বিষ-রূপ দর্শন পর্ব: ৪

Representative Image

বিষের রাজা, রাজার বিষ

একটু ভেবে দেখলে আশ্চর্য হবেন— আমাদের দেশে ইদানীং যত আসামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তারা সকলেই পুরুষ। বিগত কয়েক বছরের বিভিন্ন সংবাদপত্রের রিপোর্ট বলছে, এ-দেশে প্রায় ২৪ জন মৃত্যুদণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত মহিলা আছে। কিন্তু তাদের কারও মৃত্যুদণ্ড এখনও কার্যকর হয়নি। হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও অনেক অনিশ্চয়তা।

স্বাধীনতার পর এদেশে প্রথম এবং একমাত্র মহিলার ফাঁসি হয়েছিল, ১৯৫৫-র জানুয়ারি নাগাদ। নাম তার রতন বাঈ জৈন। রতন বাঈয়ের পর এদেশে এখনও পর্যন্ত আর কোনও মহিলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। রতন বাঈ ছিল অবস্থাপন্ন ঘরের মহিলা। বছর ৩৫-এর রতন বাঈ আর তাঁর স্বামী— দু’জনে মিলে দিল্লিতে একটা ইনফার্টিলিটি ক্লিনিক চালাতেন। সেই ইনফার্টিলিটি ক্লিনিকেই কর্মরত, তিন তরুণীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর কোনও অবৈধ সম্পর্ক আছে— এমন এক সন্দেহ, রতন বাঈকে ক্রমে দিশেহারা করে তোলে এবং শেষমেষ এক জিঘাংসার জন্ম দেয়। রতন বাঈ, বিষ মেশানো সন্দেশ খাইয়ে এই তিন তরুণীকে একে-একে হত্যা করেন।

ভাবলে আশ্চর্য লাগে, বিষ প্রয়োগে খুনের মোটিভ খুঁজলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উঠে আসবে পরকীয়া প্রেম কিংবা একপাক্ষিক প্রেম উদ্ভূত অপ্রাপ্তি। কিন্তু রতন বাঈ এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, নিজের ভালবাসার প্রতি অসম্ভব এক পজেসিভনেস থেকে! তাকে আগলে বাঁচিয়ে রাখতে! তাই অন্যান্য মার্ডার কেসের থেকে, এই ঘটনা কিছুটা ব্যতিক্রমী তো বটেই! রতন বাঈ, ওই তিন তরুণীকে নিকেশ করতে আর্সেনিক ব্যবহার করেছিলেন। স্বাধীন দেশের প্রথম মৃত্যুদণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত নারীর সঙ্গে জুড়ে গেল, আর্সেনিকের নাম, আমাদের চিরপরিচিত সেঁকো বিষ।

ইনসুলিন হয়ে উঠল খুনের হাতিয়ার? যে-হত্যাকাণ্ডে কেঁপে উঠেছিল বিশ্ব! পড়ুন: বিষ-রূপ দর্শন পর্ব ৩…

বিষ প্রয়োগে খুনের সংখ্যা এমনিতেই সবকালেই কম। আর এখন তো, ফরেনসিক বিজ্ঞানের উন্নতি, মার্কামারা বিষগুলোর নিয়ন্ত্রিত বণ্টন, প্রশাসনিক নজরদারি এসবের জন্য বিষ-প্রয়োগে খুনের সংখ্যা আরও কমে গেছে সারা দুনিয়া জুড়েই। তবুও গত বিংশ শতকের মধ্যভাগের আগে পর্যন্ত সময়কাল— বিষ-প্রয়োগে খুনের এক স্বর্ণযুগ ছিল, এটা বললে অত্যুক্তি হবে না।কিন্তু একজন খুনি, কোন বিষ ব্যবহার করতে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ? বিষের ‘বিষাক্ততা’র রসায়ন নিয়ে চর্চা খুনি করে না। বরং যে-বিষ তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদে রেখে, তার পরিকল্পনাকে অতি সহজেই বাস্তবায়িত করবে, তেমন বিষকেই সে অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়।

পটাশিয়াম সায়ানাইড দুর্দান্ত বিষ, কিন্তু সহজলভ্য নয়, প্রাপ্তিস্থানও খুব সীমিত। তাই এমন বিষ, অপরাধ-সংঘটনে ব্যবহার করলে, অপরাধী চিহ্নিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। স্ট্রিকনিন, অ্যাট্রোপিন এরাও  উত্তম বিষ। হতেও পারত খুনিদের তুরুপের তাস। কিন্তু বাধ সাধল স্বাদ। এরা অসম্ভব তেতো। খাদ্য বা পানীয়ে মেশালে, ভিক্টিম সতর্ক হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। সুতরাং, স্ট্রিকনিন বা পটাশিয়াম সায়ানাইড ডাকসাইটে বিষ হলেও, সর্বজনীন বিষ হয়ে উঠতে পারেনি।

রতনবাঈ জৈনের মৃত্যুদণ্ডর সংবাদ, ‘যুগান্তর পত্রিকা

সুতরাং আততায়ীর প্রয়োজন এমন কোনও বিষ, যা সহজলভ্য, ভিক্টিমকে কোনওভাবেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয় না, অথচ আততায়ীর অভীষ্ট-পূরণেও সমর্থ। তাই, চিরকালীন অপরাধজগতে জনপ্রিয়তার নিরিখে যে-বিষটি অন্য সব্বাইকে মাত করেছিল, তা হল আর্সেনিক।

মৌল আর্সেনিক ধাতুকল্প। না ঘরকা, না ঘাটকা— ধাতু এবং অধাতু উভয়েরই বৈশিষ্ট্য বর্তমান। ধূসররঙা বিশুদ্ধ আর্সেনিক মৌল, তেমন বিষাক্ত নয়। কিন্তু, এর অক্সাইডগুলোরই বিষ হিসেবে যত বদনাম। বিশেষ করে ট্রাই-অক্সাইডের। দুনিয়া জুড়ে এটিই বহুলব্যবহৃত এবং সহজলভ্য। সাধারণভাবে ‘আর্সেনিক’ বলতেও এই আর্সেনিক ট্রাই-অক্সাইডকেই বোঝায়।

বিষ হিসেবে আর্সেনিকের ব্যবহার স্মরণাতীত কাল থেকে। জনশ্রুতি আছে, ক্লিওপেট্রা যখন হন্যে হয়ে যন্ত্রণাহীন আত্মহননের বিবিধ উপায় খুঁজছেন, তিনি নাকি একবার চেখে দেখেছিলেন আর্সেনিক। যদিও তা তাঁর মনঃপূত হয়নি। রেনেসাঁ যুগে ইউরোপিয় অভিজাত ও রাজপরিবারগুলোতে, সিংহাসন দখলের লোভ, ইউরোপে, বিশেষ করে ইতালিতে সেঁকোর ব্যবহারকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিল। আর্সেনিক ‘কিং-মেকার’, ফরাসি ভাষায়— ‘poudre de Succession’ অর্থাৎ, উত্তরাধিকারের ‘কায়েম চূর্ণ’।

প্রায় একই সময়ে শোনা যায় ইতালিয় প্রেম-রসিকা টোফানার কথা। দাম্পত্যে অসুখী নারীদের কাছে টোফানা ফেরি করতেন তাঁর নিজের তৈরি ‘ইশক-শরাবি’ অ্যাকোয়া টোফানি— যার এক দাগে রতিরসের উচ্ছ্বাস, তিনদাগে অন্তর্জলি যাত্রা। মনে করা হয়, টোফানার এই ‘ইশক-শরাবি’-র অন্যতম উপাদান ছিল আর্সেনিক। লোকশ্রুতি আছে, টোফানার এই প্রেমৌষধি নাকি সে-কালের ইতালিতে প্রায় ছ-শো বিবাহিত পুরুষের মৃত্যুর কারণ। 

একটা সময় পর্যন্ত, আর্সেনিক ছিল মূলত ইউরোপিয় অভিজাত আর রাজারাজড়ার বিষ। তা সর্বসাধারণের হয়ে উঠল শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে। বড় শিল্পের জন্য লোহা ও সিসার মতো ধাতুর প্রয়োজন। অশুদ্ধ আকরিক থেকে বিশুদ্ধ ধাতুর নিষ্কাশনের সময়ে উপজাত দ্রব্য হিসেবে বেরিয়ে এল আর্সেনিকের ট্রাই-অক্সাইড। উপরি মুনাফার জন্য, তাকে করা হল বাজারজাত। আর ঔপনিবেশিক শাসনের কাঁধে চড়ে, বিপুল পরিমাণ আর্সেনিক বিলেত থেকে পাড়ি জমাল এদেশে। ইংল্যান্ড, জার্মানি থেকে সমুদ্র উজিয়ে তার প্রাচ্য যাত্রা। এদেশে আর্সেনিকের আটপৌরে পরিচিতি— শঙ্খ বিষ বা সেঁকো। ‘Mouse’ কিংবা ‘spouse’, অবাঞ্ছিত উপদ্রব দূরীকরণে তার জুড়ি নেই। শিল্পায়নের পাল্লায় আর্সেনিকের মানহানি ঘটল। যে-বিষে ঘায়েল হত রাজা-উজির, তাতেই মরে ইঁদুর।

এদেশে আমদানিকৃত আর্সেনিকের বেশিরভাগটাই ব্যবহৃত হত, চামড়া-ট্যানিং-সহ নানান শিল্পদ্যোগে। আর্সেনিক সে-কালে মিলত খোলা বাজারে, এমনকী মুদিখানার দোকানেও। এই সেঁকো অর্থাৎ আর্সেনিকের সাদা গুঁড়ো বা আর্সেনিকের ট্রাই-অক্সাইড একেবারেই স্বাদ-গন্ধহীন। গায়ে মাখার পাউডার কিংবা ময়দার মতো সাদা।

সাধারণ তাপমাত্রার জলে খুব একটা না গুললেও, ফুটন্ত জলে অনেকটা পরিমাণ দিব্যি গুলে যায়। তাই, চা বানানোর সময়ে, মাছ-মাংসর ঝোল রান্নার সময়ে, স্যুপ রান্নার সময়ে, কিংবা, দুধ গরম করার সময়ে সেঁকো মেশালে তা দিব্যি গুলে যায়। দিশি কিংবা বিলেতি যে-কোনও রন্ধনপ্রণালীতেই সেঁকো মেশানো যেতে পারে। আর্সেনিকের সঙ্গে যেন গৃহস্থ গৃহিণীর এক সখীত্ব আছে।

ক্রাইম সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তুল‍্যমূল্য বিচারে দেখা যাবে— এ-দুনিয়ার বেশিরভাগ অপরাধ ঘটিয়েছে পুরুষরা। সেক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় নগণ্য। কিন্তু, নারী যখন হয়েছে হত্যাকারী, তখন সে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রক্তাক্ত হত্যার তুলনায় রক্তপাতহীন উপায়কেই জিঘাংসা সিদ্ধির জন্য বেছে নিয়েছে। বিষই হয়ে উঠেছে তার হত্যার হাতিয়ার। আর বিষেদের মধ্যে আর্সেনিকই প্রতি যুগে তার পয়লা পছন্দ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরাই মূলত রসুই ঘরের দায়িত্ব সামলান। তাই, তাঁদের হাতেই আর্সেনিকের মারণখেলার প্রকৃত বাস্তবায়ন। অন্যান্য বিষের মতো আর্সেনিকের মারণ ডোজ প্রয়োগের জন্য, সেই বিষ সম্পর্কে জ্ঞান-অর্জনের প্রয়োজন নেই। আর্সেনিকের মারণডোজ কয়েকশো মিলিগ্রাম। এক খাবলা তুলে রান্নায় মিশিয়ে দিলে, তা হত্যার জন্য যথেষ্ট। তাই, আর্সেনিক গৃহস্থ গৃহিনীর বিষ। আর্সেনিকের মতো বিষ প্রয়োগে হত্যায় সাফল্য অর্জন করতে গেলে, আততায়ীকে ভিক্টিমের স্বভাব, তার দৈনন্দিন জীবনযাপন, পছন্দ-অপছন্দ, শরীর-স্বাস্থ্য, অসুখ-বিসুখ এমন নানান খুঁটিনাটি নখদর্পণে রাখতে হয়। সর্বোপরি দীর্ঘদিন ধরে ভিক্টিমের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হয়। সুতরাং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যিনি পরিবারের ঘরকন্যার দায়িত্ব সামলান, তার কাছেই বিষ প্রয়োগের অনায়াস ও সর্বোত্তম সুযোগও রয়েছে।

একটা সময় পর্যন্ত আর্সেনিক ছিল মূলত ইউরোপিয় অভিজাত আর রাজারাজড়ার বিষ। তা সর্বসাধারণের হয়ে উঠল শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে। বড় শিল্পের জন্য লোহা ও সিসার মতো ধাতুর প্রয়োজন। অশুদ্ধ আকরিক থেকে বিশুদ্ধ ধাতুর নিষ্কাশনের সময়ে উপজাত দ্রব্য হিসেবে বেরিয়ে এল আর্সেনিকের ট্রাই-অক্সাইড।

এ-প্রসঙ্গে ১৯১১ সালে এ-দেশের আগ্রার এডওয়ার্ড ফুল্যাম হত্যা উল্লেখ করা যেতে পারে। এডওয়ার্ডের স্ত্রী অগাস্টা, এডওয়ার্ডের চা, টিফিন, জুস, হেল্থড্রিঙ্কে অনায়াসে আর্সেনিক মিশিয়ে রাখত। অগাস্টার পক্ষে এ-কাজটা এত সহজ ছিল, কারণ— ঘরকন্যার খুঁটিনাটি ছিল তাঁর নখদর্পণে।  

সপ্তদশ শতকের ফ্রান্সের অভিজাত নারী মার্কুইস দ‍্য ব্রিনভিলার্স, অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ নারী মেরি ব্ল্যান্ডি, ঊনবিংশ শতকের ফ্রান্সের মেরি লাফার্জ (আগামী পর্বে আলোচ্য), হেলেন জেগেডো, ইংল্যান্ডের কুখ্যাত ম্যারি অ্যান কটন (জীবন বিমার টাকার লোভে তিন স্বামী ও এগারো সন্তানকে আর্সেনিক দিয়ে খুন), বছর কুড়ির স্কটিশ কন্যা মেডিলিন স্মিথ (ফরাসি প্রেমিকের কোকোতে আর্সেনিক মিশিয়ে হত্যা), আমেরিকার ফ্লোরেন্স মেব্রিক বিংশ শতকের মেরি বেসনার্ড, কিংবা হাঙ্গেরির সেই মহিলা দল, যারা নিজেদের বলতেন ‘এঞ্জেল মেকার্স’ (যারা আর্সেনিক দিয়ে শিশু-সহ প্রায় ৫০ জন পুরুষকে দীর্ঘ দশ বছর ধরে হত্যা করেছিলেন।) এদেশে, আগ্রার অগাস্টা ফুল্যাম, এ-প্রবন্ধের শুরুতেই উল্লেখিত রতনবাঈ জৈন, সাতের দশকে নির্মলা দেবী (স্বামী গিরিধারির চা ও পকোড়ায় আর্সেনিক মিশিয়ে খুন), ২০০৭-এ পুনের অদিতি শর্মা, ২০২২-এ মুম্বইয়ের কাজল শাহ কিংবা ২০২৬-এ মিরাটের অলকা— তালিকাটা দীর্ঘ। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও, সন্দেহের তির তাঁদের সারাজীবন পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এদের সকলের মধ্যে একটি ব্যাপার কমন— এরা প্রত্যেকেই ছিলেন সুগৃহিণী কিংবা গৃহকর্মে নিপুণা কন্যা।

এই তালিকার উপর ভিত্তি করে, যদি সাধারণভাবে আর্সেনিক প্রয়োগের হত্যার মোটিভ নির্ধারণের চেষ্টা করি, তাহলে দেখা যাবে, কিছুক্ষেত্রে দায়ী সম্পত্তি বা অর্থের লোভ, কিছু ক্ষেত্রে গার্হস্থ্য অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভের বাসনা, কিন্তু বহুক্ষেত্রে দায়ী— অসুখী দাম্পত্য, পরকীয়া প্রেমের কুসুমাস্তীর্ণ পথের কাঁটা দূরীকরণ । ‘love-lust-crime’-এর চিরকালের মধ্যমণি এই সেঁকো, রোম্যান্স আর রোমাঞ্চের মাঝে মৃত্যুর গাঁটছড়া।  অভিসারের মতো মৃত্যুও আসে অগোচরে।

সে-কালের মেডিক্যাল গেজেটগুলো ঘাঁটলে সেঁকোর মরণ-আলিঙ্গনের নানা রোম্যান্স কাহিনির খোঁজ মেলে। ১৮৭৩-এর ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট’ ঘাঁটতে গিয়ে, জনৈক ডাঃ জন্সনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা পেলাম। সেটাই সংক্ষেপে শোনাই। ডাঃ জন্সন অবিভক্ত পাঞ্জাবের কোনও এক সরকারি হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন। সেই হাসপাতালেরই হাবিলদার ছিল গুলাব। গুলাবের বছর ৪০ বয়স। ঘরে তরুণী ভার্যা। গুলাব, সৎ চরিত্রের ভোলাভালা, শান্তশিষ্ট, পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক। সহকর্মীরা ঠাট্টা করে বলে— জরু কা গোলাম। এক রাতে এই জরুর হাতে পাকানো রুটি-মাংস খেয়েই গুলাব ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ল। লক্ষণ উদরাময়ের। গুলাবকে তাঁর হাসপাতালেই ভর্তি করা হল। হাসপাতালের অভিজ্ঞ ডাক্তার, ডাঃ জন্সনের চিকিৎসায় গুলাব দিব্যি সুস্থ হয়ে কাজেও যোগ দিল। কিন্তু, দিন-দুইয়ের মধ্যেই ফের অসুস্থ। লক্ষণ সেই উদরাময়ের হলেও, এবার অবস্থা বেশ গুরুতর। গুলাবের দেখভালের জন্য, হাসপাতালের এক ছোকড়া অ্যাসিস্ট্যান্টকে বহাল রাখলেন ডাঃ জন্সন। নিজেও গুলাবের চিকিৎসার ত্রুটি রাখলেন না। কিন্তু গুলাবের অবস্থার বিশেষ কোনও উন্নতি নেই। ডাঃ জন্সন গুলাবের অসুখের কূল-কিনারা ঠাহর করতে পারেন না। তখন তো এ-দেশে কলেরা, আন্ত্রিকের মতো ছ্যাচড়া রোগের অভাব ছিল না, তাই গুলাবেরও হয়তো কোনও জটিল উদরঘটিত অসুখ হয়েছে ভেবেই, ডাঃ জন্সন চিকিৎসা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু বেচারি গুলাব দিন কয়েক ভুগে এক শীতের রাতে বেঘোরে মারা গেল। পরের দিন ডাঃ জন্সন গুলাবের দেহ তাঁর পরিবার হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করলেন। কিন্তু সে-দিনই ডাঃ জন্সনের কানে এল গুলাবের তরুণী স্ত্রী আর সেই ছোকড়া অ্যাসিস্ট্যান্টের মধ্যে বিশেষ ঘনিষ্ঠতার গুহ্য সংবাদ। এতক্ষণে ডাঃ জন্সনের টনক নড়ল। সম্ভাব্য ঘটনাটি উপলব্ধি করে শিউড়ে উঠলেন তিনি। ডাঃ জন্সন গুলাবের মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে ছাড়লেন না, তিনি পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করলেন। তাতেই চক্ষু চড়কগাছ! গুলাবের উদর অভ্যন্তরস্থ প্রত্যেকটি অঙ্গে সেঁকোর ক্ষত স্পষ্ট।

সে-কালের নিজামত আদালতের রিপোর্টেও এমন ঘটনা মিলবে ভূরি-ভূরি। গাঁয়ের জমিদার, গিন্নির সোমত্থ বিধবা সখীর প্রতি প্রেমান্ধে গিন্নির পানের চুনে মিশিয়ে রাখে সেঁকো, কিংবা কোনও বাবুর উপপত্নীটি কামোত্তেজক বটিকায় মিশিয়ে দেয় সেঁকোর গুঁড়ো। উপপত্নী বেচারি, ‘থোড়া মহব্বত’-এর লোভে বাবুকে সেঁকো দিয়েছিল। তার কোনও বদ উদ্দেশ্য ছিল না। মুখ্যু মেয়েমানুষ কি আর অত হিসেব-নিকেশ করে সেঁকো দিতে পারে! এইভাবেই কত কেস খারিজ হয়ে যায়!

আর্সেনিকের বিষক্রিয়া দু-ধরনের হয়, যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে অ্যাকিউট পয়জনিং। অর্থাৎ ভিক্টিমকে একেবারেই নিকেশ করার চেষ্টা। এক্ষেত্রে বিষের পরিমাণ মারণমাত্রার সমপরিমাণ কিংবা তারও বেশি।

আর্সেনিকজাত দ্রব্যের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলাফল

অ্যাকিউট পয়জনিংয়ের ক্ষেত্রে, ভিকটিমের শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার লক্ষণের সঙ্গে এশিয়াটিক কলেরা, আন্ত্রিক, সাধারণ ফুড পয়জনিং, মারাত্মক বদহজম এসবের প্রভেদ করা খুব শক্ত। এগুলোর প্রত্যেকের রোগলক্ষণ সেঁকোর বিষক্রিয়ার লক্ষণের সঙ্গে প্রায় এক। সে-কালের তাবড়-তাবড় ডাক্তার সেঁকোর বিষক্রিয়াকে উদরঘটিত রোগ ভেবে ভুল করেছেন। কিছুক্ষেত্রে পোস্টমর্টেমের পর সত্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। বহুক্ষেত্রে কোনওদিন সত্যটা জানাও যায়নি। সে-কালে এদেশে গ্রামের পর গ্রাম কলেরায় উজাড় হয়ে যেত। সবাই কি আর মরতেন কলেরায়! না কি, মহামারির আড়ালে সংঘটিত হত গুপ্তহত্যাও! তারপর মৃতদেহ সৎকার করে অস্থিভস্ম নদীতে ভাসালেই কেল্লাফতে। অপরাধের চিহ্নও পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল। অবশ্য মৃতদেহ গোর দেওয়াও হতে পারে অপরাধ লুকানোর উত্তম পন্থা। কারণ, গোর খুঁড়ে মৃতদেহ তোলা ধর্মীয় সংবেদনশীল হওয়ায়, সন্দেহ খুব গুরুতর না হলে, পুলিশ প্রশাসনও সাধারণত এসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার সঙ্গে অন্যান্য উদরঘটিত রোগের লক্ষণের পার্থক্য অবশ্যই আছে। কিন্তু, তা এতটাই সূক্ষ্ম এবং ব্যক্তিবিশেষে বিষক্রিয়াজনিত লক্ষণ উনিশ-বিশ হওয়ার দরুন, বহুক্ষেত্রেই সেই পার্থক্যগুলো ডাক্তারদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে, কলকাতার মেয়ো হাসপাতাল এমন একটি ঘটনার সাক্ষী আছে। প্রচণ্ড ভেদবমি, পেটের যন্ত্রণা আর বাহ‍্যত্যাগ-সহ এক রোগীকে ভরতি করা হয়। রোগীকে চারজন ডাক্তার দেখেছিলেন। এর মধ্যে তিনজনেরই ধারণা এটি উদরঘটিত সমস্যা। শুধুমাত্র একজন সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। দু-দিন পর রোগী মারা গেলে, পেট চিরে দেখা গেল অন্ত্র ও পাকস্থলিতে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার ক্ষত স্পষ্ট।

এমনকী, এই একবিংশ শতাব্দীতে, চিকিৎসা-বিজ্ঞানের এমন অগ্রগতির যুগেও এ-দেশে যে-ক’টি আর্সেনিক ঘটিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডাক্তাররা প্রথমদিকে কোনও ফাউল-প্লের সম্ভাবনা সন্দেহই করেননি। যখন ধরা পড়েছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

শরীর থেকে আর্সেনিকের মতো বিষের নির্গমন-হার খুব দ্রুত নয়। অর্থাৎ নিয়মিত কারও শরীরে আর্সেনিক প্রবেশ করতে থাকলে, শরীরে আর্সেনিক সঞ্চিত হওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। অর্থাৎ আর্সেনিকের ক্রনিক বা স্লো পয়জনিংও সম্ভব। এক্ষেত্রে ভিক্টিম মরবে তিলে-তিলে। প্রথমদিকে স্বল্প ডোজের বিষ প্রতিদিনই ভিক্টিমকে দিয়ে যেতে হবে। তারপর অল্পদিনের ফারাকে পরিবর্তনশীল বর্ধিত ডোজ। এভাবে বেশ কিছুদিন চালালে, শরীর থেকে বিষ নির্গমনের হারের তুলনায় বিষ প্রবেশের হার বেশি হলেই শরীরে বিষের সঞ্চয় হবে। সময়ের সঙ্গে কলা-কোষে পুঞ্জীভূত বিষ ধীরে-ধীরে গোটা শরীরকেই বিষিয়ে দেবে। উপরন্তু, এ-পদ্ধতিতে শরীরে আর্সেনিকের বিরুদ্ধে কোনও সহনশীলতা (টলারেন্স) গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও কম।

আর্সেনিকের ট্রাই অক্সাইড, রাসায়নিক প্ৰকৃতি অনুযায়ী আর্সেনাইট। এই রাসায়নিক প্ৰকৃতির জন্যই শরীরে প্রবিষ্ট আর্সেনিক গুরুত্বপূর্ণ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া সব ঘেঁটে দেয়। আমাদের শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এনজাইম বা উৎসচেকের দ্বারা। মনে রাখবেন, উৎসেচক হল, জৈব অনুঘটক। শরীর অভ্যন্তরীণ বহু জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়াই এদের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পন্ন হয় না।

উৎসেচকের জটিল কার্যকলাপকে সরলীকৃতভাবে আমরা চাবি ও তালার সঙ্গে তুলনা করতে পারি। নির্দিষ্ট চাবি দিয়ে যেমন নির্দিষ্ট তালাটিই খোলা সম্ভব, তেমনি কোনও নির্দিষ্ট এনজাইম, নির্দিষ্ট একটি ছাঁচেরই কোনও সাবস্ট্রেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, বিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। এক্ষেত্রে এনজাইম হচ্ছে তালা, আর নির্দিষ্ট সাবস্ট্রেটটি হচ্ছে তার চাবি। অর্থাৎ ওই খাপে খাপ না মিললে, কিস্যুটি হবে না। আমরা অনেকেই ছোটবেলায় জিগস্য-পাজ্‌ল খেলেছি। এ-ব্যাপারটাও এক্কেবারে তেমনই। এবার এইসব উৎসেচক হল একেকটি সুবিশাল প্রোটিন চেইন। আরও ভেঙে বলতে গেলে, বহু সংখ্যক অ্যামিনো অ্যাসিডের পলিমার।

আর্সেনিকজাত ওষুধ, সাবান, ওয়েফার ও ফাউলারের সলিউশন

যেসব অ্যামিনো অ্যাসিড জুড়ে-জুড়ে এনজাইম তৈরি হল, তাদেরই অনেকের অন্যতম উপাদান হল সালফার, যা সমগ্র এনজাইমটিকেই একটি নির্দিষ্ট সুস্থিত রাসায়নিক গঠন প্রদান করে। এখানেই কিস্তিমাত করে আর্সেনিকের ট্রাই অক্সাইড। এর অণুর জ্যামিতিক গঠন, সালফারের অনুর অনুরূপ। ঠিক যেন যমজ। শরীরে প্রবেশের পর ছদ্মবেশী আর্সেনিক ট্রাই-অক্সাইড এনজাইমের সালফার অণুগুলোকে হঠিয়ে, তার জায়গায় চেপে বসে। দেখতে-শুনতে একই রকম হওয়ায়, এনজাইমেরও কোনও সন্দেহ হয় না। অর্থাৎ, অলক্ষ্যেই এনজাইমের নির্দিষ্ট রাসায়নিক ছাঁচটি গেল বদলে এবং এনজাইমের ‘চাবি’ সাবস্ট্রেটটিও শত চেষ্টা করেও এনজাইমের তালা আর খুলতে পারল না। ফলে ওই এনজাইম শরীরের যে-গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়াটির জন্য অপরিহার্য ছিল, সেটিও গেল থমকে। এভাবেই আর্সেনিকের ট্রাই অক্সাইড এনজাইমের রাসায়নিক আকার-আকৃতিকে বিগড়ে দিয়ে, শরীরের বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া, বিশেষত কোষের শ্বসন সম্পর্কিত বিক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেয়। তাই আর্সেনিকের দীর্ঘকালীন বিষক্রিয়া বিস্তীর্ণ সময়কাল ধরে, ভিক্টিমের শরীরে বিচিত্র সব লক্ষণের সৃষ্টি করে— হঠাৎ-হঠাৎ পেটের গোলমাল, ক্ষুধামন্দ, ক্লান্তি, মাথা ধরা, চোখ লাল হয়ে ওঠা, সবসময় চোখ দিয়ে জল পড়া, হাত-পায়ে ঝিনঝিনে অসাড় ভাব, চিন্তা-ভাবনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে অস্বচ্ছতা (ব্রেইন ফগ), যকৃৎ ও বৃক্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া— মৃত্যু ঘনিয়ে আসার আগে পর্যন্ত এমন নানা বারোমেসে শারীরিক সমস্যায় ভিক্টিম ভুগতে থাকে। ডাক্তাররাও সিম্পটম অনুযায়ী কখনও পেটের চিকিৎসা করেন, কখনও নার্ভ কিংবা নিউরোর সমস্যার চিকিৎসা চালান। কিন্তু এ-সমস্ত লক্ষণ যে সামগ্রিক ভাবে আর্সেনিকের দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়াজাত, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডাক্তাররা বুঝে উঠতে অসমর্থ হন। একমাত্র ভিক্টিমের নখে, ‘মেস-লাইন’ পরিস্পুট হওয়াই আর্সেনিকের ক্রনিক বিষক্রিয়ার ‘ট্রেডমার্ক’ লক্ষণ। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই, তা ঠিকসময়ে পরিস্ফুট হয় না।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার আগেই ভিক্টিম মাল্টি-অরগ্যান ফেলিওর হয়ে মারা যায়। আর যে-ব্যক্তি দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মারা যায়, তার মৃত্যু আত্মীয়-স্বজনের কাছেও অস্বাভাবিক ঠেকে না, তাই তাঁদেরও সন্দেহ হয় না। আর্সেনিকের স্লো-পয়জনিংয়ের ঘটনা, অ্যাকিউট পয়জনিংয়ের তুলনায় অনেকটাই কম। কারণ, আর্সেনিকের স্লো-পয়জনিং করে ভিক্টিমকে হত্যা করতে গেলে, আততায়ীর প্রয়োজন বিষ-সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও অপরিসীম ধৈর্য। এ অনেকটা ঘুড়ি ওড়ানোর মতো। কখন কতটা সুতো ছাড়তে হবে, কতটা গোটাতে হবে— ডোজের পরিমাপ নিয়ন্ত্রন সম্পর্কেও এহেন বোধ প্রয়োজন। কতটা ডোজ দিলে ভিক্টিমের সন্দেহ হবে না, অথচ ইপ্সিত লক্ষ্যের দিকেও ছোট্ট এক ধাপ এগিয়েও থাকা যাবে— এ-জ্ঞান আততায়ীর থাকা আবশ্যিক। তাই, দেখা গেছে আর্সেনিকের স্লো-পয়জনিংয়ের দ্বারা হত্যার ঘটনায় আততায়ী মূলত কোনও ডাক্তার, নার্স, বা ফার্মাসিস্ট— যাদের বিষ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আর নিজের স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ দুই-ই আছে।

১৯১১ সালের আগ্রার এডওয়ার্ড ফুল্যামের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যাবে। এডওয়ার্ডকে দীর্ঘ কয়েকমাস আর্সেনিকের স্লো-পয়জনিং করা হয়েছিল। এডওয়ার্ডের স্ত্রী অগাস্টা, স্বামীর দৈনন্দিন খাদ্য-পানীয়ে আর্সেনিকের পুরিয়া মিশিয়ে দিতেন। কিন্তু নির্দিষ্ট ডোজের সেসব পুরিয়ার সাপ্লাই দিতেন অগাস্টার প্রেমিক হেনরি ক্লার্ক, সে ছিল পেশায় ডাক্তার। তবে, অ্যাকিউট পয়জনিং হোক বা স্লো-পয়জনিং, সে-কালের নিরিখে আদালতে আর্সেনিক ঘটিত হত্যা প্রমাণ করা ছিল বেশ দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ, সে-কালের দৈনন্দিন জীবন ছিল একপ্রকার সেঁকোর সঙ্গে সহবাস। ইঁদুর মারার বিষ, কীটনাশক, আগাছানাশক ছাড়াও, নিত্যজীবনে বহুল ব্যবহার ছিল আর্সেনিক এবং বিভিন্ন আর্সেনিকজাত যৌগর।

আর্সেনিকজাত যৌগ, নয়নাভিরাম রঞ্জক শিলি’জ গ্রিন সে-সময়ে ওয়ালপেপার, বস্ত্র রঞ্জক, প্রসাধনী, খেলনা এমনকী রঙিন মিষ্টিতেও ব‍্যবহৃত হত। স্বাদ বৃদ্ধির জন্য বিলেতি সুরাতেও স্বল্প মাত্রার আর্সেনিক ব্যবহারের চল ছিল। আর্সেনিক তখন ‘মিরাকিউরল বড়ি’। বদ‍্যির অনুপান থেকে হাকিমি দাওয়াই কিংবা পশ্চিমি মিক্সচার— বহুবিধ রোগের চিকিৎসা— সবেতেই ব্যবহৃত হত স্বল্পমাত্রার আর্সেনিক। এই যেমন, সর্বরোগহরা ফাউলারের সলিউশন— পটাশিয়াম আর্সেনাইটের দ্রবণ। এক লিটার পাতিত জলে (ডিস্টিল্ড ওয়াটার) ১০ গ্রাম আর্সেনিক ট্রাই-অক্সাইড আর পটাশিয়াম বাইকার্বনেট মিশিয়ে বানানো হত। সুগন্ধির জন্য কয়েক ফোঁটা ল্যাভেন্ডারও মিশিয়ে দেওয়া হত। সান্নিপাতিক থেকে সিফিলিস, মায় লিউকিমিয়ার চিকিৎসাতেও সে-কালে এর বহুল ব্যবহার ছিল। ডাক্তারেরা, রোগীদের ০.৫ মিলি করে, দিনে তিনবার খেতে বলতেন। কিন্তু এর ‘সর্বরোগহরা’ তকমা পাওয়াটাই শেষমেশ কাল হল। ফাউলারের সলিউশন ক্রমে হয়ে উঠল ‘অরনামেন্টাল’ মেডিসিন। অর্থাৎ, কোনও নির্দিস্ট প্রয়োজন ছাড়াই ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত লোকজন ওষুধের দোকান থেকে ফাউলারের সলিউশন কিনত। তারপর, একটু গা ম্যাজম্যাজ বা মন আনচান করলেই, ওয়াইনের সঙ্গে নিজের ইচ্ছেমতো ডোজে ফাউলারের সলিউশন মিশিয়ে খাওয়া শুরু হল। যার ফলস্বরূপ আর্সেনিকের ধীর গতির বিষক্রিয়া। অনেকে মনে করেন, চার্লস ডারুইনের ক্রনিক অসুস্থতার কারণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত ডোজে আপন খেয়ালে ফাউলারের সলিউশন গ্রহণ। মনে করা হয়, দার্জিলিঙে ভাওয়ালের রাজাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল আর্সেনিকজাত এমনই এক ওষুধের সাহায্যে। আর ছিল সেকালে ঘরে-ঘরে আর্সেনিক খাওয়ার চল। স্বল্প পরিমাণ আর্সেনিকের সরাসরি সেবন, শরীর-স্বাস্থ্য ভাল রাখে, ত্বক উজ্জ্বল-মসৃণ করে, কাজে-কর্মে উৎসাহ জোগায় এমনই ছিল ধারণা। স্বল্প পরিমাণের আর্সেনিক বলবর্ধক, কামবর্ধক ‘টনিক’। বৈদ্য-হাকিমি মতে মিলন দীর্ঘায়িত করতে এর জুড়ি নেই। আর স্টিরিয়ার আর্সেনিক খাইয়েদের কথা লোকমুখে প্রচারিত হতে, এ-দেশের বহু মানুষ এমনকী সাহেবরাও প্রায় নিত্য সেঁকো সেবন অভ্যাস করে ফেলল। সুতরাং, আর্সেনিকের বিষক্রিয়া সেকালে কোনও দুর্লভ ব্যাপার নয়। আর, সায়ানাইডের মতো চটজলদি মৃত্যু আর্সেনিকের ক্ষেত্রে ঘটে না। আর্সেনিকের অ্যাকিউট পয়জনিংয়েও মৃত্যু আসতে কম করে ঘন্টা কয়েক সময় লাগে। বহু ক্ষেত্রেই ভিক্টিম মৃত্যুর আগে কয়েক দিন ধরেও বেঁচে থাকে। এই বিলম্বিত মৃত্যুই আদালতে ফরেন্সিক প্রমাণকে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত বলা যাক; ধরা যাক, কোনও পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আর্সেনিকের লিথাল ডোজ কয়েকশো মিলিগ্রাম। খাদ্যের মাধ্যমে ওই পরিমাণ আর্সেনিক পাকস্থলিতে প্রবেশ করার পর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বমির মাধ্যমে, ওই বিষাক্ত খাদ্যের অনেকটা বেরিয়ে যায়। বমির সঙ্গে যখন প্রবল বাহ‍্যত্যাগও শুরু হয়, অন্ত্রে প্রবিষ্ট বিষেরও অনেকটা তার মাধ্যমে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়।  যেটুকু বিষ পাকস্থলি ও অন্ত্রে  পড়ে থাকে, তা শোষিত হয়ে রক্তস্রোতে প্রবেশ করে। ওই বিষ এবার রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অভ্যন্তরস্থ অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ভিক্টিম যতদিন বেঁচে থাকবে, এই দেহে প্রবিষ্ট আর্সেনিক একটু-একটু করে সরাসরি  রেচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিংবা যকৃৎ দ্বারা অপেক্ষাকৃত কম বিষাক্ত জৈব আর্সেনিক যৌগে (মিথাইলেটেড আর্সেনিক) পরিণত হয়ে মূত্রে দ্রবীভূত হয়ে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়। এই সময়ে যদি ভিক্টিম চিকিৎসা পেয়ে থাকে, তাহলে শরীর থেকে বিষ নির্গমনের হার আরও কিছুটা দ্রুত। সুতরাং, মারা যাওয়ার সময়ে শেষমেষ যে-পরিমাণ আর্সেনিক সারা শরীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়ে গেল, তা পাকস্থলিতে খাদ্যের মাধ্যমে প্রবিষ্ট আর্সেনিকের অতি ক্ষুদ্র অংশ। সে-কালের কেমিক্যাল এক্সামিনাররা (এখনকার ফরেন্সিক টক্সিকোলজিস্টের সমতুল্য) যখন মৃত ব্যক্তির দেহাংশ থেকে বিষের অস্তিত্ব খুঁজতে বসতেন, তাঁরা সামান্য বিষের চিহ্নই পেতেন। সেই রিপোর্ট যখন আদালতে দাখিল করা হত, স্বাভাবতই তখন অভিযুক্ত পক্ষের উকিল বুক ফুলিয়ে ওই রিপোর্টকে অস্বীকারও করতেন।

যেখানে দৈনন্দিন জীবনে আর্সেনিকের একাধিক স্বাভাবিক ‘নিষ্পাপ’ উৎস আছে, সেখানে মৃতব্যক্তির শরীরে আর্সেনিকের অস্তিত্ব মিললেও, এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রমাণিত হলেও—  ওইটুকু আর্সেনিকের চিহ্ন কখনওই ফাউল-প্লের স্বপক্ষে জোরালো প্রমাণ হতে পারে না, ওটি অন্য কোনও স্বাভাবিক ‘নিষ্পাপ’ উৎস থেকেও মৃত ব্যক্তির জীবদ্দশায় তার শরীরে প্রবেশ করা সম্ভব।

১৮৯৫ নাগাদ কলকাতায় মি. ওয়াগনারের রহস‍্যমৃত্যুকে ঘিরেও একই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, মিসেস ওয়াগনার তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জিলিপিতে আর্সেনিক মিশিয়ে স্বামীকে হত্যা করেছেন। রাসায়নিক পরীক্ষা করে মি. ওয়াগনারের দেহে যথেষ্ট আর্সেনিকের সন্ধানও মিলেছে। কিন্তু যখন জানা গেল, মি. ওয়াগনার অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ডাক্তার নির্দেশিত আর্সেনিকজাত ওষুধপত্র খাচ্ছিলেন, তখন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা দুরূহ হয়ে গেল। অভিযুক্তও খালাস পেয়ে গেল।

বিষ প্রয়োগে খুন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঠান্ডা মাথার পরিকল্পিত হত্যা। খুনি তাই হত্যা সংঘটিত করার পূর্বেই হত্যা পরবর্তী সময়ে অপরাধ লুকোনোর, তার পরিচয় গোপন করার সমস্ত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে। যে-বিষ তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদে রেখে তার পরিকল্পনাকে অতি সহজেই বাস্তবায়িত করবে, তেমন বিষকেই তো সে অস্ত্র হিসেবে বেছে নেবে। তাই সবদিক বিচার করলে সেঁকো অদ্বিতীয়। প্রথম কথা, সে সহজলভ্য। উপরন্তু সাদা, স্বাদগন্ধহীন, তাই কোনওরকম সন্দেহের উদ্রেক না-ঘটিয়েই ভিকটিমের খাদ্যে মিশিয়ে দেওয়া যায়। তার বিষক্রিয়ার লক্ষণের সঙ্গে সাধারণ উদরাময়ের প্রভেদ করা কঠিন এবং দৈনন্দিন জীবনে তার যথেচ্ছ ব্যবহার আছে।

তাই, ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বিংশ শতকের তৃতীয় দশক, প্রায় গোটা একটা শতাব্দী জুড়ে আর্সেনিক এ-দেশের অপরাধ জগতের চালচিত্রটাই বদলে দিল। সেঁকোর আধিপত্যে চিরায়ত সব দেশীয় বিষ ব্যাকফুটে। ১৮৬১-১৮৬৬ এবং ১৮৭৯-১৮৮৭ এই সময়কালে পাঞ্জাবের কেমিক্যাল এগজামিনার ডিপার্টমেন্ট  মোট ৪৭১৯টা সম্ভাব্য বিষক্রিয়ার অ্যানালিসিসের মধ্যে ১২৮৬টা ক্ষেত্রে আর্সেনিকের অস্তিত্ব পেয়েছে। আফিম, ধুতুরাকে টেক্কা দিয়ে প্রথম স্থান ছিনিয়ে নিয়েছে আর্সেনিক। ১৮৭৭-৭৮ এই একবছরে বাংলার কেমিক্যাল এগজামিনার সম্ভাব্য বিষক্রিয়া সংক্রান্ত মোট ৫৪৩টা অ্যানালিসিসের মধ্যে ৯৪ টা ক্ষেত্রে আর্সেনিকের অস্তিত্ব পেয়েছে। এবারেও আর্সেনিক ফার্স্ট বয়।

১৮৭৫-৮৪ এই দশ বছরে বম্বে প্রেসিডেন্সির কেমিক্যাল এগজামিনার তাঁদের অ্যানালিসিসের মধ্যে ৯৪৭টা স্যাম্পেলে বিষের অস্তিস্ত্ব পেয়েছে, যার মধ্যে ৫০৭ টাতেই রয়েছে আর্সেনিক। ১৮৭৫-১৮৮৪, এই দশ বছরে বম্বে প্রেসিডেন্সিতে ৩০৫ জনের মৃত্যু ঘটেছে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় (এই পরিসংখ্যানগুলি বিভিন্ন প্রভিন্সের বিভিন্ন বছরের কেমিক্যাল এক্সামিনার রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে তৈরি। রিপোর্টে হত্যা ও আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনাবশত মৃত্যুর নির্দিষ্ট উল্লেখ না থাকলেও, যেহেতু আত্মহত্যার ক্ষেত্রে মূলত এদেশে আফিমেরই বহুল প্রচলন এবং দুর্ঘটনাবশত আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু খুবই দুর্লভ ঘটনা, তাই উপরোক্ত মৃত্যুর পরিসংখ্যানগুলোতে সম্ভবত বেশিরভাগই হত্যা কিংবা হত্যার চেষ্টা।)

এমন সব পরিসংখ্যানে আতঙ্কিত ব্রিটিশ সরকার— ১৯০৪ নাগাদ ‘পয়জন অ্যাক্ট’ এনে খোলা বাজারে সেঁকো বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল। যদিও তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। যে-ব্যক্তির মনে হত্যার উদগ্র বাসনা রয়েছে, কোনও নিয়মের বেড়া জালের তোয়াকা সে করে না। সুযোগ, উপায় সে খুঁজে নেবেই।

তাই, এইসব সরকারি নিয়ম-নীতির চেয়েও বেশি কার্যকরি হয়েছিল সে-কালের কেমিক্যাল এক্সামিনারদের এককাট্টা লড়াই। তাঁরা একেকজন ছিলেন রসায়ন শাস্ত্রের রথি-মহারথি। মৃতদেহে আর্সেনিক চিহ্নিতকরণে রসায়ন শাস্ত্রের সফল ব্যবহারই বহু অপরাধীকে আদালতের আঙিনায় টেনে এনেছিল। ধুরন্ধর অপরাধ মস্তিষ্ক বনাম রসায়নের প্রজ্ঞার ধুন্ধুমার এই লড়াই শুরু কিন্তু হয়েছিল সেই সুদূর অতীতেই। হত্যার অস্ত্র হিসেবে আর্সেনিকের ব্যবহার যদি স্মরণাতীত কাল থেকে হয়ে থাকে, তার চিহ্নিতকরণটিও হয়েছে সমান্তরালভাবে।

আর্সেনিক চিহ্নিতকরণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিটির উদ্ভাবন ও ফরেনসিকের দুনিয়ায় তার জনপ্রিয়তার ইতিহাসটিও তাই কম রোমাঞ্চকর নয়। নির্ভেজাল উপন্যাসের মতোই তাতে রয়েছে এক তরুণ বিজ্ঞানীর প্রতিজ্ঞা, পরাজয়ের গ্লানি থেকে ফিনিক্সের মতো তাঁর নায়কোচিত উত্থান। সমকালীন ইউরোপের উত্তাল রাজনীতির আবর্ত, এক প্রথিতযশা বিজ্ঞানীর প্রতি ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস—  আর এই সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল এক অদ্ভুত বিচিত্র রহস্যময় হত্যাকাণ্ড।

সেসব কাহিনি পরের পর্বে।