১৯৮৬ সাল। হংকং। আমরা চারজন সেখানে গেছি ‘স্ট্যান্ডার্ড চ্যার্টার্ড কমনওয়েলথ ফোটোগ্রাফি কনটেস্ট’-এর বিচারক হিসেবে। আমি ছাড়াও সেই বিচারকের তালিকায় রয়েছেন, মালয়েশিয়া থেকে এরিক পেরিজ, সিঙ্গাপুর থেকে উই বাং হুয়াত এবং ভারত থেকে রঘু রাই। তখন ও কিংবদন্তি আলোকচিত্রী, ভারতের বিখ্যাত আলোকচিত্রী। আমি তখন তুলনামূলকভাবে নতুন, তেমন কোনও পরিচিতি নেই আমার। আমি এত নবীন আলোকচিত্রী হওয়া সত্ত্বেও রঘুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কোনও দূরত্বই আমি বোধ করিনি। একজন বড় আলোকচিত্রীর সঙ্গে নতুন একজন আলোকচিত্রীর যেমন সম্পর্ক হতে পারে, আমাদের ঠিক তার বিপ্রতীপ সম্পর্ক তৈরি হল। যে হোটেলে আমরা আছি, সেখানে আছেন মেরি এলেন মার্ক। রঘু আছেন শুনে, তিনি দেখা করতে এসেছেন। বিস্মিত হয়েছি। বয়সে, অভিজ্ঞতায় আমি এত ছোট, রঘুর বিচরণ এত বিখ্যাত সব মানুষের সঙ্গে, অথচ আমার সঙ্গে বন্ধুত্বেও কোনও খাদ নেই।
সেই থেকে চল্লিশ বছর যাবৎ আমার সঙ্গে রঘুর পরিচয়।
আমার মনে আছে, হংকংয়ে আমাদের কাজ হয়ে গেলে আমরা দু’জনে মিলে ঠিক করি চিনের গুয়াংঝাও-তে যাব ছবি তুলতে। আমি তার আগে কখনও চিন যাইনি। গুয়াংঝাও তখন একটা ছোট্ট, ঘুমন্ত শহর। আমরা ট্রেনে করে সেখানে যাই। সেখানে সারাদিন ঘুরে-ঘুরে নানা ধরনের ছবি তুলি। সেই অভিজ্ঞতা তো কোনওদিনই ভোলার নয়। ফিরে আসার পর, আমার তোলা সেইসব ছবি নিয়ে নিকন গ্যালারি-তে একটি প্রদর্শনী হল। আমার সঙ্গে তাই নিয়ে ঠাট্টা করতেন, বলতেন, ওই একদিনের কাজ নিয়ে তুমি প্রদর্শনী করলে, আমার ছবিগুলো তো পড়েই রইল দিল্লির আলমারিতে!
আরও পড়ুন : প্রথম ভোট দিতে গিয়ে মনে হয়েছিল, বড় হয়ে গেলাম! লিখছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়…

তারপর আমার ‘পাঠশালা’-য় এসেছেন, আমার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বেঙ্গল গ্যালারি-তে একটা প্রদর্শনী হয়, সেখানে আসেন। ছবিমেলায় আসেন। প্রথম ছবিমেলা যখন শুরু করি আমরা, তখন আমরা রঘুর কাছে অনুরোধ জানাই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওঁর অসামান্য কাজকর্ম যদি আমরা এখানে দেখাতে পারি। রঘু নিজে প্রিন্ট করে আমাদের ছবি দেন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রদর্শনী। পরে আমরা ‘বার্থটাইমস অফ আ নেশন’ নামে একটি বই করি। তার অনেকটা অংশ জুড়ে থাকেন রঘু। তাছাড়াও ওয়ার্ল্ড প্রেসের মাস্টারক্লাসে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি, আমি অনুজ হয়েও চেয়ার করেছি সেখানে, তাই নিয়ে কোনও সমস্যা তো হয়ইনি, বরং একযোগে, আনন্দে কাজ করেছি।
এছাড়াও আমি ভারতে গেলে দিল্লির আইসিসি বা ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে আমাদের দেখা হত। সেখানে রঘু, আমি, পাবলো বার্থেলোমিউ, দয়ানীতা সিং, প্রসাদ পাঞ্জিয়ার, সতীশ শর্মা প্রমুখ জড়ো হতাম। ভারতীয় আলোকচিত্রের উন্নতি কীভাবে হতে পারে, তাই নিয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা করতাম। সবসময়ই আলোকচিত্রের জগতে আরও নতুন কী ঘটানো যায়, তাই নিয়ে আমাদের তুমুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। নিয়মিত যোগাযোগ ছিল সেজন্য।
একদিন আমি ক্লাস নিচ্ছি ‘পাঠশালা’-য়। হঠাৎ ও আমাকে ফোন করল। আমি ক্লাসের সময় ফোন সাধারণত ধরি না। রঘু রাই ফোন করছেন, তাই আমি ছাত্রছাত্রীদের অনুমতি নিয়েই ফোনটা ধরলাম। ফোন ধরেই রঘু বললেন, ‘মিল গয়া!’
কী ‘মিল গয়া’? একাত্তরের বহু ছবির নেগেটিভ রঘু খুঁজে পেয়েছেন। পঁয়ত্রিশ বছর পর। অপূর্ব সেসব ছবি। জরুরিও। সেই ছবি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রকাশনায় একটি বই বেরয়, ‘দ্য প্রাইস অফ ফ্রিডম’ নামে।

এইসব যোগাযোগের বাইরেও আমাকে যা মোহিত করত, বিস্মিত করত, তা হল সাদা-কালো থেকে রঙিনে ওর সহজ বিচরণ। এটা খুব কম আলোকচিত্রীর ক্ষেত্রেই দেখেছি। বয়সের জন্য একজায়গায় আটকে থাকব, এটা ওর মধ্যে কোনওদিন ছিল না। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বরণ করতে দেরি করেনি রঘু।
আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তর্ক হত। আমাকে বলত, ‘এত রাজনৈতিক কাজ কোরো না। ঝামেলায় পড়ে যাবে। আলোকচিত্র নিয়ে থাকো!’ কিন্তু মজার বিষয়, রঘু তার কাজে অন্তঃসলিলা রেখেছিল রাজনীতিকে। ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার যে ছবি, যেখানে পিছন থেকে দেখা যায় ইন্দিরা গান্ধীকে, সেই ছবিতে সত্যি সত্যিই শক্তি কার কাছে, এটা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এইভাবে শিল্পের সঙ্গে আপস না করেই নিজের কাজের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে ছুঁয়ে যেতেন রঘু।

আমি একটি অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ইবনে বতুতাকে নিয়ে কাজ করছিলাম। তখন রঘুর বাসা মেহরোলির কাছে। ওই এলাকাই ছিল ইবনে বতুতার বিচরণক্ষেত্র। তখন ওর বাড়িকে ভিত্তি করেই আমি কাজ করেছিলাম।
রঘুকে যখন নিয়ে এসেছি, তখন সস্তার হোটেলে রেখেছি, ইকোনমি ক্লাসে নিয়ে এসেছি। একটিবারের জন্যও রঘু কিন্তু কোনও অভিযোগ জানায়নি। পাঠশালা-র ছাত্রছাত্রীদের জন্য যখনতখন বই পাঠিয়েছে, সময় দিয়েছে তাদের, আন্তরিকতা এতটাই ছিল রঘু-র। আমার বহু ছাত্রছাত্রী রঘুকে অনুসরণ করেই ছবির জগতে এসেছে।

কাজ নিয়ে কত তর্কবিতর্ক হয়েছে! তারপর ছবির টানে ফিরে এসেছি। ওর সংগীতের সংগ্রহ ভাগ করে নিয়েছে আমার সঙ্গে। জাকির হুসেনের তবলা শোনাতে নিয়ে গিয়েছে। আর্কিটেক্টদের লেখাপত্র পড়িয়েছে। ছবির জগতের বাইরেও বিবিধ ক্ষেত্রে ওর বিচরণ ছিল, যা সত্যিই শেখার মতো। ওর এক গুরুজির কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। ও যেখান থেকে রসদ পেয়েছে, সেখান থেকে আমরাও যাতে রসদ পাই, সেই চেষ্টা সবসময় করেছে। কোনও অহং কখনও দেখিনি।
আফসোস হয়, আমি আর ভারতের ভিসা পাই না বলে শেষবেলায় ওর সঙ্গে দেখা করা হল না। ওর পরিবারের প্রতি সমবেদনা রইল।



