টিকিট সবার জন্য নয়

Representative Image

ফুটবলপ্রেমী জনতার কাছে, বিশ্বকাপের টিকিট— স্বপ্ন ছুঁতে চাওয়া একটুকরো কাগজ। যদিও, দক্ষিণ এশিয়ার ভারত-সহ বহু দেশ থেকেই, সমর্থকেরা আজকাল বিশ্বকাপ দেখতে যান মাঠে। অন্তত, রাশিয়া এবং কাতারে তো ভূরিভূরি মানুষ গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার? সকলের মুখ শুকনো। কারণ? টিকিটের দাম। ইউএসএ-কানাডা-মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ। হিসেব বলছে, গ্রুপ স্টেজের টিকিটের দামই রাখা হয়েছে ১৪০ থেকে ২,৭৩৫ মার্কিন ডলার। ফাইনালের টিকিটের দাম রাখা হয়েছিল ৪,১৮৫ থেকে ৮,৬৮০ মার্কিন ডলার। এরপর ফাইনালের দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আপাতত ফাইনালের টিকিটের দাম ১০,৯৯০ মার্কিন ডলার।

মধ্যবিত্ত শুধু নয়, উপমহাদেশের বহু উচ্চমধ্যবিত্তেরও সাধ্যের বাইরে এই দাম। শুধু দক্ষিণ এশিয়া তো নয়, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যে-বিপুল সংখ্যক মানুষ বিশ্বকাপে নিজেদের দলকে সমর্থন করতে যান, তাঁদের পক্ষেও এই অগ্নিমূল্য টিকিটের কারণে, এবার সহজ হচ্ছে না যাওয়া। আর শুধু তো টিকিট নয়, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ইউএসএ-র সিয়াটেল-নিউ জার্সি-বস্টন-আটলান্টার মতো শহরগুলিতে হোটেলভাড়া, ক্যাব ভাড়া, রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম— সবই বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।

পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে, কিছুদিন আগে মার্কিন আদালতে ‘ফিফা’র বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ‘ফিফা’কে শমন পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়, কীভাবে আটটি হাইভোল্টেজ ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়েছে, কীভাবে মূল্য নির্ধারিত হয়েছে, বা ক্রেতাদের জানানো হয়েছে এবং আসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে?

আরও পড়ুন: বিতর্কিত একটি ‘লাথি’-ই বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ভাগ্য! লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী…

এই বিতর্কের মূল অভিযোগ দু’টি। প্রথমত, টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, ভুল আসন বরাদ্দ করা। দর্শকদের থেকে অভিযোগ আসে যে, অনলাইনে টিকিট বিক্রির সময়ে যে-নির্দিষ্ট সিট তাঁরা নির্বাচন করেছেন, বাস্তবে সেই সিট-নম্বরের টিকিট হাতে পাননি। প্রবল চাপের মুখে, ‘ফিফা’ সস্তায় কিছু টিকিট ছেড়ে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও, তা সংখ্যায় এতই কম যে, তা দর্শকদের ক্ষোভ প্রশমনে ব্যর্থ।

এবারের বিশ্বকাপে, আর-একটা বিষয় অভিনব। এই প্রথমবার, ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি চালু করেছে ‘ফিফা’, যেখানে চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম ‘রিয়েল টাইম’-এ পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ যদি নক-আউটের কোনও খেলায় হেভিওয়েট দু’টি দল মুখোমুখি হয়, তাহলে টিকিটের দাম বেড়ে যাবে। আবার যদি তা না হয়, সেক্ষেত্রে চাহিদা কম থাকলে, দামও সমান অনুপাতে কমবে। আবার গ্রুপ-বিন্যাসের পরে, গ্রুপ-স্টেজে হেভিওয়েট খেলাগুলির টিকিটের দাম বেড়েছে। টিকিট যাঁরা কেটেছেন, তাঁদের মতে, যাঁরা অপেক্ষা করছেন, তাঁদেরই উলটে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বিশ্বকাপের মতো বড় আসর। সেই কারণেই দর্শকদের পাশে দাঁড়িয়ে, ‘ফিফা’র বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে আমেরিকার আদালত।

এই বিশ্বকাপ শুরুর অন্তত একবছর আগে থেকেই— টিকিট বিতর্কে জেরবার ‘ফিফা’। গতবছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত, ‘ফিফা’ টিকিটের বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। যেখানে রাশিয়া ২০১৮, বা কাতার ২০২২-এর টিকিটের বিক্রয়মূল্যর বিষয়ে, স্বচ্ছতা তারা দিয়েছিল প্রায় দেড় বছর আগে, সেখানে এবার আট-ন’মাস আগেও টিকিট নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছিল তারা। রাশিয়াতে ২০১৮ সালে, প্রায় দু’বছর আগে প্রেস কনফারেন্স করে, ‘ফিফা’ টিকিটের যাবতীয় বিবরণ জানিয়ে দিয়েছিল।

তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কটি হল, ‘ক্রিপটো টোকেন’। কী এই ‘ক্রিপটো টোকেন’ ? ‘ফিফা’র ক্রিপটো পার্টনার ‘মডেক্স’-এর মাধ্যমে, দর্শকদের ‘রাইট টু বাই’ টোকেন কিনতে বলে তারা। এক-একটি টোকেনের বাজারমূল্য ১০০ ডলার। প্রায় তিরিশ হাজার টোকেন বিক্রি হয়। যে-টোকেন কিনলে, তারা একটি বা দু’টি বিশ্বকাপের টিকিট, পরবর্তীকালে টিকিট বিক্রি শুরু হলে আগে থেকেই রিজার্ভ করে রাখতে পারবে। দর্শকেরা ব্যাপকহারে সে-টোকেন কেনে, টিকিট পাবার নিশ্চয়তার আশায়।

‘দ্য আটলান্টিক’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ফিফা’ প্রায় কুড়ি থেকে তিরিশ মিলিয়ন ডলার কামিয়ে নেয় এই টোকেন বিক্রি করে। কিন্তু, পরবর্তীতে যখন দেখা যায় যে, ‘ফিফা’ টিকিটের দাম অগ্নিমূল্য করে বাজারে ছেড়েছে। তখন সাধ্যের বাইরে দাম হওয়ায়, অনেকেই কিনতে অপারগ হয়। এর ফলে, ‘ক্রিপটো টোকেন’ বিক্রির টাকা, কার্যত ফোকটে ঢোকে ‘ফিফা’র পকেটে। যা নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।

এই বিশ্বকাপ শুরুর অন্তত একবছর আগে থেকেই— টিকিট বিতর্কে জেরবার ‘ফিফা’। গতবছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত, ‘ফিফা’ টিকিটের বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। যেখানে রাশিয়া ২০১৮, বা কাতার ২০২২-এর টিকিটের বিক্রয়মূল্যর বিষয়ে, স্বচ্ছতা তারা দিয়েছিল প্রায় দেড় বছর আগে, সেখানে এবার আট-ন’মাস আগেও টিকিট নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছিল তারা।

এছাড়া টিকিট বিক্রি শুরু হতে, ডিজিটাল টিকিট বুকিংয়ের সময়ে দীর্ঘক্ষণ টিকিট ‘আন-আভেলেবল’ দেখানো, টিকিট কাটার পর কনফার্মেশন না আসা, বারংবার টাকা পেমেন্ট করার পরেও, ‘এরর’ মেসেজ দেখিয়ে চলার মতো অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছে। এই সবকিছু নিয়েই আদালতে মামলা চলছে। ফিফার প্রেসিডেন্ট ইনফ্যান্টিনো, এই টিকিট বিতর্কে মুখে কুলুপ এঁটেছেন স্বাভাবিকভাবেই।

আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশে, সামান্য ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ডার্বিতে, ৩০০-৪০০ টাকার টিকিট বিক্রি নিয়ে বিতর্কেই— নাজেহাল হয়ে পড়া আমরা অনুমান করত পারি না, মার্কিন মুলুকের কেষ্টবিষ্টুরা এবং ‘ফিফা’র ক্ষমতাশীল কর্তারা, দুনিয়াজুড়ে কীভাবে দর্শকদের বঞ্চিত করে চলেছেন। ‘ফিফা’র বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক কারচুপির অভিযোগ নতুন নয়। এবারের এই টিকিট বিতর্ক, এই জালিয়াতির পুরনো আগুনে যে ঘি ঢেলে দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।