শ্যুমেখারের লাথি
রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম টাইব্রেকার। সাডেন ডেথে (খেলা ড্র বা সমতায় শেষ হলে, বিজয়ী নির্ধারণের জন্য অতিরিক্ত সময়ের খেলা।) দলকে জিতিয়ে দু’হাত তুলে, গ্যালারির দিকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন এক গোলকিপার। কিন্তু গ্যালারি সম্পূর্ণ নির্বিকার, বিজয়ী গোলকিপারকে ন্যূননতম সম্ভাষণ জানালেন না দর্শকরা। কেবল কিছু জার্মান সমর্থক, সাংবাদিক আর জার্মান ফুটবলাররা ও তাদের বেঞ্চ ছাড়া, সেভিয়ার (ইংরেজিতে সেভিল) এস্তাদিও রামোন সাঞ্চেজ পিজহোয়েন স্টেডিয়ামের সমগ্র গ্যালারি, দেখতে চায়নি জার্মানির জয়। তার কারণ, লাল-জার্সি পরিহিত হাত তুলে, বিজয় উল্লাস করতে থাকা ওই জার্মান গোলরক্ষকটি! তাই গ্যালারির কোথাও উল্লাসের লেশমাত্র চোখে পড়ল না। বরং ছিল চাপা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। আর ক্লান্ত অবসন্ন পায়ে, ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে চলা— ওই বিশ্বকাপের ট্র্যাজিক নায়ক, মিশেল প্লাতিনি, দমিনিক রুশতু, জাঁ তিগানাদের প্রতি সমবেদনা।
৮ জুলাই, ১৯৮২-র দ্বিতীয় সেমিফাইনালের নিষ্পত্তি, শেষপর্যন্ত সাডেন ডেথে হল যখন, তখন স্থানীয় সময় রাত ১১-টা বেজে ৪১ মিনিট। বিশ্বকাপের এই অন্যতম ক্লাসিক ম্যাচের, হয়তো-বা শতাব্দীর সেরা, সমাপ্তিপর্বের ছবিটি ছিল এরকমই। সক্রেটিস-জিকোদের ব্রাজিলের পর, এবার বিদায়, ‘ব্রেজিল অফ ইউরোপ’— ফ্রান্সেরও। সেমিফাইনালে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে, ৩-১ এগিয়ে গিয়েও, শেষপর্যন্ত জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে পরাজয়। তার আগে, ১২০ মিনিট ধরে পেন্ডুলামের মতো দুলেছিল, ১৯৮২-র স্পেন বিশ্বকাপের এই দ্বিতীয় সেমিফাইনালের ভাগ্য।
শৈল্পিক ফুটবল উপহার দেওয়ার জন্য, প্লাতিনিদের— ‘ইউরোপের ব্রাজিল’ তকমায় ভূষিত করেছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়া। কিন্তু দুর্ধর্ষ ম্যাচের শিল্প-সৌন্দর্য-উত্তেজনা ছাপিয়ে, এই সেমিফাইনাল— ‘সেভিয়া ৮২’ হিসেবে ইতিহাসে রয়ে গিয়েছে মাঠের একটি ভয়াবহ সংঘর্ষের মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। কারও মতে, এটি একটি জঘন্য ফাউল, কেউ আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, নিছক বিপজ্জনক ফাউল নয়, এটি ‘চোরাহত্যার প্রচেষ্টা’ (অ্যাসাসিনেশন অ্যাটেম্পট) পর্যায়ের অপরাধ। তবুও বিষয়টা অবিশ্বাস্যভাবে রেফারি ও সহকারী রেফারির নজর এড়িয়ে গেল কী করে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ।
হ্যান্ড অফ গড! বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মারাদোনা যখন দার্শনিক!
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ১…
ঠিক কী ঘটেছিল মাঠে? ম্যাচ তখন ১-১, ৫৭ মিনিটের মাথায়, প্লাতিনি লব করে, উঁচু একটি ফাইনাল পাস বাড়ান, যা জার্মান ডিফেন্সকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে পেনাল্টি বক্সের মুখে পড়ে। পরিবর্ত ফুটবলার প্যাট্রিক বাতিস্তঁ, ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো, বলটি তাড়া করে ছিটকে বেরলেন, জার্মান ডিফেন্ডার ম্যানফ্রেড কালৎজ আর উলি স্টিলাইককে পেছনে ফেলে। বাতিস্তঁ, গতিতে তাঁর ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করেছেন দেখে, গোলরক্ষক হ্যাইরল্ড ‘টনি’ শ্যুমেখার, গোল ছেড়ে বল লক্ষ্য করে, তীব্র গতিতে বেরিয়ে আসতে শুরু করলেন। কিন্তু কিছুটা এগিয়েই, শ্যুমেখার বুঝতে পারেন, বাতিস্তঁর আগে, বলের কাছাকাছি পৌঁছনো তার পক্ষে সম্ভব নয়।
এবার, সারা স্টেডিয়ামকে বিস্মিত করে, যেন নাটকের একটি বীভৎস দৃশ্য উন্মোচিত হল। ওয়ান-ইজ-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে, শ্যুমেখার— শট নিতে উদ্যত, বাতিস্তঁর শরীর লক্ষ্য করে, ডান-পা ও কনুই উঁচিয়ে, নিজের শরীরটিকে ছুঁড়ে দিলেন। ফুটবলের পরিভাষায় যাকে বলে ‘উইদাউট দ্য বল বডিচার্জ’। উদ্দেশ্য ছিল, বাতিস্তঁকে শট নেওয়ার সময়ে বিব্রত করা। নিজের দিকে প্রবল বেগে ধেয়ে আসা শ্যুমেখারের শরীরের জন্য হয়তো, বাতিস্তঁ শটটি ঠিক মতো নিশানায় রাখতে পারেননি। বল স্পর্শ করে, বাতিস্তঁ গতি কমাচ্ছেন, অপরদিকে শ্যুমেখারের গতিবেগ ক্রমশ বাড়ছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে যে সংঘর্ষ হল, তা সারা মাঠ ও টেলিভিশন দর্শকদের স্তম্ভিত করে দেয়। শ্যুমেখারের চওড়া হিপ-বোন, সজোরে গিয়ে লাগে বাতিস্তঁর বুক, কনুই আর গলায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ফরাসি ডিফেন্ডার, সম্পূর্ণ অচৈতন্য অবস্থায়। তার হাত দু’টি পড়ার সময়ে, ওপর দিকে একবার উঠে, পর-মুহূর্তে মাথার পেছন দিকে এলিয়ে পড়ল। ছুটে এলেন প্লাতিনি, অ্যালেন জিরেস, বার্নার জেনজিনি-সহ সতীর্থরা। মাঠে স্ট্রেচার ডাকলেন ডাচ রেফারি চার্লস কোর্ভার; কিন্তু স্ট্রেচার আসতেই সময় লেগে যায় সাত মিনিট।

‘ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, প্যাট্রিক আর নেই! ওর পালস পাওয়া যাচ্ছিল না, মুখ ও সারা শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল।’ খেলার পর, ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ফরাসি অধিনায়ক। স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাতিস্তঁকে, তার বাঁ-হাত ঝুলে রয়েছে স্ট্রেচারের বাইরে, সেই হাত তাঁর বন্ধু, তাঁর ক্যাপ্টেন প্লাতিনি, চুম্বন করে, সযত্নে তাঁর বুকের ওপর রেখে দিচ্ছেন— সহমর্মিতার এই দৃশ্যে ধরা পড়ে ক্যাামেরার লেন্সে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর, কিছুক্ষণের জন্য কোমায় চলে গিয়েছিলেন বাতিস্তঁ। প্লাতিনি পরে আরও জানান, হাসপাতালের বেডে জ্ঞান ফেরার পর, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ফরাসি ডিফেন্ডার সর্বপ্রথম তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বলটা কি গোলে ঢুকেছিল?’

শ্যুমেখার কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন? এই ঘটনা ঘটিয়ে, জার্মান গোলকিপার নির্লিপ্তভাবে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একবার বলটি হাতে তুলে, গ্যালারিতে ফরাসি সমর্থকদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বিদ্রুপ করতেও দেখা যায় তাঁকে। তারপর বলটা ছ’গজ বক্সের ওপর বসিয়ে, মুখে ঈষৎ বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। শরীরী ভাষাখানা এমন যে, স্ট্রেচার-বাহকরা তাড়াতাড়ি একে বের করছে না কেন মাঠ থেকে, আমি গোলকিক নিয়ে খেলাটা শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছি!

অথচ, তার ওই ‘পাশবিক’ চার্জে, বাতিস্তঁর তিনটি দাঁত, দুটি পাঁজরের হাড় ও গলার কাছের ভার্টিব্রা ভেঙে যায়। ম্যাচের পর এক সাংবাদিক যখন শ্যুমেখারকে বাতিস্তঁর আঘাতের বিস্তারিত খবর জানালেন, তখন ভাবলেশহীনভাবে জার্মান গোলকিপারকে বলতে শোনা যায়, ‘ঠিক আছে, ওর ডেন্টিস্টের বিল আমি চুকিয়ে দেব খন!’ সে-যুগে ফিফার কোনও টেকনিকাল রিভিউ কমিটি ছিল না যে, ম্যাচের পর টেলিভিশন রিপ্লে দেখে, মাঠে রেফারির নজর এড়িয়ে ছাড় পেয়ে যাওয়া সংশ্লিষ্ট দোষী ফুটবলারকে শাস্তি দেবে। যেমন শাস্তি পেয়েছিলেন, ’৯৪-এ ইতালির মাওরো তাসোত্তি, বা ২০১৪-তে উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ। দুই ফুটবলারই নির্বাসিত হয়ে ওই বিশ্বকাপে আর খেলতেই পারেননি। কিন্তু শ্যুমেখার সম্পূর্ণ ছাড় পেয়ে যান, ও ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে জার্মান গোলপোস্টের নীচে, আবার দেখা যায় তাঁকে।
রেফারি যদি ফাউলের বাঁশি বাজিয়ে, শ্যুমেখারকে লালকার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দিতেন, তাহলে হয়তো সেখানেই সমস্ত বিতর্কের ইতি হয়ে যেত। কারণ ছবি ও টেলিভিশন রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায়, শ্যুমেখার যখন চার্জ করছেন, তখন বলের গতিপথ তার পেছনে গোল-লাইন মুখী। অর্থাৎ, বল ছেড়ে তিনি বিপজ্জনক ফাউল করেছেন। কিন্তু ডাচ রেফারি চার্লস কোর্ভার, কার্ড তো দূরের কথা, ফাউলের বাঁশিটিও বাজালেন না! পরে এই রেফারি বিবৃতি দেন, ‘আমার চোখ বলের ওপর নিবদ্ধ ছিল, তাই সংঘর্ষ দেখতে পাইনি। আমি সহকারীকে জিজ্ঞেস করি, কিন্তু সে জানায়, ইচ্ছাকৃতভাবে ফাউল করেনি শ্যুমেখার!’ ভাবুন তো? পাড়ার মাঠের রেফারিও যদি এইরকম কথা বলতেন, তাহলে কি তাকে ছেড়ে দিতেন দর্শকরা? ৮ জুলাই, ৮২-র সেভিয়ার দ্বিতীয় খলনায়ক কোর্ভার প্রয়াত হন ২০২০ র নভেম্বরে, ৮৪ বছর বয়সে।

‘কোর্ভার কি আদৌ আন্তর্জাতিক মানের রেফারি? যেভাবে ও প্লেয়ারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল ও তাদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছিল, তাতে তো মনে হয় না!’ ম্যাচের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে ফরাসি কোচ মিশেল হিদালগো প্রশ্ন তোলেন। তবে কোর্ভারকে ওই ম্যাচে রেফারি নিযুক্ত করার পেছনে রয়েছে অদৃষ্টের পরিহাস। ফরাসি শিবির থেকেই ওই ম্যাচের জন্যে প্রথমে যে-রেফারিকে নির্বাচন করেছিল ফিফা, তাঁর সম্পর্কে আপত্তি জানানো হয়, কারণ সেই রেফারি, গ্রুপ লিগে ইংল্যান্ড-ফ্রান্স ম্যাচে, বাঁশি মুখে দায়িত্বে ছিলেন। হিদালগোর দল, সেই ম্যাচে ১-৩ গোলে পর্যুদস্ত হয়েছিলেন। পরের ম্যাচ থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে, স্বপ্নের ফুটবল খেলতে শুরু করেন প্লাতিনি-জিরেস-তিগানারা।
ম্যাচের পরের দিন, ‘ল’একিপ’-এর মতো ফরাসি ক্রীড়া সংবাদপত্রগুলো, ফ্রান্সের দুর্ধর্ষ ফুটবলের প্রশংসায় মেতে ওঠে। ‘ফ্যাবুলিক্স’ শিরোনামে যে-রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তার সারমর্ম— ফরাসি দল সেমিফাইনালে অসাধারণ ফুটবল খেলে, টাইব্রেকারে দুর্ভাগ্যের জন্য পরাজিত হয়েছে। একসঙ্গে প্লাতিনি, জিরেস ও জেনজিনির মতো তিনজন বল-প্লেয়ার ফুটবলারকে দলে রেখে, আক্রমণাত্মক কৌশল নেওয়ার জন্য— ভূয়সী প্রশংসা করা হয় কোচ হিদালগোরও। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, ১৭ মিনিটেই পিয়ের লিটবারস্কির গোলে জার্মানি এগিয়ে গেলেও, দশ মিনিটের মধ্যেই, জার্মান বক্সের মধ্যে, বার্ন্ড ফোর্স্টার রুশতুকে ফাউল করায়, পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। ডান-পায়ের নিখুঁত প্লেসিংয়ে সমতা ফেরান প্লাতিনি। এরপরে, নির্ধারিত সময়ে আর কোনও গোল হয়নি। ফ্রান্সের কাব্যিক সৌন্দর্যময় ফুটবলের ছন্দ ধ্বংস করতে, শুরু থেকেই পা চালিয়ে খেলার কৌশল নিয়েছিলেন জার্মান কোচ জুপ দেরওয়াল। দ্বিতীয়ার্ধে, ফরাসি দল যখন জার্মানিকে কোণঠাসা করে ফেলেছে, তখনই ঘটে শ্যুমেখার-বাতিস্তঁ সংঘর্ষ। ‘চরম অবিচার! ওই ঘটনা আমাদের ফোকাস নষ্ট করে দেয়। আমরা প্যাট্রিকের জীবন নিয়ে খুবই বিচলিত হয় পড়ি!’ অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে অবশ্য, ছন্দ ফিরে পান জিরেসরা। ছ’মিনিটের ব্যবধানে, পরপর দুটো গোল করে, ৩-১ করে দেন মারিয়াস ট্রেজর আর জিরেস। কিন্তু প্রথম পনেরো মিনিটের মধ্যেই, একটি গোল শোধ করে দেন কার্লহেন্স রুমেনিগে। দ্বিতীয়ার্ধে, কর্নার থেকে দুরন্ত ব্যাকভলিতে, ৩-৩ করেন ক্লাউস ফিশার। টাইব্রেকারেও জার্মানির উলি স্টিলাইকের তৃতীয় শট, ফরাসি গোলকিপার জাঁ লুক এত্তোরে আটকে দেওয়ায়,এগিয়ে যায় ফ্রান্স। কিন্তু দিদিয়ের সিক্সের শট বাঁচিয়ে, এবার জার্মানিকে লড়াইতে ফিরিয়ে আনলেন শ্যুমেখার। টাইব্রেকার ৪-৪-এ শেষ হওয়ায়, ম্যাচ গড়াল সাডেন ডেথে। চাপের মুখে ম্যাক্সিম বসিস, শট নিলেন শ্যুামেখারের হাতের নাগালের মধ্যে। পরিবর্ত হর্স্ট রুবেশ, গোল করে ফাইনালে নিয়ে গেলেন জার্মানিকে। প্লাতিনিদের রূপকথার দৌড় শেষ হল, ট্র্যাজিক পরিণতিতে।
টনি শ্যুমেখার, সত্যিই ‘বলবান’ পুরুষ ছিলেন। তিনি একবার নিজের হাতের ওপর জ্বলন্ত সিগারেট নিভিয়ে, তার প্রেমিকাকে প্রদর্শন করেছিলেন, তাঁর যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা কতদূর। কোনও ম্যাচ হারলে, বাড়ি ফিরে বালির বস্তায় ঘুঁষি মারতেন, যতক্ষণ না তাঁর আঙুলের গাঁট দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়! শ্যুমেখারকে নিয়ে বলতে গিয়ে, বাতিস্তঁ পরে ‘এএফপি’-কে জানান, ‘সে-দিন রিজার্ভ বেঞ্চে বসেই লক্ষ করেছিলাম, ও খুব তেতে (হাইপড হয়ে) আছে! যে-ভাবে ও দু’বার সিক্স ও রুশতুর শরীরের ওপর চার্জ করল… বেঞ্চে আমার সতীর্থদের বলেওছিলাম সে-কথা। পরে মাঠের ঘটনা তা প্রমাণ করল।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আসলে শ্যুমেখার সেই প্রজাতির খেলোয়াড়, যারা যে-কোনও মূল্যে। জিততে চায়। আর সে-দিনও এই মানসিকতার চরমে বিরাজ করছিল!’ শ্যুমেখার অবশ্য পরে বলেন যে, বাতিস্তঁর শরীরে আঘাত করার কোনও অভিপ্রায় তাঁর ছিল না। সঙ্গে জার্মান গোলকিপার এও যোগ করেন, ‘আবার ওরকম পরিস্থিতি হলে, আবার একই কাজ করতাম। কারণ ওইভাবেই একমাত্র বলের কাছে পৌঁছনো সম্ভব ছিল।’ যদিও ম্যাচে সংঘর্ষ-মুহূর্তে, বলের ধারেকাছেও পৌঁছতে ব্যর্থ হন তিনি! ’৮২ ফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে, পাওলো রোসি, আলতো বেলিরা শ্যুমেখারকে তিন-তিনটে গোল মেরে— ইতালিকে তৃতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন।

কিন্তু ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারলেন না ফরাসিরা। ‘ল একিপ’-এর মতো ফরাসি পত্রিকার অফিসে, আসতে লাগল ফোনের পর ফোন। সমগ্র ফ্রান্স থেকে বাতিস্তঁ-র প্রতি ‘অবিচার’ নিয়ে সমর্থকদের তীব্র ক্ষোভ লাভাস্রোতের মতো বেরিয়ে আসতে শুরু করল! সংবাদপত্রটি এবার মাঠের সংঘর্ষ, বাতিস্তঁর আঘাত ও রেফারির বদান্যতা বিষয়ক প্রতিবেদনের শিরোনাম করল, ‘ট্র্যা্জেডি অফ সেভিয়া!’ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এই ই্যসু নিয়ে বিতর্কের ঝড় তুলল। বিষয়টা আর মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। ফরাসি শিবিরের ধারেকাছে, জার্মান নম্বরপ্লেট থাকা প্রতিটি গাড়ির কাচ ভেঙে, চুরমার করে দেয় ফরাসিরা। কয়েকটা জার্মান গাড়ির চাকাও ফুটো করে দেওয়া হয়েছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে, আসরে নামতে হল আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদদের। জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট শ্মিট ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া মিতেরঁকে, সমবেদনা জানিয়ে একটি বার্তায় বললেন, ‘ফরাসি দলের এই হার দুর্ভাগ্যজনক। প্লাতিনিরাও ফাইনালে যাওয়ার ততটাই যোগ্য ছিলেন, যতটা জার্মানরা।’ বরফ গলাতে মিতেরঁ, বার্তাটি কোচ হিদালগো ও অধিনায়ক প্লাতিনির কাছে পাঠান, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্য। কিন্তু বলাই বাহুল্য, প্রেসিডেন্টের আবেদনে, বরফ আংশিকও গলেনি। বাতিস্তঁর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতেই লেগে যায় ছ’মাস। হিদালগোকে শ্লেষাত্মক সুরে বলতে শোনা যায়, ‘প্রেসিডেন্ট কি আমাদের প্লেয়ারদের, জার্মান প্লেয়ারদের, তথা শ্যুমেখারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে যাওয়ার কথা বলছেন?
এর একবছর পর, বাতিস্তঁর বিয়ের ঠিক আগের দিন, উভয়পক্ষের এক বন্ধুর মধ্যস্ততায়, মেটসে তার সঙ্গে দেখা করতে যান টনি শ্যুমেখার; সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন দুঃখপ্রকাশ করে লেখা একটি বার্তা, ও নিজের ক্লাব এফসি কোলনের স্মারক পতাকা। কিন্তু দু’জনের একান্তে সাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব হল না। ফরাসি মিডিয়া, দু’জনকে একসঙ্গে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে বসিয়ে দেয়। ক্যামেরার সামনে বাতিস্তঁ আর শ্যুমেখারকে সম্পূর্ণ উলটোদিকে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। ফরাসি মিডিয়ার সেভিয়া ’৮২ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে, প্রবল বিরক্ত শ্যুমেখার জানিয়ে দেন, ‘এটা নিছক আমার আর প্যাট্রিকের ব্যাপার। এরকম হবে জানলে, আমি জার্মানি থেকে সাংবাদিক নিয়ে আসতাম’!
ফরাসিদের চোখে শ্যুমেখার তখন এক ‘পাশবিক’ ভিলেন! সেভিয়ার ঘটনা, সমগ্ৰ ফরাসি জাতিকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ হল, ’৮৪-র স্ট্রাসবুর্গের এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে, যখন আবার মুখোমুখি হল ফ্রান্স-জার্মানি। স্পেন বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের পর প্রথমবার। কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও দর্শকরা, শ্যুমেখারকে ডিম, টোমাটো, আলু ইত্যাদি ছুঁড়ে মারতে থাকেন। গ্যালারিতে স্বস্তিক চিহ্ন-সহ নাৎসি পতাকা উড়িয়ে, তাঁকে বিদ্রূপ করা হয়। ওই সময়ে এক ফরাসি দৈনিক, একটি জনমত সমীক্ষা করে জানতে চায়— দেশের জাতীয় শত্রু কে। দেখা যায়, অ্যাড্লফ হিটলারের থেকেও ওপরে রয়েছেন টনি শ্যুমেখার! তবে এত অবমাননার মধ্যেও, জার্মান গোলকিপার নিজের নার্ভ ধরে রেখে, কয়েকটি ভাল সেভ করেন ম্যাচে। যদিও তার দল ০-১ গোলে হেরে যায়। শ্যুমেখার পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ওই ম্যাচগুলোর চাপ নিতে না পারলে, আমার কেরিয়ার শেষ হয়ে যেত। তাই নিজের মনঃসংযোগ ধরে রেখেছিলাম বিশেষ ট্রেনিং করে।’ জার্মান গোলকিপার বলেছিলেন, ‘আমি একজন আদ্যন্ত অরাজনৈতিক ব্যক্তি। কিন্তু, ওই সময়ে মনে হত, আমাকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যে নতুন যুদ্ধ লেগে যেতে পারে!’ স্ট্রাসবুর্গ ম্যাচের পর, বাতিস্তঁর সঙ্গেই জার্সি বদলেছিলেন শ্যুমেখার। তবে মাঠের মধ্যে সাহস না পেয়ে, ড্রেসিংরুমে ফেরার পর তা করেছিলেন।
ফরাসি ফুটবলে কিন্তু সেভিয়া ’৮২ একটি যুগান্তরের সূচনা করেছিল। এর দু’বছর পরই, ঘরের মাঠে, প্রথমবার ইউরো কাপ জয়ের স্বাদ পান প্লাতিনি-বাতিস্তঁরা। শিল্পের দেশ ফ্রান্স, ওইদিন থেকে ফুটবল শিল্পকেও ভালবাসতে শুরু করে। সেভিয়ার ওই অভিশপ্ত রাতের পর যে, ফুটবলকে ঘিরে দেশব্যাপী এক জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা মেনে নেন স্বয়ং প্লাতিনিও। ‘জার্মানদের কাছে ওই হারটাই আমাদের ফুটবলের টার্নিং পয়েন্ট; ফ্রান্স জুড়ে ফুটবলপ্রেমের এক জোয়ার আনে ওই ঘটনা।’ শিল্পের দেশের গায়ক, নাট্যকার, নৃত্য-নির্দেশকরা সেভিয়া ’৮২-র মধ্যে খুঁজে পেলেন সৃজনশীলতার উৎস। ওই ম্যাচের নানা মুহূর্ত, ওই মর্মান্তিক সংঘর্ষের দৃশ্য নিয়ে রচনা করেন গান, নাটক ও নৃত্যনাট্য; যা ফরাসি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে, সমগ্র ইউরোপে রীতিমতো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ফুটবলপ্রেমের এই জোয়ারের ঢেউয়েই উঠে আসেন জিনেদিন জিদান-দিদিয়ের দেশঁরা। ফরাসি ফুটবলের পরবর্তী প্রজন্ম, যারা ঘরের মাঠে দেশকে অধরা বিশ্বকাপ এনে দেন ১৯৯৮-এ।
ফরাসিদের চোখে শ্যুমেখার তখন এক ‘পাশবিক’ ভিলেন! সেভিয়ার ঘটনা, সমগ্ৰ ফরাসি জাতিকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ হল, ’৮৪-র স্ট্রাসবুর্গের এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে, যখন আবার মুখোমুখি হল ফ্রান্স-জার্মানি। স্পেন বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের পর প্রথমবার। কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও দর্শকরা, শ্যুমেখারকে ডিম, টোমাটো, আলু ইত্যাদি ছুঁড়ে মারতে থাকেন। গ্যালারিতে স্বস্তিক চিহ্ন-সহ নাৎসি পতাকা উড়িয়ে, তাঁকে বিদ্রূপ করা হয়। ওই সময়ে এক ফরাসি দৈনিক, একটি জনমত সমীক্ষা করে জানতে চায়— দেশের জাতীয় শত্রু কে। দেখা যায়, অ্যাড্লফ হিটলারের থেকেও ওপরে রয়েছেন টনি শ্যুমেখার!
শ্যুমেখার অবশ্য আর-একটি কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন পরবর্তীতে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওই ঘটনার পর হাসপাতালে বাতিস্তঁকে দেখতে, তার নিজের ও একটি জার্মান প্রতিনিধি দলের না যাওয়াটা ছিল বিরাট ভুল। তবে তিনি নিজে যে ঔদ্ধত্য বা অসংবেদনশীলতার জন্য যাননি তা নয়, আসলে বাতিস্তঁর শারীরিক পরিণতির কথা ভেবে, তিনি ভেতরে-ভেতরে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন; বাইরে যতই লৌহমানব মার্কা হাবভাব দেখিয়ে থাকুন না কেন!
জীবনের চরম আঘাতের ২৭ বছর পর, মিশেল প্লাতিনির কাছ থেকে একটি উপহার পান বাতিস্তঁ। সেভিয়া ম্যাাচে ব্যবহৃত তার কিট্স। সেই ৩ নম্বর জার্সি, শর্টস, লাল হোর্স (মোজা); যা তার ‘ক্যাপ্টেন’ উয়েফা সভাপতি হিসেবে সেভিয়া সফর করতে গিয়ে, শহরের একটি মিউজিয়াম থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। বাতিস্তঁর ওই কিটস এখন তার বড় পুত্রের শোয়ার ঘরে টাঙানো রয়েছে। যদিও জার্মান গোলকিপার সম্পর্কে, আর কোনও রাগ জমা নেই প্রাক্তন ফরাসি ডিফেন্ডারের মনে। ২০১৪ বিশ্বকাপে, ফ্রান্স-জার্মানি ম্যাচের আগে, ’৮২-র স্মৃতি নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়ে দেন, ‘আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এর জন্য ওকে অনেক ভুগতে হয়েছে। সর্বত্র লোকে ওই ঘটনা দিয়ে ওকে চিহ্নিত করত।’ শ্যুমেখারকে পরপর দুটো বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের গ্লানি, আর দু’ক্ষেত্রেই তিন গোল খাওয়ার জ্বালা নিয়ে, ফুটবল থেকে অবসর নিতে হয়েছিল। ’৮৬-র ফাইনালেও দিয়েগো মারাদোনার ফাইনাল পাস থেকে, বুরুচাগার প্লেসিংয়ের কাছে পরাজিত হতে হয় তাকে। ওই ম্যাচে শুরু থেকেই নড়বড়ে মনে হয়েছিল শ্যুমেখারকে; আর্জেন্টিনার প্রথম দু’টি গোলের ক্ষেত্রে তার আউটিং নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেভিয়ার ‘ভূত’ কি অ্যাজটেকায় তাড়া করেছিল টনিকে? যদিও ওই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে, ফ্রাঞ্জ কাইজার বেকেনবাওয়ারের টাফ-ফুটবল কৌশলের কাছে আবার ০-২ গোলে হার মানতে হয়েছিল প্লাতিনি-তিগানা-বাতিস্তঁদের।
’৮৭-তে জার্মান ফুটবল মহলও— টনিকে একঘরে করে দেয়, নিজের আত্মজীবনীতে জার্মান ফুটবলে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে ডোপিং চলে আসছে, সেই নিয়ে এক বিতর্কিত তত্ত্ব লেখার জন্য। আর, শ্যুমেখারের দেওয়া ’৮৪-র স্ট্রাসবুর্গের জার্সিটি কী করলেন প্যানট্রিক বাতিস্তঁ? তা নিয়ে তার কোনও মাথাব্যথা নেই তার। না থাকাটাই স্বাভাবিক! শ্যুমেখারের মারণ-চার্জ বা কোর্ভারের ক্ষমার অযোগ্য বদ্যানন্য তা নয়, ‘ট্র্যারজেডি অফ সেভিয়া’ ফরাসি ফুটবল-শিল্পের বিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণ হয়ে রয়ে যাবে ইতিহাসে।




