আসর-স্মৃতি
ছোটবেলায় শীতকাল আর গানবাজনার সারারাতের আসর ছিল আমার কাছে সমার্থক। সেসব সময়ে যেমন শীতকালের সঙ্গে কমলালেবু, সার্কাস, ক্রিকেট বা চিড়িয়াখানার একরকম অব্যর্থ যোগাযোগ ছিল, তেমনই আমাদের ছিল রাতজাগা সব আসর। কলকাতার নামিদামি আসরেরা তো ছিলই সেই তালিকায়, যাদের বিশেষ খ্যাতি গড়ে ওঠেনি, সেসব ছোটখাট বা অনামী আসরও বাদ যেত না। মা বা মামা-র গান থাকত যেখানে-যেখানে, সেসব আসরে জায়গা তো পাকা, কিন্তু যেসব আসরে তাঁদের গান নেই, সেখানেও আমি ঠিক ঢুকে পড়তাম যা-হোক ক’রে। কলকাতা থেকে খুব দূরে হলে হয়তো গিয়ে উঠতে পারতাম না, কিন্তু কাছাকাছির মধ্যে সারারাত গানবাজনা হবে আর আমি তা শুনতে পাব না, এ-জিনিস মন থেকে মেনে নেওয়ার বান্দা আমি ছিলাম না।
মায়ের নামে কার্ড আসত বহু আসরের, তারা ছিল আমার জোরের জায়গা। বাবা-ও সাংবাদিক হিসেবে অনেক আসরের আমন্ত্রণ পেতেন। বাবা-র সঙ্গে সেসব আসরে যে কত গেছি, তার লেখাজোখা নেই, অনেক সময়ে বাবা-র কার্ড নিয়ে আমিই দিব্যি শুনে এসেছি রাতভর গানবাজনা। তেমন রাতজাগাদের আনন্দই আলাদা। একটু ছোট থাকতে বাড়ি থেকেই খেয়েদেয়ে যাওয়ার নিয়ম ছিল, স্কুলের গণ্ডি পেরনোর পর সেটাও আর রইল না। রাত আটটা নাগাদ ঢুকে গেলাম কোনও আসরে, দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ টুক করে বেরিয়ে কাছাকাছি যা পাওয়া যায় খেয়ে নিয়ে চাদরমুড়ি দিয়ে আবার ফেরত। তখন বেশিরভাগ আসরই হতো ম্যারাপ বেঁধে, বিশাল শামিয়ানা ক’রে। শীতও পড়ত বেশ জাঁকিয়ে। মাটি থেকে উঠে আসা ঠান্ডা আর ম্যারাপের চারপাশ থেকে ঢুকে আসা শীতল হাওয়া, এর মধ্যে ঠায় ব’সে একের পর এক জাদুকরদের সুরের খেলা শুনে যাওয়া, এর কোনও তুলনা ছিল না আর।
ব্যাপারটা সবসময়ে এত সহজও হত না অবশ্য। কোনও জলসার কার্ড হয়তো এসে পৌঁছল না আমাদের বাড়ি। তখন কী হবে? যাব না গানবাজনা শুনতে। বাবা-মা’কে বলে লাভ নেই জানি, ওঁরা কোনও আমন্ত্রণ চেয়ে নিতেন না কখনও। কিন্তু আমি যেতে চাইলে না করতেন না। শুনে আসতে বলতেন, যেভাবে হোক।
এখন প্রশ্ন হল, যেভাবেটা কীভাবে? সাধারণ শ্রোতাদের জন্যে টিকিট তো থাকতই, আজও যেমন থাকে। কিন্তু তা কেনার সামর্থ্য আমার কোথায়? আমিও বাবা-মা’র কাছ থেকে হাতখরচ নেওয়া বন্ধ করেছি ততদিনে। তাই তাঁরা যেমন কার্ড চাইতে পারতেন না, আমিও টিকিট কেনার অতখানি টাকা চাইতে পারতাম না। সবচেয়ে বড় কথা, একমাসে হয়তো সাতটা আসর, যাদের আমন্ত্রণ এসে পৌঁছয়নি। ক’টার জন্যে টাকা চাইব?
এসব ক্ষেত্রে নিটোল ছলনা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকত না। তেমনই এক ছলনাময় রাত্তিরের ছোট্ট গল্প এখানে বলি। গড়িয়া-রই এক সম্ভ্রান্ত পাড়া, শ্রীরামপুরে শুরু হল শাস্ত্রীয় সংগীতের বার্ষিক আসর। তখন ওই এলাকায় ওরকম এলাহি আয়োজনের চল একেবারেই ছিল না। শ্রীরামপুরের আসর প্রথমবার তাদের শিল্পী-তালিকা ঘোষণা করেই তাক লাগিয়ে দিল। এত বড়-বড় সব গাইয়ে-বাজিয়ে আমার পাশের পাড়ায় সারারাত গানবাজনা করবেন? আমি তো ধরেই নিয়েছি, কার্ড আসছে বাড়িতে। কিন্তু ওই যে, কথায় বলে, গেঁয়ো যোগী। লখনউ থেকে আসরের আমন্ত্রণ এসে পৌঁছলেও, পাশের পাড়া থেকে সেবার এল না। আমার ভারি মনখারাপ তখন। সে-পাড়ায় মধুমিতাদি’র কাছে হপ্তায় একদিন ভূগোল পড়তে যাই, কত চেনাশোনা ছেলেমেয়ের দল সেখানে। তাদের সামনে কোথায় গর্বিত বুকে কার্ড হাতে ক’রে আসরের প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকব, তা না, কার্ডই অনুপস্থিত? কিন্তু দুঃখ পেয়ে বসে থাকলে তো চলবে না, এর একটা বিহিত করা তখন আশু প্রয়োজন, করলামও তাই।
পরপর দু’খানা গাড়ি মাঠের চত্বরে ঢুকল। কর্মকর্তারা হইহই করে দৌড়ে গেলেন। প্রথমটা থেকে নামছেন উস্তাদ জাকির হুসেন স্বয়ং, পরেরটায় তাঁর ছাত্ররা। এখানে বলি, তখনও এ-ধরনের অনুষ্ঠানে বাউন্সারদের ডাকা’র চল হয়নি। এটাও মনে রাখতে হবে যে, সেলফি ব’লে কিছু একটা পৃথিবীতে আসবে, এ-খবরের নাগাল অবধি কারও কাছে নেই। তাই শিল্পীদের চারপাশে একটা আলগা ঘেরাটোপ থাকলেও, বিশাল কড়াকড়ি কিছু থাকত না।
সে-রাতে, যতদূর মনে পড়ছে, উস্তাদ আশিস খানের সরোদের সঙ্গে বাজাবেন উস্তাদ জাকির হুসেন। জাকিরজি-কে ততদিনে বেশ কিছু আসরে সামনে ব’সে শোনার সৌভাগ্য হয়েছে, আশিস খানের বাজনা তখনও শুনিনি। এই দু’জন জোট বাঁধলে ধুন্ধুমার কাণ্ড হবেই নির্ঘাত! তাই ছাড়ার কোনও প্রশ্নই নেই। তখনকার দিনে, গানবাজনার জগতে যাঁরা নিয়মিত ঘোরাফেরা করতেন, বিশেষত যাঁরা গানবাজনা শিখছেন, বা সবে-সবে মঞ্চে উঠছেন, তাঁদের একটা অলিখিত পোশাকবিধি ছিল। এখনও যে নেই, তা বলব না। শীত যত-ই পড়ুক, একটি পাঞ্জাবি, একটি চোস্ত, কায়দা ক’রে জড়ানো একখানি শাল। এই পোশাকেই তারা নানা আসরে ঘুরে বেড়াত, পরস্পরের সঙ্গে চেনাজানাও হয়ে যেত এইভাবে। তাই কোনও আসরে একা পৌঁছলেও, গিয়ে পড়লে আর একা লাগত না। চেনা মুখের ভিড়ে নিজেকে দিব্যি মানিয়ে নেওয়া যেত।
আমি ছোট থেকেই বেজায় শীতকাতুরে, কিন্তু সেবার শিল্পের স্বার্থে স্বাস্থ্যকে অবজ্ঞা করতেই হল। আমন্ত্রণ থাকলে সোয়েটার-জ্যাকেট-মাফলার-টুপি পরেই যেতে পারতাম, কিন্তু এবার অন্য পন্থা। আলমারি থেকে ভাল পাঞ্জাবি আর চোস্ত বের ক’রে পরলাম, বাবা’র একটা ভারী শালও নিলাম। গায়ে জড়ানো যাবে না, একটু কায়দা সহকারে বাঁ’দিকের কাঁধে ফেলে রাখতে হবে। তা-ই সই। অল্প কম্পন-সহ সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ পৌঁছলাম আসর-প্রাঙ্গনে। খোলা মাঠ, শামিয়ানা দেওয়া হয়েছে। গানবাজনার ধুনিতে এলাকা জমজমাট হয়ে আছে। এদিক-ওদিক কর্মকর্তাদের ব্যস্ত আনাগোনা, শ্রোতাদের ভিড় উপচে পড়ছে। মঞ্চের পাশে একটা দরজা করা হয়েছে, সেখান দিয়ে শিল্পীরা ঢুকবেন, এ-কথা আমার জানা। সেখানে বেশ কড়া প্রহরা। একভাঁড় চা নিয়ে এদিক-সেদিক পায়চারি ক’রে ব্যাপারটা একটু বুঝে নিলাম। এ-খেলা কপালের। লাগলে তুমি রাজা, নইলে লজ্জার একশেষ।


আমি যে-সময়টার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ। পরপর দু’খানা গাড়ি মাঠের চত্বরে ঢুকল। কর্মকর্তারা হইহই করে দৌড়ে গেলেন। প্রথমটা থেকে নামছেন উস্তাদ জাকির হুসেন স্বয়ং, পরেরটায় তাঁর ছাত্ররা। এখানে বলি, তখনও এ-ধরনের অনুষ্ঠানে বাউন্সারদের ডাকা’র চল হয়নি। এটাও মনে রাখতে হবে যে, সেলফি ব’লে কিছু একটা পৃথিবীতে আসবে, এ-খবরের নাগাল অবধি কারও কাছে নেই। তাই শিল্পীদের চারপাশে একটা আলগা ঘেরাটোপ থাকলেও, বিশাল কড়াকড়ি কিছু থাকত না। এক্ষেত্রেও তাই হল। শীতের পাড়ার সন্ধেবেলায় রোশনাই ছড়িয়ে হাসিমুখ জাকিরজি সকলকে নমস্কার ক’রে মঞ্চের পাশের দরজাটার দিকে এগোলেন, কর্মকর্তারা তাঁকে ঘিরে আছেন যথারীতি। পিছনে ছাত্রদের যে মিহি দলটা এগোচ্ছে, আমি দিব্যি মাথা চুলকোতে-চুলকোতে সেটায় ভিড়ে গেলাম। একটি ছেলেকে ‘কী, ভাল তো?’ জাতীয় প্রশ্নও করলাম, স্বাভাবিকতা বজায় রাখার জন্য। সে অপ্রস্তুত একটা হাসি ফেরত দিল। সে দিক গে, ততক্ষণে আমার কাজ হয়ে গেছে। আমি ওই ঝাঁকের সঙ্গে নিশ্চিন্তে দরজা’র প্রহরা পার ক’রে অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছি। ব্যস, ছলনা সার্থক!
সে-রাতে আর খেতে বেরোইনি, কারণ এই হাতসাফাই বা পা-সাফাইয়ের খেল বারবার হবে না, পরের বার ধরা পড়লে বাঁচানোর কেউ নেই। সে-রাতে অবশ্য খাওয়ার কথা মনেও ছিল না আর। সিট নম্বর দেওয়া নেই, তাই কোণের দিকের একটা চেয়ার দখল ক’রে সেই যে বসেছিলাম, ওঠা একেবারে ভোরে। মাঝে আশিস খান সাহেব আর জাকিরজি প্রায় ঘণ্টাদুয়েক বাজিয়েছেন, সে-অভিজ্ঞতা ভোলার নয়।
বছরচারেক আগে কলকাতার এক বড় আসরে নিমন্ত্রিত হয়ে যখন গান শুনতে গেলাম, আর জাকিরজি’র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, সেই সেদিনকার উস্তাদ জাকির হুসেন আমার হাতদুটো নিজের দু’হাতের পাতায় মুড়ে সৌজন্য বিনিময় করলেন, তখন আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই সদ্য-যুবকের কথা, যে তাঁর ছাত্র সেজে অবলীলায় ঢুকে পড়েছিল বিনা টিকিটের আসরে। সেই জাদু’র হাতে মিলে গেল আমারও নগণ্য হাতজোড়া, এর চেয়ে বড় হাতসাফাই কে দেখাবে আর?




