি হিরোগিরি। কালীপাগলির খাঁড়া বদলে দিতে গিয়েছিল। আমার সামনে গলির মুখে কাণ্ডটা হল। চিন্টুর মন খুব ভাল। দুপুর থেকে তিনটে সিনেমার ডিরেক্টরের ঠিকানা পকেটে নিয়ে ঘুরছে। আমাকে এসে বলল, কাল তোমার অ্যালবামটা এসে নিয়ে যাব। এবার একটা কিছু লেগে যাবে। বলেই ও কালীপাগলিকে হাত ইশারা করে ডাকল। কালী এল। আমি জানি, চিন্টু হয়তো কালীকে বিস্কুট-তেলেভাজা কিছু কিনে দেবে। তা না, ও কালীকে বলে কিনা— কালী চ’, আমার মন আজ খুব খুশি, তোকে একটা নতুন বড় খাঁড়া কিনে দেব। এই খাঁড়াটা জং ধরে আছে, ফেলে দে। ব্যস, কালী সঙ্গে-সঙ্গে পানের দোকানের পাশে রাখা বালতি তুলে দিল এক ঘা— বাপ রে কী রক্ত!

আমরা আঁতকে উঠলাম!

রুমি বলল, ‘আমাদের এখানকার মেয়েগুলোকে দু-দিন ছাড়া-ছাড়া কেউ না কেউ ধরে-মারে, এত রক্ত বের হয় না। চিন্টুর শরীরে খুব রক্ত! আমি ওকে পিজি নিয়ে গেলাম। তিনটে সেলাই পড়ল।’

আমরা হাঁ! চিন্টু কালীকে খাঁড়া কিনে দিতে গিয়ে মাথা ফাটাল!

চিন্টু গলাখাঁকারি দিল। এটা ওর বাপ-জ্যাঠার মতো গাম্ভীর্য আনার চেষ্টা বলল— “চ’। আমার খোঁজ পড়ার আগেই বাড়ি ঢুকে যেতে হবে।”

বেরিয়ে আসার সময় চিন্টু রুমির দিকে তাকাল। রুমি বলল— ‘আজ আমি কোথাও দাঁড়াব না।’ বলেই সে আয়নার সামনে গিয়ে সাজার বাক্স নিয়ে বসে পড়ল।

দাঁড়াবে না তো সাজছে কেন! এই রুমিকে চিন্টু সিনেমায় নামাবেই-নামাবে, অ্যাক্টিং করাবে।

আমরা চলে এলাম। সন্ধে হয়ে গেছে। চিন্টু বাড়ি ঢোকার আগে আমাকে বলল— ‘আমি যা বলব, তুই হু-হু করে করে যাবি।’

চিন্টু ম্লান মুখে বাড়ি ঢুকল। চিন্টুর মা ওকে দেখে আঁতকে উঠলেন। চিন্টু বলল— ‘খেলতে গিয়ে চার্জ হয়েছিল।’ চিন্টুর মা খুব ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ। শান্ত গলায় বললেন, ‘কার সঙ্গে?’ চিন্টু আমার দিকে তাকাল। বলল, ‘ও আগে সপ্তাহে কাল্টুর পায়ের বুড়ো আঙুলের পাশে ফাটিয়ে দিয়েছিল। চারটে সেলাই হয়েছিল। কী রে, তাই তো?’

আমি বললাম— হ্যাঁ, বল চার্জ করতে গিয়ে…।

চিন্টু বলল— আমার তো কম, তিনটে সেলাই।

কাকিমা আমার পায়ের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘তোমার পা-গুলো খুব বড়-বড়।’

চিন্টু বলল— ও এবার থেকে আমার টিমে খেলবে। আমার আর ভয় থাকবে না।

আমি মাথা নীচু করে চলে এলাম। পুরো দোষ আমার ঘাড়ে। আমি আর কাকে বলব? আমি কালীপাগলি হয়ে গেলাম! এমনকী, ক’দিন পরে চিন্টুদের বাড়িতে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর পুজো হল। সবাইকে যেতে বলল। আমি বাদ। চিন্টু বলল, আমার মা বলেছে তোর পা খুব শক্ত।

কাকিমা অনেক পরে জেনেছিলেন, আমি নই, চিন্টুর মাথা ফাটিয়েছে কালীপাগলি— চিন্টু ওর পুরনো জংপড়া খাঁড়া ফেলে, বড় একটা খাঁড়া কিনে দিতে গিয়েছিল বলে। সেদিন কাকিমা বললেন, ও যে তোমার নামে দোষ দিল, তুমি কিছু বললে না? চিন্টু বলল— আমি কি ওর নাম একবারও বলেছি। আমি বলেছি কাল্টুর সঙ্গে ওর চার্জ হয়েছিল। সেটা কী মিথ্যে?

আমি বললাম— না।

সেসময়ই আমি প্রথম রুমির ঘরের ভেতর ঢুকেছিলাম। রুমি আর পাঁচটা মেয়ের থেকে আলাদা ছিল। সেসময় গলির মেয়েদের ড্রেস ছিল শাড়ি আর স্কার্ট। একমাত্র রুমিকে দেখতাম প্যারালাল প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকতে। সবসময় ওর জামা ছিল ওপর দিক করে তুলে গেঁট বাঁধা। রুমি সানগ্লাস পরত, খুব কায়দা করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেত। আমরা বলতাম— চিন্টুর হিরোইন।

হঠাৎ একদিন আমাদের চমকে দেওয়ার মতো কাণ্ড হল— চিন্টু এসে আমাদের সবার সামনে একটা কাগজ ফেলল। সাদা-কালোর হ্যান্ডবিল। কোনও এক শাড়ির দোকানের বিজ্ঞাপন। শাড়ি পরে মডেল হয়েছে— রুমি। চিন্টুর হিরোইন। চিন্টু বলল— আমার মানসকন্যা!

মুক্তা মুখ ভ্যাটকাল। কন্যা কী রে!

কিন্তু মানস… আর কী হতে পারে।

চিন্টু একা সাউথ পয়েন্টের মতো নামী ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ত। ক্লাস নাইনে সেই স্কুল থেকে ওর বিদায় হয়ে গেল। চিন্টু খিদিরপুরের দিকে একটা বেনামী ইংলিশ মিডিয়ামে চলে গেল। সেখানে গেলেও হয় না-গেলেও হয়। তার আরও পোয়া বারো। পাপ্পু আর রাকেশ টালিগঞ্জ ফাঁড়ির দিকে একটা হিন্দি মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। আর বাদবাকি আমরা সবাই বাংলা মিডিয়াম।