আমার প্রথম ভোট : ২

বড় হওয়ার স্বাদ

প্রথম ভোট দেওয়ার আগে আমি বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছি। তার মধ্যে তপন সিংহ-র ‘টনসিল’, মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর মতো ছবি আছে। তখন ২১ বছর বয়সে ভোটাধিকার পাওয়া যেত, আমার একুশ বছর বয়সে আমি তো নায়িকা! কিন্তু তাও, মনে পড়ে, প্রথম ভোট দেওয়ার সময়েই আসলে মনে হয়েছিল, আমি বড় হয়ে গেছি।

দেশ যখন স্বাধীন হয়েছে, তখন আমার কতই বা বয়স, পাঁচ বছর হয়েছে সবে। সামান্যই মনে আছে সেই সময়ের সেই বিপুল উত্তেজনা। তারপর আমি চলচ্চিত্রজগতে পা রাখলাম সেই স্বাধীন ভারতেই। আমিও যেন স্বাধীনতার সামান্য আস্বাদ পেলাম। তবে সেই সময়টা তো অন্যরকম ছিল! তাই স্বাধীনতা মানে বিশৃঙ্খলাও ছিল না কখনও।

প্রথম নির্বাচন তো হল পাঁচের দশকের গোড়ায়। আমার ওইটুকু বয়সের স্মৃতিতেও উজ্জ্বল, মানুষের মনে কত আনন্দ, কত উত্তেজনা! বাক্সে ব্যালটপেপার ফেলে, হাতে কালি নিয়ে, হাসিমুখে মানুষ বাড়ি ফিরছে। স্বাধীন দেশ, সেখানে মানুষ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের মতামত ভাগ করে নিচ্ছে। তার আনন্দই তো অন্যরকম!

নকল ভোট দেওয়ার ব্যাপারে সেসময় ছাত্ররাই ছিল অগ্রণী! ‘আমার প্রথম ভোট’ ধারাবাহিকে লিখছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়…

সেই প্রথম নির্বাচনের সময়েই মনে হয়েছিল, আচ্ছা, আমিও যদি এভাবে নিজের মতামত ওই চিরকুটে শিলমোহর দিয়ে জানাতে পারতাম!

তারপর আস্তে-আস্তে, বলা যেতে পারে, প্রায় পুরোদস্তুর অভিনেত্রী হয়ে উঠলাম। নায়িকা-ই বলা যায়। কিন্তু শেষমেশ যখন ভোট দেওয়ার সুযোগ এল, তখনই মনে হল, আমি আসলে বড় হয়ে গেছি!

দেশ স্বাধীন হয়েছিল বটে, কিন্তু ছয়ের দশকের গোড়ায়, আমি যখন প্রথম ভোট দিচ্ছি, তখন নানারকম সংকটও চলছে চারপাশে। চিন-যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যেই। তাই সে-সময় রাজনীতিতে নানা উথালপাথালও চলছে। তপনবাবু, মৃণালবাবু-দের সঙ্গে ততদিনে কাজ করে ফেলেছি। তখন কাজ করছি সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে। এঁদের ছবির মূল্যবোধটাও তো ভেতরে-ভেতরে কিছুটা কাজ করে! তাই ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়ে, স্বাধীনতা পেয়ে যতটা আনন্দ হয়েছিল, ততটা সংশয়ও হয়েছিল। সংশয়ের আরও একটা কারণ ছিল বটে। সেই নির্বাচনে যাঁরা প্রার্থী, তাঁরা কেউ-কেউ তো আমার পরিচিত! আমি কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁদের কাউকে ভোট দিতে পারব?

আসলে ভোট দেওয়া এমনই একটা অধিকার, একজন নাগরিককে এতটা শক্তিশালী করে তোলে সেই অধিকার, যে অনেকরকম ভাবনাচিন্তারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

এই সংশয়ের জেরে কী হল, ভোটের দিন ভোট দেব কি না, তাই নিয়েই একটু সংশয় দেখা দিল! তারপর মনে করলাম যে, না এটা তো আমার দায়িত্ব! তাছাড়া আমি না ভোট দিলে আমার নামে যদি অন্য কেউ ভোট দিয়ে দেয়!

সাতপাঁচ ভেবে ঠিক করলাম, একজনকে ভোটটা দিয়েই আসি। গেলাম, ভোট দিলাম। তারপর শুরু হল অন্য সংশয়, ভুল করলাম না তো?

‘মহানগর’-এর শেষ দৃশ্য

আসলে ভোট দেওয়া এমনই একটা অধিকার, একজন নাগরিককে এতটা শক্তিশালী করে তোলে সেই অধিকার, যে অনেকরকম ভাবনাচিন্তারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

শেষে একটা কথা বলি। আমার সেই প্রথম ভোটের বছরেই সম্ভবত, যদি খুব ভুল না করি, ‘মহানগর’ ছবিটা মুক্তি পায়। এই ছবি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন, ছবির শেষে আরতি একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে চাকরি ছেড়ে দেয়। সুব্রত, তার স্বামী তাকে সমর্থন করে। বলে, আমরা ভীতু হয়ে পড়ছি। গণতন্ত্রের মজাই হচ্ছে, সেখানে নির্ভয়ে সবরকম অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়।