‘সুগার’ কী কিমত
অসময়ে টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ডাঃ প্রাইসের। খুব গাঢ় ঘুমে ছিলেন তিনি। তাঁর বেডরুমের টেলিফোনটা যে বাজছে, সেটা বুঝতে তাঁর কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেখলেন, রাত প্রায় দুটো। একটু বিরক্তি নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলেন তিনি। রিসিভারটা তুলে ঘুম জড়ানো গলায় বললেন— ‘ইয়েস, ডাঃ প্রাইস স্পিকিং।’ টেলিফোনের ওপাশ থেকে কৌতুক মেশানো গলা ভেসে এল— ‘এত রাতে আপনার ঘুম ভাঙানোর জন্য সরি স্যর।’ টেলিফোনের ওপাশে পুলিশ সার্জেন্ট নেলর। গলা চিনতে ভুল হওয়ার নয়। তাঁরা বহুদিনের পরিচিত। ডাঃ প্রাইস বিরক্তভাব কাটিয়ে বললেন, ‘আমায় এসব মেকি ভদ্রতা দেখিয়ে লাভ নেই। তা এত রাতে ফোন, কী ব্যাপার! জরুরি কিছু?’ নেলর ইতস্তত হয়ে উত্তর দিলেন—‘জরুরি না হলে, এত রাতে আপনাকে আর বিরক্ত কেন করব স্যর! একটা আনন্যাচারাল ডেথ ঘটেছে…এক ভদ্রমহিলার। আমি প্লেস অফ অকারেন্সেই আছি। আপনি একবার একটু এসে দেখলে ভাল হত।’ ডাঃ প্রাইস কিছুক্ষণ চুপ করে, জিজ্ঞেস করলেন— ‘জায়গাটা কোথায়?’ নেলর উৎসাহিত হয়ে উত্তর দিলেন—‘থ্রনবারি ক্রিসেন্ট, ব্র্যাডফোর্ড।’ ‘ও বাবা, সে তো অনেক দূর। এত রাতে ওখানে…’ সংশয় মাখা গলায় বললেন ডাঃ প্রাইস। ‘আপনাকে ওসব কিচ্ছু ভাবতে হবে না স্যর। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি আপনার বাড়িতে। ‘উৎফুল্ল স্বরে বলে নেলর। ‘বেশ। পাঠাও তাহলে। আমি দেখছি।
রিসিভারটা রেখে দিলেন ডাঃ প্রাইস। বিছানায় বসলেন। ফরেনসিক প্যাথোলজিস্টের চাকরি যখন করছেন, রাত-বিরেতে এসব উৎপাত লেগেই থাকবে। কী আর করা! অগত্যা পোশাক বদলে বেরনোর জন্য প্রস্তুত হলেন।
এ-কাহিনির জন্ম, বিশ্বযুদ্ধত্তোর ইংল্যান্ডে। সময়টা ১৯৫৭, মে মাস। ডাঃ প্রাইস যখন পুলিশের গাড়িতে ব্র্যাডফোর্ড পৌঁছলেন, তখন প্রায় ভোর তিনটে। নেলর অকুস্থলের কাছাকাছিই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। নেলরের সঙ্গে অকুস্থলে যেতে-যেতে ঘটনাটা সংক্ষেপে শুনলেন ডাঃ প্রাইস।
সায়ানাইড ওস্তাদ শিল্পী! ক্যানভাসে এক আঁচড়েই তার জাত চিনিয়ে দেয়! পড়ুন: বিষ-রূপ দর্শন পর্ব ৩…
যে-মহিলার মৃতদেহ বাথরুমে পাওয়া গেছে, নাম তাঁর মিসেস এলিজাবেথ বার্লো। বছর তিরিশ বয়স। কেনেথ বার্লোর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে এক বছরও হয়নি। বার্লোদের প্রতিবেশী মিসেস স্কিনারের সঙ্গে মৃতার বেশ সখ্যতা ছিল। নেলর মিসেস স্কিনারের কাছ থেকেই আপাতত এই দম্পতি সম্পর্কে যা কিছু জেনেছেন। কেনেথ আর এলিজাবেথ দু’জনেই ছিলেন নার্স। কাজের সূত্রেই দু’জনের আলাপ। সেখান থেকে প্রেম ও বিয়ে। এটা কেনেথের দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম পক্ষের স্ত্রী, বছর দুই হয়েছে মারা গেছে। প্রথম পক্ষের একটা বছর দশেকের ছেলেও আছে। কেনেথ আপাতত বেকার। নতুন কোনও হাসপাতালে কাজ খুঁজছিল। আর এলিজাবেথ বিয়ের পর নার্সিংয়ের কাজ ছেড়ে, একটা স্থানীয় লন্ড্রিতে কাজ করছিল। এই দম্পতির মধ্যে বেশ মিলমিশ ছিল। কোনওদিন কোনও ঝগড়ার আওয়াজ প্রতিবেশীদের কানে আসেনি। গত বিকেলেও এলিজাবেথ মিসেস স্কিনারের বাড়ি এসেছিল আড্ডা মারতে। আধঘণ্টা আড্ডা মেরে চলে যায়। সে-সময়েও এলিজাবেথকে বরাবরের মতোই হাসিখুশি লেগেছে। তারপর কী ঘটেছে, সেটা মিসেস স্কিনারের জানা নেই। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ, কেনেথ হন্তদন্ত হয়ে তাঁর বাড়িতে হাজির হয়। স্কিনার, বার্লোদের বাড়ি ছুটে গিয়ে দেখে— এলিজাবেথের নিস্পন্দ দেহ বাথরুমের বাথটবে পড়ে আছে। স্কিনার হাউস ফিজিশিয়ানকে খবর দেন। তিনিই এসে পুলিশকে খবর দিয়েছেন।
সব শুনে ডাঃ প্রাইস নেলরকে জিজ্ঞেস করলেন—‘গতকাল এই বার্লো ফ্যামিলিতে কী-কী ঘটেছে, তার পুরো ডিটেলস আমার চাই। তার ব্যবস্থা কিছু হয়েছে?’ ‘না স্যার। সেটা তো মৃতার স্বামী কেনেথই ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু উনি শোকে থমথমে হয়ে আছেন। কথাবার্তা বিশেষ বলছেন না। এই সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা…’ উত্তর দেয় নেলর।
‘বেশ… আগে না হয়ে অকুস্থলে চলো। বডিটা দেখি। তারপর মিঃ বার্লোর সঙ্গে কথা বলা যাবে।’ বললেন ডাঃ প্রাইস। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ স্যর। এদিকে আসুন। আপনি দেখবেন বলে বডিতে আমরা হাত দিইনি। কোনও কিছু সরাইনি।’ নেলর, ডাঃ প্রাইসকে নিয়ে গেল বার্লোদের বাথরুমে।
ছিমছাম বাথরুমের একধারে লম্বা বাথটব। সেই বাথটবেই ডানদিক ফিরে পড়ে আছে, মাঝারি গড়নের স্বাস্থ্যবতী তরুণীর নগ্ন-নিথর দেহ। দেখে যেন মনে হয় পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। পা দুটো ঈষৎ ভাঁজ করা। হাত দুটো ভাঁজ হয়ে আছে মাথার কাছে। বাথটবের কর্ক খোলা। বাথটব জলশূন্য। কিন্তু মৃতার ডান কনুইয়ের ভাঁজ আর বাথটবের মধ্যবর্তী অংশে, বেশ কিছুটা জল তখনও জমে আছে। মেঝেতে পড়ে মৃতার অন্তর্বাস। বাথরুমের মেঝে, দেওয়াল খটখটে শুকনো। ওয়াশ-বেসিনে বমি মাখা বালিশের কভার জড়ো করে রাখা।
ডাঃ প্রাইস, গ্লাভস পরে মৃতদেহ পরীক্ষা করতে এগিয়ে গেলেন। মৃতদেহে রিগর মর্টিস ধরতে শুরু করেছে। ডান নাক থেকে ক্ষীণ একটা রক্তের ধারা বেরিয়ে এসেছে। বন্ধ চোখ পরীক্ষা করে বুঝলেন— চোখের তারারন্ধ্র প্রসারিত। দেহে বাহ্যিক কোনও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। ‘তুমি কী বুঝছ হে!’ নেলরকে প্রশ্ন করলেন প্রাইস।
‘দেখে তো মনে হচ্ছে, ড্রাউনিং-কেস। বাথটবের জলে ডুবে মৃত্যু।’ উত্তর দিল নেলর। ‘এত সোজাসাপ্টা কেস যখন, তবে আমায় ডেকে পাঠালে কেন?’ অন্যমনস্ক হয়ে প্রশ্ন করলেন ডাঃ প্রাইস। ‘স্যর, সুস্থ-সবল একজন মানুষ, এ-ভাবে বাথটবের জলে ডুবে মারা গেল! ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত না স্যার? কোনওরকম স্ট্রাগলের চিহ্নও তো নেই।’ কথাটা ডাঃ প্রাইসেরও মনে হয়েছে। মৃত্যুটা যতটা সহজ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, আদৌ কি তাই? এই অতিসারল্যের মধ্যে কোথাও যেন একটা জটিল ধাঁধা আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রাইস বললেন— ‘চলো, মিঃ বার্লোর সঙ্গে কথা বলা যাক। গতকাল ঠিক কী কী ঘটেছে তা ডিটেলসে জানা প্রয়োজন’
শোকবিহ্বল কেনেথ বেডরুমে চুপচাপ বসে ছিল। ডাঃ প্রাইস শান্ত স্বরে বললেন— ‘আই অ্যাম সরি ফর ইওর লস মিঃ বার্লো। আমি জানি, এ-সময়ে আপনাকে বিরক্ত করা উচিত নয়। কিন্তু কাল ঠিক কী কী ঘটেছে, সেটা জানতে পারলে, তদন্তে সুবিধা হত। আপনি কি এখন বলতে পারবেন?’ কেনেথ সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। ‘বেশ তাহলে বলুন।’ কেনেথ ক্লান্তস্বরে শুরু করল, গতকালের পুঙ্খানুপুঙ্খ বৰ্ণনা।
‘গতকাল ৩ মে ছিল শুক্রবার। ওর (এলিজাবেথ) ছিল হাফ-ডে। ও, দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যেই বাড়ি চলে এসেছিল। লন্ড্রি থেকে বাড়ি আসার পথে লাঞ্চ প্যাক করেই এনেছিল। আমরা, মানে আমি, এলিজাবেথ আর আমার ছেলে (প্রথম পক্ষের) ইয়ান একসঙ্গেই লাঞ্চ করি।’
‘লাঞ্চে কী খেয়েছিলেন?’
‘ফিস-চিপস, বাটার দিয়ে ব্রেড আর চা।’
‘বেশ, তারপর বলুন…’
কেনেথ আবার শুরু করলেন— ‘লাঞ্চের পর ঘরের কিছু টুকটাক কাজ ছিল। সারা সপ্তাহ ঘরদোর পরিষ্কারের সময় তো ওর হয় না। লাঞ্চের পর সেসবই ও করছিল। আমি গ্যারেজে আমাদের গাড়িটা ধোয়ামোছা করছিলাম। হাতের কাজ সেরে বিকেল চারটে নাগাদ ও গেল আমাদের পাশের বাড়ি, মিসেস স্কিনারের সঙ্গে আড্ডা মারতে। একটু বাদে আমিও গেলাম সেখানে। বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে, আমরা দু’জনে বাড়ি ফিরে আসি। বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমরা চা-টা খাই। গতকাল চায়ের সঙ্গে টোস্ট, ব্রেড-বাটার দিয়ে বিকেলের টিফিনটাও সেরে নিই। ঠিক করেছিলাম, সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ টিভিতে একটা প্রোগাম একসঙ্গে দেখব। তাই কাল আগে-ভাগে টিফিনটা সেরে নিই। টিফিন খাওয়ার পর আমরা দু’জনে সোফায় বসে গল্প করছিলাম। আমাদের ছেলে ইয়ান বসে টিভি দেখছিল। সে-সময়ে, বেটি (এলিজাবেথের ডাক নাম) বলল— ওর শরীরটা নাকি তেমন ভাল লাগছে না। খুব ক্লান্ত লাগছে।
সন্ধে সাড়ে ছ’টা নাগাদ ও ডাইনিং ছেড়ে বেডরুমের দিকে গেল রেস্ট নিতে। ও বলল-ওর নাকি খুব অস্থির লাগছে। মাথার ভিতরটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা বোধ হচ্ছে। ভীষণ দুর্বল লাগছে। যাওয়ার আগে বলে গেল— সাড়ে সাতটার প্রোগ্রামের আগে ওকে ডেকে দিতে। আমি ভাবলাম, সারা সপ্তাহ কাজের চাপে তেমন বিশ্রামের সুযোগ তো ও পায় না। তাই হয়তো শরীরটা একটু বিগড়েছে। ও নিয়ে সে-সময়ে আমি মাথা ঘামাইনি। সাড়ে সাতটার একটু আগে ডাকতে গিয়ে দেখি, ও এর মধ্যেই পোশাক বদলে নাইট-ড্রেস পরে শুয়ে পড়েছে। বুঝলাম, বেচারির শরীরটা ভালোই বিগড়েছে। আমার ঘরে ঢোকার শব্দ পেয়ে ও ক্লান্ত স্বরে বলল— ‘আমার শরীরটা একদমই ভাল লাগছে না। আজ বোধহয় টিভির প্রোগ্রামটা দেখা হবে না।’ আমিও ওকে কোনও জোর করলাম না। আমি তারপর ড্রয়িং-রুমে ফিরে আসি। আমি আর ছেলে দু’জনে মিলে প্রোগ্রাম দেখি। রাত আটটা নাগাদ টিভি ব্রেকের সময়ে এক গ্লাস জল নিয়ে বেটির কাছে যাই। দেখি, তখনও ও ঘুমায়নি। অস্থিরতায় উশখুশ করছে। গ্লাসের জলটা খেয়ে আমায় বলল— ‘আমার এত ক্লান্ত লাগছে, উঠে গিয়ে ইয়ানকে গুডনাইট বলার শক্তিটুকুও নেই। তুমি ওকে আমার হয়ে গুডনাইট জানিয়ে দিও।’ সে-সময়ে লক্ষ করলাম, ওর কথাগুলো কেমন অস্পষ্ট। যেন জড়িয়ে যাচ্ছে।
আমি বেডরুমের আলো নিভিয়ে আবার ডাইনিঙে ফিরে আসি। টিভি দেখলেও, বেটির শরীর নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলাম। কান সজাগ রেখেছিলাম। রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ, বেডরুম থেকে বেটির ডাক শুনে ছুটে গিয়ে দেখি, ও বিছানায় বমি করেছে। আমি বিছানার চাদর, বালিশের কভার বদলে ওকে আবার শুইয়ে দিই।
ও সে-সময়ে বলে, ওর নাকি প্রচণ্ড গরম লাগছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি ও গা ঘামে ভিজে সপসপে। এত গরম তো পড়েনি, যে এরকমভাবে ঘামবে! বড় চিন্তা হল। ইয়ানকে টিভি বন্ধ করে শুতে যেতে বলে, আমিও শুয়ে পড়লাম। বেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম, যাতে ওর ঘুম আসে। কিন্তু ও কেবল উশখুশ করছে।
এক সময়ে বিছানায় উঠে বসল। বলল, ওর এত গরম লাগছে কোনও পোশাক নাকি গায়ে রাখতে ইচ্ছে করছে না। বাথটবের জলে গা ডুবিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। একটু স্নান করলে ওর নাকি ভাল লাগবে। আমি কিছু বলার আগেই, পাজামা খুলে ফেলে বাথরুমের দিকে গেল। আমি শুধু বললাম— বাথরুমের দরজা দেওয়ার দরকার নেই। কোনও অসুবিধা হলে আমায় ডেকো। কয়েক মিনিট বাদেই বাথটবের কল খোলার শব্দ কানে এল। আমি একটা বই পড়ছিলাম। কখন যে দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে এল বুঝতেই পারিনি। তারপর হঠাৎই যখন ঘুম ভাঙল, দেখি রাত প্রায় সাড়ে এগারটা বাজে, কিন্তু বেটি তখনও বাথরুম থেকে ফেরেনি। মনটা কু ডাকল। আমি দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে দেখি, দরজা ভেজানো। বার কয়েক ডাকাডাকি করলাম। কিন্তু বেটির কোনও সাড়া নেই। তখন দরজা খুলে দেখি, বেটি কাত হয়ে বাথটবের জলে ডুবে রয়েছে!’ ডুকরে কেঁদে ওঠে কেনেথ।
ডাঃ প্রাইস, কেনেথের কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখেন। শান্ত স্বরে কেনেথকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘আপনার স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখে, আপনি তখন কী করলেন?’ কেনেথ নিজেকে সামনে নিয়ে বলল— ‘আমি সঙ্গে-সঙ্গে ওকে সোজা করে কাঁধ আর মাথা জলের উপরে তুলে ধরে, বাথটবের কর্ক খুলে জল বার করে দিই। মন বলছিল, ভয়ানক কিছু একটা ঘটে গেছে। তারপর চেষ্টা করেছিলাম ওকে বাথটব থেকে তুলে বাথরুমের মেঝতে শোয়াতে, কিন্তু পারিনি। শরীর শক্ত হয়ে গেছিল, বারবার কাত হয়ে যাচ্ছিল। শেষমেষ, বাথটবের মধ্যেই চিৎ করে শুইয়ে পেটে চাপ দিয়ে জল বার করার চেষ্টা করি, মুখে মুখ দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের চেষ্টা করি। কিন্তু পারলাম না। কিচ্ছু করতে পারলাম না।’ কান্নায় ফুঁপিয়ে ওঠে কেনেথ। ডাঃ প্রাইস কেনেথের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলেন— ‘ইটস ওকে… আমার আর কিছু জানার নেই। টেক কেয়ার অফ ইওরসেল্ফ।’
ডাক্তার প্রাইস, নেলরকে এলিজাবেথের মৃতদেহ পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দিতে বলে, নিজেও রওনা দিলেন। হাসপাতালে যাওয়ার পথে ডাঃ প্রাইস ভাবছিলেন, এলিজাবেথের এমন অদ্ভুত মৃত্যু নিয়ে। কেনেথের বয়ানের এক জায়গায় তাঁর বেশ খটকা লেগেছে। কেনেথের বয়ানের সঙ্গে তাঁর নিজের চোখে দেখা অকারেন্স সিনের একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কেনেথ যদি গত রাতে এলিজাবেথকে ওই অবস্থায় দেখে বাথটবের কর্ক খুলে, জল বার করে দিয়ে, এলিজাবেথকে তুলে ধরে বাথটব থেকে তোলার চেষ্টা করে, চিৎ করে শুইয়ে পেটে-বুকে চাপ দিয়ে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টাই করে, তাহলে এলিজাবেথের কনুইয়ের ভাঁজে এখনও ওতটা জল দাঁড়িয়ে থাকে কী করে! এলিজাবেথের শরীর এতবার নাড়াচাড়া করলে ওই জলটা তো ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়!
অকারেন্স সিন দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এলিজাবেথ যেন অমন কাত হয়েই জলের তলায় পড়ে ছিল। কেনেথ শুধু কর্ক খুলে জল বার করে দিয়েছে, এলিজাবেথকে স্পর্শও করেনি। তাই, বাথটবের বাকি অংশের জল বেরিয়ে গেলেও, এলিজাবেথের কনুইয়ের ভাঁজে জলটুকু আটকে রয়েছে। তাই-ই যদি হয়, তাহলে কেনেথ এমন করল কেন? সে কি তবে আগে থেকেই জানত, এলিজাবেথ মৃত? হাসপাতালে এলিজাবেথের মৃতদেহ যখন এল, তখন দিনের আলো ফুটেছে।
এছাড়াও, বার্লোদের বাড়ি থেকে পুলিশ এলিজাবেথের ঘামে ভেজা পাজামা, অন্তর্বাস, বমি মাখা বেডশিট ও বালিশের কভার সংগ্রহ করেছে। ভাঁড়ার ঘরে দুটো সিরিঞ্জ আর চারটে হাইপোডার্মিক সূঁচও পাওয়া গেছে। সে-সবও পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে। এ-সবকিছুকেই পরীক্ষার জন্য ফরেনসিকে পাঠানো হবে।
ডাঃ প্রাইস নিজেই এলিজাবেথের পোস্টমর্টেম করলেন। এলিজাবেথের শরীর-অভ্যন্তরে, অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তন তাঁর চোখে পড়ল না। দেহ অভ্যন্তরস্থ অঙ্গের যা পরিবর্তন লক্ষ করেছেন, সবই জলে ডুবে মৃত্যুর দিকেই ইঙ্গিত করছে। অনেকক্ষণ জলে ডুবে থাকার কারণে, ফুসফুসও ফুলে ঢোল হয়ে গেছে।
কিন্তু পোষ্টমর্টেম করতে গিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি পেয়েছেন। মৃত্যুর সময়ে এলিজাবেথ আট সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তবে, ফিটাস-সহ মেমব্রেন অটুট রয়েছে। সারভিক্সও (জরায়ু মুখ) স্বাভাবিক, যোনিপথেও কোনও অস্বাভাবিকত্ব নেই। অর্থাৎ গর্ভপাতের কোনও চেষ্টা হয়নি। তবে, মৃত্যু ওই বাথটবের জলে ডুবেই? সেটাই তো ভাবাচ্ছে প্রাইসকে।
অকারেন্স সিন দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এলিজাবেথ যেন অমন কাত হয়েই জলের তলায় পড়ে ছিল। কেনেথ শুধু কর্ক খুলে জল বার করে দিয়েছে, এলিজাবেথকে স্পর্শও করেনি। তাই, বাথটবের বাকি অংশের জল বেরিয়ে গেলেও, এলিজাবেথের কনুইয়ের ভাঁজে জলটুকু আটকে রয়েছে। তাই-ই যদি হয়, তাহলে কেনেথ এমন করল কেন?
যদি ব্যাপারটা নিছক দুর্ঘটনা হত, কিংবা কেউ যদি জোর করে এলিজাবেথকে বাথটবের জলে চুবিয়ে ধরত, তাহলে স্বভাবতই ও আত্মরক্ষার জন্য স্ট্রাগল করত। তার ফলে বাথটবের জল চলকে বা ছিটকে বাথরুমের মেঝে ও দেওয়াল ভিজিয়ে দিত। কিন্তু প্রাইস নিজের চোখেই দেখে এসেছেন— বাথরুমের দেওয়াল-মেঝে খটখটে শুকনো। এমনকী বার্লোদের প্রতিবেশী মিসেস স্কিনারও জানিয়েছেন— উনি গতরাতে যখন প্রথম এলিজাবেথকে বাথটবে পড়ে থাকতে দেখেন, তখনও বাথরুম শুকনোই ছিল।
এর অর্থ একটাই— এলিজাবেথ যখন বাথটবের জলে তলিয়ে যায়, তখন সে কোমাগ্রস্ত ছিল। তাই প্রতিরোধের কোনও সুযোগ সে পায়নি। কিন্তু, ও অজ্ঞান বা কোমায় চলে গেলই-বা কেন? যদিও এলিজাবেথ গতকাল বিকেল থেকেই অসুস্থ বোধ করছিল, কিন্তু কোনও গুরুতর শারীরিক গোলযোগ ছাড়া একজন আপাত সুস্থ ব্যক্তি একবেলার অসুস্থতায় সোজা কোমায় চলে যাওয়া খুব দুলর্ভ। হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, সেরিব্রাল হ্যামারেজের কারণে এমনটা হতে পারে। কিন্তু এলিজাবেথের পোস্টমর্টেমে তেমন কোনও সম্ভাবনার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তবে? কোনও বিষ বা ওষুধের প্রভাবেও এমন কোমায় চলে যাওয়া সম্ভব? এলিজাবেথ বাথটবে স্নান করতে নামার সময়ে, সেই বিষ পুরোমাত্রায় হয়তো তার শরীর কব্জা করে ফেলেছিল। তাই সে তখন অজ্ঞান হয়ে যায় কিংবা কোমায় চলে যায়। তারপর জলে ডুবে বেঘোরে মৃত্যু। ডাঃ প্রাইস এলজিবাথের ভিসেরা, রক্ত, মূত্র ও মলের স্যাম্পল টক্সিকোলজির পরীক্ষার জন্য পাঠালেন। ততদিন এলিজাবেথের মৃতদেহ হাসপাতালের মর্গেই রইল।
টক্সিকোলজির রিপোর্ট এল দিন চারেক পর। রিপোর্ট দেখে ডাঃ প্রাইস যারপরনাই হতাশ হলেন। এলিজাবেথের স্যাম্পেলের উপর শতাধিক চেনা-অচেনা বিষের পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু সমস্ত রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। রিপোর্টে কোনও বিষের অস্তিত্ব মেলেনি। এমনকী, গর্ভপাত সংক্রান্ত ও অন্য কোনও ওষুধের চিহ্নও তার স্যাম্পেলে মেলেনি। ডাঃ প্রাইস অসম্ভব হতাশ হলেও, হাল ছাড়লেন না। এমন কি কোনও ওষুধ আছে, যার প্রতিক্রিয়ায় এলিজাবেথ এমন অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, অথচ মৃত্যুর পর তার অস্তিত্ব টক্সিকোলজির পরীক্ষায় না পাওয়াও যেতে পারে!
ডাঃ প্রাইসের হঠাৎ মনে এল, আমাদের বহুল পরিচিত এক ওষুধের। ইনসুলিন! ইনসুলিন আদতে আমাদের দেহেই তৈরি হয়। মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে ইনসুলিন অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন।
আমাদের দেহের অগ্ন্যাশয় ইনসুলিনের আঁতুড়ঘর। অগ্ন্যাশয়ের ‘আইলেটস অফ ল্যাঙ্গারহান্স’-এর বিটা কোষ থেকে ক্ষরিত হয় ইনসুলিন। আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাই, তার বড় অংশই কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ। সেসব খাদ্য আমাদের পরিপাক তন্ত্রের দ্বারা পাচিত হয়ে সরল শর্করা বা গ্লুকোজ-রূপে আমাদের রক্তে মেশে এবং রক্তের গ্লুকোজের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে ইনসুলিনের সক্রিয়তা বেড়ে যায়, অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন ক্ষরণের পরিমাণও বাড়ে। ইনসুলিনের সক্রিয় হস্তক্ষেপে, শর্করা, রক্ত থেকে বিভিন্ন কোষে-কোষে প্রবেশ করে। কিছু গ্লুকোজ কোষের শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, বাকিটা যকৃৎ আর দেহের পেশিগুলো শোষণ করে গ্লাইকোজেনে পরিণত করে সঞ্চিত থাকে। এইভাবেই ইনসুলিনের হস্তক্ষেপে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়। যখনই রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসে, অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন ক্ষরণও কমে গিয়ে, শরীরে ইনসুলিনের সক্রিয়তাও কমে যায়। যখনই ইনসুলিনের সক্রিয়তা কমে গেল, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অগ্ন্যাশয়ের আলফা কোষ থেকে ক্ষরিত হল গ্লুকাগন নামের এক হরমোন। গ্লুকাগনের হস্তক্ষেপে, যকৃৎ ও পেশিতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ভেঙে, শরীরকে নিরন্তর প্রয়োজনীয় গ্লুকোজের জোগান দেয়। যখন পুনরায় খাওয়ার খাব, তখন আবার ইনসুলিনের সক্রিয়তা বেড়ে গিয়ে যকৃৎ ও পেশি, রক্ত থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ শোষণ করে তা সঞ্চিত করে রাখবে। ইনসুলিন আর গ্লুকাগনের এই পরস্পর বিপরীতধর্মী কার্যকলাপের ফলেই, সুস্থ মানুষের রক্তে গ্লুকোজের একটা স্বাভাবিক স্থিতাবস্থা সবসময়ে বজায় থাকে, তা কখনও খুব বেড়েও যায় না, আবার স্বাভাবিকের থেকে নীচেও নেমে যায় না এবং এর ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলোতেও নিরবিচ্ছিন্ন গ্লুকোজের জোগান বজায় থাকে, স্বাভাবিক কাজকর্ম চালানোর জন্য, তাদের এনার্জি-ফুয়েলের কমতি কখনও হয় না। ইনসুলিন রক্তের গ্লুকোজকে একটা স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসে, আর গ্লুকাগন রক্তের গ্লুকোজকে আর কমতে না দিয়ে, সেই স্বাভাবিক মাত্রাকেই বজায় রাখে। ফলে, সকালে একথালা ভাত খেয়ে কাজে বেরিয়ে সারাদিন কায়িক পরিশ্রম করলেও, আমাদের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কখনওই স্বাভাবিকের তুলনায় মারত্মকরকম নীচে নেমে যায় না। যদি এই দুই হরমোনের মধ্যে কোনও একটির কার্যকলাপ বিঘ্নিত হয়, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার স্বাভাবিক স্থিতাবস্থাটিও তখন আর বজায় থাকে না। আর এটি মূলত ঘটে ইনসুলিনের কারণেই। ইনসুলিন যদি অগ্ন্যাশয় থেকে কোনও কারণে প্রয়োজনের তুলনায় কম ক্ষরিত হয়, কিংবা একেবারে ক্ষরিত না হয়, তখন খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্র দ্বারা পাচিত হয়ে যে-গ্লুকোজ আমাদের রক্তে মিশছে, তা ইনসুলিনের অভাবে কোষেও দ্রুত প্রবেশ করতে পারে না, যকৃৎ ও পেশি দ্বারা শোষিতও হতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে, ‘হাইপারগ্লাইসিমিয়া’। এর ফলে আমাদের ডায়াবেটিস মেলিটাস বা মধুমেহ রোগ হয়।
এখন যেমন মধুমেহ বা ডায়াবেটিস খুব সাধারণ অসুখ, এককালে কিন্তু কোনও ব্যক্তির ডায়াবেটিস ধরা পড়া মানে, তাঁর একপ্রকার মৃত্যু-শমন জারি হয়ে গেল। সে-সময়ে ডায়াবেটিসের কোনও কার্যকরী ওষুধ না থাকায়, তিলে-তিলে মৃত্যুর প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। ডাক্তাররা কিঞ্চিৎ আয়ুবৃদ্ধির জন্য, সেকালে ডায়াবেটিস রোগীদের কঠোর উপবাস করার নিদান দিলেও, তাতে অবশ্য শেষরক্ষা হত না।
প্রাণীর অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামে কোনও একটা পদার্থ ক্ষরিত হয়ে, রক্তের শর্করার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, এমন একটা ধারণা বহুকালই বিজ্ঞানী মহলে প্রচলিত ছিল। কিন্তু অগ্ন্যাশয় থেকে ক্ষরিত ইনসুলিনের চিহ্নিতকরণ তখনও হয়নি। ১৯২১ সালে কানাডার দুই চিকিৎসক ফ্রেডরিক বেন্টিং আর চার্লস বেস্ট সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করলেন। তাঁরা কুকুরের অগ্ন্যাশয়ে শুধু ইনসুলিনের ক্ষরণকে চিহ্নিতই করলেন না, অগ্ন্যাশয় থেকে তাকে নিষ্কাশনও করলেন। এই ইনসুলিন এখন ইনজেকশনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস আক্রান্ত কোনোও প্রাণী এমনকী মানুষকেও দেওয়া যেতে পারে। সে সুযোগ চলেও এল। পরের বছর, গৃহপালিত পশুর অগ্ন্যাশয় থেকে নিষ্কাশিত ও পরিশ্রুত ইনসুলিন ডায়াবেটিস আক্রান্ত এক মুমূর্ষু চোদ্দ বছরের বালকের শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করালেন বেন্টিং। তার ফল হল অভাবনীয়। বালকটি অচিরেই সুস্থ হয়ে উঠল, রক্তে শর্করার মাত্রাও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এল। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য, বেন্টিং ১৯২৩ সালে মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ পেলেন। সেই বছর থেকেই বাণিজ্যিকভাবে বিপুল পরিমাণ ইনসুলিন বাজারজাতও হল। বিশ্বের ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর কাছে হয়ে উঠল সঞ্জীবনী সুধা।

অগ্ন্যাশয় থেকে দৈহিক ইনসুলিনের ক্ষরণ বিঘ্নিত হলে, রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডাক্তাররা এখনও ভরসা রাখেন ইনসুলিনে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিনের কম ক্ষরণেই যে শুধু রক্তের শর্করার স্বাভাবিক সাম্যাবস্থাটি বিঘ্নিত হয়, তা নয়। যদি অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিনের মাত্রাতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ক্ষরণ হয়, সেক্ষেত্রেও রক্ত শর্করার এই সাম্যাবস্থাটি বিঘ্নিত হতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় আসার পরেও যদি অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিনের ক্ষরণ বন্ধ না হয়, সেক্ষেত্রে যকৃৎ ও পেশি ক্রমাগত রক্ত থেকে শর্করা শোষণ করতে থাকে। ইনসুলিনের সক্রিয়তার ফলে, গ্লুকাগন হরমোনের প্রভাবও স্তিমিত হয়ে পড়ে; তাই এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতেও যকৃৎ ও পেশিতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ভেঙে, রক্তে প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ সরবরাহও করতে পারে না।
ফলে রক্তের শর্করার মাত্রা ক্রমশ নামতে-নামতে, একসময়ে বিপদজনক ভাবে স্বাভাবিকের থেকে অনেক নীচে নেমে যায়। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে— ‘হাইপোগ্লাইসিমিয়া’। সাধারণ ভাবে যাকে আমরা বলি, ‘সুগারফল’ করা। রক্তেই যখন ন্যূনতম শর্করার অভাব, মস্তিষ্কও তার পর্যাপ্ত জ্বালানি পায় না। এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের একমাত্র রাস্তা, রোগীকে চিনির শরবত, মিষ্টি খাওয়ানো কিংবা গ্লুকোজের ইনজেকশন দেওয়া।
ইনসুলিনের মিত ক্ষরণ কিংবা অধিক ক্ষরণে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা হ্রাস পাওয়া, অর্থাৎ হাইপার গ্লাসমিয়া এবং হাইপো গ্লাইসিমিয়া উভয় ক্ষেত্রেই রোগীর জ্ঞান হারানো এবং কোমাগ্রস্ত হওয়া সম্ভব। কিন্তু এলিজাবেথের ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি হয়েছিল?
ডাক্তার প্রাইস সেটাই খতিয়ে দেখা শুরু করলেন। যদি এলিজাবেথ হাইপার গ্লাইসিমিয়া অর্থাৎ উচ্চ রক্ত-শর্করার কারণে জ্ঞান হারিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তার মূত্রেও শর্করার উপস্থিতি অবধারিতভাবে পাওয়া যাবে। কিন্তু এলিজাবেথের মূত্রের নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষায় কোনওরকম শর্করার চিহ্নই মেলেনি। আর এলিজাবেথের কোনওকালেই ডায়াবেটিস ছিল না। সুতরাং এলিজাবেথের জ্ঞান হারানোর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্ত-শর্করা কারণ নয়। তাই এলিজাবেথের ক্ষেত্রে, ইনসুলিনের অধিক সক্রিয়তায় রক্ত শর্করার মারাত্মক অবনমন এবং তার ফলে হাইপো-গ্লাইসিমিক শককেই, মৃত্যুর আগে তাঁর অজ্ঞান হয়ে হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গণ্য করলেন ডাঃ প্রাইস।

কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে হঠাৎ ইনসুলিনের অধিক সক্রিয়তা এবং তার ফলস্বরূপ রক্ত-শর্করার অবনমন— এমন পরিস্থিতি বেশ দুর্লভ। অগ্ন্যাশয়ে টিউমার বা কোনও আঘাতের ফলেই একমাত্র ইনসুলিনের আকস্মিক-অত্যাধিক ক্ষরণ সম্ভব। এদিকে পোস্টমর্টেমের সময়ে ডাঃ প্রাইস এলিজাবেথের অগ্ন্যাশয়ে তেমন কোনও কিছু লক্ষ করেননি। তাই আরও এক ব্যতিক্রমী সম্ভাবনার কথা ডাঃ প্রাইসের মাথায় এল। কোনও ব্যক্তিকে যদি বাজারে প্রাপ্ত ইনসুলিনের ওভারডোজ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলেও তো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া সম্ভব!
ডাঃ প্রাইসের স্মরণে আসে ষোড়শ শতকের সুইস চিকিৎসক ও অ্যালকেমিস্ট প্যারাসেলাসের সেই বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ, যা পরবর্তী সময়ে টক্সিকোলজি বা বিষ-বিজ্ঞানেরও আপ্ত বাক্য— যে-কোনও পদার্থের ‘বিষ’রূপে আত্মপ্রকাশ সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, পরিস্থিতি বিশেষে তার প্রয়োগমাত্রার উপর। দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ কোনও পদার্থও, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, নির্দিষ্ট কোনও প্রয়োগমাত্রায় হয়ে উঠতে পারে সম্ভাব্য ‘বিষ’।
ইনসুলিনের ইনজেকশনের ক্ষেত্রেও তো প্যারাসেলাসের এই পর্যবেক্ষণ প্রযোজ্য। ব্যক্তিবিশেষে চিকিৎসাবিজ্ঞান নির্ধারিত ডোজে, যে ইনসুলিন ইনজেকশন ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাণদায়ী, এলিজাবেথের মতো নন-ডায়াবেটিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে অনাবশ্যক মাত্রারিক্ত পরিমাণে তাইই হয়ে উঠতে পারে ‘বিষ’। অর্থাৎ, এলিজাবেথের মতো নন-ডায়াবেটিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ইনসুলিন ইনজেকশনের ওভারডোজ মৃত্যুদূত। এলিজাবেথের ডায়াবেটিস ছিল না। তাই তার ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়ার কোনও প্রয়োজনও ছিল না, তাই তার ক্ষেত্রে অসাবধানতাবশত ইনসুলিনের ওভারডোজের সম্ভাবনাটিকেও নস্যাৎ করা যায়। সুতরাং, এতদিন যে মৃত্যু নিছকই দুর্ঘটনা ছিল, তা ক্রমশ হয়ে উঠছে এক ঠান্ডা মাথার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড!
আর হত্যাকারী? সেইই-বা কে? ডাঃ প্রাইসের প্রথমেই মনে এল এলিজাবেথের হাজবেন্ড কেনেথের নাম। কারণ, সে একজন অভিজ্ঞ নার্স। আর পুলিশি তদন্তে জানা গেছে— কেনেথ একসময়ে হাসপাতালের ডায়াবেটিস রোগীদের শুশ্রূষার দায়িত্বে ছিল। সুতরাং ইনসুলিনের ডোজের প্রায়োগিক জ্ঞান তার আছে।


ইনসুলিনের ওভারডোজ দিয়ে হত্যা! এও কি সম্ভব! সারা দুনিয়ার অপরাধজগতে এমন ঘটনার নজির তখনও একটিও নেই। কিন্তু অতীতে যা কখনও ঘটেনি, তা যে ভাবীকালেও কখনও ঘটবে না, এ নিশ্চয়তা কোথায়!
কিন্তু খুনের এই সম্ভাব্য তত্ত্বকে আদালত গ্রাহ্য করে তোলার জন্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ চাই। সর্বাগ্রে, এলিজাবেথের শরীরে মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিনের উপস্থিতির খোঁজ পেতে হবে। সেটাই ডাঃ প্রাইসের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এলিজাবেথকে ইনসুলিনের ওভারডোজ দেওয়া হয়ে থাকলেও, মৃত্যুর প্রায় চারদিন পর শরীরে তার টিকি মেলা ভার। এলিজাবেথের ব্লাড স্যাম্পেলেও কোনও ইনসুলিনের চিহ্ন মেলেনি।
এলিজাবেথকে যদি ইনসুলিনের ওভারডোজের ইনজেকশন দেওয়া হয়েই থাকে, একমাত্র শরীরের যে-স্থানে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, সেই অংশে ইনসুলিনের অস্তিত্ব মিললেও মিলতে পারে।
ডাঃ প্রাইস আর তাঁর দল খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার ভার নিলেন। এলিজাবেথের নগ্ন মৃতদেহ জোরালো আলোর তলায় ফেলে, আতস কাঁচ ধরে শরীরের প্রত্যেক ইঞ্চিতে তন্ন-তন্ন করে খুঁজতে লাগলেন ইনজেকশনের সূঁচ ফোঁটানোর দাগ। ঘণ্টাখানেক বাদে পরিশ্রম ফলপ্রসূ হল। এলিজাবেথের দুই নিতম্বেই মিলল সূঁচ ফোঁটানোর চিহ্ন। এই দুই স্থানেই যে ইনসুলিনের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, ডাঃ প্রাইস একপ্রকার নিশ্চিত।
তিনি ওই দুই স্থান থেকে প্রায় ৩৭০ গ্রাম টিস্যু চেঁছে সংগ্ৰহ করে সংরক্ষণ করলেন। এবার এই টিস্যুতে ইনসুলিনের মাত্রা নির্ধারণ করার পালা। কিন্তু এ-দুঃসাধ্য সাধন করবে কে? মৃতদেহের টিস্যু থেকে নির্যাস নিষ্কাশন করে তার মধ্যে ইনসুলিনের অস্তিত্ব খোঁজা, এবং সেই ইনসুলিনের পরিমাণ পরিমাপ করা— এ আগে কেউ কখনও করেনি। তৎকালীন ফরেনসিক দুনিয়ার কাছে অন্তত তেমন কোনও উপায় জানা ছিল না। ডাঃ প্রাইসের দল তাই এ-কাজের জন্য বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির দোরে কড়া নাড়লেন।
শেষমেষ, মে মাসের শেষের দিকে খোঁজ পেলেন বুটস ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির। এরা বাণিজ্যিকভাবে ইনসুলিনও প্রস্তুত করে। সুতরাং ইনসুলিন নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। এরা এলিজাবেথের টিস্যু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে রাজি হল। এবার পরীক্ষার ফলের জন্য অপেক্ষা।
তবে ততদিন তো হাত গুটিয়ে বসে থাকা চলে না। ডাঃ প্রাইস এই ফাঁকে বিভিন্ন মানসিক হাসপাতালে যাতায়াত শুরু করলেন। কারণ, সে-সময়ে ইনসুলিন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ছাড়াও স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগের চিকিৎসাতেও ব্যবহার করা হত। স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীদের উপর প্রয়োগ করা হত ইনসুলিনের ‘শক্-থেরাপি’। নিয়ন্ত্রিতভাবে ইনসুলিন ইনজেকশনের ওভারডোজ দিয়ে তাঁদের ইচ্ছাকৃত কোমা দশায় ঠেলে দেওয়া হত। কোমা অবস্থায় কিছুক্ষণ রেখে দেওয়ার পর গ্লুকোজ ইনজেকশন দিয়ে আবার তাঁদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হত। কিছুক্ষেত্রে স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীদের এই শক্ থেরাপিতে সুফলও মিলত। যেসব ডাক্তাররা এই শক্ থেরাপি পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন, বিভিন্ন মানসিক হাসপাতালে ঘুরে ডাঃ প্রাইস তাঁদের সঙ্গে কথা বললেন।
পেশেন্টদের শক্ থেরাপির রিপোর্টও তিনি খতিয়ে দেখলেন। ডাঃ প্রাইস আশ্চর্য হলেন। শক্ থেরাপির সময়ে ইনসুলিন ইনজেকশনের ওভারডোজে পেশেন্টদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া আর মৃত্যুর আগে এলিজাবেথের শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণসমূহ প্রায় হবহু এক। উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে— প্রচণ্ড ক্লান্তি, অসম্ভব গরমবোধ হওয়া, শারীরিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, প্রচণ্ড ঘাম, মানসিক বিভ্রান্তি, চোখের তারারন্ধ্রের প্রসারণ, ঝাপসা দেখা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, বমি এবং শেষমেষ অজ্ঞান হয়ে গিয়ে কোমায় চলে যাওয়া।
ওদিকে, বুটস ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিজ্ঞানীরাও এলিজাবেথের টিস্যু স্যাম্পেল নিয়ে কাটা-ছেঁড়া শুরু করেছেন। তাঁরা ৩৭০ গ্রাম টিস্যু স্যাম্পেল থেকে প্রায় ১৭০ গ্রাম কেটে নিয়ে তার থেকে নির্যাস নিষ্কাশন করলেন। তারপর নানা রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেই নির্যাসে ইনসুলিনের উপস্থিতি চিহ্নিত করে, সেখান থেকে ইনসুলিনকে পৃথক করলেন। এবার সেই ইনসুলিনের পরিমাণ পরিমাপ ও তার শক্তি যাচাইয়ের পালা।
বিজ্ঞানীরা একদল ইঁদুর ও গিনিপিগের উপর এলিজাবেথের টিস্যু থেকে প্রাপ্ত ইনসুলিন প্রয়োগ করলেন। প্রায় সব ইঁদুর, গিনিপিগেরই এলিজাবেথের মতো হাইপো-গ্লাইসিমিয়ার সমস্ত লক্ষণ দেখা দিল। কয়েকটি মারাও গেল।
তারপর বিস্তর অঙ্ক কষে, শেষমেষ যা রিপোর্ট পাওয়া গেল, তাতে চক্ষু চড়ক গাছে।পরীক্ষিত ওই ১৭০ গ্রাম ট্যিসুতে প্রায় ৮৪ ইউনিট-পরিমাণ ইনসুলিন ছিল। বিজ্ঞানীদের হিসেব আরও বলছে, এলিজাবেথের মৃত্যুর সময়ে ওই টিস্যুতে ২৪০ ইউনিটের সমতুল্য পরিমাণ ইনসুলিন থাকাও সম্ভব। সুতরাং এ-থেকেই আন্দাজ করা যায়, এলিজাবেথকে হয়তো এর চেয়েও বেশি ডোজ ইনসুলিন ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁর মতো নন-ডায়েবটিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে মৃত্যুর পরোয়ানা।
বুটস কোম্পানির এই রিপোর্ট, ডাঃ প্রাইসের ভাবনাকেই মান্যতা দিল। হাতে তাঁর ভাবনার পক্ষে এখন জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। এর ভিত্তিতে এবার কেনেথকে চেপে ধরা যাবে। আদালতেও এ-রিপোর্ট পেশ করা যেতে পারে। কেনেথকে শেষমেশ বসতেই হল পুলিশি জেরার সামনে। এলিজাবেথের শরীরে মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিন পাওয়া গেছে শুনে, সে আকাশ থেকে পড়ল। অবাক হওয়ার ভান করে বলল— সে নাকি এলিজাবেথের সম্মতি ক্রমেই গর্ভপাত করানোর জন্য সেদিন দুপুরে এলিজাবেথের নিতম্বে, দু’ডোজ এরগোমেট্রিন ইনজেকশন দিয়েছিল। কিন্তু, এলিজাবেথের রক্তে, মূত্রে কোনওরকম গর্ভপাতের ওষুধের চিহ্ন মেলেনি, পোস্টমর্টেমের সময়ে তার প্রজননতন্ত্রেও গর্ভপাতের প্রচেষ্টা সংক্রান্ত কোনও পরিবর্তন লক্ষ করেনি ডাঃ প্রাইস। এরগোমেট্রিন কোনওভাবেই রক্তের শর্করার হঠাৎ অবনমন ঘটায় না, উপরন্তু এলিজাবেথের নিতম্ব টিস্যু থেকে মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিন আবিষ্কার হয়েছে। এরগোমেট্রিন তো আর ভোজবাজির মতো ইনসুলিনে বদলে যেতে পারে না! সুতরাং, কেনেথ যা বলছে, তা ডাহা মিথ্যে কথা। আর পুলিশ কেনেথের আগের কর্মক্ষেত্রে খোঁজখবর করে জানতে পেরেছে। সে নাকি তার সঙ্গী-সাথীদের মস্করা করে বলত— ‘ইনসুলিন ঠিকঠাক ব্যবহার করতে জানলে, ইনসুলিন ইনজেকশন দিয়ে পারফেক্ট মার্ডার করাও সম্ভব!’
সে-বছর জুলাই মাসে, এলিজাবেথকে হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত হিসেবে কেনেথকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। যদিও, এলিজাবেথকে খুনে, তার মোটিভটি পরিস্কার নয়। কিন্তু সমস্ত তথ্যপ্রমাণ কেনেথের বিরুদ্ধেই। তার আর পালাবার পথ নেই। তবে এলিজাবেথকে হত্যার পেছনে কেনেথের মোটিভটা আমরা আন্দাজ করতে পারি। কেনেথ হয়তো এলিজাবেথের বাচ্চাটা চায়নি। তার চাকরি নেই, এলিজাবেথ সারা সপ্তাহ লন্ড্রির কাজ করে ক’পয়সাই বা রোজগার করে। এই অবস্থায় পরিবারে নতুন একজনের আবির্ভাবের অর্থ, প্রবল আর্থিক সঙ্কটে পড়া। কিন্তু এলিজাবেথ হয়তো তার প্রথম সন্তান নষ্ট করতে চায়নি। এ-নিয়েই সম্ভবত জন আর এলিজাবেথের মনোমালিন্য হয়। দাম্পত্যে, সব মনোমালিন্যর প্রবল বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। কিছু-কিছু দাম্পত্য সমস্যা ঘুণপোকার মতো কুঁড়ে-কুঁড়ে দাম্পত্যের ভিত্তিকে ফোঁপড়া করে দেয়। কেনেথ হয়তো আন্দাজ করেছিল, এলিজাবেথ তাদের প্রথম সন্তানকে রাখতে বদ্ধপরিকর। এমনকী, তার জন্য সে হয়তো কেনেথকে ডিভোর্স দিতেও প্রস্তুত। তাহলে কেনেথকে মহা ফাঁপরে পড়তে হবে। এলিজাবেথ গর্ভাবস্থায় খোরপোশ চেয়ে বসলে, কেনেথকে পথে বসতে হবে। তাই, গর্ভস্থ সন্তান-সহ এলিজাবেথকে খতম করে দেওয়াই একমাত্র রাস্তা। সেদিন দুপুরে, কেনেথ হয়তো কোনও ভিটামিন বা প্রেগন্যান্সি হরমোন ইনজেকশনের নাম করে এলিজাবেথকে ইনসুলিনের ওভারডোজের ইনজেকশন দিয়েছিল।
আর, তারপর মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিন, এলিজাবেথের রক্তে শর্করার অবনমন ঘটায় বিপদজনকভাবে। এলিজাবেথের মস্তিষ্ক রক্তে পর্যাপ্ত গ্লুকোজের অভাবে ক্রমে অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। তাই এলিজাবেথ বাথটবে স্নান করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে কোমায় চলে যায় এবং তারপর বাথটবের জলে ডুবে মৃত্যু।
কিংবা আরও একটি ভয়ানক সম্ভাবনার ব্যাপারে আমরা আন্দাজ করতে পারি— এলিজাবেথ হয়তো জ্ঞান হারিয়েছিল বেডরুমেই। এলিজাবেথ যদি বিছানাতেই মরে যেত, তাহলে প্ৰথমেই কেনেথের উপর সন্দেহ পড়ত। তাই এলিজাবেথের মৃত্যুটাকে দুর্ঘটনা বলে দেখানোর জন্য, কেনেথ অজ্ঞান এলিজাবেথকে বাথরুমে নিয়ে বাথটবে কাত করে শুইয়ে দেয়, তারপর বাথটবের কল খুলে দেয়। অচেতন এলিজাবেথ ক্রমে ডুবে যায় বাথটবের জলে। তারপর ঘণ্টা দু’য়েক বাদে, বাথটবের কর্ক খুলে দিয়ে, হন্তদন্ত হয়ে প্রতিবেশীদের ডাকতে যায়।
আদালতে কেনেথ বারবার নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি জানালেও, বিচারকরা তদন্তকারী ও ডাঃ প্রাইসের রিপোর্টে সন্তুষ্ট হন। তাঁদের প্রদত্ত রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই কেনেথের যাবজ্জীবনের সাজা হয়। কেনেথের এই কর্মকাণ্ড এ-দুনিয়ার অপরাধের ইতিহাসে, ইনসুলিন দিয়ে হত্যার প্রথম ‘নথিভুক্ত’ কেস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকল। ইনসুলিন দিয়ে হত্যার ঘটনা এরপরেও অনেক ঘটেছে সারা দুনিয়ায়। এমনকী এ-দেশেও ২০১৩ ও ২০১৮ সালের লখনঔ, মুম্বই ও বেঙ্গালুরুর তিনটে ঘটনা বেশ শোরগোল ফেলেছিল। তিনটি ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা ছিলেন ডাক্তার। ইদানীংকালে একটা বেসরকারি সমীক্ষা বলছে, এখনও পর্যন্ত ১৭টিরও বেশি ইনসুলিন-মার্ডার ঘটেছে এ-দেশে। অপরাধতত্ত্বে একটা কথা আছে, ‘কপি-ক্যাট কিলার’। ইনসুলিন দিয়ে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কেও এ-কথা বলা যায় কি? কে জানে, এক বিংশ শতকের এই সব ইনসুলিন হত্যাকারীরা কেনেথের কর্মকাণ্ড থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছে কি না!


