নিছক দেরি নয়
দেরি হয়ে গেলে আমরা গজগজ করি বটে, কিন্তু দেরি যে কত সময়ে প্রাণ থেকে মান বাঁচায়, কত নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ করে দেয়, সেটা ভেবে দেখা দরকার। মনে আছে, আমেদাবাদ-লন্ডন অভিশপ্ত বিমানের যে যাত্রী দেরির কারণে ফ্লাইট মিস করেছিলেন, সেই মহিলার কথা? তাই মাঝে-মাঝে দেরি হলে অত ক্ষেপে যাবেন না। ‘আগে গেলে বাঘে খায়, পরে গেলে সোনা পায়’— ছোটবেলায় শোনা কথাটা ভুলে গেলেন? আমরা অবশ্য সান ফ্রান্সিসকোতে রাত ঘনিয়ে আসায় সোনাদানা কিছু পাইনি, পেয়েছিলাম পলকে। সরকারি বাসের মাঝবয়সি ড্রাইভার পল। সে গল্পে পরে আসছি, তার আগে দেরির কারণটা বলা দরকার।
পায়ার থার্টি নাইনে দাঁড়িয়েই আমরা ঠিক করেছিলাম, ওই যে দূরে সাগরের বুকে জেগে আছে কুখ্যাত আলকাট্রাজ আইল্যান্ড, সেখানে যাব। অনলাইনে টিকিট কাটাও হল। আলকাট্রাজ সিটি ক্রুজ ফেরিতে মিনিট পনেরো লাগলেও, আসলে ট্যুরটা ঘণ্টা আড়াইয়ের। খুব অস্বস্তিকর আলকাট্রাজ, একসময়ে যা ছিল ফেডারাল বন্দিশালা। যে-সব বিপজ্জনক অপরাধীদের অন্যান্যদের সঙ্গে রাখা যাবে না, যারা জেল ভাঙতে ওস্তাদ, তাদের পাঠানো হত দ্বীপান্তরে। নামসমেত ছবিও টাঙানো আছে দেওয়ালে আল কাপোনে, মেশিন গান কেলি, রবার্ট স্ট্রাউড বার্ডম্যান, এরকম সব বন্দিরা নাকি আমেরিকার অপরাধ-ইতিহাসে এক-একটা মাইলস্টোন। সে যাকগে, আমরা ফাটাকেষ্ট, হাতকাটা ছোটন, শ্মশান স্বপন, এসব নাম শুনে অভ্যস্ত। ওইসব সাহেবি অপরাধীদের নাম শুনিনি কস্মিনকালেও। গাইডের কাছে শুনলাম, ছোট-ছোট কুঠুরিতে, অনেকসময়ে অন্ধকারে রেখে দেওয়া হত বন্দিদের। বাইরে যখন বেরতো, রোদ ঝলমলে সান ফ্রান্সিসকোর স্কাইলাইন কি হাতছানি দিত ওদের? ফেলে আসা সুখ-দুঃখের কথা কানে-কানে বলে যেত সাগরের বাতাস? রোজকার ঘরোয়া জীবনের একঘেয়েমির যে কী মায়া, তা হয়তো মানুষ বোঝে শুধু মুক্তির লক্ষ্মণরেখাটা পার হলেই।
সানফ্রান্সিসকো-কে ঘিরে রাখে রহস্যের কুয়াশা! পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৪৬…
গাইডের বলার ভঙ্গি বেশ নাটকীয়। যখন শুনলাম, সেই ১৯৩৪ সালেও সারাক্ষণ গরম জলের ঢালাও বন্দোবস্ত থাকত এই হাই সিকিউরিটি জেলখানায় এবং সে-জন্য পাম্পহাউস পর্যন্ত তৈরি হয়েছিল, ভাবলাম এ আবার কী ধরনের ‘জুতো মেরে গরু দান?’ এরপর কারণটা জেনে অবাক হলাম। বন্দিদের গরম জলে অভ্যস্ত করে দেওয়ার জন্যই এই আয়োজন, যাতে পালালেও সান ফ্রান্সিসকো বে-র কনকনে জলে, হাইপোথার্মিয়া হয়ে মারা যায় তারা। তা সত্ত্বেও নাকি বহুবার জেল-পালানোর চেষ্টা হয়েছে, একবার ছাড়া কখনওই সফল হয়নি। আর আশ্চর্যজনকভাবে সেই পলাতক তিন বন্দির হদিশ আজ পর্যন্ত পায়নি কেউ। ১৯৬৩ সালে মার্কিন সরকার বন্ধ করে দেয় আলকাট্রাজ বন্দিশালা। তারপর বছর ছয়েক ফাঁকাই পড়ে ছিল এই দ্বীপ। কিন্তু ’৬৯ সালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। দলে-দলে আমেরিকার আদি বাসিন্দারা, যাঁরা নিজেদের ইন্ডিয়ান, আমেরিকান ইন্ডিয়ান বা ফার্স্ট আমেরিকান বলেন, আলকাট্রাজ দ্বীপে পৌঁছে গেছিলেন। শুধু তাই নয়, নাগরিক অধিকারের দাবিতে দ্বীপ দখল করে রেখেছিলেন ১৯ মাস। তাই নেট ঘাঁটতে গিয়ে কারও যদি চোখে পড়ে ‘ওয়েলকাম টু ইন্ডিয়ান ল্যান্ড’ লেখা আলকাট্রাজের ছবি আঁকা পোস্টার, অবাক হবেন না। এর সঙ্গে ভারতীয়দের কোনও সম্পর্ক নেই। কলম্বাসের সেই ঐতিহাসিক ভুলের চারা রয়ে গেছে। আমেরিকায় পৌঁছে কলম্বাস ভেবেছিলেন, তিনি এশিয়ায় এসেছেন আর আছেন ইন্ডিয়ার কাছাকাছি। তাই আমেরিকার আদিবাসীদের তিনি বলেছিলেন ইন্ডিয়ান।

রোদ ঝলমলে সান ফ্রান্সিসকোর স্কাইলাইন কি হাতছানি দিত ওদের? ফেলে আসা সুখ-দুঃখের কথা কানে-কানে বলে যেত সাগরের বাতাস? রোজকার ঘরোয়া জীবনের একঘেয়েমির যে কী মায়া, তা হয়তো মানুষ বোঝে শুধু মুক্তির লক্ষ্মণরেখাটা পার হলেই।

যখন ফিরে এলাম পায়ার থার্টি থ্রির জেটিতে, আটটা বাজে। তখনও আলো ফুরোয়নি। জুলাই মাসে সাড়ে আটটার আগে সূর্যাস্ত হয় না এ-শহরে। ঘড়ির দিকে না তাকালে আমাদের মত পূবালি মানুষদের বিভ্রান্তি হয়, এই তো সবে বিকেল। তা সেই অলীক বিকেলের তাড়নায় আমাদের এক যুবক সঙ্গী খেপে উঠল, সে নাকি হো হো বাসের মাথা থেকে দেখেছিল, বিশ্ববিখ্যাত ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট শোরুম। সেখান থেকে বান্ধবীর জন্য বিশেষ কিছু উপহার কিনবে, দেশে ফিরেই বিরাট সারপ্রাইজ না দিলে নাকি গঙ্গার ভাঙনে তলিয়ে যাবে তাসের ঘর! প্রেমিক পক্ষীযুগলের হত্যাকারী ব্যাধের নিষ্ঠুরতায় উদ্বেল বাল্মীকি লিখে ফেলেছিলেন রামায়ণের প্রথম শ্লোক। কিন্তু আমরা তো সেই নির্মম ব্যাধ নই, তাই প্রেমের ফাঁদে পড়ে আমরা সবাই হৈ-হৈ করে ছুটলাম সিক্রেট অভিযানে। প্রেমিক তো ছুটে ঢুকে গেল দোকানে, আমরা থমকে দাঁড়ালাম বাইরেই। বিশাল কাচের শো-উইন্ডোর পাশে এ আবার কে? অনেকেই পোষ্য বেড়ালকে আদর দিয়ে মাথায় করে রাখেন দেখেছি, কিন্তু সত্যিই কি আর মাথার ওপর চড়ান? ইনি কিন্তু চড়িয়েছেন। মাথার ওপর রীতিমত পাখির বাসার মতো জটা তৈরি করে তার ওপর বসিয়ে রেখেছেন মোটাসোটা পার্সিয়ান ক্যাটকে। দোকানের দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে নিমীলিত চোখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছেন উলোঝুলো চেহারার মাঝবয়সি মহিলা, আর তাঁর বিড়াল চোখ গোলগোল করে ইতিউতি নজর রাখছে। এরপর আমি আর ঢুকি ওই ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট নামক চমকদার শপিং-স্বর্গে? এমনিতেই বিচিত্রদর্শন কিছু অঙ্গশোভা ততোধিক আবাক করা প্রাইস ট্যাগ লাগিয়ে ঝুলছে যেখানে, সেখানে আমার মতো মধ্যবিত্ত প্রৌঢ়ার কী-বা কাজ! ভাবলাম, তার থেকে এই বিড়ালবাহিনী দেবীর সঙ্গে আলাপটা সেরে ফেলা যাক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আলাপ বেশিদূর এগয়নি। ড্রাগের নেশায় তার সব ইন্দ্রিয় এতটাই আচ্ছন্ন যে, সামনে দাঁড়ানো আমাকেও বোধহয় অনেক বড় একটা বেড়াল ভাবছিল। নয়তো মুঠো খুলে ক্যাট ফুড দেখিয়ে কাছে ডাকবে কেন?
যাই হোক, প্রেমিক যুবক তো বিশ্বজয়ীর ভঙ্গিতে হাতে একটা পুঁচকে প্যাকেট ঝুলিয়ে বেরিয়ে এলেন দোকান থেকে। এতক্ষণে সন্ধে নেমেছে। এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, ও হরি, সাড়ে ন’টা বাজে। দৌড়, দৌড়, ফিরতে হবে সান হোসের মোটেলে। কিছুক্ষণ উবের বুকিঙের বৃথা চেষ্টা করে বাসে উঠে পড়লাম সবাই মিলে। কী ভিড়, পুরো অফিস টাইমের কলকাতা। কন্ডাক্টর থাকে না এখানকার বাসে। কার্ড বা ক্যাশে ভাড়া নেন চালকই। এই বাসটা যাবে পাতালরেলের স্টেশন পর্যন্ত। সেখান থেকে দু-তিনটে স্টেশন পেরিয়ে নেমে আবার ক্যাব ধরতে হবে। ততক্ষণে বুঝে গেছি, কিছু একটা ভুল করে ঘুরপথে ফিরছি আমরা। টেনশনে আমরা ক্ষণে-ক্ষণে ড্রাইভার এবং সহযাত্রীদের বিরক্ত করতে লাগলাম, ঠিক জায়গা এলে যেন বলে দেয়। হঠাৎ বাস থামিয়ে ড্রাইভার পিছন ফিরে বলল, ‘ডোন্ট ওরি। আই অ্যাম পল ফ্রম দ্য ক্যারিবিয়ান্স। আমি তোমাদের ট্রেনে তুলে দেব। আগে আমার মায়ের সঙ্গে আলাপ কর।’ আমরা অবাক। মা তো বাড়িতে আছেন নিশ্চয়ই। আর বাসটা থামিয়ে নেমেই-বা গেল কেন? বাসের অন্য যাত্রীদের কিন্তু হেলদোল নেই। কতজন তো দাঁড়িয়ে আছেন রড ধরে। কেউ একবারও বলছেন না, ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে, আপনি মস্করা করছেন এই রাতে?’ মানে কলকাতা হলে যা বলত সেটাই বললাম। দেখি, জানালা দিয়ে পল ডাকছে আমাদের, দরজার কাছে যেতে বলছে। গেলাম ভিড় ঠেলেঠুলে। ফুটপাথে দাঁড়ানো ফুলছাপ ফ্রক পরা এক কৃষ্ণাঙ্গী বৃদ্ধা হাসিমুখে হাত নাড়লেন। তাঁর হাত থেকে একটা টিফিনকৌটো নিয়ে মাকে ঘিরে একপাক নেচে নিল পল। তারপর বাই করে আবার এসে স্টিয়ারিঙে বসল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই রুটে যাই রোজ। মা দাঁড়িয়ে থাকে খাবার নিয়ে। মাই ডারলিং মম।’ আমার চোখে জল চলে এল। কিন্তু এই কথাটায় তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া দেখলাম না বাসের কারও। তারা যেমন বই পড়ছিল, পাশের লোকের সঙ্গে কথা বলছিল বা শুধুই বাইরে তাকিয়ে ছিল, তেমনই রইল। অবাক হওয়া অবশ্য বাকি ছিল তখনও। ইতিমধ্যে বাস প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। আমাদের স্টপ আসতে আবার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল বাসের। আমাদের হাতের ইশারায় নামতে বলে পলও নামল। একটু হেঁটে গিয়ে পাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি নামব তোমাদের সঙ্গে না তোমরা পারবে যেতে?’ আমরা তো হাঁ হাঁ করে উঠলাম, ‘ভাবে তোমাকে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না। প্লিজ তুমি বাস নিয়ে যাও। এখনও কজন যাত্রী আছেন। তাঁদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ পল মুচকি হেসে বলল, ‘রোজ রোজ তো হয় না। তোমাদের কেমন যেন বন্ধু মনে হল।’ বলেই হাতের বিশাল পাঞ্জাটা তুলে বাই বলে চলে গেল। সেই যে প্রথমেই বলেছিলাম, দেরি সবসময় খারাপ না। দেরি হয়ে গেল বলেই তো মনে রাখার মতো বাস ড্রাইভার পলের দেখা পেলাম। তার মায়ের হাসিমুখ এঁকে দিল একটা সুখী গৃহকোণের ছবি।

সে-রাতে আরও ঝামেলা হয়েছিল, তবে বলার মত তেমন কিছু নয়। গভীর রাতে (সান হোসের মত কেজো শহরের জন্য সাড়ে দশটা অনেক রাত) পাতাল স্টেশনের বাইরে বেরতেই দুয়ারে রথ টাইপের কালো ক্যাব, দেবদূতের মতো সাহেব ক্যাবচালকের উদয় এবং শেষমেষ তিনগুণ ভাড়া দিয়ে মোটেলে ফেরা, কোথাও খাবারের দোকান খোলা না পেয়ে পাশেই ছোট্ট সেভেন ইলেভেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে ঠান্ডা পিৎজা ভক্ষণ, সারা রাত পরিযায়ী পরিবারের ঝগড়ায় দু’চোখের পাতা এক করতে না পারা (ট্রাম্প এই অনুপ্রবেশকারীদের ওপর মোদির মতই খাপ্পা, তবু এরা সারা আমেরিকাতেই আছে) ইত্যাদি। তবে পরদিন সকালে, লাস ভেগাস যাত্রায় বিমান বিভ্রাটের তুলনায় সেসব নস্যি। সেই কাহিনি আগেই বলে দিয়েছি। অনেকে আমাকে ফোন করে বলেছেন, ‘যাঃ, যতসব বানানো গল্প, আমেরিকায় প্লেনের নাটবল্টু ঢিলে হয়ে রানওয়ে থেকে ফিরে আসে, এ আবার হয় নাকি?’ আমি বলি, ‘হয়, হয়, জানতি পারো না।’ তৃতীয় বিশ্বের সব খারাপ আর ফার্স্ট বয়ের সব ভাল, এই বাইনারি মিথ্যে। যাই হোক, পচুর উদ্বেগ, রাগারাগি, হতাশা পেরিয়ে যখন প্লেনে উঠলাম, মনটা সত্যিই উড়ুউচু হয়ে গেল। লাস ভেগাস যাচ্ছি বলে কথা! লোকে আদর করে নাম দিয়েছে, ‘সিন সিটি’, পাপের শহর। সেখানে পা রাখার আগে কিছু খুচরো পাপের মাশুল গুনে যেতে হবে না? আমাদের ভোগান্তি সে-রকমই কিছু, ভেবে নেওয়াটাই ঠিক। মনে পড়ল চলতি শতাব্দীর গোড়ায় পর্যটক টানতে তৈরি হয়েছিল নতুন মার্কেটিং স্লোগান, ‘হোয়াট হ্যাপেনস ইন ভেগাস, স্টেস ইন ভেগাস।’ মানে, ট্যুরিস্টদের লোভদেখানো যে ভেগাসে যে চটুলতায় মাতবে, যে বেপরোয়া কীর্তি করবে, যে লাগামছাড়া ফুর্তিতে ভেসে যাবে, তার রেশ পৌঁছবে না বাইরের আটপৌরে জগতে। নিশ্চিন্তে মস্তি করো, ভেগাস সমুদ্রের মতো নয়, যা নেয় তা ফেরত দেয় না কখনও। তাহলে সেই পাপের দুনিয়ায় ডুব দেবার আগে ভালমানুষীর খোলসটা অন্য কোথাও ছেড়ে যাওয়াই উচিত কি না?


