উল্টো দূরবিন: পর্ব ১৫

কবিতার মুহূর্ত

এর মধ্যে আমাকে বোধহয় একটু-একটু কাব্যরসে ধরে ফেলেছিল। কাশিমবাজার স্কুলের ম্যাগাজিনে, ক্লাস সিক্সেই বোধ হয় একটা কবিতা ছাপা হয়ে গিয়েছিল— নাম ‘ঝড়’। কয়েকটা লাইন আজও মনে পড়ে—

‘ঝড় উঠেছে, আজ করব না রে কাজ
ডালপালা সব ভাঙছেরে মড় মড়
মেঘগুলো সব ডাকছেরে ঘড় ঘড়
ও রাখাল গরু চরাস নে রে আজ।
সূয্যিমামা পালিয়ে গেল কালো মেঘের ভয়
গুড়ুম গুড়ুম ঘুর কত রকম সুর
মেঘেরা কথা কয়।’

রাঙাদা খুব খুশি হয়েছিল। আমাকে ‘শুকতারা’ পত্রিকার গ্রাহক করে দিয়েছিল। এক বছরের জন্য। এক বছর হয়ে গেলে আবার এক বছর। এর মধ্যেই কী একটা গল্প প্রতিযোগিতায় সেকেন্ড হয়ে, আবার ছ’মাসের জন্য বই পেয়েছিলাম। সে-গল্পটা নেই। অনেক কিছুর মতোই হারিয়ে গেছে। ওই কাব্যরোগের কারণেই বিয়ের পদ্য ছেপেছিলাম। কাশিমবাজার স্কুলে, শিবব্রত নামে আমার একজন বন্ধু ছিল, ওদের একটা ছোট প্রেস ছিল। ওখানেই গোলাপি কাগজে বিয়ের পদ্য ছেপেছিলাম। এর আগে অন্য কোথাও বিয়ের পদ্য দেখেছি, বাবা-মা, পিসি-মাসিরা আশীর্বাদ করত— ‘তোমরা দুজনে এ নব জীবনে পাড়ি দিও বহু পথ…’ বন্ধুরা রঙ্গতামাশা করত। আমাদের পিসিমা-মাসিমারা হল বাঙাল। এসব কায়দাকানুন জানে না। আমিই কিছু একটা লিখেছিলাম বারো-চোদ্দ লাইন— ‘রাঙাদার বিয়েতে কত না হৈ-চৈ/ খাব লুচি, রসগোল্লা, সন্দেশ দৈ/ নতুন বৌদি এসে ঘর করবে আলো/ পিসিমার শান্তি হবে, মন হবে ভাল…’ এরকম। লজ্জায় বিলি করিনি। শুধু আমার কয়েকজন ভাইবোন, আর স্কুলের বন্ধুদের দিয়েছিলাম। শিবব্রত ছাড়া আর দু’জন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেছিলাম।

ওই যে ইস্কুল ম্যাগাজিনের কবিতাটা, ওখানে ছিল ‘ও রাখাল গরু চরাস নে রে আজ’ ওটা কী করে লিখেছিলাম? আমি কি রাখাল দেখেছিলাম নাকি কোনওদিন? রাখাল তো জেনেছি বইয়ে, বইয়ের ছবিতে। আর ওটা তো রবীন্দ্রনাথের, ‘নীল নভোঘনে আষাঢ় গগনে/ তিল ঠাঁই আর নাহিরে,/ ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের/ বাহিরে…’ কবিতাটির পুরোপুরি প্রভাব। পরে বুঝেছি।

রাঙাদার বিয়ের সাত-আটমাসের মধ্যেই রাঙাদা আমেরিকা চলে গেল। খড়গপুর থেকে এম টেক করা ছিল, কিন্তু ওখানে গিয়ে আবার এম.এস করতে হল। আমি ততদিনে হেয়ার স্কুলে ভরতি হয়ে গেছি। আমি ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটেই থাকছি, ওখানে ঠাকুর্মা, ছোটকাকু এবং কাকিমা আছে, ছোটকাকুরও বিয়ে হয়ে গেছে অল্প কিছুদিন আগে। আমি ছোটকাকুর সঙ্গেই আছি। আমি-ঠাকুর্মা বারান্দায়, কাকু-কাকিমা একটা ঘরে। প্রায়ই পিসিমার বাড়িতে খাই, টুকটাক বাজার করি।

১৪ বি গ্যালিফ স্ট্রিট আর ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের মধ্যে একটা মাত্র বাড়ি। মানে তিরিশ সেকেন্ডের দূরত্ব। প্রায়ই যেতাম ওই বাড়ি। বিয়েতে পাওয়া রেডিওগ্রামে গান শুনতাম। রেডিওগ্রাম হল একটা বেশ বড় যন্ত্র। উপরে রেডিও। গমগম করে আওয়াজ রেডিওর তলায় একটা বেশ বড়সড় খুপরি। ওখানে রেকর্ডপ্লেয়ার আছে। ছ’টা গ্রামোফোন রেকর্ড পরপর সাজিয়ে রাখলে, ওই যন্ত্র পরপর বাজিয়ে যায়। একটা রেকর্ড শেষ হয়ে গেলে, নিজে- নিজেই আরেকটা রেকর্ড বসে যায়, স্টাইলাসটাও ঠিকঠাক জায়গা মতন সেট হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালে সেটা খুবই আধুনিক একটি যন্ত্র। এখন এসব অ্যান্টিক। খুঁজলেও পাওয়া দুষ্কর। আমি গান শুনতে যেতাম। রাঙাদা বিদেশে। নববিবাহিতা বউদি। প্রায়ই বাজত— ‘কেটেছে একেলা বিরহের বেলা আকাশকুসুম চয়নে…’ কিম্বা ‘ওই জানলার ধারে বসে আছে করতলে রাখি মাথা’, ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’— এইসব গান চালাত বউদি। এগুলো সব বিরহের গান। আমি হলাম দেওর। বউদির সঙ্গে ঠাট্টা-সম্পর্ক, কিন্তু আমি কক্ষনো ইয়ারকি-ফাজলামো করতাম না। শ্রদ্ধা-ভক্তি করতাম। গুরুজনরা যেমন মান্য হয়ে থাকেন, তেমনভাবেই। বউদি ‘ফেমিনা’ নামে একটা ইংরিজি পত্রিকা রাখত। এখন জানি— এইসব পত্রিকাকে বলে লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন। তখনও ‘সানন্দা’ বেরোতে অনেক দেরি। ওই পত্রিকাতে সুন্দরী মেয়েদের ছবি থাকত প্রচুর। আমি মাঝে-মাঝে দেখতাম কিছুটা লুকিয়ে। বাড়িতে হিমানী স্নোর বদলে ল্যাকমে ঢুকল, হিমালয়ান থেকে পাউডারের বদলে পনড্‌স ঢুকল, ল্যাকমে, অ্যান ফ্রেঞ্চ— এই সব। পিসিমা একটু রাগ করত। অন্য পিসিরা, যারা মেজপিসিমার বোন, ওদের আস্তে-আস্তে বলত, বউমার বড় বেশি স্টাইল। কিন্তু পিসেমশাইয়ের মধ্যে কোনও উষ্মা দেখিনি।

বউদি বাপের বাড়ি গেল। মহিলাদের মুখে পোয়াতি কথাটা শুনেছিলাম শৈশব থেকেই। মানেটাও বুঝতাম। পুরুষ গুরুজনরা বলত গর্ভবতী, দাদু বলতেন অন্তরাবর্তী। কিছুদিন পর বউদি ফিরল কোলে বাচ্চা নিয়ে। ছেলে হয়েছিল। পিসেমশাই নাম রাখলেন সুজিত।

পিসিমা আমায় বললেন, খোকা, তুই এখানেই থাক। ও বাড়িতে তোর ঠাকুর্মার কষ্ট হয়। আসলে কাকিমাকে কলেজে ভরতি করে দেওয়া হয়েছে ততদিনে। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পরই, কাকিমার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে, প্রায় দু’বছর। আমার পিসেমশাই উদ্যোগ করে, কাকিমাকে কলেজে ভরতি করিয়ে দিলেন। মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজে। ছোটকাকু অফিসে যায়। কাকিমা কলেজে, তারউপর আমার ইস্কুল। ঠাকুর্মাকেই করতে হয়, তার উপর কাকিমাও যতটা পারে করে। ফ্রিজ, গ্যাস ইত্যাদি আমাদের স্বপ্নের বাইরে। মা বিরাটিতে, দাদুও বিরাটিতে। ঠাকুর্মা এখানে। আমি পিসিমার বাড়িতেই থাকতে লাগলাম। সেই ১৪ বি গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ি।

রাঙাদা বিদেশে। নববিবাহিতা বউদি। প্রায়ই বাজত— ‘কেটেছে একেলা বিরহের বেলা আকাশকুসুম চয়নে…’ কিম্বা ‘ওই জানলার ধারে বসে আছে করতলে রাখি মাথা’, ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’— এইসব গান চালাত বউদি। এগুলো সব বিরহের গান। আমি হলাম দেওর। বউদির সঙ্গে ঠাট্টা-সম্পর্ক, কিন্তু আমি কক্ষনো ইয়ারকি-ফাজলামো করতাম না। শ্রদ্ধা-ভক্তি করতাম। গুরুজনরা যেমন মান্য হয়ে থাকেন, তেমনভাবেই।

এই বাড়িতে কলঘর নয়, বাথরুম। বাথরুম পিসেমশাইদের দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতেও ছিল। উপরে শাওয়ার। চৌবাচ্চা নেই। পাম্পে জল ওঠে, ছাদে ট্যাঙ্ক, চব্বিশ ঘণ্টা জল। পায়খানা কিন্তু কমোড ছিল না। এই বাড়িতে কমোড। তার উপর গিজার। গরম জল পাওয়া যায় ইচ্ছে হলেই। বাথরুমে গামছা নয়, তোয়ালে। বাথরুমের দেওয়াল মোজাইক করা। এ-বাড়ির প্রায় পুরোটাই মোজাইক করা। চারতলা বাড়ি। চারতলায় মাত্র একটা ঘর।  একতলায়  গ্যারেজ এবং দুটো ঘর। দোতলায় তিনটে ঘর, তিনতলায় দুটো, চারতলায় একটা ঘর। দোতলা এবং একতলার মাঝখানে, গ্যারেজের ঠিক ওপরে একটা ম্যাজেনাইন ফ্লোর ছিল, আমি ওখানেই থাকতে লাগলাম। কিন্তু দোতলার বাথরুমে যেতাম না। আমার ভয় করত, পিসেমশাইয়ের তোয়ালে কী করে ব্যবহার করব? ওই একই সাবান কী করে? ততদিনে আমার গোঁপ-দাড়ি গজিয়ে গেছে। ক্লাস ইলেভেন হবে-হবে। জাঙ্গিয়া পরছি এবং গোপনে জাঙ্গিয়া শুকোচ্ছি। মাঝেমধ্যে দাড়িও কাটতে হচ্ছে। কী করে ওই বাথরুমে দাড়ি কাটব?

আমার দাদুকে দাড়ি কাটতে দেখেছি অনেক সরঞ্জাম জোগাড় করে। ভাঁজ করা যায় এমন একটা ছোট আয়না রাখতেন, জানলার লাছে একটা বাটিতে কিছুটা জল, একটা গোল মতো সাবান। গোদরেজ সেভিং সোপ। একটা ব্রাশ। বাটির জলে ব্রাশ ডুবিয়ে বাটির সাবানে ব্রাশ ঘষে মুখে মেখে, ক্ষুর দিয়ে দাড়ি কামাতেন। বাবা ক্ষুর দিয়ে নয়, সেফটি রেজার দিয়ে। ধাতব দু’টি প্লেটের মাঝখানে, ব্লেড সেট করে দিয়ে রেজারের হাতলটা বসিয়ে দাড়ি কামাতেন। সবচেয়ে সস্তা ব্লেড ছিল ‘ভারত ব্লেড’। ‘সেভেন ও ক্লক’ ছিল দামি ব্লেড। দামি ব্লেডে ধার বেশি, বেশিবার দাড়ি কামানো যেত। বাবা দাড়ি কামিয়ে ব্লেডটা ধুয়ে, হাল্কা করে মুছে— যত্ন করে রেখে দিতেন পরেরবারের জন্য। আরও ছোটবেলায় দেখেছি, বাড়িতে নাপিত আসত। নামটাও মনে পড়ছে। শীতল। ছোটখাটো চেহারা। বিহারি। একটা খবরের কাগজের মাঝখানে গোল গর্ত করে মাথাটা ঢুকিয়ে দিতে হত।  চুল গায়ে পড়ত না। আমি দোতলায় পিসেমশাইয়ের বাথরুমে গোপনে দাড়ি কামিয়েছি কয়েকবার। পিসেমশাইয়ের সেফটি রেজারে নয় আমার নিজের। কী করে পেরেছিলাম? ওটা ছিল রাঙাদার। রাঙাদা বিদেশে চলে যাওয়ার পরে, রাঙাদার কয়েকটা জিনিস আমি পেয়েছিলাম।  

ম্যাজেনাইন ফ্লোর— মানে দেড়তলার ঘরে, আমার জগত। আমার নিজস্ব জগত। আমার কতই-না সম্পত্তি। যেহেতু হেয়ার স্কুলে পড়ছি তখন, পুরনো বই কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতে, কত রকম বই কিনছি এক টাকা দু’টাকায়। আট আনাতেও পেতাম স্বপন কুমারের গোয়েন্দা বই— ‘গোয়েন্দা দীপক অ্যাসিস্ট্যান্ট রতন’, ‘চলন্ত ছায়া’, ‘বিষাক্ত হাসি’ ‘চায়না লজ’, ‘বিজয়িনী তন্দ্রা’— এইসব বই যেমন ছিল, আবার ‘সহজকথায় মার্কসবাদ’, ‘আদিম সমাজ’ এইসব বইও ছিল; আসলে কাশিমবাজার স্কুলে নীচু ক্লাসে আমি র‍্যাঙ্ক করতাম বলে, প্রাইজ পেয়েছিলাম, ‘রবিনসন ক্রুশো’, ‘মানুষ কী করে গুনতে শিখলো’, ‘গভীর জলের রহস্য’— এইসব বই। এছাড়াও, বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মাঠে রাশিয়ান বইয়ের স্টল বসত। ওখান থেকেও কিছু বই কিনেছিলাম। যেমন, ‘পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ ‘মানুষের শ্রমবিকাশ’, ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’, ‘দুনিয়া কাঁপানো ১০ দিন’— এইসব বইপত্র কিনে ফেলেছিলাম। সব বইগুলোর উপরে আমার নাম লিখতে খুব ভাল লাগত। আমি ভিতরের পাতায় কখনও লিখেছি, ‘স্বপন তোকে দিলাম।’ স্বপন চক্রবর্তী। ও হ্যাঁ, আমি তো স্বপন, স্বপ্নময় কী করে হলাম, কেন হলাম— পরে জানাব।

এইসব বইপত্র ছাড়াও, আমার আরও কিছু নিজস্ব সম্পত্তি ছিল। যেমন একটা সাপের খোলস; খালধারে রামরতনের বাগানে পেয়েছিলাম এটা। কিছু রিঠার বীজ, একটা গুলতি; যদিও গুলতি ব্যবহার করিনি কখনও। একটা ব্যাঙকটকটি— একটা টিনের খেলনা, টিপলে, কট-কট শব্দ হত। একটা সিনেমা বাক্স — এটা অনেক ছোটবেলার সম্পত্তি, দু’আনা কিংবা চারআনায় এরকম একটা বাক্স পাওয়া যেত। একটা কাচ বসানো থাকত, ফিল্মের টুকরো আটকে দিতে হতো উল্টোদিকে। এরকম টুকরো ফিল্ম কিনতে পাওয়া যেত বেশ বড় করেই দেখা যেত— মিনা কুমারী, মধুবালা, রাজ কাপুর, বৈজয়ন্তীমালা…। এসব অনেক পুরনো। তবুও ফেলিনি। এইসব সম্পত্তিতে ভরা ছিল দেড়তলার ওই ঘর। আমার নিজের। সবই পিসেমশাইয়ের দয়ায়। এই যে সম্পত্তি, এসব কিনতে তো পয়সা লেগেছে। পেয়েছি কীভাবে? বাবা মাসে ১৫ টাকা হাত খরচ দিতেন, আর পিসিমাদের বাজারটা করতাম প্রায়শই। পিসিমাদের বাড়িতে একজন সবসময়ে থাকার লোক থাকত; সেই গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ি থেকেই দেখেছি ধনঞ্জয়দাকে, মনে পড়ে, ঝুলবারান্দায় থাকত। কালির বড়ি গুলে, দেওয়ালে ছবি আঁকতো, বাঁশি বাজাচ্ছে কৃষ্ণ, পাশে রাধা, তীর-ধনু হাতে রাম। দেশের বাড়িতে মাটির দেওয়ালে আঁকা ছবি দেখেছি পরবর্তীকালে, তখন ধনঞ্জয়দার দেওয়ালচিত্রের কথা মনে পড়ত।

আমি  ১৪বি গ্যালিফ স্ট্রিটে আসি।  ওই বাড়িটা পিসেমশাইয়ের খুব প্রিয় ছিল, একটা লোক ডেকে, মোজাইক মেঝে মাঝেমধ্যে পালিশ করাতেন, দেওয়ালে কোনও দাগ লেগে গেলে, ওঠাবার চেষ্টা করতেন। দোতলায় থাকা-বসা, কিন্তু রান্না-খাওয়া তিনতলায়; আমার পিসিমার দোতলা তিনতলা ওঠানামা করতে হত। দোতলায় রান্নার ব্যবস্থা ছিল না। ও বাড়িতে সর্বক্ষণের লোক ছিল বিভিন্ন সময়ে। মদন, হরিপদ, মনোরঞ্জন এরা। তারপর জয় নামে একটি ছেলে। মনোরঞ্জন থাকার সময়ে, পিসিমা আমাকেই বাজারে পাঠাতেন; আমি নাকি ভাল বাজার করি। না কি পিসিমার মনে হত— মনোরঞ্জন পয়সা চুরি করে, কিন্তু চুরি তো আমিও করেছি। দশটাকার বাজারে, চারআনা নিজের রেখে দিতাম প্রায়শই। তখন মনে হত, চারআনা ওদের কাছে কিছু নয়, ততদিনে তো ‘শ্রেণি’ ব্যাপারটা মাথায় ঢুকেছে। পিসেমশাইরা ধনী, সুতরাং সারপ্লাস মানি দু’চারআনা না সরানো অন্যায় নয়। এরকম একটা তত্ত্ব খাড়া করেছিলাম। কিন্তু অনুতাপও হত। মনে হত— আমি তো আগেও চুরি করেছি খুচরো পয়সা। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে, পকেট থেকে; আমি তো তবে চোর! যদি আমি বলি, ‘চারআনা পয়সা দেবে মেজপিসি?’ তাহলেই তো দিয়ে দেবে, বরং সেটাই ভাল। যদি এক টাকা চার আনা ফিরত, আমি বলতাম চার আনা রেখে দিই আমি, কিংবা কখনও বলতাম, তিনটে কচুরি খেয়ে নিয়েছি। আসলে খেতাম না। পয়সাটা রেখে দিতাম। স্কুলে যাবার সময়ে ট্রামে যেতাম, কিন্তু ফেরার সময়ে মাঝেমধ্যেই হেঁটে ফিরতাম কলেজ স্ট্রিট থেকে। পুরনো খাতাটাতা, পঞ্জিকা এটাসেটা সেরদরে বিক্রি করতাম যখন, বৌদির পুরনো ফেমিনা বিক্রি করে দিতাম। পিসেমশাইরা যখন কারখানা বাড়িতে থাকতেন, তখন দেখেছি ‘বসুধারা’ নামের একটা সাময়িক রাখতেন। বোধ হয়, মাসিক। অনেক পরে, ‘দেশ’ পত্রিকা রাখতেন। বাঁধিয়ে রেখেছিলেন বেশকিছু। প্রফুল্ল রায়ের ‘পূর্ব-পার্বতী’ ধীরাজ ভট্টাচার্যের ‘যখন নায়ক ছিলাম’ এইসব ছিল। খাবলে-খাবলে পড়েওছিলাম। শিবরাম চক্রবর্তী ‘অল্পবিস্তর’ নামে একটা কলাম লিখতেন। ‘ট্রামে বাসে’ নামে একটা কলাম থাকত, যেখানে সে-সময়ের ঘটনা নিয়ে ট্রাম বাস যাত্রীদের মধ্যে আলোচনার রসালো উপস্থাপনা থাকতো। কিছু পত্রপত্রিকা সের দরে বিক্রি হত খবরের কাগজের সঙ্গে। দুটো খবরের কাগজ রাখা হত। উপরে আসত ‘আনন্দবাজার’। নীচের কারখানায় ‘যুগান্তর’, যখন ওরা গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে দিলেন, তখন আমাদের খবরের কাগজ নিয়মিত রাখা হত না। কারখানা থেকে আগের দিনের ‘যুগান্তর’টা নিয়ে আসা হত, সে-সবও বিক্রি করে দিতাম।