কুমোরটুলি বিপন্ন?
কুমোরটুলিতে একটু-একটু করে কাটছে মাটি-সংকট। রাজ্যে পরিবর্তন ঘটার পর থেকেই কুমোরটুলিতে শুরু হয়েছিল এই অভূতপূর্ব সমস্যাটি। আগের সরকারের বিরুদ্ধে কয়লা-বালি-মাটি ইত্যাদি পাচারের এত অভিযোগ জমে ছিল, যে, পালাবদলের পরে-পরেই পুলিশ প্রশাসন অতি-তৎপর হয়ে আটকে দিচ্ছিল যাবতীয় মাটির লরি। ফলে, মাটি এসে পৌঁছচ্ছিল না কুমোরটুলিতে। বায়না নেওয়াও বন্ধ রেখেছিলেন কারিগররা। কারণ, বায়না নিলেই সময়ে মূর্তি গড়ার তাগিদ থাকবে। এদিকে মাটির এই অভাবনীয় সংকটে প্রতিমা গড়া চলবে কী করে? শিল্পীরা ক্রমে অসহায় হয়ে পড়ছিলেন। ভূমি ও ভূমিসংস্কার দফতর থেকে প্রশাসন, সর্বত্রই আর্জি জানাচ্ছিলেন তাঁরা। আপাতত সংশ্লিষ্ট বিধানসভা শ্যামপুকুরের নবনির্বাচিত বিধায়ক ও একজন পূর্ণমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। আশ্বাস মিলেছে। যদিও সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত কুমোরটুলি প্রায় ফাঁকাই। ধীরে-ধীরে, প্রায় হপ্তাদুয়েক পর, হয়তো শুরু হবে মূর্তি গড়া।
আরও পড়ুন: ‘এআই’ কি ক্রমশ জল সংকটের কারণ হয়ে উঠছে?
‘চোখ-কান খোলা’, পর্ব ৩১…
হুতোমের নকশায় একটি অপূর্ব মজার কিস্সা পাওয়া যায়, প্রতিমা আনতে গিয়ে সিংহ-র পা ভেঙে যাওয়ায়, বারোইয়ারি পুজোর উদ্যোক্তারা এক সিংহমশায়কে গিয়ে ধরেন; বলেন, মা তাঁদের স্বপ্ন দিয়েছেন, সিংহ জোগাড় হলে তবেই তিনি আসবেন। অতএব সিংহমশায়ই এখন ভরসা। ব্যাপারটা আদতে ছিল চাঁদা তোলার ফিকিরমাত্র। সিংহমশায়ও সন্তুষ্ট হয়ে চাঁদা দিয়ে দেন। কিন্তু এই গল্পের নিছক রসিকতার ছাঁচটুকু বাদ দিলেও, প্রতিমা ঠিক সময়ে না-পাওয়া, বা প্রতিমা গড়া সময়মতো শেষ না-হওয়া নিয়ে সংকট কিন্তু চিরন্তন। কুমোরটুলির এই সাম্প্রতিক মেঘাচ্ছন্নতা তাই চিন্তার ভাঁজ বাড়াচ্ছেই।
অধ্যাপক ও চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় একবার এক গল্প বলেছিলেন একটি আলোচনাচক্রে। একুশ শতকের শুরুর দিকের কোনও একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গিয়েছিল ইরানের পরিচালকর জাফর পানাহি-র। কলকাতায় তথাকথিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে যা যা পরিচিত, তার বাইরে অন্যরকমের কোনও একটি জায়গা দেখতে চাইছিলেন তিনি। সঞ্জয় তাঁকে প্রস্তাব দেন কুমোরটুলি সফরের; এবং তাঁর সঙ্গেই পানাহি যান কুমোরটুলি অঞ্চলে। ঘুরে দেখেন, মুগ্ধ হন।

কুমোরটুলি কেবলই বিদেশি অতিথি বা পর্যটকদের কাছেই বিস্ময় নয়, কুমোরটুলি কলকাতাবাসীর কাছেও একরকমের সময়-সফর। চিৎপুর রোড বা রবীন্দ্র সরণি ধরে সোজা নিমতলার দিকে হেঁটে যাওয়ার রাস্তায় একটি ডানদিকের বাঁক খুলে দেয় এমন এক দুনিয়ার দরজা, যেখানে কেবলই প্রতিমা তৈরি হচ্ছে না, কোথাও বিবেকানন্দ বসে আছেন, কোথাও আবক্ষ রবীন্দ্রনাথ নজর রাখছেন পথচারীদের ওপর। কোথাও ধুলো খাচ্ছে পুরনো, পরিত্যক্ত কালীমূর্তি; কোথাও-বা সুভাষ বসু স্বমহিমায় উজ্জ্বল। কোথাও ডাইনোসর, কোথাও-বা নন্দী-ভৃঙ্গী। কুমোরটুলি— মূর্তি গড়ার পাড়া, ভাঙার নয়। সার-সার স্টুডিয়ো জুড়ে বাংলার এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পের আঁতুড়।
কিন্তু কুমোরটুলির মূল আকর্ষণ তৈরিই হয় বছরের মাঝামাঝি, যখন বায়না নেওয়া হয়ে যায়, শুরু হয় দুর্গাপ্রতিমা গড়ার তুমুল ব্যস্ততা। সপরিবার দুর্গার কাঠামোতে আস্তে-আস্তে মাটি লেপা শুরু হয়। জুন-জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন-চার মাস প্রতিমা গড়া দেখতে যাওয়ার হিড়িক আগেও ছিল, কিন্তু বিগত কয়েক বছর ভিড় বেড়েছে ফোটোগ্রাফারদের। সেই ভিড় সামলাতে না পেরে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী সমিতি দশ টাকার টিকিটেরও ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন মাঝে। কিন্তু এই ভিড়ের মূল উদ্দেশ্য যা, দুর্গাপ্রতিমা গড়ার শিল্পটির সাক্ষী থাকা, তাও তো একরকমের উৎসবই বটে। কুমোরটুলির পরিচিতি জড়িয়েই রয়েছে বছরের এই সময়টির সঙ্গে। ফলে, মাটির এই সংকট নিয়ে চিন্তা সব মহলেই।
গুন্টার গ্রাসের কলকাতা সফরের অন্যতম স্মারক ‘শো ইওর টাং’-এর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই কুমোরটুলি-ই। কুমোরটুলিতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন গুন্টার গ্রাস। এই আশ্চর্য ঐতিহ্যটার সঙ্গে কলকাতা ও বাংলার যোগাযোগের সূত্র ধরেই বলা যায়, পুজোর প্রস্তুতির আঁচ, ‘পুজো আসছে’— বাঙালির এই সনাতন আনন্দের বোধের স্বার্থে কুমোরটুলির সংকটের আশু সমাধান প্রয়োজন। আশা করা যায়, সুরাহা হবেই।



