কুকুর হইতে সাবধান!
একটা বয়স থাকে, যখন সবকিছুই তোয়াক্কাহীন হয়ে যায়। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলা যায়, আমার কী? সেই বয়সেরই আর-এক গুণ, যেখানে বুদ্ধিমান একটু থমকে দাঁড়ান, সহসা ঢোকেন না, সেখানে মুরগির মতো ঢুকে পড়া যায়। আমি ঠিক ওই বয়সটাই কাটিয়েছি কালীঘাটে। সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতার মতো হয়তো ‘একটি মোরগের কাহিনী’-ও হয়ে যেতে পারতাম। যেমন অনেককে দেখেছি। যেমন টুকরেকে দেখেছি, চিন্টুকে দেখেছি। সবাই বীরদর্পে ঢুকে টেবিলে চালান হয়ে গেছে, ডজ করে বেরতে পারেনি।
আমি দেখেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দূরত্ব ছিল। কাছাকাছি চলে গিয়েও তফাত ছিল। আমি ভীতু বলে ভেসে যাইনি। সাহসীরা ডুবে গেছে। একটু এদিক-ওদিক করলে মা-দিদিদের হাতে গণহারে বেদম মার খেয়েছি। গালে-পিঠে দাগ নিয়ে বলেছি— ফুটবল মাঠে হয়েছে। ওই ফুটবল বারবার বাঁচিয়ে দিয়েছে।
আমাদের চক্রবর্তীপাড়া ছিল বাবু সরকার-মালা সরকারের বাড়ি। আর ফরওয়ার্ড ক্লাবের পাশে মীরা বিশ্বাস-বুবাই বিশ্বাসদের বাড়ি। এই দুই জুড়িই একসময় পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। মাচা শিল্পী দম্পতি। এঁদের মধ্যে মীরা বিশ্বাসের গান রেডিওতেও শোনা যেত। তখন রেডিও-আকাশবাণী-র ছোঁয়া মানে বিশাল ব্যাপার। যখনই ওদের দেখতাম, হাঁ করে দেখতাম। কী ঝলমলে পোশাক, যা আর পাঁচজনের সঙ্গে মেলে না! বাবু সরকার বা বুবাই বিশ্বাসদের দেখি চোখগুলো লাল। শুনি, ওরা সারারাত জেগে গানের অনুষ্ঠান করে বলে চোখগুলো লাল! চিন্টু বলে নেশায় লাল!
পয়লা বোশেখ ও কালীঘাটের গুপ্তধন!
পড়ুন জয়ন্ত দে-র কলমে ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১৫…
তখনও পশ্চিমবাংলা লাল চোখের দাবড়ামি দেখেনি, বরং লাল রং ছিল সম্ভ্রমের। সেটা বাবার থেকেই পেয়েছি। পরে জেনেছি— ভয় কী লাল রঙে ভয় কী, আমাদের প্রিয় রং লাল!
সেই ছেলেবেলায় যাঁর সান্নিধ্য বেশি করে পেয়েছি তিনি প্রতাপ পাল। তিনি নামকরা শাস্ত্রীয় সংগীতের শিল্পীদের সঙ্গে সঙ্গত করতেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন অনুপ ঘোষাল। অনুপ ঘোষালের গান আর প্রতাপদার নারকেল তেলের কৌটো বাজানোর গল্প শুনছি। তিনিই দেখিয়েছেন গিরিজা দেবী, বিরজু মহারাজকে। সব সময় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। গানবাজনার লোক কিন্তু কোথাও যেন শুদ্ধ সূচি, সুস্থ রুচির মানুষ। সেই প্রতাপদা মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ক্লাসিক। মাথার ভেতর ক্লাসিক ঢোকানোর আর একজন হলেন— অমল দত্ত। প্রোজেক্টর নিয়ে হাজির হতেন স্কুলে, ক্লাবে। ফিল্ম রোল চালিয়ে দেখাতেন কাকে বলে— ফুটবল! আমাদের স্কুলে অমল দত্ত এলেন, কালীঘাট হাই স্কুলেও এলেন, আমরা খোঁজ রাখতাম, কোথায় উনি যাবেন খেলার ছায়াছবি কাঁধে করে। তখনও টিভিতে বিশ্ব ফুটবল দেখিনি।

দেখছি, কিন্তু ভাবছি না— এ-জীবন লইয়া কী করিব?
কিছু একট করব তো বটেই। যে যেখানে বলে তার সঙ্গে জুটে যাই। পাড়াতুতো এক পিসি আফিম কেনে গরাদওয়ালা দোকান থেকে। তার সঙ্গে যাই পটুয়াপাড়ার দিকে। ক্রমশ আমার কাছে ইলাস্টিকের মতো টেনে-টেনে লম্বায় বেড়ে যাচ্ছে কালীঘাটের চৌহদ্দি। কোথাও গেলে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করি— সবাই যা দেখছে আমি কি তা দেখতে পাচ্ছি? আর আমি যা দেখছি?
এই প্রশ্ন আমাকে তাড়া করত কালীঘাটের অলিতে-গলিতে। বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম এক ব্রহ্মচারীর বাড়ি। কালী টেম্পল রোড ছুঁয়ে সবুজ সংঘের উল্টোদিকের একটা গলি হবে। পরে জেনেছিলাম— উনি তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী। বাবার কাছ থেকে জানা হয়নি। যখন শুনেছি। তখন আর বাবা ছিলেন না। তারাপ্রণব ব্রহ্মচারীর অনেক লেখা আছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমল মিত্র যেমন কালীঘাটের দু-দিকে স্তম্ভ হয়েছিলেন, বারবার তাঁদের বাড়ির চারপাশে ঘুরে গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করেছি, তারাপ্রণব ব্রহ্মচারীর কাছে যাইনি। অথচ বাবা যেতেন মাঝেমাঝেই। শুনতাম, গল্প করতে যেতেন। অথচ এই সবুজ সংঘের সামনে ড্রাম-ড্রাম কস্টিক সোডা থাকত। কিছু কস্টিক সোডা রাস্তায় পড়ে থাকত, কালীঘাট পার্ক থেকে খেলে ফেরার সময় তুলে নিয়ে আসতাম। রাস্তা থেকে তুলতাম, বল পাকিয়ে রাস্তায় ফেলে আসতাম। সব সংগ্রহ বাড়ি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে আসতাম না। জীবনও তেমন সব কিছু বয়ে নিয়ে চলে না। আগের পর্বের একজায়গায় বলেছিলাম, ক্যালেন্ডার সংগ্রহের কথা।

পয়লা বৈশাখের দিন ঘুরে ঘুরে এ-দোকান ও-দোকান থেকে ক্যালেন্ডার নিতাম। সেই ক্যালেন্ডার কিন্তু সবার বাড়ি পর্যন্ত যেত না। নির্দিষ্ট দু’জনকে ক্যালেন্ডারগুলো দিয়ে দেওয়া হত।
আমাদের চক্রবর্তীপাড়ার বেশ ক’টা টিনের বাড়ি ছিল। আমার জন্মের পর বাবা বেহালার সাগর মান্না রোডের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কালীঘাট চক্রবর্তীপাড়ার একটিনের বাড়ির ভাড়াটে জীবন শুরু করে। সেখানেই আমরা অনেকদিন থাকি। আমি যখন ক্লাস টু বা থ্রি তখন চলে আসি উলটো দিকের একটা দোতলা বাড়ির একদিকের অংশের একটা বিশাল ফ্ল্যাটে, সেখানেই আমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে থাকত আমার মায়ের এক গ্রামতুতো বোন। আমরা হয়ে গেলাম পাকা বাড়ির বাসিন্দা। কিন্তু জানি, টিনের বাড়িতে থাকার কষ্ট। এক উঠোন বারো ঘরের টানাপোড়েন!
টিনের বাড়িতে শীতে যেমন বেশি ঠান্ডা, তেমনই গ্রীষ্মের গরম টিনের ঘরদোরকে তপ্ত কড়াই বানিয়ে দেয়। তুঁতের আঠা করে ওই ক্যালেন্ডারগুলো টিনের দেওয়ালে সেঁটে দিলে গরম-ঠান্ডা অনেক কমে যায়। ওই ক্যালেন্ডার ছিল লড়ে যাওয়ার অস্ত্র! আমাদের দুই বন্ধু, যারা টিনের বাড়িতে থাকত সব ক্যালেন্ডার ছিল তাদের জন্য।
তখনকার এইসব পাড়ার ভেতর একটা করে একান্নবর্তী পরিবার ঢুকে থাকত। সেই পাড়া থেকে পরিবারের একটা ঘটনার কথা শোনাই।
একদিন হঠাৎ শোনা গেল পাড়ার একটা কুকুর পাগল হয়ে গেছে। সে সকাল থেকে দু-একজনকে কামড়েছে। ফেরিওয়ালা, ভিখিরি— যাদেরই তার সন্দেহজনক মনে হয়েছে, কামড়ে দিয়েছে। পাড়ার ভেতরকার এক ময়লা ফেলা গাড়ির নীচে জিভ ঝুলিয়ে বসে আছে। ক্রমশ বাড়ি-বাড়ি খবর রটে গেল, সাবধান। ক্রমশ কামড় খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, মানুষ দেখলেই তাড়া করছে। যাকে পাচ্ছে, তাকেই কামড়াচ্ছে, ছুটছে। সঙ্গে-সঙ্গে ছোটদের বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ। সব বাড়ির সদর দরজায় খিল পড়ে গেল। সেইসঙ্গে রাস্তার দিকের জানলাগুলো পটাপট খুলে গেল। বারান্দায়-বারান্দায় লোক। ছাদে-ছাদে লোক। না-জেনে যারাই পাড়ায় ঢুকছে, কুকুরটা তাদের কামড়ে দিচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে, কামড়ানোর সংখ্যা বাড়ছে।
পাড়ার সাহসী একটা ছেলে বের হল খিল নিয়ে— কুকুরটাকে মারবে। তার হাতের খিল একবার সিমেন্টের রাস্তায় গড়াম করে পড়ল বটে, তবে সেই খিল কুকুরটিকে স্পর্শ করল না। বরং কুকুর তাকে কামড় দিয়ে ছুটে চলল জিভ বের করে। আমরা আমাদের বাড়ির চৌহদ্দির পাঁচিলে চড়ে বসে আছি। এবার এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে দল পাকানো হল— একজন নয়, বেশ কয়েকজন একসঙ্গে অ্যাটাকে যাবে। চারজন চারদিক থেকে একসঙ্গে অ্যাকশনে নামল। কুকুরটা পিঠে দু-এক ঘা পড়ল বটে, কিন্তু জনাদুয়েক আহত রক্তাক্ত হয়ে ফিরে এল। এরকম আরও দু-তিনজনের দল পথে নেমে রক্তাক্ত হয়ে ফিরে গেল। কুকুর মারা গেল না। ততক্ষণে দিকে-দিকে রটে গেছে, পাগলা কুকুর হইতে সাবধান!
এ-বাড়ির জানালা, ও-বাড়ির বারান্দা থেকে বড়-বড় ফাঁস ঝুলছে। দড়ি দুলছে। শুধু কুকুরটাকে নাগালের মধ্যে পেতে হবে। অনেক বাড়ির ওপরে, ছাদে, লোকজন রেডি থান ইট আর মাটিভরা ফুলের টব নিয়ে। তারা সুযোগ বুঝে দু-একবার ছাদ থেকে ফেলেওছে কিন্তু ততক্ষণে কুকুরটি তার স্থান পরিবর্তন করে চলে গেছে। মণ্ডল দিদা রোজ দু’বেলা কুকুরদের ডেকে ডেকে খাওয়ান। সব কুকুরই তাঁর চেনা। তিনিও একবার চেষ্টা করলেন— খাবার নিয়ে। তাঁর সুরেলা ডাকা অগ্রাহ্য করে কুকুরটা তেড়ে গেল। মণ্ডলদিদা কামড় খেলেন। অবস্থা ঘোরালো!
সব বাড়িতে রান্না-খাওয়া মাথায় উঠেছে। দূরে দেখা যাচ্ছে, কালীঘাট রোড থেকে যে-রাস্তা পাড়ায় ঢুকেছে, বাজারপাড়ার লোকজন সেখানে ফলের প্যাকিং বাক্স, ভ্যানরিকশ উলটো করে দিয়ে আটকে দিয়েছে। কুকুরটা আর চক্রবর্তীপাড়া ছেড়ে বাইরে কালীঘাট রোডের দিকে বেরতে পারবে না। যে-রাস্তা সাদা মাঠের ওপর দিয়ে দেবনারায়ণ ব্যানার্জি রোডের দিকে গেছে, সেই রাস্তায় সাদা মাঠের আগেই কারা বাতিল তক্তাপোশ দিয়ে দেওয়াল তুলে দিয়েছে। আর একদিকে পাড়ার ভেতরকার রাস্তা বাতিল ক্যারাম বোর্ড, বড়-বড় ঝুড়ি, বস্তার ভেতর বাঁশ ঢুকিয়ে এক বিচিত্র দেওয়াল। তিনদিক বন্ধ জায়গায় কুকুরটা হাঁ-হাঁ করে ছুটে বেড়াচ্ছে। মাঝে-মাঝে কোথাও বসে সবাইকে দেখছে। করুণাপিসিমা একটা মাছের টুকরোতে চারটে ঘুমের ওষুধ গুঁড়ো করে মাখিয়ে কুকুরটির মুখের কাছে ফেলে দিল। মাছ খেয়ে যদি ঘুময়। কুকুরটা মুখ দিল না। ওদিকে পাড়ার ভেতরকার যে দু-তিনটে বাড়িতে ফোন আছে, তারা কর্পোরেশন অফিসে ডায়াল ঘুরিয়েই যাচ্ছে— পাগলা কুকুর থেকে বাঁচান! কেউ-কেউ চিৎকার করে জানাল— কর্পোরেশনের লোক এসে পড়ল বলে। কেউ-কেউ জানাল, তাদের ফোন বেজে যাচ্ছে, কেউ তুলছে না। দমকলেও ফোন করা হল। তারা শুনল না।
আমার বাবা দোকান থেকে দেড়টা নাগাদ খেতে আসে। পাশের বাড়ি থেকে বাবাকে ফোনে খবর দেওয়া হল, পাড়ার দিকে পা না রাখতে, হোটেলে গিয়ে খেয়ে নিতে? অন্যদিন হলে, বাবা হোটেলে কী খাচ্ছে, কী খেতে পারে— আমার কল্পনার বিষয় হতে পারত, কিন্তু সেদিন সবকিছুই সারমেয়ময়।
এ-বাড়ির জানালা, ও-বাড়ির বারান্দা থেকে বড়-বড় ফাঁস ঝুলছে। দড়ি দুলছে। শুধু কুকুরটাকে নাগালের মধ্যে পেতে হবে। অনেক বাড়ির ওপরে, ছাদে, লোকজন রেডি থান ইট আর মাটিভরা ফুলের টব নিয়ে। তারা সুযোগ বুঝে দু-একবার ছাদ থেকে ফেলেওছে কিন্তু ততক্ষণে কুকুরটি তার স্থান পরিবর্তন করে চলে গেছে। মণ্ডল দিদা রোজ দু’বেলা কুকুরদের ডেকে ডেকে খাওয়ান। সব কুকুরই তাঁর চেনা। তিনিও একবার চেষ্টা করলেন— খাবার নিয়ে। তাঁর সুরেলা ডাকা অগ্রাহ্য করে কুকুরটা তেড়ে গেল। মণ্ডলদিদা কামড় খেলেন। অবস্থা ঘোরালো!
কর্পোরেশনের কুকুর-ধরা গাড়ি আসেনি। বেলা বাড়ছে। কোনও-কোনও বাড়িতে আরও চিন্তার কারণ, তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে গেছে, তারা এবার ফিরবে। যারা কুকুরের কামড় খেয়েছে, তাদের বাড়ির ভেতর সেবা-শুশ্রুষা চলছে। এ-বাড়ি ও-বাড়ির থেকে তাদের খবর নেওয়া চলছে। কর্পোরেশনের কুকুর ধরার গাড়ি কেন এল না, তাই নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যা চলছে। যারা চাকরি করতে গেছে— তাদের কেউ-কেউ এমন দুঃসংবাদ পেয়ে কালীঘাট রোড পর্যন্ত চলে এসেছে। কেউ-কেউ এমনও বলছে— পেটো লে আও, বোমা লে আও। সেই ছিনাথ বহুরূপীর গল্পের মতো, লে আও তো বটে, কিন্তু আনবে কে?
আমাদের দোতলা বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটই ছিল চিন্টুদের। তবে দেওয়াল দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। চিন্টুর কেমন এক কাকা ছিল বেচাকাকা। বেচারি থেকে বেচা না বেচারাম থেকে বেচা, জানতাম না। নিজের কাকা নয়। বেচাকাকা চাকরি করত। পড়াশোনা করত। সবাই বলত, বেচাকাকা নকশাল করত। জেল খেটেছে। কাকার কাছে আমরা বড়-একটা ঘেঁষতাম না। দেখতে সুপুরুষ, কিন্তু খুব গম্ভীর। হঠাৎ দেখা গেল, সেই বেচাকাকা ট্র্যাকস্যুট, টি-শার্ট, পায়ে কেডস পরে দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে। সবাই ভাবল, বেচাকাকাকে হয়তো কোথাও যেতেই হবে। তাই সাহস করে বেরিয়ে পড়েছে। একছুটে বেচাকাকা পাড়া পেরিয়ে কালীঘাট রোডে গিয়ে পড়বে। কিন্তু না, বেচাকাকা দরজা খুলে বেরিয়ে রাস্তার ওপর টিউবওয়েলের সামনে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল গম্ভীর মুখে।
বেচাকাকা কি কুকুর মারবে? কী করে মারবে? কাকার হাতে খিল নেই, লোহার রড নেই, আছে বলতে একটা তিন-চার হাত লম্বা নাইলনের দড়ি। তবে কি বেচাকাকা কুকুর ধরবে?

কুকুরটা তখন ঠিক এ-দিকটা ছিল না, ও-দিকে চড়তে গিয়েছিল। বলতে-বলতে সবাই হইহই করে উঠল— আসছে, আসছে। কুকুরটা টিউবওয়েলের সামনে এবার বেচাকাকার মুখোমুখি। বেচাকাকা ঘাবড়াল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। কুকুরটা এগিয়ে আসছে— এবার বেচাকাকাও এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এগতে গিয়েই পা হড়কে বেচাকাকা পড়ে গেল। শ্যাওলার জন্য। কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়ল বেচাকাকার ওপর। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বেচাকাকা জড়িয়ে ধরল কুকুরটাকে। কুকুরটা দাঁত দিয়ে, নখ দিয়ে বেচাকাকার টি-শার্ট ছুড়ে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, কিন্তু বেচাকাকা কুকুরটাকে ছাড়ছে না। ভয়ংকর এক লড়াই। আমি সেই দৃশ্য সারাজীবন ভুলতে পারব না। একটু পরে বেচাকাকা আর কুকুর দু’জনেই থেমে গেল। সেদিন বেচাকাকা কুকুরটার গলায় নাইলন দড়ির প্যাঁচ দিয়ে টেনে মেরে ফেলেছিল। তারপরই সবাই হইহই করে বেচাকাকাকে নিয়ে চলল— পিজি হাসপাতালে। কুকুরটাকে গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় সারা পাড়ায় ঘোরানো হল। পরে বাজারপাড়া হয়ে তার গঙ্গাযাত্রা হল। তখন এ-বাড়ি ও-বাড়ির বড়রা ঠিক করে ফেলল, কাল সকালে কাকে কাকে নিয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে নিয়ে যাবে।
কুকুরে কামড়ানো ইঞ্জেকশন নাকি পেটে দেয়, নাভির চারপাশে দেয়, আমরা সারা বিকেল তার ভয়াবহ বিবরণ শুনলাম। রাতে স্বপ্নেও দেখলাম।
বেচাকাকা ফিরল পরের দিন। চোখদুটো কোনওক্রমে বেঁচে গেছে। সারা শরীর ফালা-ফালা, বুকে, হাতে, পেটে ব্যান্ডেজ বাঁধা। পাড়ার লোকজন টুকটাক যাচ্ছে। খাবারদাবার দিচ্ছে। আমরাও আছি, সে-খাবারে ভাগ বসাতে।
বিকেলে আমাদের হিরো বেচাকাকার কাছে আমরা সবাই বসে আছি। চিন্টু তখন বেচাকাকাকে বলছিল— ও থাকলে কী করত? বড় একটা ড্রাম জোগাড় করে তার আড়ালে-আড়ালে গিয়ে খপ করে কুকুরটাকে ড্রামবন্দি করত। আরও আরও অনেক কিছু। চিন্টু বলছিল— একটা পাইপগান বাঘাদার কাছ থেকে কেউ যদি চেয়ে নিয়ে আসত—।
একজন বলল, ‘পাইপগান কে চাইতে যাবে— পাড়ায় তো কুকুর?’
তখন বাদবাকি সবার আঙুল ছিল আমার দিকে। আমি— কারণ, আমাকে মাঠে কেউ মারতে পারে না। আমি এত রোগা ছিলাম যে, দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে স্যাট করে গলে যেতাম।
চিন্টু আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘একে কুকুরটা কামড়াতে পারত না, ও ঠিক ডজ করে বেরিয়ে যেত। আর তখন তো আরও পারত না, ওর পায়ে বল নেই। ওর পায়ে বল থাকলেই মারতে পারে না, তখন বল ছাড়া।’
বেচাকাকা এক চোখ খুলে আমাদের কথা শুনছিল। হঠাৎ বলল, ‘তুই পারতিস?’
আমি বিড়বিড় করলাম, কুকুরটা যখন ওদিকে যেত আমি যদি তখন দৌড় শুরু করতাম, পারতাম।
বেচাকাকা বিছানার তলা থেকে একটা খাম বের করে আমার হাতে দিল। বলল, ‘কাল খেলা দেখতে চলে যা। তোর বাবা মা তোকে ছাড়বে তো?’
খেলার টিকিট দেখে আমার চক্ষু ছানাবড়া!
‘ছাড়বে না মানে? যদি না ছাড়ে এই টিকিট নিয়ে বাড়ি থেকে পালাব।’
আমি বিশ্ব ফুটবলকে একটু হলেও চাক্ষুষ করলাম। সেটা ছিল প্রথম নেহরু কাপ।
আমি পাইপগান আনিনি। কিন্তু সেদিন বুদ্ধি দিলে ওই পাগলা কুকুরকে এড়িয়ে আমি আনতে পারতাম। সবার এটা বিশ্বাস ছিল। আমারও। সেই বিশ্বাস নিয়ে তার পরের জীবনে অনেক পাগলা কুকুরকে আমি ডজ করে চলতে শিখেছি। পাগলা কুকুরদের এড়িয়ে নিজের কাজ করেছি।



