চম্বল থেকে মরিচঝাঁপি
পুলিশ ফুলন দেবীর ঘাতক শের সিং রানাকে তিহার জেল থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় সে পালিয়ে গিয়েছিল। দু-বছর পর, ২০০৬-এর ২৫ এপ্রিল। কলকাতার ব্যস্ততম এলাকা ধর্মতলার মোড়ে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) অফিসাররা জাপটে ধরলেন এক যুবককে, সেই শের সিং রানা ওরফে পঙ্কজ সিং পুণ্ডিকে! জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, তিহার থেকে পালিয়ে কলকাতা হয়ে সে বাংলাদেশে খুলনা শহরে ছিল কিছুকাল। ফের কলকাতায় এসে, ধরা পড়ে যায়। নেপাল যাওয়ার মতলব এঁটেছিল সে। শের সিংয়ের তো ফের তিহার জেলে ঠাঁই হল। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল তার। ২০১২ সালে কারাগার থেকে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি চাইলে, আদালত তাকে সেই সম্মতি দেয়। তবে ভোটে জিততে পারেনি। ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর শের সিং রানাকে দিল্লি হাই কোর্ট জামিন দিয়ে দিয়ে দেয়। এরপর আর এ-মামলা গড়িয়েছে বলে খবর পাইনি। এখন বছর ৫০ বয়স শের সিং রানা-র, রাজনীতি করে উত্তরপ্রদেশ আর নিজের রাজ্য উত্তরাখণ্ডে, ২০১৯-এ নিজের দল গড়েছে— রাষ্ট্রবাদী জনলোক পার্টি।
ওদিকে ১৯৮১ সালে ফুলন দেবী ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে বেহমাই গ্রামে গণহত্যার যে মামলা কানপুর আদলতে আনা হয়েছিল, তার রায় বের হয় ৪৩ বছর পর। এই মামলায় ফুলন দেবী-সহ মোট ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে ফুলন দেবী ও তাঁর দলের বেশ কিছু সদস্য আত্মসমর্পণ করলেও, বাবা মুস্তাকিন, রামরতন, অশোক-সহ অনেকেই ছিলেন পলাতক। মামলায় অভিযুক্ত ১৭ জনের মধ্যে ফুলন-সহ ১৫ জনই মারা গিয়েছেন। ৪৩ বছরে রায়দানের সময় কানপুরের কারাগারে ছিলেন ফুলনের দলের ৮৫ বছর বয়সি সদস্য শ্যামবাবু, বিচারক শ্যামবাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। জেলবন্দি অপর অভিযুক্ত ৫৮ বছর বয়সি বিশ্বনাথকে ঘটনার সময় নাবালক থাকায় খালাস দেওয়া হয়েছে। ১৯৮০ সালে গণধর্ষিতা বিধ্বস্ত ফুলনকে পিতৃস্নেহে আশ্রয়দান করেছিলেন যে বাবা মুস্তাকিন, তিনি ১৯৮৩ সালে ফুলনের সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেননি। ১৯৮৫ সালে পলাতক অবস্থায় মুরেনার কাছে এক বেহড়ে পুলিশের গুলিতে বাবা মুস্তাকিন নিহত হন।
মালখান সিং, ফুলন দেবীর আত্মসমর্পণের পর কিন্তু চম্বলে শান্তি ফেরেনি, প্রতিহিংসার হাওয়া ঘুরপাক দিয়ে চলেছে চম্বল নদীর বেহড়ে। শান্তির বার্তা নিয়ে নিশ্চয় এখনও ঘুরছেন গান্ধীবাদী আচার্য বিনোবা ভাবের অনুগামী সর্বোদয়ীরা। কিন্তু শান্তি নামেনি। মালখান, ফুলনের আটের দশকীয় দাপাদাপির পর নব্বই দশকের গোড়া থেকে ১৫ বছর ধরে উত্তরপ্রদেশের জালাউন, ইটাওয়ার বেহড়ে তৎপরতা চালিয়েছেন নির্ভয় সিং গুজ্জর। ২০০৫ সালে ইটাওয়ায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশের গুলিতে ইটাওয়ায় নির্ভয় নিহত হন। নির্ভয়ের বাগী দলে তাঁর স্ত্রী সীমা পরিহারও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে ফুলন দেবীর মতো সীমাও সমাজবাদী পার্টির মহিলা নেত্রী হয়েছিলেন। নতুন শতাব্দীর সূচনাকালে রাজস্থানের ঢোলপুর ও তার লাগোয়া মধ্যপ্রদেশের মুরেনা অঞ্চলের বেহড়ে দাপাদাপি শুরু হয় যে বাগী দলটির, তার নেতৃত্বে ছিলেন জগন গুজ্জর। দেড় দশকের তৎপরতার শেষে ঢোলপুরে ২০১৯-এ জগন ও তার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
চম্বলে একমাসের অধিককাল কাটিয়ে আমরা ফিরি ১৯৮১-র জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে। তবে আর-একটি কাজের দায়িত্ব থাকায় ফেরার পথে আমরা নেমে পড়েছিলাম রায়পুরে, সে-সময়ে বাংলায় আলোড়ন ফেলা মরিচঝাঁপির ঘটনার পরবর্তী সংবাদ সংগ্রহে। সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি দ্বীপ থেকে বিতাড়িত হয়ে যে-উদ্বাস্তুরা ফের মধ্যভারতে শরণার্থীদের আশ্রয়গুলিতে ফিরে গিয়েছিলেন, তাঁদের হালহদিশ জানতে। মধ্যভারতের দণ্ডকারণ্য অঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলি থেকে বাঙালি উদ্বাস্তুরা ১৯৭৭-’৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে এসে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি দ্বীপে বন কেটে বসতি স্থাপন করেন। বাঘের অভয়ারণ্য বলে ঘোষিত ওই দ্বীপটিতে রীতিমতো ঘরবাড়ি নির্মাণ, প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, এমনকী, চিকিৎসাকেন্দ্রও তাঁরা গড়ে তোলেন। নৌকাযোগে আশপাশের বসবাসের উপযুক্ত দ্বীপে দোকান-বাজার করা, পানীয় জল নিয়ে আসা, এসবও তাঁরা চালিয়ে যেতে থাকেন।

তখন পশ্চিমবঙ্গে সবে জ্যোতি বসুর বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় বসেছে, মরিচঝাঁপির ঘটনায় বামফ্রন্ট সরকার নড়েচড়ে বসে। সেসময় রাজ্যের বেশ কিছু বিশিষ্টজন, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুদের পাশে রাজ্য সরকারের সহায়তার দাবি জানিয়েছিলেন। পান্নালাল দাশগুপ্ত (‘যুগান্তর’, ২৪ জুলাই ১৯৭৮ ও ২৬ জুলাই ১৯৭৮), জ্যোতির্ময় দত্ত (‘যুগান্তর’, ২৭ ও ৩০ জুলাই ১৯৭৮) প্রতিবেদন লেখেন। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় ১৯৭৮-এর ১৩ এপ্রিল বরুণ সেনগুপ্ত লেখেন একটি প্রতিবেদন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মরিচঝাঁপি দ্বীপে গিয়েছিলেন। কলকাতায় ফিরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় সম্পাদক সমীপেষুতে একটি কাতর আবেদন করেছিলেন, ‘সারা রাজ্য জুড়ে এখন বন্যা। বন্যার্তদের সমস্যা এই মুহূর্তে এখন অনেক বড়। সব উদ্যম সেদিকেই এখন নিযুক্ত থাকা উচিত। এরই মধ্যে আবার পুলিশ দিয়ে উদ্বাস্তুদের দমন করার চেষ্টা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাক না। এর মধ্যে দু-একটা বাঘ মরে তো মরুক, জঙ্গলের কিছু কাঠ কাটা যায় তো যাক, তবু মানুষগুলো বেঁচে থাক।’
মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ‘দণ্ডকারণ্য ফেরত উদ্বাস্তুদের প্রতি’ শীর্ষক একটি বিবৃতিতে মরিচঝাঁপি থেকে উদ্বাস্তুদের দণ্ডকে ফিরে যেতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সুন্দরবনে আর চাষের যোগ্য এবং বসবাসের উপযুক্ত জমি নেই। ওই বিবৃতিটিতে সবিনয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু মরিচঝাঁপিতে বসতি গড়া উদ্বাস্তুদের বলেছিলেন, ‘…আপনারা দণ্ডকারণ্যে ফিরে চলুন, সেখানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করুন। এই উদ্যমে পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট সরকার আপনাদের সঙ্গে আছেন, আপনাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করবেন।’
পুলিশি অভিযান চলছিল-ই, পুলিশকে সহায়তায় ছিল পার্টির সশস্ত্র দলবলও। এরপর বাঘের জঙ্গলে, কুমির-ভরা নদীতে এক অসম জলযুদ্ধ। ১৯৭৯-এর মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দু’টি রাতের ওই জলযুদ্ধ ও জলাজঙ্গলে এদিক-সেদিক গুলি, আগুনের পর ফাঁকা হয়ে গেল মরিচঝাঁপি। প্রথমদিকে দগ্ধ দ্বীপটিতে ঘুরে দেখেছেন কেউ-কেউ। মরিচঝঁপি নিয়ে বই বেরিয়েছে কয়েকটি, তথ্যচিত্রও হয়েছে খানদুয়েক। আমার বন্ধু ও সহকর্মী মধুময় পাল ‘মরিচঝাঁপি ছিন্নদেশ, ছিন্ন ইতিহাস’ নামে যে-সংকলনটি করেছেন (‘গাঙচিল’), এ-লেখায় সে-বইটির সাহায্য নিয়েছি।

কতজন মরিচঝাঁপিতে মারা গিয়েছিলেন? ‘কবিতা থেকে মিছিলে’ বইখানি যিনি লিখেছেন, বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র সরকারিভাবে জানিয়েছিলেন, দু’জন। মরিচঝাঁপি নিয়ে তদন্ত, অনুসন্ধান, তথ্য-সংগ্রহকারী গ্রন্থসকল ও তথ্যচিত্র তা মানে না। কুমিরমারি দ্বীপের আরএসপি পঞ্চায়েত প্রধান প্রফুল্ল মণ্ডল সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুলিশের লঞ্চে বস্তাবোঝাই লাশ দেখেছেন তিনি। মরিচঝাঁপির দগ্ধ কুটিরে দেখেছেন, পাঁচ-ছ’টি আধপোড়া বালকের মৃতদেহ। মরিচঝাঁপি থেকে উদ্বাস্তুরা প্রাণভয়ে অধিকাংশরাই পালিয়ে হাসনাবাদে গিয়েছিলেন। দলে-দলে মানুষকে পুলিশ প্রশাসন ধরপাকড়ের পর দণ্ডকে পাঠিয়ে দেয়। বাকি অনেকেই দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন রেলস্টেশনের ধারে, শহরতলির ফাঁকফোকরে সেকালে যে যেমন পেরেছেন, ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করে দক্ষিণবাংলার জনজীবনে মিশে গিয়েছে। আমাদের অঞ্চলে কোন্নগর, ভদ্রেশ্বর, মানকুণ্ডুতে আমি ওইরকম ঝুপড়ি, পরবর্তীকালে বস্তিও দেখতে পেয়েছি।
মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ‘দণ্ডকারণ্য ফেরত উদ্বাস্তুদের প্রতি’ শীর্ষক একটি বিবৃতিতে মরিচঝাঁপি থেকে উদ্বাস্তুদের দণ্ডকে ফিরে যেতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সুন্দরবনে আর চাষের যোগ্য এবং বসবাসের উপযুক্ত জমি নেই। ওই বিবৃতিটিতে সবিনয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু মরিচঝাঁপিতে বসতি গড়া উদ্বাস্তুদের বলেছিলেন, ‘…আপনারা দণ্ডকারণ্যে ফিরে চলুন, সেখানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করুন। এই উদ্যমে পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট সরকার আপনাদের সঙ্গে আছেন, আপনাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করবেন।’
মরিচঝাঁপির ঘটনা যখন ঘটে, তখন আমি সবে ‘পরিবর্তন’ পত্রিকায় যোগ দিযেছি। এর বছরদেড়েক বাদে ১৯৮০-র শেষে আমি যখন চম্বল যাই, তখন রায়পুরে নেমে মানা-র শরণার্থী শিবিরে যাই, আশপাশের অঞ্চলেও দিনতিনেক ঘুরি, মরিচঝাঁপি থেকে উৎখাত হওয়া উদ্বাস্তুদের হাল দেখতে। মানা-র উদ্বাস্তু পল্লিতে আমি দেখেছি নবজাতক শিশু কোলে মা-কে। দাওয়ায় বসে তামাক খেতে-খেতে ঠাকুরদাদা বালক নাতিকে পড়াচ্ছেন ‘কোন্ দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল’, কিশোরী পায়ে আলতা পরছে। তখনও দণ্ডকে বাংলা পড়ার ২৯৬টি প্রাথমিক স্কুলের ভেতর টিকে ছিল ১৯৬টি স্কুল, তাও আবার অস্থায়ী চালাঘরে। মানা-র শিবিরেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল উদ্বাস্তু উন্নয়নশীল সমিতির নেতা সতীশ মণ্ডলের। তিনি আর রঙ্গলাল গোলদার ছিলেন মরিচঝাঁপিতে যাওয়া শরণার্থীদের নেতা। সতীশ মণ্ডল আমাকে জানিয়েছিলেন। বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী রাম চ্যাটার্জি দণ্ডকে এসে তাঁদের বলেছিলেন, বাংলায় ফিরে আসুন। সতীশ মণ্ডল বলেছিলেন, তাঁরা দণ্ডকের রুক্ষ ভূমিতে ফসল ফলিয়েছেন, ভেড়িতে মাছ ধরছেন। তবু আমরা কেবল বাংলায় ফিরতে চেয়েছিলাম।
অনেককাল আগের কথা। মধ্যভারতে ওই বাংলা যেন ভাসমান।



