চোখ-কান খোলা : পর্ব ৩৪

ডিমন্যাস্টিক-চর্চা

গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বাড়ছে, মানুষ চাইছে হিমযুগ। কিন্তু বঙ্গ-রাজনীতিতে পালাবদলের পর যে-উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এ-রাজ্যে, শুরু হয়েছে ডিমযুগ। একের পর এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গ্রেফতার হচ্ছেন কি থানায় হাজিরা দিচ্ছেন, জনতা জড়ো হচ্ছে ডিম নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ সেই কবে লিখেছিলেন, ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে/ডিম্‌-ডিম্‌ রবে/সাঁওতাল-পল্লীতে/উৎসব হবে।’ উৎসব আবারও শুরু হয়েছে, তবে তা ক্ষোভ উগরে দেওয়ার উৎসব। যে-দুর্নীতির প্রতিবাদ মানুষ এতকাল করতে পারেননি, মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে— তাঁরাই আজ পথে বিদ্রোহী। পুলিশের মতো ডান্ডা মারার এক্তিয়ার তাঁদের নেই যেহেতু, তাই তাঁরা বেছে নিয়েছেন আন্ডা। শহরের নানা প্রান্তের জমায়েত থেকে নানাবিধ কৌশলে তাঁরা ডিমন্যাস্টিকের খেলা দেখিয়ে চলেছেন।

সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন উঠে আসছে এমনই সব খবর— ডিম-হামলা ঠেকাতেকোনও নেতা হেলমেট পরছেন, কেউ আবার বাধ্য হচ্ছেন চোরাপথে পালিয়ে যেতে কিংবা লুকিয়ে থাকতে। যে-নেতার ওপর ডিম বর্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে অবশ্য মুষড়ে পড়ছেন বিক্ষোভকারীদের অনেকে। আক্ষেপের সুরে কেউ-কেউ বলছেন, ‘এত কষ্ট করে ডিমগুলো নিয়ে এলাম, কোনও সুযোগই পেলাম না!’ অর্থাৎ, বহু মানুষের এখন মূল দাবি একটাই— যাদের ওপর রাগ, তাদের ওপর একটু ডিম ছুড়তে দেওয়ার ব্যবস্থা অন্তত করা হোক। যাঁরা সে-সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁরা অবশ্য বেশ তৃপ্ত। কম টাকার বিনিময়ে, হইহই করে এত অপমান যে ফিরিয়ে দেওয়া যায় কাউকে— তা যেন তাঁদের কল্পনাতেই কোনওদিন ছিল না! দোলের সময়ে রংভরা বেলুন যেমন আচমকা পথচারীকে বিব্রত করে দিয়ে হাস্যকর করে তোলে মুহূর্তে— আর দূরে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয় ছেলের দল— বর্তমান পরিস্থিতি খানিকটা সেরকমই।

এবার পুজোয় ঠাকুর তৈরি হবে না কুমোরটুলিতে?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৩…

ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ করা, যা ‘এগিং’ নামে পরিচিত, তার ইতিহাস সুদীর্ঘ। শোনা যায়, প্রাচীন রোম এর আঁতুড়। সেখানে রাজপরিবারের সদস্য থেকে থিয়েটারের অভিনেতা— পচা ডিমের হাত থেকে নিস্তার মেলেনি কারুরই। পরবর্তীতে এই ধারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ডিম ছোড়ার উদ্দেশ্য ঠিক কী?

পচা ডিম বিক্রির হার যেরকম ঊর্ধ্বমুখী, তেমনই নাগাড়ে বিক্রি বেড়েছে এমনি ডিমেরও। দিন কয়েক আগে এক ব্যক্তির বক্তব্য ছিল, ‘আমরা জানি, ডিম ছুড়ে মারলে লাগে না। আমরা তাই, খারাপ ব্যক্তির জন্য ভাল ডিম নিয়ে এসেছি। এটা উপহার।’ প্রশ্ন হল, উপহার দেওয়ার তরিকা যদি এ-ই হয়, তাহলে তা ‘খারাপ ব্যক্তি’র জন্য কেন? যে-রাজ্যে এক সময়ে স্বল্পমূল্যে ডিম-ভাত খাওয়ার জন্য লাইন পড়ে যেত, সেখানে প্রতিবাদী হাতিয়ার হিসেবে ভুরি-ভুরি ডিম নষ্ট করা কি অপচয় নয়? যে-সমস্ত নাগরিক, ওই ডিমটুকুও কিনতেও অসমর্থ, তাঁরা এই প্রতিবাদকে কী চোখে দেখবেন? যে-কোনও অপচয়ের বিরুদ্ধে আমরা যেমন সরব হই, এক্ষেত্রেও কি আমাদের ভূমিকা তেমন থাকবে না? না কি, অন্যের বিব্রত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা সেই পৈশাচিক আমোদেই উল্লসিত হতে থাকব?

ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ করা, যা ‘এগিং’ নামে পরিচিত, তার ইতিহাস সুদীর্ঘ। শোনা যায়, প্রাচীন রোম এর আঁতুড়। সেখানে রাজপরিবারের সদস্য থেকে থিয়েটারের অভিনেতা— পচা ডিমের হাত থেকে নিস্তার মেলেনি কারুরই। পরবর্তীতে এই ধারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ডিম ছোড়ার উদ্দেশ্য ঠিক কী? দুর্গন্ধযুক্ত দ্রব্য, পচনশীল পদার্থ— সেসব আমরা যে-চোখে দেখি, অর্থাৎ ঘেন্নামিশ্রিত এক অনুভূতি নিয়ে, সামাজিকভাবে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই অন্যের প্রতি নিক্ষেপ করা; সপাটে জানান দেওয়া, সেই ব্যক্তি আসলে সমাজে কতটা ঘৃণ্য। শারীরিকভাবে আঘাতের উদ্দেশ্য লঘু হয়ে গিয়ে, এখানে প্রধান হয়ে দাঁড়ায় কাউকে জনসমক্ষে হেয় করার বাসনা।

প্রতীকী প্রতিবাদে অবমাননা প্রদর্শন করার যে-পথ, তা অবশ্যই সমর্থনযোগ্য; কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মারমুখী জনতা যখন এই ইচ্ছা পোষণ করেন, ‘ওকে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক’— তখন বুঝতে হবে, প্রতিবাদ হিংস্রতার পর্যায়ে চলে যেতে চাইছে, এবং তা সবসময়েই নিন্দনীয় অপরাধ। নিজের হাতে আইন তুলে নিতে চাওয়ার অর্থ হল, চূড়ান্ত হতাশাকে ক্ষমাহীন এক নৃশংসতার উদ্‌যাপনে ঢেকে রাখা। আজ যে-জনতা ডিম ছোড়ায় সীমাবদ্ধ, হতাশা বৃদ্ধি পেলে কাল তারাই বোম ছুড়বে না, কে বলতে পারে! এবং আরও যা ভাববার, সস্তায় সহজলভ্য বলেই পেটি-পেটি ডিম নষ্ট করা কি আদৌ একজন সচেতন নাগরিকের কাজ? একদলের সামর্থ্য আছে বলে তারা গোটা ডিম কিনে নষ্ট করবে এবং আরেকদলের সামর্থ্য নেই বলে তারা একটা ডিম কিনে খেতেও পারবে না— এই ব্যবস্থাকে যদি মান্যতা দিতে হয়, তাহলে এও আমাদের মাথায় রাখা দরকার— কেউ উপহার হিসেবে কাউকে ৪৫০ কোটি মূল্যের হার উপহার দিলেও, আমরা সেদিন ‘অপচয়’-‘অপচয়’ বলে চিৎকার করব না…