উল্টো দূরবিন: পর্ব ২১

Representative Image

খাতা পোড়ানোর বিপ্লব

মশলা মাখিয়ে, মাংস-টাংসকে তেলে নাড়িয়ে-নাড়িয়ে নরম করাকে বলে, কষানো। অঙ্ক করাটাকে কেন অঙ্ক কষা বলা হয়, আজও জানি না। অঙ্ক ব্যাপারটাকে, বেশ রসিয়ে-রসিয়ে কষানোর ব্যাপারে পারঙ্গম মানুষ, যুগে-যুগে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। আমাদের ‘কাশিমবাজার স্কুল’-এ ছিলেন, শ্যামল ঘোষ, প্রবীর মিত্র। পরে ‘হেয়ার স্কুল’-এ, পার্থ, অঞ্জন, উৎপল, ইন্দ্র, শশী— এইসব ভাল-ভাল ছেলেরা, অঙ্কের মধ্যে একটা অ্যাস্থেটিক মজা পেত। আমি তো পেতাম না, তবু আমাকে বিজ্ঞান নিয়েই পড়তে হয়েছিল। বাবার বাসনা ছিল, আমি আমার অকালপ্রয়াত ইঞ্জিনিয়র কাকার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারব। বাবার মনোবাসনা পূরণ করতে পারিনি।

অঙ্কে, ‘সরলঅঙ্ক’ নামে একটা ব্যাপার ছিল; সেটা ছিল সবচেয়ে ‘জটিল’। কেন যে এত জটিল অংকের নাম, ‘সরলঅঙ্ক’, জানি না। আর অ্যালজেব্রার ব্র্যাকেট, দ্বিঘাত-ত্রিঘাত সমীকরণ ** ২ বিজ বিজ-করছে। একবার, অঙ্কখাতায় লিখে ফেলেছিলাম, ‘হ্যাবড়া জেব্রা আলজেব্রা/ আলু-কুমড়োর পচা লাবড়া / তার উপরে ভনর-ভনর xyz মাছি। অঙ্কখাতায় এমনি করেই আছি।’

‘হরনাথ স্কুল’-এ একজন অঙ্ক-স্যরের নাম ছিল, ‘বোম’। কারণ, অঙ্ক-ক্লাসের শুরুতে বলে নিতেন, ‘ব্যোম কালী’। দেবকিঙ্করবাবু ছাড়া, আর-একজন স্যর ছিলেন, তাকে পুঁটকি বলে ডাকা হত। কারণ উনি দশমিক না বলে, বলতেন পুঁটকি। ছয় দশমিক দুই না বলে, উনি বলতেন ছয় পুঁটকি দুই।

আমাদের স্যর ফিসফিসিয়ে বলেছিলেন, নেজাজির সঙ্গে ওঁর যোগাযোগ আছে!
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ২০…

‘কাশিমবাজার স্কুল’-এ আরও কয়েকজন স্যরের কথা মনে পড়ে। ইংরেজি পড়াতেন, প্রণববাবুস্যর, কোন ক্লাসে মনে নেই। একটা র‍্যাপিড রিডার ছিল, ‘কিং লিয়ার’। ক্লাস ফাইভে এবিসিডি, ‘কিং লিয়ার’ কী করে হতে পারতো— ক্লাস সেভেন, কিংবা এইটে, মাথায় আসে না। ইংরেজি পড়ানোর আরও স্যর ছিলেন। কিন্তু প্রণববাবুকে মনে আছে, তার নাটকীয় ভঙ্গিতে পড়ানোর জন্য। সাত বছর পরও, মনে রেখেছি— ‘নাথিং উইল কাম অফ নাথিং।’ কী আশ্চর্য কণ্ঠস্বর এবং স্বরক্ষেপণ। এই কথাটার মানেটাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বৃদ্ধপিতার হাহাকার কী আশ্চর্যভাবে ফোটাতেন— আমাদের বালক বয়সের মনে।

দু’জন বাংলাস্যরের কথা মনে পড়ে। একজন ছিলেন খানবাবু, অন্যজন জীবনবাবু। জীবনবাবু ভারি সুন্দর বাংলা পড়াতেন। ‘হাট’ কবিতায়, হাট ভেঙে যাবার পর, শূন্য-হাটের হাহাকার আমাদের মনে সঞ্চারিত করে দিতে পারতেন। উনিই প্রথম আমাদের কাছে, জীবনানন্দ দাশের কথা বলেন; আমরা তখন ক্লাস সেভেন, ‘রূপসী বাংলা’ থেকে একটি কবিতা পড়ে শোনালেন। আমরা খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। জীবনানন্দের কবিতা আমাদের সিলেবাসে ছিল না। একদিন ‘বোধ’ কবিতাটা পাঠ করলেন, কিছুই বুঝলাম না তেমন। কবিতা এরকমও হতে পারে? একদিন ‘দ্য হলো মেন’ কবিতাটা একটুখানি পড়লেন। একটু ব্যাখ্যাও করলেন। ওটা টি এস এলিয়টের।

জীবনবাবুই, আমাদের অনেকের মনে সাহিত্যের রস ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। জীবনবাবু বলতেন, রচনা-বই থেকে কোনও রচনা মুখস্থ করে লিখবি না। মানে-বই থেকে প্রশ্নের উত্তর লিখবি না। ওগুলো সব বানিয়ে-বানিয়ে লেখা! নিজের যা মনে হয়, লিখবি। অন্যের যা মনে হয়, সেটা তুই লিখবি কেন? এই জীবনবাবুর সঙ্গে একবার কী দুর্ব্যবহার করেছি ভাবলে, নিজের উপর হাসি পায়। ক্লাস সেভেনের হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায়, বাংলায় বেশিরভাগ ছেলে ফেল করল। হাইয়েস্ট উঠল ৩৮, আমি বোধহয় ৩২। আমার মধ্যে বিপ্লবীপনা জেগে উঠল। এই বিপ্লবীপনার জন্য— একটু হলেও দায়ী হরিপদ কুশারী স্যর, উনিই তো ভূগোল পড়াতে গিয়ে ইতিহাস পড়িয়েছেন, উনিই তো ’৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’, ‘তাম্রলিপ্ত স্বাধীন সরকার’, ‘নেতাজী’, ‘চে গুয়েভারা’…

আমাদের খাতা ফেরত দেওয়া হত, যাতে নিজেদের ভুলগুলো ধরতে পারি। আমরা বিপ্লবীপনা করলাম। ক্লাসের মধ্যে সব খাতা জড়ো করে, আগুন দিয়ে দিলাম। এই খাতা পোড়ানোর বিপ্লবে, নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি এবং শিবব্রত। ‘এইভাবে ফেল করানো চলবে না, চলবে না’ স্লোগানের মধ্যে— খাতায় আগুন ধরানো হল। কাগজের পোস্টারে লেখা হল, ‘ফেল করানো মানছি না।’ শিবব্রত ভাল আঁকতে পারত, ও কিছু একটা কার্টুন করেছিল। একটা পোস্টার, ক্লাসরুমের সামনের বারান্দায়, আর-একটা পোস্টার, স্কুলের গেটের সামনে লাগানো হল। কয়েকজন স্যর চলে এলেন। তারপর হেডস্যর; হেডস্যর এসে প্রথমেই— সবাইকে ক্লাসে ঢুকিয়ে, কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। ড্রিলস্যর চলে এলেন। হাতে বেত। আমাদের মনিটর ছিল মণিলাল। হেডস্যর জিজ্ঞাসা করলেন, খাতা পোড়ানোর ব্যাপারটা কার মাথায় প্রথম এল? মণিলাল আমায় আঙুল তুলে দেখাল। আমি ক্ষুদিরামের মূর্তির মতো মাথা উঁচু করতে গেলাম, কিন্তু মাথাটা নীচুই হয়ে গেল, ঝুলে পড়ল। হেডস্যর বললেন, তোমার বাবাকে একটা চিঠি দিচ্ছি, চিঠিটা সই করিয়ে কালকেই আমাকে ফেরত দেবে।

এই খাতা পোড়ানোর বিপ্লবে, নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি এবং শিবব্রত। ‘এইভাবে ফেল করানো চলবে না, চলবে না’ স্লোগানের মধ্যে— খাতায় আগুন ধরানো হল। কাগজের পোস্টারে লেখা হল, ‘ফেল করানো মানছি না।’ শিবব্রত ভাল আঁকতে পারত, ও কিছু একটা কার্টুন করেছিল। একটা পোস্টার, ক্লাসরুমের সামনের বারান্দায়, আর-একটা পোস্টার, স্কুলের গেটের সামনে লাগানো হল।

দারোয়ান মথুর এসে, চিঠিটা দিল। খামে। বাবাকে দিলাম, বাবা আমার কান ধরে, পরপর কয়েকটা চড় দিলেন কষে!
পরদিন জীবনবাবু ক্লাসে পড়াতে এলেন, মুখে মুচকিহাসি। ওইসব প্রসঙ্গ তুললেন না আদৌ, যেন কিচ্ছু জানেন না। যেন কিছুই ঘটেনি। যেমন পড়ান তেমনি পড়ালেন। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় উনিই প্রশ্ন করলেন, খাতা দেখলেন। কম-কম নম্বর পেলাম ঠিকই, কিন্তু দু’তিনজন ছাড়া সবাই পাস করে গেলাম।

আমাদের সময়ে, অনেক স্কুলেই একটা প্রথা ছিল— গ্রীষ্মের ছুটির আগে, ক্লাসে ডেকে স্যরদের খাওয়ানো। সমস্ত স্যরদের হয়তো ডাকা হত না, ক্লাসটিচার তো বটেই, এবং অন্যান্য যাঁরা আমাদের ক্লাস নিতেন। ড্রিলস্যর এবং ড্রয়িং স্যর, সমস্ত ক্লাসেই নিমন্ত্রিত থাকতেন, কারণ একজন ড্রয়িংস্যর এবং একজন ড্রিলস্যরকেই, সমস্ত ক্লাসগুলো করতে হত।

ড্রইংস্যর রাজেনবাবুর কথা বলতে ভুলেই গিয়েছি। ক্লাস ফাইভ থেকে, ড্রইং ছিল ক্লাস এইট পর্যন্ত। আমরা, ‘আম’, ‘কলা’, আর ‘পেঁপে’ আঁকতে শিখেছিলাম। স্যর বোর্ডে ‘পেঁপে’, ‘কলা’ এঁকে বলতেন, দেখে-দেখে আঁকো। আমরা তাই করতাম, সে তো পাঁচ-সাত মিনিটেই হয়ে যেত। বাকি সময় নিজেরা গল্প করতাম। স্যর বলতেন, গল্প করতে পারো, কিন্তু আস্তে। স্যর বসে-বসে, একটা খাতায় কী সব লিখতেন, আর উদাস-উদাস চাহনিতে, কড়িকাঠ, ফ্যান, দেওয়ালের ঝুল, বা অন্য বাড়ির ঝুলবারান্দা দেখতেন।

অনেক পরে, যখন আমি যখন ‘আকাশবাণী’তে, রাজেনবাবুর সঙ্গে দেখা। উনি ‘আকাশবাণী’র অ্যাপ্রুভড লিরিসিস্ট। মানে, ওঁর লেখা গান, ‘আকাশবাণী’র শিল্পীরা গাইতেন। উনি আধুনিক গান লিখতেন। আমি দেখেছি, কী রোমান্টিক গানগুলো সব! ‘আমি একেলা বসে রয়েছি এই নিরালায়,/ তুমি কাছে এসো এই বিকেল বেলায়…’, ‘তুমি আছো অন্য বাড়ি, কত আর সইতে পারি’— এই ধরনের সব গান। রোগা, সিড়িঙ্গে, টাকমাথা, রসকষহীন একটা চেহারার লোকটা কেবল ‘কলা’ আর ‘পেঁপে’ আঁকলেন, তাঁর ভিতরে-ভিতরে এত রসের প্রবাহ! মানুষকে দেখে কিচ্ছু বোঝা যায় না। যাকগে, আগের কথায় ফিরে যাই! ‘স্যর খাওয়ানো’। পরে ‘হেয়ার স্কুল’-এ দেখেছি, এই প্রথাটার নাম সোশ্যাল। কাশিমবাজারে, ‘স্যর খাওয়ানোই’ বলা হত। আমরা চাঁদা তুলতাম, কোনও-কোনও বড়লোক বন্ধু, দু-একটা আইটেম বাড়ি থেকে নিয়ে আসত। এখনকার ভাষায়, স্পন্সর করত। গুপীনাথ শীল, শিবনাথ শীলদের বাড়ি থেকে একটা আইটেম আসত। তখন তো থার্মোকল ইত্যাদি ছিল না, শালপাতার থালায় সাজিয়ে দিতাম— লিচু, সন্দেশ, কেক— এইসব। মাটির ভাঁড়ে, অরেঞ্জসিরাপ ঢেলে, শরবত দেওয়া হত। বেশিরভাগ স্য রই, খাবারগুলি ছাঁদা বেঁধে বাড়ি নিয়ে যেতেন। আমরা বলতাম, ‘আমাদের সামনে খান স্যর, চোখে দেখলে, তৃপ্তি হবে।’ এইসব ডায়লগ কোত্থেকে শিখতাম কে জানে!

বাবার কেন যে মনে হয়েছিল— ‘কাশিমবাজার স্কুল’ থেকে ‘হেয়ার স্কুল’ অনেক ভাল! ওখানে ভাল ছেলেদের সঙ্গে পড়াশোনা করলে, আমি আরো ভালো ছেলে হয়ে উঠব, এবং আমি বাবার হারানো ইঞ্জিনিয়র ভাইয়ের অভাব পূরণ করতে পারব। বাবা নিজের স্কুলের শিক্ষক হয়েও, এটা বুঝতে পারলেন না যে— বেশি ভালোর দঙ্গলে, আমি হারিয়ে যেতে পারি! ‘অতি বেশি ভাল’র দলে, আমার মতো ‘অত ভাল নয়’, মোটেই পাত্তা পাব না।