ডেটলাইন: পর্ব ৪৬

Representative Image

কুয়াশা যখন তখন

চিরকুটটা হাতে পেয়েই কু ডেকেছিল মন, দিনটা আজ ভাল যাবে না। কিন্তু খুব ভাল যাওয়ার কথা। একটু আগেই চেপে বসেছি হো হো বাসে, মানে হপ অন হপ অফ বাসকে আদর করে এই নামেই ডাকে ট্যুরিস্টরা। যেখান থেকে খুশি ওঠো, যেখানে খুশি নামো, আবার ওঠো পরের কোনও বাসে, এইভাবে সারাদিন ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াও শহর তোলপাড় করে; ইউরোপ-আমেরিকায় এরই নাম হো হো বাস। তো সেই টুকটুকে লাল দোতলা বাসের খোলা ছাদে জমিয়ে বসে, কেন খারাপ যাবে আমার এই রোদেলা দিনটা? ‘আ মোলো যা’ বলে দলামোচা করে ফেলতে যাব কাগজের টুকরোটা, আমার মেয়ে হাঁ হাঁ করে উঠল, ‘রেগে গিয়ে রাস্তা নোংরা করলে পুলিশে ধরবে এখানে। তার থেকে পকেটে রেখে দাও। দেখো না মেলে কিনা!’ ব্যাজার মুখ করে অগত্যা জিন্‌সের পকেটে গুঁজলাম সেই কাগজ। হোটেলে, বাসে, ট্রেনে ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক দেয় দেখেছি, এখানে বাসে দেয় কুকিজ। যে সে কুকিজ নয়, এর নাম ফরচুন কুকিজ। ছোট্ট প্লাস্টিকে মোড়া সেই খাস্তা বিস্কুটে কামড় দিতেই, উঁকি দিল একটা চিরকুট। তাতে লেখা দেখলাম, ‘ফগি ডেজ অ্যাহেড।’ কেন রে বাপু, সানি ডেজ লিখতে কী হয়েছিল? আশেপাশের বাচ্চাবুড়ো সবাই দেখি কুকিতে কামড় দিচ্ছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে, কারটাতে কী লেখা দেখার জন্য ঝুঁকে পড়ছে একে অন্যের ওপর। তখন তো আর জানি না, সান ফ্রান্সিসকোর মানুষের কাছে কুয়াশা ব্যাপারটা দারুণ রোম্যান্টিক!

‘কুয়াশা যখন’ বলে নয়ের দশকে দূরদর্শনে একটা সিরিয়াল খুব হিট হয়েছিল, সেই সঙ্গে মুখে-মুখে ফিরত নচিকেতার গাওয়া এর টাইটেল সংটা। সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট ব্রিজ দেখলে বলতে ইচ্ছে করবে, কুয়াশা যখন তখন। রোদ ঝলমলে স্পষ্ট গোল্ডেন গেট দেখা অনেকটা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মতো। কতদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পুরো বিজ দেখতে পাবেন না। কোথা থেকে যেন কুয়াশার পর্দা এসে ঝুলে থাকবে অর্ধেক সেতুর মাথায়। তবে এই কুয়াশা আমাদের মতো অধৈর্য ট্যুরিস্টদের কাছে হতাশার হলেও, এখানকার লোক কুয়াশা নিয়ে খুবই আবেগপ্রবণ।

সারা পৃথিবীর পুতুলনাচের সুতো বাঁধা সিলিকন ভ্যালির রঙিন অফিসগুলোতে! পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৪৫…

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কুয়াশা তৈরি হওয়ার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে। ছোট ক্লাসের ভূগোল বইয়ের সোজা ভাষায় বলতে গেলে, উষ্ণ হাওয়া ঠান্ডা জলের সংস্পর্শে এসে ওপরে ওঠার সময় বাষ্প তৈরি হয়। সেটাই পশ্চিমা বাতাসে কুয়াশার মত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তার বাইরেও এই শহরের মানুষ বিশ্বাস করে, আইকনিক গোল্ডেন গেটের অধরা মাধুরীই এর আসল আকর্ষণ ‘সব পেলে নষ্ট জীবন’। নাহলে কি আর তারা নিজেদের শহরকে বলে ‘the cool grey city of love!’ এই কুয়াশার কারণেই ব্রিজের রং অমন উজ্জ্বল কমলা, যাতে দূর থেকে নজরে পড়ে জাহাজের। এটা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ‘ফোটোগ্রাফড ব্রিজ’ ক্যামেরার লেন্সে ঐ অবগুণ্ঠিতাকে বেশ রহস্যময় লাগে। আমরাও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম, যদি চকিতে ঘোমটা সরে যায়, একঝলক দেখা যায় সম্পূর্ণ বিজের অবয়ব, কিন্তু না, সে-সৌভাগ্য হল না। ওই যে ফরচুন কুকিজে লেখা ছিল ভবিষ্যৎ-বাণী, ফগি ডেজ ডাকছে আমাকে! তবে সত্যি বলছি, গোল্ডেন গেট ব্রিজের এই ‘শুধু আধোখানি ভালবাসা’ মন্দ লাগেনি আমার। যদিও সহযাত্রীদের ভয়ে সে-কথা বলতে পারিনি।

গোল্ডেন গেট ব্রিজ

কুয়াশা ছাড়া আর যে-রহস্য সান ফ্রান্সিসকোতে ট্যুরিস্টদের অবাক করে দেয়, তা হল যখন-তখন কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার দাপট। এটা নিয়েও বেশ গর্বিত এখানকার মানুষ। এটা নাকি প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা। যাকে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘চিমনি এফেক্ট’ বলা হয়। কুয়াশার নেপথ্যে যে-কারণ, এর পিছনেও তাই। ঠান্ডা প্রশান্ত মহাসাগর আর গরম ক্যালিফোর্নিয়ার ডাঙার সংঘাত। দিনের বেলা, বিশেষ করে দুপুরের পর ডাঙার গরম বাতাস সমুদ্রের ওপর থেকে ঠান্ডা হাওয়াকে চিমনির মতো টেনে আনে শহরের ভেতর। উপকূলের পাহাড় আবার তাতে বাধা সৃষ্টি করলে, বাতাস বইতে থাকে গোল্ডেন গেটের ভেতর দিয়ে। হোসপাইপের মুখে আঙুল চেপে ধরলে যেমন আরও তোড়ে জল ছিটকে আসে, তেমন ঐ উতল হাওয়ার বেগ বেড়ে যায় সরু জায়গা দিয়ে বেরোতে গিয়ে। এতসব তথ্য জেনে কে আর বেড়াতে যায় বলুন! তাই জুলাইয়ের গরমে সারা সকাল হাঁসফাস করে ঘুরে, হঠাৎ বেলা দুটো নাগাদ এমন হাড়কাঁপানো হাওয়ায় নাকচোখ থেকে জল বেরনো, হতবাক তো হবই। এখানকার লোকেরা দিব্যি হুডি, জ্যাকেট বার করে গলিয়ে নিচ্ছে দেখছি। আমরা কী করব? এরকম হাওয়ায় এমনি ঘুরলে নিউমোনিয়া হবে নির্ঘাৎ! অগত্যা হো হো বাস থেকে নেমে কাঁপতে-কাঁপতে এগোলাম জ্যাকেটের সন্ধানে। আবার কোথাও থেকে এরকম বাসে উঠে যাব না হয়! বড় দোকানে ঢুকে টাকা নষ্ট করার মানে হয় না কয়েক ঘণ্টার জন্য। আরেক চিন্তা, যাই কিনি তাকে তো সুটকেসে ভরে নিতে হবে। আগেই ঠিক করেছিলাম, লাঞ্চ করব বিখ্যাত চায়না টাউনে। সেদিকেই হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার ধারে হকার তো পাবই। পেলামও। দেওয়ালের গায়ে হ্যাঙার ঝুলিয়ে বিক্রি করছে জ্যাকেট। আমরা পুরো গড়িয়াহাট স্টাইলে দরদাম শুরু করলাম। ‘দেখো ভাই, চারটে নেব, দাম তো কমাতেই হবে।’ জানি না, আমাদের এই অসামান্য স্মার্টনেসে চমকিত হয়ে নাকি দরদামই এখানকার দস্তুর বলে, একটু পরেই রণে ভঙ্গ দিল অথবা দেওয়ার ভান করল দোকানি। অবিকল আমাদের চেনা হকার দাদার মতই বলল, ‘জিতে গেলেন, এত কমে কারোকে দিই না।’ শুধু দিদি বা বৌদি ডাকটা বাদ রইল। জয়ের হাসি মুখে ঝুলিয়ে রংবেরঙের জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে আমরা হাঁটা লাগালাম চায়না টাউনের দিকে।

এই রাস্তাটার পোশাকি নাম গ্রান্ট অ্যাভিনিউ। মুখে-মুখে চায়না টাউন। আমেরিকার সবচেয়ে পুরনো চায়না টাউন বলেই এত বিখ্যাত। ড্রাগন গেট, প্যাগোডার মতো রেস্তোরাঁ, মাথার ওপর ঝোলানো লণ্ঠন দেখে যে কেউ বুঝবে, ঠিক ঠিকানায় এসেছি। কিন্তু কোন রেস্তরায় ঢুকবো তা নিয়ে তো কোনও হোমওয়ার্ক করে আসিনি। একটু ভেতরে হেঁটে গিয়ে পুরনো ধাঁচের অথেন্টিক দেখতে একটায় ঢুকলাম। এখানে ভাগ্যিস ওয়েলকাম ফরচুন কুকি দেয়নি, চাইনিজ গ্রিন টি দিল। চিনে ম্যানেজার আপ্যায়ন করে বলল, ‘গুড অ্যাপেটাইজার।’ স্বাদ-গন্ধ কিছু পেলাম না অবশ্য, তবে এক টি পট ভর্তি গরম জল হিসেবে মন্দ না! আমরা ঠিক করলাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সব তোলা থাক আমাদের কলকাতার চেনাশুনো চায়না টাউনের জন্য। এখানে টিপিক্যাল মিক্সড চাউ আর চিলি চিকেনই ভাল। আর শুনেছি সান ফ্রান্সিসকোর ডিম সাম ভাল, সেটা এক প্লেট নেওয়া যেতে পারে। খাবারটা আহামরি না হলেও, মন্দ ছিল না। খেয়েদেয়ে আবার হাঁটা, বেরিয়েই কেবল-কারে চেপে যাব, ফিশারম্যানস ওয়ার্কে। বেরনোর মুখে চোখ আটকে গেল সাইনবোর্ডে গোল্ডেন গেট ফরচুন কুকি ফ্যাক্টরি। ও হরি, এই সেই জ্যোতিষ-কুকির কারখানা!

কেবল-কার

সান ফ্রান্সিসকোর অনেক আশ্চর্যের মধ্যে একটা এই কেবল-কার। সেই ১৮৭৩ সাল থেকে চলছে। পরে আমেরিকার অনেক শহরে চালু হলেও, বেশিরভাগ জায়গাতেই কালের নিয়মে বন্ধ হয়ে গেছে। সান ফ্রান্সিসকো কিন্তু আঁকড়ে রয়েছে সেই ঐতিহ্য। কলকাতার ভালবাসার ট্রামের মতো। গোটা তিনেক রুটে চলে। তবু তো চলে শহরের রোম্যান্টিক মনটার ছবি এঁকে, ‘নড়িতে নড়িতে’। সান ফ্রান্সিসকো শহরটা যেহেতু পাহাড়ি, তাই প্রচুর চড়াই-উতরাই পথ। এক একটা রাস্তা এমন খাড়া যে— বাস কীভাবে যাবে ভেবে ভয়ে চোখ বুজে ফেলবেন। ব্র্যাডফোর্ড স্ট্রিট হল সবচেয়ে খাড়াই, ট্যুরিস্টদের কাছে রীতিমত দ্রষ্টব্য। আর লমবার্ড স্ট্রিটে সবচেয়ে বেশি বাঁক আছে। আসলে গাড়ি চলার সুবিধার জন্য খাড়া রাস্তাকে এভাবে ম্যানেজ করা হয়েছে। মনে আছে, হো হো বাসের ছাদ থেকে দেখেছিলাম, এরকম একটা রাস্তার ধারে দোতলা বাড়ির জানালা থেকে একজোড়া পা বেরিয়ে আছে, লাল টুকটুকে স্টিলেটো পরা দুর্ধর্ষ লাস্যময়ী পা। মানুষ নয় অবশ্য, মানেকুইনের। আমার কেন যেন মনে হল, এমন একজোড়া পায়ের মালিক এই পৃথিবীতে একজনই হতে পারেন চির-রহস্যময়ী, চির-বিষণ্ণ, চির-যুবতী মেরিলিন মনরো।

যাই হোক, কেবল-কারে ওঠানামার সময়ে আবার মনরোর কথা ভাববেন না! ওঠার পর খুব সাবধানে হাতল ধরে থাকবেন। আচমকা ঢালু বেয়ে নামলে মুশকিল হতে পারে। আর কেবল কার থেকে নামার সময়েও সাবধান। খেয়াল রাখবেন, সবুজ ক্রস দেওয়া সিগন্যাল আপনাকে রাস্তা পেরোতে বারণ করছে আর কেবল-কারকে বলছে, এগিয়ে যাও। কায়দা করে হাতল ধরে ঝুলে ছবি তোলার লোভ হবেই। তুলুন, কিন্তু কেবল কার দাঁড়ানো অবস্থায়।

ফিশারম্যানস ওয়ার্কে গেলে পেটে খিদে নিয়ে যাওয়া উচিত। এত সি ফুডের রেস্তরা, এমনভাবে সাজানো কাঁকড়া, গলদা চিংড়ি, স্কুইড, আরও কত নাম-না-জানা সামুদ্রিক প্রাণী, বেছে দিলেই কিছুক্ষণের মধ্যে পাতে চলে আসবে। কিন্তু আমরা সদ্য পেট পুরে খেয়েছি চায়না টাউনে, ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং ছাড়া এই মুহূর্তে উপায় নেই। ছুটির দিন তো বটেই, এই পায়ার থার্টি নাইনে কাজের দিনেও বিকেল পড়তেই খুব ভিড়। ফ্যামিলি ক্রাউড আর ট্যুরিস্ট। কোথাও ড্রামস, কোথাও গিটার, কোথাও মাউথ অর্গান বাজিয়ে দুটো পয়সা রোজগার করছে অল্পবয়সি ছেলেরা। এখন কিন্তু আর সেই কনকনে হাওয়ার দাপট নেই। বরং সমুদ্রের খোলা বাতাসে খুব আরাম লাগছে। দুপুরের জ্যাকেট বিকেলে হয়েছে বোঝা। পায়ারের একপ্রান্তে খুব ভিড়। সি লায়ন দেখার। কাঠের জেটিগুলোর ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকে ওরা। সাঁতারও কাটে দল বেঁধে। দেখার আগেই ওদের ডাক শুনবেন। মনে হয় ঝগড়া করছে। সারা বছর ওরা থাকে এই পায়ারের সামনে, কখনও সংখ্যায় বেশি, কখনও কম। এদিকে বিকেল পড়ে আসছে। এখন সূর্য ডোবার পালা। আমরা দাঁড়ালাম জেটির ধারে। একসময়ে এই ফিশারম্যানস ওয়ার্ফ ছিল মাছ ধরার ব্যস্ত বন্দর। এখন শুধুই বেড়ানোর জায়গা। আর কুয়াশার আড়াল নেই। দূরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গোল্ডেন গেট ব্রিজ। আকাশছোঁয়া কমলা সেতুর পিছনে কমলা অগ্নিগোলক— শঙ্খ ঘোষ কি একেই বলেছিলেন, ‘হলুদডোবানো সন্ধ্যাবেলা’?